সাপ্তাহিক ধারাসম্পাতে সিদ্ধার্থ সিংহ (পর্ব – ১৬)

দেবমাল্য
— সে তো বলেছিলাম। কিন্তু ও কি তা মনে করে রেখেছে!
— নিশ্চয়ই মনে করে রেখেছে। তাই বোধহয় ট্রেন থেকে নেমে আপনাকে দেখতে না পেয়ে ওই জিপ ভাড়া করে উনি আপনার হোটেলে চলে গেছেন।
পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেবমাল্য ডায়াল করল তানিয়াকে। এ বার আর নট রিচেবল নয়, শুনতে পেল— দিস নম্বর ইজ বিজি।
— বিজি! তা হলে তাকেই ফোন করছে হয়তো। সঙ্গে সঙ্গে লাইনটা কেটে দিল ও। মোবাইলের স্ক্রিনে তখন তিনটে আটচল্লিশ। নিজের মনেই ও বলল, সিডিউল টাইমের এত আগে ট্রেন ঢুকে পড়েছে!
ওই জিপটা কোন দিকে যেতে পারে! আন্দাজ করে এগোতে এগোতে ড্রাইভার বলল, আপনি আপনার বউকে ঠিক দেখেছেন তো?
দেবমাল্য বলল, আমি আমার বউকে চিনব না?
— না না, একই রকম দেখতে অন্য কেউও তো হতে পারে!
— না না, বলছি না, ওটা আমার বউ। তোমার কি মনে হয় আমি ইয়ার্কি মারছি?
— না, তা বলছি না। বলছি, জিপটাকে তো দেখতে পাচ্ছি না। একবার স্টেশনে গিয়ে দেখে এলে হতো না! এখান থেকে স্টেশন তো খুব একটা দূরে নয়। দু’মাইলও হবে না।
দেবমাল্য বলল, ঠিক আছে, চলো। কিন্তু ও তো ফোন করল না। একবার ফোনে না পেলে আর একবার চেষ্টা করবে না! নাকি… তা হলে ও তখন কাকে ফোন করছিল! আবার ডায়াল করল তানিয়াকে। এবং এ বারও ভেসে এল— দিস নাম্বার ইজ বিজি।
এতক্ষণ কার সঙ্গে কথা বলছে ও! কার সঙ্গে! আমাকে ফোনে না পেয়ে কি সামশেরকে ফোন করেছে! সামশের ওর বউদিকে এখানে পৌঁছে দিয়ে যেতে চেয়েছিল। সে-ই বারণ করেছিল। এখন মনে হচ্ছে, বারণ না করলেই বোধহয় ভাল হতো। এর আগেও ও দেখেছে, সামশের নিজে থেকে যেটা করতে চায়, সেটা বাধা দিলেই যত সমস্যার সৃষ্টি হয়। এর আগেও বহুবার হয়েছে।
সেদিন ও বারবার করে বলেছিল, খেতে আর কতক্ষণ লাগবে? এই এত বেলায় কেউ না খেয়ে বেরোয়? দশ-পনেরো মিনিট দেরি হলে এমন কিছু মহাভারত অশুদ্ধ হবে না। ওরা ভাববে, নিশ্চয়ই জ্যামে পড়েছে। রাস্তাঘাটের যা অবস্থা…
ও ওর মতো বলে যাচ্ছিল। কিন্তু ওর কথায় কান না দিয়েই দেবমাল্য বলেছিল, তোর খাওয়া হয়েছে তো? তা হলে আর কথা বাড়াস না। যা, গাড়িটা বার কর। আমি নামছি।
দেবমাল্য কিছু বললে ও তার অন্যথা করে না। তাই চুপচাপ নেমে, গাড়ি নিয়ে গেটের কাছে এসে দাঁড়িয়েছিল সামশের। দেবমাল্য নামতেই স্টার্ট করে দিয়েছিল গাড়ি। আর চলা শুরু করতে না-করতেই তার গাড়িটাকে ঘষে দিয়ে একটা ট্রাক এমন ভাবে চলে গিয়েছিল, আর একটু হলেই মারাত্মক কিছু ঘটে যেতে পারত।
আর একবারও এ রকম হয়েছিল। সেদিন প্রচণ্ড ঝড়-জলে চারদিক তোলপাড়। বড় বড় গাছ উপড়ে পড়েছে। রাস্তার হাঁটু-জল দ্রুত পাস করানোর জন্য স্থানীয় ছেলেরাই ম্যানহোলের ঢাকনা খুলে দিয়েছে। বেরোনোর জন্য দেবমাল্য তোড়জোড় শুরু করতেই সামশের বলেছিল, জল নামার পর গেলে হয় না?
দেবমাল্য বলেছিল, কখন জল নামবে কোনও ঠিক আছে? যদি সারা রাতেও জল না নামে, আমি কি তা হলে সারা রাত ধরে কারখানাতেই বসে থাকব? বলেই, হাঁটু পর্যন্ত প্যান্ট গুটিয়ে সোজা হাঁটা দিয়েছিল বাড়ির দিকে। তার পরেই সেই অঘটন। তাকে জলের মধ্যে কাতরাতে দেখে মুহূর্তের মধ্যে একটি ছেলে দৌড়ে এসে যদি বাঁশ দিয়ে ইলেকট্রিক তারটা জল থেকে তুলে না ধরত, তা হলে সে দিন যে কী হত, কে জানে!
এত ঘটনার পরেও কেন যে তার আক্কেল হয় না, দেবমাল্য বুঝতে পারে না। যদি বুঝতে পারত, সামশের যখন তার বউকে এখানে পৌঁছে দিয়ে যেতে চেয়েছিল, সে কি বারণ করত!
তানিয়ার নম্বর বারবার বিজি দেখে সামশেরকে ফোন করল দেবমাল্য। দেখল, সুইচ অফ। তা হলে! তা হলে কার সঙ্গে কথা বলছ ও! কার সঙ্গে! এত সকালে নিশ্চয়ই বাবা-মা-দাদা-ভাইকে ফোন করতে যাবে না। তা হলে!
ভাবতে ভাবতে স্টেশনের সামনে, একদম টিকিট কাউন্টারের কাছে চলে এল ওদের গাড়ি। গাড়ি থেকে নামার আগেই দেবমাল্য শুনতে পেল প্ল্যাটফর্মের ওদিক থেকে ভেসে আসা অ্যানাউন্সমেন্ট— আপ লালগোলা প্যাসেঞ্জার, লালগোলা যাওয়ার গাড়ি পঁয়তাল্লিশ মিনিট লেটে আসছে…
অবাক হয়ে গেল দেবমাল্য। তার মানে ট্রেন এখনও আসেইনি!