ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ৫৪)

সুমনা ও জাদু পালক

বানর রাজ্যের রাজা ও রানীকে শুভেচ্ছা ও ধন্যবাদ জানিয়ে এবং ছোট্ট বানর রাজকুমারকে ভালোবাসা ও আশীর্বাদ জানিয়ে নতুন পথে যাত্রা শুরু করার জন্য সুমনা দুধরাজকে নিয়ে গুহার বাইরে যাওয়ার ইচ্ছা প্রকাশ করল। বানর রাজ সানন্দে সম্মতি দিলেন।
তার আগে জাদুকর হূডুর বিরুদ্ধে লড়াইয়ে রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা সুমনার সঙ্গী হতে চেয়ে বিনীত প্রার্থনা জানিয়েছে। অদৃশ্য কন্ঠের পরামর্শে সুমনা সানন্দে রাজি হয়েছে রাজকুমারী চন্দ্রকান্তাকে সঙ্গে নিতে । এরপর রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা ও সুমনা একসাথে হূডুর বিরুদ্ধে লড়াই করার শপথ নিয়েছে।
বানর রাজ্যের মন্দিরে দেবী মায়ের সামনে দাঁড়িয়ে দুজন দুজনের বন্ধুত্ব স্বীকার করেছে। হাতে হাত রেখে রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা ও সুমনা যে কোন অবস্থায় একে অপরকে নিঃশর্ত সাহায্য করার প্রতিশ্রুতি দিয়েছে। জাদুকর হূডুকে পরাজিত না করা পর্যন্ত কেউ লড়াইয়ের ময়দান ছাড়বেনা, কেউ কাউকে কোন অবস্থায় ছেড়ে যাবে না, সেই শপথ ও নিয়েছে ওরা।
দেবীমাকে প্রণাম জানিয়ে সুমনা ও চন্দ্রকান্তা দুধরাজকে সঙ্গে নিয়ে বানর রাজপ্রাসাদ ছেড়ে গুহার বাইরে উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে এসে দাঁড়ালো।
কিছুক্ষণের মধ্যেই ওদের বিদায় জানাতে একে একে বানর রাজ মহাগ্রীব, বানর রাজকুমার কে কোলে নিয়ে মহারানী তারা, বানর রাজ্যের চার সেনাধ্যক্ষ আর অসংখ্য বানর সেনানি উপস্থিত হল সেই উন্মুক্ত প্রাঙ্গণে।
বানর সেনানির দল গাছের উপর বসে তাদের দীর্ঘ লাঙ্গুলগুলি আন্দোলিত করতে লাগলো।
বানর সেনাধ্যক্ষ ‘প্রাচী’ ঈষৎ ঝুঁকে বানর রাজ্যের মহারাজা ও মহারানী কে হাত জোড় করে নমস্কার জানালো, নমস্কার জানালো দুধরাজের পিঠের উপরে বসে থাকা সুমনা ও রাজকুমারী চন্দ্রকান্তাকে । তারপর সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে ডান হাত উপরে তুলে চিৎকার করে বললো, জয় মহারাজা মহাগ্রীবের জয়।…………
হাজার হাজার বানর সেনারা চারদিক কাঁপিয়ে সমুদ্র গর্জনের মতো একসাথে চিৎকার করে বলল, জয়—- মহারাজা মহাগ্রীবের জয়—–!
এরপর একে একে মহারানী তারা,রাজকুমারী রত্নমালা ও রাজকুমারী চন্দ্রকান্তার নামে সবাই জয়ধ্বনি দিল। দুধরাজ তার পিঠের দুপাশ থেকে ধবধবে সাদা একজোড়া ডানা বের করল।
তারপর ধীরে ধীরে ডানা দুটোকে আন্দোলিত করতে করতে উড়তে শুরু করল। বিস্মিত বানর রাজকুমার হেসে উঠল খিল খিল করে।

বৃহল্লাঙ্গুল আসমানী বানরদের রাজ্য পার হয়ে রাজকুমারী চন্দ্রকান্তার নির্দেশমতো উত্তর মুখে যাচ্ছিল দুধরাজ। অনেকটা পথ অতিক্রম করার পর ওরা এসে উপস্থিত হল একটা নদীর কাছে। বিশাল চওড়া নদী। এপার থেকে ওপার দেখা যায় না বললেই চলে। রাজকুমারী চন্দ্রকান্ত বললো, বন্ধু রত্নমালা, এটাই সেই তটিনী নদী।
——- তারমানে এখানে স্নান করাতে এসেই বানর রাজকুমারের সেই বিপত্তি ঘটেছিল?
——– হ্যাঁ বন্ধু।
—— তোমার দেশ ,তোমার রাজ্য ‘সবুজের দেশ’ এটা?
——- হ্যাঁ,কিন্তু আজকে আর আমার দেশে সবুজের চিহ্ন মাত্র নেই। জাদুকর হূডুর কালো জাদুর প্রভাবে সমগ্র দেশ এক মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে।
—– দুঃখ করো না বন্ধু। খুব শিগগির আমরা দুজনে মিলে তোমার দেশকে অভিশাপ মুক্ত করবো।
—— পারবো আমরা বন্ধু রত্নমালা?
—— অবশ্যই পারবো।
কথা বলতে বলতে চোখের সামনে ভেসে উঠলো দিগন্ত বিস্তৃত বিশাল মরুভূমি । সামনে পিছনে ডাইনে-বাঁয়ে শুধু বালি আর বালি।
সুমনা চারদিক দেখার পরে বলল, “এতো বিশাল মরুভূমি। ইস্কুলে ভূগোল বইয়ে মরুভূমির কথা পড়েছি ,কিন্তু তা যে এত বড় হয় জানতাম না।”
চন্দ্রকান্তা বিস্মিত কন্ঠে বলল, বন্ধু রত্নমালা, ‘ইস্কুল’ ,’ ভূগোল বই’ –এসব কি বলছ তুমি?
——– কেন, তুমি ইস্কুলে পড়ো নি কোনোদিন?
—— নাতো, সেটা কি জিনিস?
——— তুমি কোথায় পড়তে তাহলে?
——– কেন, রাজগুরুর কাছে। তিনি মুখে মুখে যা বলতেন আমাদের, তাই শুনে শুনে শিখতাম।
—–ও।
সুমনা বিস্মিত হলেও আর কিছু বলল না।
চন্দ্রকান্তা বলল, এই যে সারা মরুভূমি জুড়ে খেজুর গাছ, ঝোপঝাড় দেখতে পাচ্ছ– এগুলো একটাও সত্যি নয়।
—- মানে?
—— এরা আমার দেশের আমার বাবার রাজ্য ‘সবুজের দেশের’ সাধারণ প্রজারা ।
হঠাৎ অনেক দূরে বিশাল বড় বড় দুটো ছাতিম গাছ দেখতে পাওয়া গেল। গাছ দুটো যেন গায়ে গা লাগিয়ে দাঁড়িয়ে আছে।
চন্দ্রকান্তা বললো, বন্ধু রত্নমালা, একবার দুধরাজকে ওই গাছ দুটোর কাছে যেতে বল না ভাই।
—– তুমি দুধরাজকে অনুরোধ করো, তোমার কথাও শুনবে।
—– আমার কথা শুনবে?
— হ্যাঁ ,শুনবে। এখন তো আমরা সবাই বন্ধু -তাই না?
রাজকুমারী চন্দ্রকান্তা খুব মিষ্টি করে দুধরাজ কে বলল, বন্ধু দুধরাজ, ওই যে দূরে দেখা যাচ্ছে বিশাল বড় বড় দুটো ছাতিম গাছ ডালপালা মেলে দাঁড়িয়ে আছে, ওখানে একবার আমাদের নিয়ে যাবে ভাই?
দুধরাজ উড়তে উড়তেই একবার ঘাড় ঘুরিয়ে চন্দ্রকান্তাকে দেখে নিয়ে বলল, অবশ্যই নিয়ে যাব। তুমি এখন রাজকুমারী রত্নমালার বন্ধু, মানে আমারও বন্ধু।

চলবে

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!