ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সমীরণ সরকার (পর্ব – ৮০)

সুমনা ও জাদু পালক
হিরণ কুমারকে ওই অবস্থায় দেখে রাজা রুদ্রমহিপাল খুব বিচলিত হয়ে ছুটে যাচ্ছিলেন পুত্রের কাছে । পরী রানী বাধা দিয়ে বললেন ,না মহারাজ, আপনি আগে যাবেন না , আগে আমাকে যেতে দিন।
—- কেন পরী রানী?
—- শয়তান হূডু কোন জাদু করে রাখতে পারে । সেক্ষেত্রে আপনি রাজপুত্রকে স্পর্শ করলে ওর এবং আপনার দুজনেরই ক্ষতি হতে পারে ।
রাজা রুদ্র মহিপাল শঙ্কিত কন্ঠে পরীরানীকে জিজ্ঞাসা করলেন, হে পরীরানী, আমার ছেলেটা ওভাবে মাটিতে পড়ে আছে কেন? ও বেঁচে আছে তো?
—- অবশ্যই আছে। মনে হয় সাময়িক জ্ঞান হারিয়েছে রাজকুমার অথবা ওকে জাদু বলে ঘুম পাড়িয়ে রাখা হয়েছে। আমি দেখছি কি করা যায়।
কথা শেষ করেই পরী রানী দুর্বোধ্য ভাষায় গানের মত সুর করে মন্ত্র বলতে বলতে কক্ষের ভিতর প্রবেশ করলেন। মন্ত্র বলতে বলতেই ঘরটির চারদিকে ঘুরলেন। মন্ত্রের সুরটা ঠিক যেন প্রার্থনা করার মত ।
মন্ত্র পড়া শেষ করে পরীরাণী রাজকুমারের কাছে গিয়ে ,নিজের জাদুদণ্ডটি রাজকুমারের শরীর স্পর্শ না করিয়ে মাথা থেকে পা অব্দি ঘোরাতে শুরু করলেন। তখনো মন্ত্র পড়ছিলেন পরী রানী। কিন্তু এবারের মন্ত্রের সুরটা আগের থেকে আলাদা। যেন বহুদূর থেকে ভেসে আসা সমুদ্রের গর্জনের মতো।
ওরা সবাই সবিস্ময়ে লক্ষ্য করল যে, পরী রানী প্রত্যেকবার যখনই তাঁর জাদু দণ্ডটি রাজকুমারের মাথা থেকে পায়ের কাছে নিয়ে আসছেন, সঙ্গে সঙ্গেই উজ্জ্বল লাল আলোয় ঘরটা ভরে যাচ্ছে। একটু পরেই সেই লাল আলোর ভিতর থেকে কালো ধোঁয়া বেরিয়ে কুণ্ডলী পাকাতে পাকাতে যেন হারিয়ে যাচ্ছে কোথাও। আর তারপরেই ওই উজ্জ্বল লাল আলো পরি- রানীর হাতে ধরা জাদুদন্ডের ভিতরে প্রবেশ করছে। দেখে মনে হচ্ছে যেন ওই দন্ডটি লাল আলো শোষণ করে নিচ্ছে।
চন্দ্রকান্তা ফিসফিস করে সুমনাকে বলল, কী
অদ্ভুত কাণ্ড!
—- সত্যি ।
—-পরীরানী তো একদম ঠিক কথাই বলেছিলেন। ওই শয়তান জাদুকর সত্যিই তো কালা জাদু করে ঘুম পাড়িয়ে রেখেছে রাজকুমারকে।
—– একদম তাই।
পরীরাণী ওই প্রক্রিয়া পরপর নয় বার করার পর ঘরের মেঝেতে বসে খুব ধীরে ধীরে রাজকুমারের মাথা নিজের কোলে তুলে নিলেন। আবার মন্ত্র বলতে শুরু করলেন । তবে এবারের মন্ত্রের সুরটা যেন কিছুটা আলাদা। ভোরের বিহগের কূজনের মতো ।কিছুটা সময় কেটে যাওয়ার পর হিরণ কুমার ধীরে ধীরে চোখ মেলল।
রাজকুমার পরীরাণীকে চেনে না। তাই সে অদ্ভুত দৃষ্টিতে কিছুক্ষণ তাকিয়ে থাকলো তাঁর মুখের দিকে। তারপর ক্ষীণ কন্ঠে বলল, আপনি কে?
—– আমি পরী রাজ্যের রানী।
—— আমি কোথায় ?
—— তোমাকে দুষ্টু জাদুকর হূডু মন্ত্র বলে বন্দী করে রেখেছিল এখানে।
—- আমার মা কোথায়?
—– তোমার মা প্রাসাদে আছেন। তোমার বাবা এসেছেন এখানে?
—- কোথায় আমার বাবা?
—- কাছেই আছেন, এক্ষুনি আসবেন।
পরীরাণী এবার রাজা রুদ্রমহিপালের উদ্দেশ্যে বললেন, এবার ভিতরে আসুন মহারাজ। রাজকুমারের বিপদ কেটে গেছে।
রাজা ঘরের ভিতরে ঢুকলেন। বাবাকে দেখেই উঠে বসলো হিরন কুমার । অশ্রু সজল চোখে রুদ্ধ কন্ঠে রাজা বললেন, হিরন কুমার, এখন কেমন লাগছে বাবা?
—- ভালো
কথা শেষ করেই হিরণ কুমার বাবার বুকে ঝাঁপিয়ে পড়ল। রাজা দু হাতে থাকে বুকে জড়িয়ে ধরলেন পুত্রকে। এই দৃশ্য দেখে সুমনা ও চন্দ্রকান্তার চোখ অশ্রু সজল হয়ে উঠলো।
কিছুক্ষণ পরে পরীরানী বললেন, চলুন মহারাজ, এবারে আমরা মহারানীকে উদ্ধার করি।
—– হ্যাঁ, চলুন।
হিরন কুমার জিজ্ঞাসা করল, বাবা ,ওই দুষ্টু যাদুকর আমার মাকেও কি আমার মত বন্দি করে রেখেছে?
——- হ্যাঁ বাবা। তাকে শুধু বন্দী করেই রাখেনি, ওই শয়তান জাদুকর তার চেহারাও বিকৃত করে দিয়েছে মন্ত্র বলে। তাছাড়া তাকে রাজপুরীর রন্ধনশালায় রান্নার কাজ করতে হচ্ছে।
এ কথা শুনে হিরন কুমার উঠে বসে বলল, কি বলছো বাবা , আমার মা এখন রান্নার কাজ করছে?
—— হ্যাঁ ।
—- আমি আমার মাকে উদ্ধার করতে যাব।
চন্দ্রকান্তা কক্ষের বাইরে থেকে বলল, আমরা সবাই রাণীমাকে উদ্ধার করতে যাব রাজকুমার। চন্দ্রকান্তার কথা শুনে হিরণ কুমার উঠে বসলো।
এবার সে লক্ষ্য করল যে কক্ষের বাইরে দুটি কিশোরী দাঁড়িয়ে আছে। অপরিচিত। হিরণ কুমার বলল, তোমরা কারা?
চন্দ্রকান্তা সুমনাকে দেখিয়ে বলল, ও রত্নমালা, হাসিখুশি দ্বীপের কনকনগর রাজ্যের রাজকন্যা।
—– আর তুমি?
কিছু বলতে গিয়ে চন্দ্রকান্তা কেঁদে ফেলল। হিরণ
কুমার বলল, একি, তুমি কাঁদছো কেন?
সুমনা বলল, ও চন্দ্রকান্তা, তোমাদের ‘পুষ্পনগর’ রাজ্যের পাশের রাজ্য ‘ সবুজের দেশ’ রাজ্যের রাজকন্যা। দুষ্টু জাদুকর হূডুর কালো জাদুর প্রভাবে ওদের রাজ্য আজকে মরুভূমিতে পরিণত হয়েছে। সে কথা মনে পড়তেই হয়তো ও কাঁদছে এখন।
—— তোমরা এখানে কেন এসেছ?
সুমনা উত্তর দিল, দুটো কারণ ছিল প্রথম কারণ পরীরাণীকে উদ্ধার করা। সেটা হয়ে গেছে। দ্বিতীয় কারণ হলো দুষ্টু জাদুকর হূডুকে পরাস্ত করে ওর জাদু দণ্ড কেড়ে ধ্বংস করে দেওয়া। আর তাহলেই তোমাদের পুষ্পনগর রাজ্য, ‘সবুজের দেশ’ রাজ্য ,’কনক নগর’ রাজ্য এবং আরো অনেক রাজ্য অভিশাপ মুক্ত হবে।
হিরণ কুমার বলল, আমাকে নেবে তোমাদের সাথে?,
সুমনা বলল, কেন হিরন কুমা
—- আমিও তোমাদের মত হূডুর বিরুদ্ধে লড়াই করব। সে তো আমার রাজ্যের ও শত্রু।
চন্দ্রকান্তা চোখের জল মুছে বলল, পুষ্প নগর রাজ্যের রাজকুমার হিরন কুমারকে স্বাগত জানাই আমাদের অভিযানে। আজ থেকে আমরা ‘ত্রয়ী’!
এত মিষ্টি করে কথাটা বলল চন্দ্রকান্তা যে হিরন কুমার তার দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইল।
চলবে