গল্পে সঞ্জীব সেন

গানের দিদিমনি আর ভজহরী মান্না

“বুঝলেন আমার একটা ভাল নাম ছিল = আকাশ, এই নামে এখন আর কেউ ডাকে না । “ভজহরী ক্যাটারিং” করতে করতে কখন যে ভজহরী হয়ে গেলাম তার সাথে মান্নাও জুড়ে গেল কখন! কখন কার সাথে কি জুড়ে যায়! সবই খেলা, তাই না? কি বলেন!
“ঠিকই বলছেন”,
“তবে আমার অবশ্য ভালোই হয়েছে, ভজহরী মান্না হওয়া তে ব্যবসা-টা বেড়েছে, কী একটা গান আছে না,”
“আমি শ্রী শ্রী ভজহরী মান্না”
“হ্যা ওইটাই, ওখানে কতরকম রান্নার কথা বলা আছে, ওই সব আইটেম আমার এখানে পাবেন,
গোয়ানীজ পমপ্লেট করে গোয়ানীজ দের তাক লাগিয়ে দিয়েছি কতবার , আরেকটা মজার কথা কি জানেন এই গানটা আমার জানা, এই একটা গান আমি মাঝেমধ্যে গাই। ওই যাকে বলে বাথরুম সিঙ্গার”। এভাবেই আমি আর ভজহরী এক্কেবাড়ে আঁষ্টে পিষ্টে বেধে আছি।
তাই! তবে তো একদিন শুনতে হয়!
নিন চা নিন,
“তাহলে শেষ পর্যন্ত বিয়েটা করেই ফেললেন!”
হা হা ,,, যা বলেছেন ! ওই একটু দেরি হয়ে গেল আরকি!
না না মশাই দেরি হয়নি, পঞ্চাশে অনেকেই বিয়ে করছে আজকাল !
হ্যাঁ তা ঠিক, তবে এরকম নাটকীয় ভাবে, সবার জীবনে ঘটেনা ।
“নাটকীয় মানে, যদি কিছু না মনে করেন, মানে যদি বলেন, আরে বাবা, আনন্দ শেয়ার করলে আনন্দ বহুগুন বেড়ে যায়। ফেসবুকে দেখেন না, বর্ষায় ঘরে কাঁচপোকা ঢুকেছে, ছবি তুলে লিখে দিল ‘পোকা অনেক রকম’ বা বেশী বয়সে প্রেমে পরেছে বেলফুল হাতে নিয়ে ছবি তুলে লিখে দিল আমার প্রথম ধরেছে কলি, সেইরকম আরকি!”
“বাহঃ বেশ বললেন ! আপনি তো বেশ রসিক! আপনি তো ফেসবুকে আছেন । এই যে মেয়েটি বেলফুল হাতে লিখল তার বয়সটা কত হবে, কিম্বা তার জানালার পর্দায় কী কোন হরিণের ছবি ছিল! এনি ক্লু!
না না , এগুলো তো উদাহরণ ,
যাক, তবে শুনুন,,”
নিন বলুন, তার আগে আরেক কাপ চা হয়ে যাক!
“তখন সকাল আটটা হবে , মন্টার চায়ের দোকানে বসে আছি, হরি মিত্তির নাতনী মিট্টি দৌরে এল , এসে বলল’ ভজহরী কাকা আপনাকে বাবা ডেকেছে খুব দরকার আজকেই যাবে কিন্তু ‘। বললাম ঠিকাছে যাচ্ছি। এখন তো মল মাস , ফাঁকাই আছি। বিকালে যাবো । মেয়েটা দৌড়ে চলে গেল । মিত্তির বাড়ি আমার আলাদা খাতির । ওদের সব কাজ আমার ধরা । হরি দা অনেক কাজ পাইয়েও দিয়েছে । বিকেলে হরিদার বাড়ি গেলাম । হরি দা বলল ভজহরী, শোনো, একটা কাজ আছে । আমাদের আত্মীয়, তোমার রান্না খেয়ে ভাল বলেছে। কাজটা তাই তোমাকেই দিতে চায়। অবশ্য দেরি আছে , আষাঢ়ের পাঁচ । আইটেম ওরা বলে দিয়েছে। বড় পার্টি । টাকা নিয়ে চিন্তা নেই । কিন্তু সেই বাঁশবেড়িয়া । করবে কিনা ওরা জানিয়ে দিতে বলেছে । হরি দার কথা খেলাপ করা যায় না, হরিদার সাথে আলাদা ব্যাপার । তিনশো জনের কাজ মটন বিরিয়ানী, চিকেন চাপ, বাটার নান, মটন কিমা, দিয়ে চানা মশলা, বাটার ফ্রাই আরও অনেক কিছু। আর মিষ্টি ওরা আনবে । যাই হোক কন্ট্রাক্ট হল। সময় মত পৌছে গেলাম । সকাল সকাল । টিফিনটা করে লোক খুঁজছি তখন দেখি ও শাড়ি পরে এল । সুন্দর তাতের শাড়ি সঙ্গে কটা কমবয়সি মেয়ে । ওদের দিদিমনি । তখনও জানিনি ও গানের দিদিমনি। লুচি তরকারি আর প্লেটগুলো নিয়ে ঘরে চলে গেল । আষাঢ় মাস । বৃষ্টির মরশুম । আর বৃষ্টি পড়লেই আমার মনটা কেমন যেন হয়ে যায় । বিশ্বাস করুন ঠিক বলে বোঝাতে পারব না, কবিরা যাকে বলে পাগল পাড়া । সেই ছোট থেকে । এসবের তো কোন ওষুধ হয় না । যাই হোক দেখলাম ও মেয়েগুলোকে নিয়ে পাশের ঘরে বসে আছে । সোজাসুজি চেয়ার পাতা । ও বৃষ্টির গান গাইছে ।”নীল নবঘনে আকাশগগনে তিল ঠাঁই আর নাহি রে” ওদের ভিতর একটা মেয়ে গাইল “শ্রাবণের ধারার মত পরুক ঝরে” । জানালার বাইরে থেকে চোরের মত দেখছি আর কেমন যেন হারিয়ে যাচ্ছি। যাই হোক দুপুরের খাওয়ার তৈরি করে ওদের ডাকতে গেলাম । বললাম দুপুরের খাওয়ার তৈরি হয়ে গেছে । কে হয় আত্মীয় না পাশের বাড়ির ঠিক বুঝতে পারছি না । এত মেয়েলি অনুষ্ঠান, হাসিঠাট্টা । গায়ে হলুদ হল । একবারও দেখতে গেল না । বছর দশকের মেয়েটা রান্নার দিকটায় আসতে বললাম । ‘কে হয় যে গান গাইছে’ । ওই বলল আমাদের গানের দিদিমনি, । দুপুরে খাওয়ার সময় তাকালাম মুখের দিকে না কপালে সিঁদুর নেই । অবশ্য আজকাল অনেকেই সিঁদুর পরে না। নাহলে চুলের নিচে আড়ালে থাকে । কিন্তু ওর চুল তো সামনে দিয়ে সিঁথে কপালে ছোট টিপ . আমার দিকে তাকল একবার । সত্যিই একদম দিদিমনি সুলভ চাউনি । এযুগের ছেলেরা যেমন বলে বোল্ড হয়ে গেলাম। আসলে প্রকৃত বয়সে প্রেম না করলে যেমনটা হয় ।
সন্ধ্যাবেলা আমন্ত্রিত লোকজন আসতে শুরু। কলকাতা থেকে দূরে আধা শহর। তবু বেশীর ভাগ মেয়েরা লেহেঙ্গা পড়েছে। যার বিয়ে সেও ল্যাহেঙ্গা। বেনারসী আর কেউ পরে না । যাইহোক আমি তো একজনকেই ঘুঁজছি। অবশেষে এলেন তিনি। তুতে রঙের একটা তুতে শাড়ি আর রাউন্ড নেকের ব্লাউজ। আর তাতে চোরাগোপ্তা হেমসেলাই । চওড়া কপালে ছোট একটা কালো টিপ । চড়া মেকাপ নেই । কিন্তু কী সুন্দর । তাক লাগিয়ে দেওয়া । হরিদার খাতিরে এখানে শুধুই ক্যাটারারের লোক নই। হরি দা আর যার নাতনির বিয়ে মিহির বাবু পাশাপাশি বসে আছে। আমায় ডেকে নিল । সানাই বাজছে । বিয়ে রাত্রে। কফি পকোরা নিয়ে বসলাম । দেখলাম মিহিরবাবু “অঞ্জনা শোন “ডাক দিল । তখন জানলাম ওর নাম অঞ্জনা । ও আমাদের পাশে এসে বসল । ওদিকটায় বসে আছে। আমার ওর চোরাগোপ্তা হেমসেলাই ঘোর লাগিয়ে দিয়েছে । হরি দা হয়ত মিহিরদাকে বলেছিল কথাটা মিহির দা বেমাক্কা বলে দিল অঞ্জনা তোর মতোই আকাশেরও প্রতি বিয়ের ডেটে কাজ থাকে তাই বিয়ে করার ফুরসত হয়নি । তোর যেমন সারেগামার জন্য মেয়ে তৈরী করতে গিয়ে সময় পেলি না । অঞ্জনা হাসল মাথা নিচে করে লজ্জ্ব্যায়। মিহির বাবু আর হরি দা ওদিকটায় চলে গেল । অঞ্জনা গেল না । আমি ক্যাটারিং না করলে ঠিক কবি হতাম । তখন মাথায় কোথায় শোনা একটা লাইন “উনিশ শতকের মেয়ে তুমি চড়া মেকাপে না গিয়ে ছোট টিপেই মানিয়ে যায় । সাহস সঙ্চয় করলাম । বললাম আপনাকে বেশ ভাল লাগছে । বেশ অন্যরকম । আর তুতে রঙটাও আমার পছন্দের ।তখন আমার মাথায় কতদিন আগে পড়া শঙ্খ ঘোষের একটি কবিতা” হে আমার সুনিবীর তমস্বিনী ঘনভার রাত্রি , আমাকে হানো/ওই তার আলুলায়িত বেদনার আলো । দেখছি অঞ্জনা মাথা নিচু করে চেয়ারে হাত ঘসছে । উনিশ শতকের মেয়ে তুমি লজ্ব্যাই তোমার ভূষণ । তখনই একটা মেয়ে অঞ্জনাকে ডেকে নিয়ে গেল ।
তারপর!
ওত উতলা হবেন না, আপনি ক্লাইমেক্সে পৌঁছে গেছেন ।
অঞ্জনা চলে যাওয়ার পথে ঘুরে তাকিয়েছিল একবার, বিনুনিতে বাধা বেলফুলের মালা ,শুধু স্বরলিপি রেখে গেল । কি ছিল ওই চাউনির ভিতর , এবার কিন্তু বোল্ড হলাম না পুরো হিটউইকেট।অঞ্জনার ছাত্রিরা সারেগামাপায় অংশ নেয় জানার পরে কেমন একটা গর্ব অনুভব হচ্ছে । অথচ কত বিয়ে বাড়িতে কতরকম মেয়ে তাদের গুনের কথা শুনি কই কখনও তো গর্ব হয় না ! তারপরে যেগুলো হল গিয়ে মানে নাটকীয় ব্যাপারটা ভাবতে পারবেন না । অনুষ্ঠান তো ভালোই মিটে গেল । গুনে গুনে সাত দিন পর ,একটা ফোন এল মনে হল যেন এই ফোনটার জন্যোই যেন অপেক্ষা করছিলাম । অথচ আমার ঘুমে চোখ জুড়িয়ে আসছিল । গলা শুনেই চিনতে পেরেছি অঞ্জনা ফোন করছে । আমার সব ঘুম নিমেশে উঠাও হল । অঞ্জনা বলল ঘুমাচ্ছেন নাকি । তারপর বলল আপনি কি ফেসবুকে নেই । আমি বললাম আকাউন্ট খোলা আছে । করা হয় না । তবে আজ খুলবেন । তারপর সার্চে গিয়ে অঞ্জনা ব্রেকেটে গানের দিদিমনি খুঁজবেন আমাকে পাবেন । রিকু পাঠিয়ে দিলে আমি একসেপ্ট করে নেব । আমি সময় নষ্ট না করে সঙ্গেসঙ্গে অঞ্জনার কথামত ফেবুটা খুলে অঞ্জনাকে রিকু পাঠাতেই দেখি ও একসেপ্ট করে নিয়েছে । তারপর আপডেট আসতে লাগল । কি বলব মশাই । অঞ্জনার লুকগুলো হেব্বি লাগছিল । প্রোফাইলে ছবি রেখেছে জোৎস্না রাত জানালার সামনে দাড়িয়ে চাঁদ দেখছে উপরে ক্যাপশনে লিখছে আজ জোছনা রাতে সবাই গেছে বনে,, কপালে বড় কালো টিপ কালো শাড়ি স্লিপলেস কালো ব্লাউজ । এইযুগের ছেলেরা যাকে বলে ওয়াইল্ড লুকিং । মাথার ঠিক থাকে বলুন । আমি কমান্ডে লিখলাম ।আপনাকে কালো শাড়িতে দারুণ লাগছে । লাভ সাইন এল একটা । পরের ছবিতে কলেজ জীবনের একটি ছবি আটপৌরে হলুদ শাড়ি কপালে ছোট টিপ । কলেজের সরস্বতী পুজোয় ক্যামেরায় তোলা একটা ছবি ।আমি লিখলাম তখনোও যেমনটা ছিলেন এখনোও তেমনই সুন্দরী আছেন । পিং করে ইনবক্সে ম্যাসেজ ঢুকল । দেখি অঞ্জনা লিখেছে আর আপনি না তুমি ।কিছুক্ষণ পর ফোন এল । অঞ্জনা ফোন করেছে । রাত তখন একটা । বলল তুমি কি কবিতা লেখ? আমি যে স্বপ্নে দেখলাম হিজল গাছের নিচে আমাকে নিয়ে লেখা কবিতা পাঠ করে শোনাচ্ছ। আমি পাশে তুতে রঙের একটা শাড়ি পরে দাঁড়িয়ে আছি । আমি অঞ্জনার কথার ভিতর রয়ে গেছি । অঞ্জনা ফের বলল কি ভাবছ । আমি একটা পাগলী । কোন একটা বিয়ে বাড়িতে দেখা । আমি হলেও এটাই ভাবতাম । আসলে স্বপ্নটা দেখার পর আমার মনে হল তোমাকে জানাই । কিছুক্ষণ কথা নেই । অঞ্জনাই বলল বললে না তুমি কি কবিতা লেখ কিম্বা লিখতে । শোনাবে কালকে এইসময়ে । আমি বললাম ঠিকাছে । আমি প্রায় প্রতিরাতেই একটি করে কবিতা শোনাচ্ছি । অবশ্য আমার না । নীরাকে নিয়ে সুনীল দার লেখা । কবিতা শোনাতে শোনাতে একদিন অঞ্জনা বলল আকাশ,আমার মনে হয় তোমায় ক্রমশ ভালবেসে ফেলছি । এইবয়সে এসে এমন কথায় মাথা ঘুরে যাবে না বলুন ? আমি এবার আর আউট হলাম না । মনে হল অঞ্জনার সঙ্গেই আমার ঘুঁট বাধা আছে । আমরা যারা সিলসিলার অমিতাভ কে বুকের ভিতর নিয়ে নিয়েছিলাম তারা সুন্দরী মেয়ে দেখলে সরাসরি মুখের দিকে তাকাতাম না মনে মনে সায়েরি লিখিতাম । আমার মাথায় তখন অঞ্জনাকে নিয়ে বেশকিছু সায়েরি আসছিল ।
তারপর!
তারপরে কোথা থেকে কি যে হল । হরিদার নাতনী আর আমার ভাইঝি মিলেই পথটা একদম ক্লিয়ার করে দিল । এযুগের মেয়ে এরা,ওদের কাছে শেখার আছে ।
তারপর!
তারপর আর কী,” শুভ পরিণয়, “মধুরেণ সমপয়েৎ” ফুলসজ্জ্যার রাত, অঞ্জনা আমার বুকে মাথা রেখে শুয়ে আছে। তখন আমার ভিতর গান এল , কাভি কাভি মেরে দিলমে,, অঞ্জনাও গুন গুন করে গেয়ে উঠল । আমি এবার আর ব্লোড আউট হলাম না, হিটউইকেটও না এবার বাম্বসার সামলাতে না পেরে এক্কেবারে ছেঁতড়ে পরলাম ।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!