ভ্রমণে রোমাঞ্চ ধারাবাহিকে সমীরণ সরকার (পর্ব – ১২)

তীর্থভূমি বীরভূম, ভ্রমণ তীর্থ বীরভূম

রত্ন মন্দির:- ‌
এই জাতীয় মন্দিরের উদ্ভব, স্থাপত্য শৈলী ও বিবর্তন বিষয়ে গবেষকগণের মধ্যে মত পার্থক্য আছে। সাধারণভাবে বলা যায় যে, চালা মন্দিরের উপরের আচ্ছাদনের সৌন্দর্য বৃদ্ধির জন্য পরিকল্পনা থেকে রত্ন মন্দিরের উদ্ভব হয়েছে। প্রাচীন পর্বে রত্ন মন্দিরের কোন নিদর্শন ছিল না। স্থাপত্য শৈলীর বিচারে রত্ন মন্দিরের খুব একটা গুরুত্ব না থাকলেও চালা মন্দিরের সৌন্দর্য বৃদ্ধির ক্ষেত্রে রত্ন মন্দির অধিক আকর্ষণীয়। মন্দিরের প্রথম তলের শীর্ষে মূল শিখরটিকে কেন্দ্র করে সমদূরত্বে চালের চার কোণের দেয়ালের উপরে চারটি ছোট শিখর তৈরি করে রত্ন মন্দির তৈরীর ভাবনাচিন্তা শুরু হয়েছিল বলে মনে করা হয়। অনেকের মতে বুদ্ধগয়ার মহাবোধি মন্দির দেখে বাঙালি মন্দির শিল্পীরা নাকি রত্ন মন্দির নির্মাণের চিন্তাভাবনা করেছিলেন। তবে মনে হয়, এটা কেবল ধারণা মাত্র। কারণ মহাবোধি মন্দিরের সঙ্গে বাংলার পঞ্চরত্ন মন্দিরের তুলনা করা চলে না।
একজন বিশিষ্ট গবেষকের মতে’ কদম রসুল মসজিদের স্থাপত্য শৈলী থেকে বাংলার রত্ন মন্দিরের সৃষ্টি। কদম রসুলের স্থাপত্য শৈলীতে চারকোণে মিনার ও মধ্যস্থলে বড় গম্বুজ
যা ইসলামী স্থাপত্য শৈলী মেনেই নির্মিত হয়েছিল।’
তবে এটাও মনে হয় ঠিক নয়। কারণ,’ কদম রসুল’ নির্মাণের(১৪৭৫–৮০ খ্রিষ্টাব্দ) আগেই বাঙালি শিল্পীদের মধ্যে নতুন চিন্তাভাবনা শুরু হয়েছিল । উড়িষ্যারীতির নাগর শৈলী ধরনের দেউল এই সময়ে মেদিনীপুর, বর্ধমান, পুরুলিয়া, বাঁকুড়ার বিভিন্ন স্থানে অনেক তৈরি হয়েছিল। এই সময়ে সৃজনশীল বাঙালী স্থপতিরা নতুন এক শৈলীর জন্ম দিল— তা হলো রত্ন মন্দির।
অনেকের মতে, পঞ্চরত্ন শৈলীর মন্দির প্রাচীন পঞ্চায়তন মন্দিরের কথা মনে পড়িয়ে দেয়।
অর্থাৎ মূল মন্দিরটির সঙ্গে একই প্লাটফর্মে চার কোণায় চারটি ছোট দেউল নির্মাণ করে পঞ্চায়তন মন্দির হত।
মালদহ জেলার ওয়াড়ির ( হরিশ্চন্দ্রপুর) মন্দির এবং পরবর্তীকালে মুর্শিদাবাদ জেলার পাঁচথুপি ও বর্ধমানের বৈকন্ঠপুর, পুরুলিয়া জেলার বুধপুরে পঞ্চায়তন মন্দির নির্মিত হয়েছিল।
সম্ভবত অমরকন্টক, খাজুরাহো অথবা মহাবোধি মন্দির বাঙালি শিল্পীদের মাথায় পঞ্চরত্ন মন্দির নির্মাণের চিন্তাভাবনা প্রবেশ করিয়েছিল।
বাংলার স্থপতিরা চালা মন্দিরের সঙ্গে প্রচলিত শিখর রীতির মিশ্রণ করে রত্ন মন্দিরের জন্ম দিয়েছেন বলে মনে হয়। রত্ন কথাটির অর্থ চূড়া।
বাঁকানো কার্নিশ ও ঢালু আচ্ছাদনের চার চালা মন্দিরের ছাদের মাঝখানে ছোট্ট শিখর বা পীঢ়া রীতির মন্দির যুক্ত হলেই সেটা একরত্ন শৈলীর মন্দির হয়। এই রত্ন সব জায়গায় যে হুবহু শিখর মন্দিরের মতোই হয়েছে এমনটাও নয়। স্থাপত্য সজ্জায় বৈচিত্র আনার জন্য শিখরের চূড়াগুলোকে কোথাও আটকোণা করা হয়েছে, কোথাও শিখরের ছাদ পীঢ়া দেউলের মত ঘন খাঁজকাটা সমান্তরাল বেষ্টনীযুক্ত করা হয়েছে।
মোদ্দা কথা বাঙালি মন্দির শিল্পীরা যখন শিখর ছেড়ে চালা ও রত্ন মন্দির নির্মাণে মন দিয়েছিলেন, তখন তাদের পক্ষে পুরনো শিখর মন্দির কে বাদ দিয়ে স্থাপত্য চিন্তা করা হয়তো সম্ভব হয়নি।
রাঢ়ে রত্ন মন্দির নির্মাণের প্রেরণা জুগিয়েছিলেন বিষ্ণুপুরের রাজারা। স্থানীয় স্থপতিদের সহায়তায় বিষ্ণুপুরে প্রথম রত্ন মন্দির তৈরি হয়েছিল। পরবর্তীকালে ওই শৈলী জনপ্রিয় হয়ে বিভিন্ন জায়গায় ছড়িয়ে যায়।

একরত্ন :–
চালা মন্দিরের ঠিক মধ্যবর্তী জায়গায় শিখর মন্দিরের মতো ক্ষুদ্র শিখন নির্মাণ করে এক রত্ন মন্দির শৈলীর সূচনা হয়েছিল বলে মনে করা হয়। পশ্চিমবাংলায় বহু রত্ন মন্দিরের রত্ন বা চূড়ায় শিখর,পীড়া ক্ষুদ্র গম্বুজ নির্মাণের ছাপ পড়েছে।
মনে করা হয় যে একরত্ন মন্দির সর্বপ্রথম বাঁকুড়া জেলায় নির্মিত হয়েছিল।

পঞ্চরত্ন:-
রত্ন বা চূড়ার সংখ্যাকে বৃদ্ধি করে রত্ন মন্দিরের বিবর্তন ঘটেছে। মন্দিরের বাঁকানো কার্নিশের চার কোণে রত্ন স্থাপন করে এবং চার চালের উর্ধ্বাংশের সংযোগস্থলে একটু বড় আকৃতির রত্ন বা শিখর স্থাপন করলে পঞ্চরত্ন মন্দিরের রূপ তৈরি হয়। বাঁকানো চাল ও শিখরের গঠনের উপরে নির্ভর করে মন্দিরের সৌন্দর্য। অনেক ক্ষেত্রে এই ধরনের মন্দিরের গায়ে, পুরোটা না হলেও সামনের ভাগে টেরাকোটা অলংকরণ করে মন্দিরগুলিকে সুসজ্জিত করে অনুপম দৃষ্টিনন্দন করা হয়েছে।
আগেই আলোচনা করেছি যে, অনেকের মতে পঞ্চায়তন মন্দিরের গঠন দেখেই বাঙালি শিল্পীদের মাথায় পঞ্চরত্ন মন্দির তৈরির ভাবনা জন্ম নিয়েছে।
এই প্রসঙ্গে উল্লেখ করা যেতে পারে যে, ‘ মেদিনীপুর জেলার গ্রাম গ্রামান্তরে ‘হরিসভা’ নামে কথিত বসতবাড়ি সংলগ্ন কোন চত্বরে সংস্থাপিত হয় একই সঙ্গে লাগোয়া পাঁচটি তুলসী মঞ্চ, যার মধ্যেরটী হয় বৃহৎ এবং চার কোণে চারটি হয় ক্ষুদ্রাকৃতি। সুতরাং প্রথাগত রীতির এই পাঁচটি তুলসী মঞ্চ প্রতিষ্ঠার মধ্যে বাংলার মন্দির শিল্পীরা হয়তো পঞ্চরত্ন মন্দির পরিকল্পনার আদর্শটিকে গ্রহণ করে সেটিকে নিজস্ব প্রতিভায় পঞ্চরত্ন মন্দির স্থাপত্যের কৌশল উদ্ভাবনে সচেষ্ট হয়েছিলেন।’
এই মত কতটা গ্রহণযোগ্য সে বিষয়ে বিতর্ক থাকলেও বাংলার প্রচলিত কাঠের রথের আদর্শে বাংলার মন্দির শিল্পীরা যে রত্ন রীতির মন্দির নির্মাণে সচেষ্ট হয়েছিলেন তেমন নিদর্শন অনেক আছে।
বাঁকুড়া জেলার বিষ্ণুপুরে লালবাঁধ মন্দির গুচ্ছের মধ্যে রাধাগোবিন্দ মন্দিরের লাগোয়া পাথরের তৈরি এক রত্ন সদৃশ ‍ স্থাপত্যটি হুবহু একটি রথের আদলে নির্মিত।
পাথর ছাড়া ইটের তৈরি রথাকৃতি পঞ্চরত্ন মন্দির মেদিনীপুর জেলার হীরাধরপুর গ্রামের বংশী গোপাল মন্দির(১৮৪৮খ্রিষ্টাব্দ) , ‘যার ভিত্তিবেদী তে আটটি চাকা উৎকীর্ণ করে সেটিকে অভিনব কাঠের রথের রূপ দেওয়া হয়েছে।’
সুতরাং এটা ভাবা যেতেই পারে যে, রত্ন মন্দির তৈরির বহু আগে থেকেই এই রত্ন শৈলীটি কাঠের রথ নির্মাণ কাজে প্রয়োগ করেছিলেন সূত্রধর শিল্পীরা।
এর কারণ হিসেবে বলা যায়, কাঠের তৈরি রথের গঠন ও আকৃতি এবং কাঠের উপর খোদাই করা ভাস্কর্য , অলংকরণ অনুসরণ করে মন্দির স্থপতিরা সেই আদলেই রত্ন মন্দির নির্মাণে সচেষ্ট হয়েছিলেন।
কাঠের রথের প্রতি কোণে‌ কোণে( সূত্রধর শিল্পীদের পরিভাষায় যা ‘বর্শা’ নামে পরিচিত) খাড়াভাবে উৎকীর্ণ করা তিনকোনা আকারের যে কৌণিক ভাস্কর্যটি দেখা যায়, সেটিকে রূপায়িত হত হাতি, ঘোড়া ,বাঘ, সিংহ, হরিণ ও মোষ প্রভৃতি জন্তু-জানোয়ারের মিছিলের উপর সন্নিবদ্ধ বর্শা হাতে কোন অশ্বারোহী সৈন্য অথবা কোন নর্তকী বা নারী প্রভৃতির খোদিত মূর্তি। রথের এই কৌণিক ভাস্কর্যের মতোই বিশেষ করে বাংলার রত্ন মন্দিরের অলংকরণ সজ্জা হিসেবে মন দিয়ে চার কোণে এই ধরনের যে বর্শা ভাস্কর্য
ভাস্কর্য প্রযুক্ত হয়েছে তার উদাহরণ দেখা যায়,
বীরভূম জেলার কেঁদুলীর রাধাবিনোদ মন্দির এর তিনটি নবরত্ন এবং বর্ধমান জেলার কালনার লালজি(১৭৩৯ খ্রিষ্টাব্দ) মন্দিরের গাত্রালঙ্কারে।
ইঁটের তৈরি পঞ্চরত্ন মন্দির পশ্চিমবাংলার প্রায় সর্বত্রই দেখা যায় ।
বীরভূম জেলার ইলামবাজারের লক্ষ্মী জনার্দন(আঃ ১৯ শতক) মন্দির এই রীতিতে তৈরি।
‘রত্ন মন্দিরের প্রথাগত বহিরাঙ্গ সজ্জা ও আকৃতিতে তার চারপাশে বাঁকানো চালের স্থাপত্য লক্ষ্য করা যায়।’ কিন্তু কোথাও কোথাও সোজা কার্নিশযুক্ত দালানের উপর রত্ন সংযোগ করে যে পঞ্চ রীতির মন্দির নির্মাণ করা হয়েছে, এমন উদাহরণ গোপালপুরের( থানা খয়রাশোল) রঘুনাথ মন্দির(আঃ ১৮ শতক), কলেশ্বর গ্রামের( ময়ূরেশ্বর থানা) কলেশনাথ শিব মন্দির । বীরভূম জেলা, বর্ধমান ও নদিয়া জেলায় এই জাতীয় মন্দির অনেক আছে। ‘এই রীতির প্রায় সবকটি মন্দিরের প্রতিষ্ঠাকাল খ্রিস্টীয় ১৯ শতক।’

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।