• Uncategorized
  • 0

ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ২)

সুমনা ও জাদু পালক – ২

—– সুমনা,অ সুমনা, দরজাটা খোল মা।
একটু অন্য মনস্ক হয়ে পড়েছিল সুমনা। ওই সুন্দর নীল পাখিটার কথা ভাবছিল। বাইরে থেকে তার নাম ধরে কেউ ডাকছে কানে আসায় সে উৎকর্ণ হয়।আরে, এটাতো পুটু পিসির গলা।
পাড়াতুতো পিসি হলেও পুটু পিসি বড় আপনার জন। সুমনা কে খুব ভালোবাসে। মা ও ভালোবাসে পুটু পিসিকে। পুটু পিসির বাড়িতে তার বুড়ি মা ছাড়া আর কেউ নেই । শহরের বাজারে শাক বিক্রি করে পুটু পিসি। সকালে বাজারে যায়, ফিরতে ফিরতে দুপুর হয়ে যায়। বাড়িতে এসে মায়ের হাতের রান্না করা ভাত দু’টো নাকে মুখে গুঁজেই আবার বেরিয়ে যায় শাক তুলতে। মাঠে, জঙ্গলে ,পুকুরে, জলা জমিতে ঘুরে ঘুরে হিঞ্চে শাক, কলমি শাক, শুশনি শাক, গিমে শাক ,থানকুনি পাতা ,শাপলা ইত্যাদি সংগ্রহ করে। বাড়িতে ফিরে এসে সে গুলোকে ভালো করে পরিষ্কার করে আঁটি বেঁধে রেখে দেয়, পরদিন শহরের বাজারে নিয়ে যাওয়ার জন্য ।
—– সুমনা– অ সুমনা, তাড়াতাড়ি দরজাটা খোল মা। ফার্স্ট বাসটা ফেল হয়ে যাবে যে।
দরজার গায়ে শিকলটা জোরে জোরে ঠুকছে পুটু পিসি।
কাঠা তিনেক জায়গার উপরে ছোট্ট একটা বাড়ি সুমনাদের। বাড়ির দেওয়ালটা মাটির, মাথায় টালির ছাউনি । প্রাচীর একটা আছে বটে তবে সেটাও মাটির। মাটির প্রাচীর জায়গায় জায়গায় ভেঙে গেছে। সেই ফাঁকগুলো শুকনো তালপাতা আর বাঁশের টুকরো দিয়ে কোনমতে বন্ধ করা আছে যাতে গরু ছাগল ঢুকতে না পারে। প্রাচীর ভাঙ্গা হলে কি হবে প্রাচীরের গায়ের দরজাটা কিন্তু খুব মজবুত। সুমনা মায়ের মুখে শুনেছে যে, তার বাবা নাকি নিজের হাতে তৈরি করেছে এই দরজাটা ।দরজাটার গায়ে খুব ভালো করে আলকাতরা মাখানো আছে বলে উইপোকা কোন ক্ষতি করতে পারেনি এখনো। দরজাটার দুপাশে দুটো চওড়া ইঁটের পিলার আছে ।দরজাটার ভেতরের দিকে একটা খিল থাকলেও সেটা সাধারণত ব্যবহার করা হয় না। তার বদলে একটা বেশ মোটা বাঁশের হুড়কো দিয়ে আটকানো থাকে দরজাটা। হুড়কোটার দুই প্রান্ত পিলারের গায়ের গর্তে ঢোকানো থাকে। দরজাটার বাইরে ডান দিকের পাল্লার গায়ে একটা শিকল ঝুলছে।ওই শিকলটাই দরজার গায়ে ঠুকছে পুটু পিসি আর মাঝেমাঝে সুমনার নাম ধরে ডাকছে।
সুমনা দরজাটা খুলে দিতেই পুটু পিসি একটু যেন বিরক্ত হয়ে বলল, কিরে, দরজা খুলতে এত দেরি করলি কেন? ঘুমোচ্ছিলি নাকি?
—– না না পিসি, পাখিটার ডাক শুনে আমি তো সেই কোন ভোরে উঠে গেছি।
—— পাখি! কি পাখি রে?
—– নাম তো জানিনা পিসি, তবে খুব সুন্দর দেখতে পাখিটা। কি সুন্দর ঝকঝকে নীল রংয়ের।আর….
—- বেশ বেশ, সন্ধ্যেবেলা পাখির গল্প শুনবো। এখন দেরি করলে তো ফার্স্ট বাসটা ফেল হয়ে যাবে ।
—- আমাকে ডাকছিলে কেন?
—— কাল দুপুরে হিজল পুকুরের পাড়ে আমরুল পাতা তুলতে গেছিলাম। শহরের এক বাবু অর্ডার দিয়েছে। কি নাকি কবিরাজি ওষুধ তৈরি করার জন্য তার প্রয়োজন আমরুলের পাতা। ভালো পয়সা দেবে বলেছে।
—- তা ঠিক আছে, কিন্তু আমাকে ডাকছিলে কেন সেটা তো বললে না।
পুটু পিসি ডান হাতের চেটো ঘনঘন দুবার কপালে চাপড়ে বলে, আ আমার পোড়া কপাল!আসল কথাটাই বলতে ভুলে গেছি!আসলে বয়স হচ্ছে তো,তাই।
সুমনা হেসে বলে, কি যে বলোনা পিসি তার ঠিক নেই! তোমার নাকি বয়স হয়েছে। মাথার সব চুলগুলো কি সুন্দর কুচকুচে কালোএখনো।
——- ছাড় ওসব কথা। শোন, কাল হিজল পুকুর থেকে ফেরার পথে বাদল ঠাকুরের সঙ্গে দেখা হয়েছিল। বাদল ঠাকুর তোকে আজ একবার রাধামাধব মন্দিরে যেতে বলেছে।
—- কেন গো পিসি?
—- সে তো জানি না। তা হ্যাঁরে, রাঙ্গা বৌদি কেমন আছে এখন? জ্বর ছেড়েছে?
—- নাগো পিসি।
—– ডাক্তার দেখিয়েছিস?
—— জীবন মাস্টারের কাছ থেকে ওষুধ নিয়ে এসেছি।
——- মধু ডাক্তারের কাছে ওষুধ আনলি না কেন?
সুমনা চুপ করে থাকে।
—– চুপ করে আছিস কেন? অ,বুঝেচি। মধু ডাক্তার পঞ্চাশ টাকার কমে ওষুধ দিল না বুঝি?
সুমনা কোন উত্তর না দিয়ে নীরবে ঘাড় নাড়ে।
—– ব্যাটা চশমখোর! এখন চললাম রে। দেখি, শহর থেকে ফিরে যদি কিছু করতে পারি। মা কে সাবধানে রাখিস।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।