• Uncategorized
  • 0

ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ১০)

সুমনা ও জাদু পালক

আমরা সবাই খেলার পুতুল
তোমার খেলাঘরে ,
কাঁদিলে কাঁদাও তুমি,
হাসি ,তোমার বরে ।
বিধিরে….,ও বিধিরে…….
যেমন চালাও,তেমনি চলি
নাচি,যেমন নাচাও,
আঁধার পথে হোঁচট খেলে
আলোর দিশা দেখাও।
বিধিরে…..,ও বিধিরে………..”
অনেকদিন আগে এক অঘ্রাণের সন্ধ্যায় বাবার হাত ধরে চিরপ্রসন্ন দাদুর আখড়ায় গেছিল সুমনা।হাসিখুশি দিদা একতারা বাজিয়ে এই গানটা গেয়েছিল। সবাই মুগ্ধ হয়ে শুনেছিল গান।সুমনা ও শুনছিল ।কিন্তু সব কথার মানে বুঝতে পারছিল না ।গান থেমে যাবার পরে সবাই চুপচাপ ছিল ।তাঁতিপাড়ার অশোক কাকাও সেদিন ছিল ওই আসরে।না,অশোক কাকা অসুস্থ হয়নি তখনো।
সে হঠাৎ হাসিখুশি দিদাকে বললো, তোমার গানটা খুব ভালো লাগলো মা ।তবে একটা ……..!
——- হ্যাঁ ,বল বাবা অশোক ,তোমার মনে কি কোন প্রশ্ন জেগেছে?
—— হ্যাঁ মা।
——- কি?
—— তোমার গান শুনে মনে হল ,আমরা সংসারে যা কিছু করি, সব ভগবানের ইচ্ছামতোই করি ।মানে ,আমরা তার হাতের পুতুল ।
——তাইতো!
—— তা সবই যদি ভগবান করান, তাহলে কেউ ভালো কাজ কেউ খারাপ কাজ করি কেন ?ভগবান তো সবাইকে দিয়ে ভালো কাজ করাতে পারেন ।
হাঃ হাঃ করে হেসে ওঠে ছিল চির প্রসন্ন দাদু। অশোক কাকা বলেছিল, আপনি হাসছেন কেন বাবাজি ?আমি কি ভুল বলেছি ?
——না বাবা, ভুল কিছু বলনি ,তোমার ভাবনা একদম সঠিক। তবে ………!
এর পরে অনেক কিছু বলেছিল চির প্রসন্ন দাদু ।সব কথাগুলো আজ মনে নেই সুমনার ।মনে থেকে‌ লাভ ও নেই।কারণ সেদিনও কথাগুলোর মানে বুঝতে পারেনি সুমনা,আজ ও জানেনা।তবে আজকে মন্দিরের গায়ে ছোট ছোট পুতুলগুলো দেখতে দেখতে তার মনে একটা প্রশ্ন জাগে, আচ্ছা ,আমরা নিজেরাই যদি পুতুল হই তাহলে আবার পুতুল নিয়ে খেলি কেন ?নাকি এটাও ভগবানের ইচ্ছেতেই হয় !কে জানে !মন্দিরের গায়ে রামায়ণ ,মহাভারত, পুরান ইত্যাদির কাহিনী থেকে তৈরি অনেক পুতুল থাকলেও কিছু আছে ঘর-গেরস্থালির কাহিনী। যেমন,গরুর দুধ দোয়ানোর পুতুল, ধান ঝাড়ার পুতুল,মেয়েদের ঢেঁকিতে পাড় দেওয়ার পুতুল– এমনি আরও কত কি! কিন্তু ওদের মাঝেই একটু বড় আকারের একটা পুতুল আছে ।মৎস্যকন্যার পুতুল ।এত সুন্দর পুতুলটা যে দেখলে মনে হয় এইমাত্র বুঝি মৎস্যকন্যা উঠে এলো সাগরের জল থেকে।। সারা সারা গায়ে বুঝি এখনো রেগে রয়েছ সমুদ্রের লবণ আর ফেনা।
মৎস্যকন্যা জল থেকে ডাঙায় উঠলে সেতো আর হাঁটতে পারে না ।তাই ছটফট করতে করতে মরে যায় সে ।মৎস্যকন্যার পুতুলটা সবেমাত্র হাত দিয়ে ছুঁয়েছে সুমনা, এমন সময় কানে এলো কে যেন বলছে, এই, তুই কি করছিস এখানে ?সুমনা ঘাড় ঘুরিয়ে দেখে, সরকারি বাড়ির ছোট গিন্নি মা। সুমনা এই ছোট গিন্নি মাকে খুব ভয় পায় ।তিনি স্বভাবে সরকারি বাড়ির বড় গিন্নিমা কমলাদেবীর ঠিক উল্টো। যেন সব সময়ই রেগে থাকেন ছোট গিন্নিমা। কাজ করেন কম, চিৎকার করেন বেশি। সে যাই হোক, ছোটগিন্নীমা একটা প্রশ্ন করেছেন তার তো জবাব দিতে হবে একটা। সুমনা এখন যদি বলে যে, বাদল দাদু ডেকে পাঠিয়েছে বলে সে এসেছে ,তাহলে হয়তো বলা যায়না বাদল দাদু কোন অসুবিধায় পড়তে পারে।সেটা মোটেই উচিৎ কাজ হবেনা। তাহলে কি উত্তর দেবে সে?
—– কিরে চুপ করে আছিস কেন? এখানে কি মতলবে এসেছিস বলতো? আবারো ছোট গিন্নি মা জিজ্ঞাসা করেন ।
সুমনা কিছু বলার আগেই শুনতে পায় যে ,বাদল দাদু বলছে, আমি ওকে একটু ডেকে পাঠিয়ে ছিলাম ছোট গিন্নিমা । ওর মায়ের খুব অসুখ, তা কবে থেকে কাজে জয়েন দিতে পারবে সেই কথাটা জানার জন্য ডেকেছিলাম।
—— বেশতো, তা আপনার জানা হয়ে গেছে তো? কিরে সুমনা,কবে আসবে তোর মা?
——–মায়ের জ্বর এখনো পুরোপুরি ছাড়েনি গো গিন্নি মা। মা ভাল হলেই কাজে আসব। বাদল ঠাকুর সাততাড়াতাড়ি বলে, সুমনা খুব চটপটে মেয়ে গো গিন্নিমা। এই তো এতক্ষণ আমাকে কুটনো কুটে দিলো ,ধুয়ে দিল, কতকিছু করলো ।তা সেই জন্যই আমি ওকে বললাম একটুখানি বসতে ।
——কেন?
—– ঠাকুরের ভোগ হয়ে গেলে সামান্য একটু প্রসাদ ওকে দেবো ছোট গিন্নিমা।
—– বলার আগে আমার তো অনুমতি নেননি । বড়দিভাই না হয় বাপের বাড়ি গেছে, আমিতো ।
—–ভোগ দেওয়ার পরে আপনি তো নিজের বাড়ির জন্য অনেকটা প্রসাদ নিয়ে যান।, আবার দান-খয়রাত করার জন্য আরো একজনকে জুটিয়েছেন। দেখুন ঠাকুর মশাই, আপনি পুজো করার মালিক ,পুজো করবেন ।প্রসাদ কাকে কি দিতে হবে না হবে সেটা না হয় আমাকে ভাবতে দেন ।দিদি ভাইয়ের প্রশ্রয়ে প্রশ্রয়ে সবাই দেখছি লাগামছাড়া হয়ে গেছে।। সুমনা অবাক হয়ে দুজনের কথাবার্তা শুনছিল ।তার জন্য বাদল দাদুকে এত কথা শুনতে হচ্ছে দেখে সুমনা বলে, আমার প্রসাদ চাইনাগো দাদু ।আমি যাচ্ছি।
এক ছুটে মন্দির এলাকা থেকে বেরিয়ে যায় সুমনা।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।