কলিংবেলটা খুব বিশ্রীভাবে কে যেন বাজাচ্ছে। এতটুকু ধৈর্য নেই তার। বাজিয়েই যাচ্ছে। টিভিতে মহাপঞ্চমীর সব বড় বড় ঠাকুর ও প্যান্ডেল দেখাচ্ছে। আরতি মন দিয়ে তাই দেখছে। কিন্তু কলিংবেলের ক্রমাগত আওয়াজে আরতি খুবই বিরক্ত হল। প্রায় দৌড়েই যেন ঘর থেকে বেরিয়ে লম্বা ডাইনিংটা টপকে চলে গেল। তারপর দরজাটা খুলে মুখটা বাড়িয়ে থমকে গিয়ে বলল, “ওমা, তনু তুই?”
“কি করছিলে? এতক্ষণ ধরে বেল বাজাচ্ছি শুনতে পাচ্ছিলে না?”, তনু ঝেঁজে উঠে এবার একটা মুখ খিস্তিই করে ফেলল।
আরতি চমকে উঠে কানে আঙুল দিয়ে বলে, “ওমা, ছিঃ ছিঃ তুই এসব গালাগাল কেন দিচ্ছিস? আয়, আয় ভেতরে। আয়”।
কোলাপসিবল গেটের তালাটা খুলে দিতেই তনু টলতে টলতে ঘরে ঢুকে ডাইনিং-এ রাখা লম্বা সোফাটায় ধপাস করে বসে পড়ল।
আরতি ছেলের এই অবস্থা দেখে হতচকিৎ হয়ে যায়। তনুর মুখে মদের উগ্র গন্ধ। ছেলেটা ‘ঠাকুর দেখতে যাচ্ছি, ফিরতে রাত হবে’ বলে বেরিয়েছিল দুপুরে। বিকেল হওয়ার আগেই এমন বেসামাল হয়ে ফিরে এল কেন বুঝতে না পেরে আরতি বলল, “কি হল তুই এত তাড়াতাড়ি ফিরে এলি যে! এ কি অবস্থা তোর!…”
“রাস্তায় শালা এক ঢ্যামনা জেঠু জুটেছিল। গান্ডু জেঠুটা আমার সব চটকে চাটনি করে দিয়েছে”। তনু বিড় বিড় করে কথাগুলো নেশার ঘোরে বলে যায়।
আরতি ছেলের কথাগুলো ঠিক বুঝতে পারে না। অসহায়ভাবে চেয়ে থাকে ওর দিকে। অবাক হয়ে ভাবে, তনুটা দিনকে দিন কেমন যেন হয়ে যাচ্ছে। কলেজ শেষ করে সবেমাত্র ইউনিভার্সিটিতে গেল ক’মাসও হয়নি। ছেলেটা এর মধ্যেই কত দ্রুত বদলে গেল। আজকাল কথায় কথায় মুখ খিস্তি করে। লজ্জাও পায় না। বাড়িতে প্রকাশ্যে সিগারেট ধরায়। মদ লুকিয়ে-চুরিয়ে প্রায়ই খেয়ে আসে। কিচ্ছু বলা যায় না। চিৎকার করে সিন ক্রিয়েট করবে। বাবাকেও বাজে বাজে কথা বলে দেয়। সুকল্যাণ ছেলেকে তাই এখন আর কিছুই বলে না। আরতি তনুকে অনেক বোঝাবার চেষ্টা করেছে, কিন্তু শোনেই না। কেমন ডোন্ট কেয়ার হাব ভাব হয়ে গেছে ওর।
তনু টলতে টলতে বাথরুমে গেল। বেরিয়েও এল একটু পরে। আরতি বলল, “কি রে ফ্লাশ করলি না?”
“ধুৎ শালি!”, তনু মুখ ভেংচে কেমন বিকৃত উচ্চারণে বলল, “তুমি দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখছো কেন? ফ্লাশটা করে দিতে পারছো না?”
আরতি নীরবে বাথরুমে ঢুকে ফ্লাশ করে দিয়ে এল। ইউরিনের গন্ধের সঙ্গে মদের গন্ধ মিশে কি বিশ্রী উৎকট একটা গন্ধ সৃষ্টি হয়েছিল।
তনু টলতে টলতেই ফ্রিজের দরজাটা খুলে একটা ঠান্ডা জলের বোতল বের করে ঢগ ঢগ করে অনেকটা জল খেল। আরতি নির্বাক, নিশ্চুপ হয়ে শুধুই দেখছে। তনুর পকেটের মোবাইলটা বাজছে। বেজেই যাচ্ছে। তনুর খেয়াল নেই। আরতি ছেলের দিকে ভয়ে ভয়ে চেয়ে বলল, “হ্যাঁরে ফোনটা তো বাজছে তোর পকেটে”।
তনু এ পকেট, ও পকেট হাতড়াতে হাতড়াতে শেষ পর্যন্ত ফোনটা বের করতেই কলটা কেটে গেল। “ধুৎ ল্যাওড়া!” বলে তনু বেজায় চটে গিয়ে মোবাইলটা প্রায় ছুঁড়েই ফেলে দিল সোফায়।
আরতি এসব দেখে বিস্ময় আর আতঙ্কে কুঁকড়ে যায়।
ফোনটা আবার বাজতে শুরু করেছে। তনু কাঁপা কাঁপা হাতে ফোনটা এবার তুলে নিয়ে দাঁত খিঁচড়ে বলে, “কে বে?”
ও প্রান্ত থেকে জবাব আসে, “তন্ময়, আমি রাজীবদা”।
-“অ তুমি! তা ফোন করছো কেন বলো?”
-“তন্ময়, অয়ন আমাকে সব বলেছে”।
“ধুৎ শালা, অয়নটা একটা হাফগান্ডু”। তনু বিশ্রী চিৎকার করে বলল, “ও আমায় কি বলেছো জানো, আমি নাকি সত্যিই বেশি বাওয়াল করছিলাম বাসে”।
-“তুই পাবলিক বাসে অত মুখ খিস্তি করে কথা বলছিলিস কেন?”
-“ধুৎ ল্যাওড়া, তুমিও তো দেখছি ঐ জেঠুটার মত ঢ্যামনা হয়ে গেছো”।
“তন্ময়!”, ধমকে ওঠে রাজীবদা।
“জানো রাজীবদা, অয়ন দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে দেখল বাস ভর্তি লোক আমাকে হ্যাটা করল, প্যাক দিল। ঐ শালা গান্ডু জেঠুটা আমাকে থাপ্পড় মারল, অয়ন কিচ্ছু করল না!” তনু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কথাগুলো শেষ করল।
-“তুই এখন কোথায়?”
-“বাড়ি চলে এসেছি”।
-“শর্মিলার ফ্ল্যাটে আজ আমাদের পার্টি আছে। আসবি না?”
-“না। এই পুজোয় আমি আর কোত্থাও যাব না। গান্ডু জেঠুটা…”
-“আবার সেই কথা! ভুলে যা বলছি। চলে আয়। মন ভালো হয়ে যাবে”।
-“রাজীবদা সত্যিই আমার মন ভালো নেই। রাস্তার একটা বেফালতু ঢ্যামনা লোক শালা আমায় থাপ্পড় মারল, আমি বাঁড়া কিচ্ছু করতে পারলাম না!…”
-“ঠিক আছে। শান্ত হ। এখন বাড়িতেই থাক। একটু রেস্ট নে। আমি অভিজিৎকে পাঠাব। তুই ওর বাইকে চেপে চলে আসবি। মোনালিসা ভালো স্কচ আনবে। ফুলটুস মস্তি হবে সারারাত”। ফোনের কথা শেষ হতেই তনু তাচ্ছিল্যের সঙ্গে মোবাইলটা ছুঁড়ে ফেলে দিল সোফায়। তারপর আর নিজেকে ধরে রাখতে না পেরে ঢলে পড়ল সোফাতেই। পড়েই কেমন বেহুশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়ল।
আরতি ঘরের টিভিটা বন্ধ করে দিয়ে এসে দেখল বেহুশ ছেলেটাকে। তনুটা সত্যিই কেমন হয়ে যাচ্ছে দিনকে দিন। এই তনুকে আরতি চেনে না। তনু পড়াশোনায় কত ভালো। রেজাল্টও ভালো করেছে। মাস্টার্স করছে। কেমিস্ট্রি ওর প্রিয় সাবজেক্ট। পিএইচডি করার ইচ্ছে। ছোটবেলা থেকেই তনু ব্রিলিয়ান্ট। একটু কথা বেশি বলে। একদম চুপ করে থাকতে পারে না। কিন্তু এমন অনর্গল মুখ খিস্তি করাটা শুরু হল কলেজ শেষ করে ইউনিভার্সিটিতে পা দিয়েই। মদ খাওয়াটাও শিখল। সিগারেট আগে লুকিয়ে খেত। এখন প্রকাশ্যেই ধরায়। বেশি কিছু বলাই যায় না। চিৎকার করে ওঠে। নোংরা নোংরা কথা বলে। আজ নিশ্চয়ই বড় কিছু একটা হয়েছে রাস্তাঘাটে। কিন্তু ঠিক কি যে হয়েছে আরতি বুঝতে পারছে না।
পঞ্চমীর রাতে আরতি সুকল্যাণের সঙ্গে ঠাকুর দেখতে যাবে প্ল্যান হয়ে আছে। সুকল্যাণ আজ অফিস থেকে তাড়াতাড়িই ফিরে আসবে বলে গেছে। তনু ওদের সঙ্গে এখন আর কোথাওই যেতে চায় না। আরতি একবার ভাবল সুকল্যাণকে ফোনে সব বলবে। আবার ভাবল সুকল্যাণ হয়তো চিন্তা করবে। ভয়ও পাবে। ছেলেকে তো শাসন করা দু’জনেই ছেড়ে দিয়েছে বহুদিন আগে। ছেলে এখন দারুণ স্বাধীন। পড়াশোনায় ভালো বলে সব মাফ। এত মেধাবী ছেলেও কেমন বেসামাল চরিত্রের হয়ে উঠছে। আরতির এসব ভেবে খুব কষ্ট হয়। চোখ ফেটে জল গড়িয়ে পড়ে। সোফায় বেহুশ হয়ে পড়ে থাকা নিজের সন্তানের দিকে চেয়ে আরতি নীরবে কাঁদতে থাকে।
তনুর মোবাইলটা আবার বাজছে। তনুর হুশ নেই। গভীর ঘুমে আচ্ছন্ন হয়ে রয়েছে। আরতি ভয়ে ভয়ে ছেলের পাশে গিয়ে পরখ করে দেখল ছেলেটা সত্যিই ঘুমে কাদা হয়ে আছে। মোবাইলটা বাজছে তখনও। তাই একটু সঙ্কোচের সঙ্গেই মোবাইলটা হাতে তুলে নিয়ে দেখল স্ক্রিনে অয়নের মুখ। অয়ন ফোন করছে। এই অয়নকে আরতি চেনে। ছেলেটা কলকাতায় পড়তে এসেছে। হস্টেলে থাকে। খুবই ভালো ছেলে। রেজাল্টও ভালো। অয়নের সঙ্গে তনুর খুব ভাব। অয়ন এই বাড়িতেও এসেছে অনেকবার। বেশ শান্ত, সুভদ্র ছেলে। তনুর একদম বিপরীত। তনু যেমন অশান্ত, তেমন মুখভরা বাজে কথা। অথচ এমন ভিন্ন স্বভাবের দুজনের বন্ধুত্বও খুব। আরতিকে অয়ন খুব সুন্দর করে কাকিমা বলে ডাকে। সুকল্যাণও অয়নকে পছন্দ করে। আরতি ফোনটা হাতে নিয়ে একটু দূরে সরে গিয়ে কল রিসিভ করে বলল, “হ্যালো…”
-“কাকিমা, আমি অয়ন”।
-“হ্যাঁ, বলো”।
-“তন্ময় কোথায়?”
-“ও তো বেহুশ হয়ে ঘুমিয়ে পড়েছে। কি ব্যাপার বল তো?”
অয়ন চুপ করে থাকে। আরতি আবার প্রশ্ন করে, “অয়ন কি হয়েছে একটু বলবে?”,
-“কাকিমা, আজ আমরা দুজন প্রথমে সিনেমা দেখব বলে ঠিক ছিল। তাই বাসে করে হলেই যাচ্ছিলাম”।
-“বাসে কি কিছু হয়েছে?”
-“হ্যাঁ কাকিমা, বাসেই ঘটনাটা ঘটেছে”।
-“কি ঘটেছে অয়ন?”
-“আমি আর তন্ময় পাশাপাশি বসেছিলাম। বাসটা ফাঁকাই ছিল। খুব কথা বলছিল তন্ময়। ননস্টপ কথা”।
-“কথা তো ও একটু বেশিই বলে”।
-“আমাদের ঠিক আগের সিটটাতেই একজন বয়স্ক ভদ্রলোক বসেছিলেন। তন্ময় প্রতিটি কথার শেষে একটা করে মুখ খিস্তি, স্ল্যাং ইউজ করছিল”।
-“তাই! ছিঃ ছিঃ”।
-“ভদ্রলোক মুখ ঘুরিয়ে একবার বিরক্তি প্রকাশ করেন”।
-“তারপর?”
-“কিন্তু কাকিমা, তন্ময় তবু থামে না। কথা বলেই যায়। স্ল্যাংও ইউজ করে চলে”।
-“একটুও ভয় পায় নি?”
-“না কাকিমা। ভদ্রলোক তখন উঠে দাঁড়িয়ে সতর্ক করলেন, “তুমি কিন্তু ঠিক করছো না। এত মুখ খারাপ করে কথা বলছো কেন?”
তন্ময় তখন হঠাৎ বলে, “আমি কথা বলছি তো আপনার কি? কথা বলা আমার ফান্ডামেন্টাল রাইট”।
-“এ বাবা! ছিঃ ছিঃ। ও এই কথা বলেছে!”
-“হ্যাঁ কাকিমা। ভদ্রলোক তো তখন ভীষণ রেগে গিয়ে বলেন, “কথা বলা ফান্ডামেন্টাল রাইট। কিন্তু পাবলিক বাসে মুখ খারাপ করে কথা বলা ফান্ডামেন্টাল রাইট হতে পারে না। তুমি বাসে বসে এসব স্ল্যাং ইউজ করবে না”।
-“বেশ করছি। যান”। তন্ময় হঠাৎ ক্ষেপে উঠে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়।
-“ছিঃ ছিঃ”। আরতি অবাক হয়ে বিড় বিড় করে বলে।
ভদ্রলোকও তখন চ্যালেঞ্জ নিয়ে বলেন, “তুমি আর একবার এইসব বাজে কথাগুলো বলে দেখ, তোমায় আমি বাস থেকে নামিয়ে দেব”।
-“তারপর কি হল?”, আরতি অধীর হয়ে ওঠে।
-“তন্ময় কিছুক্ষণ চুপ করেছিল। কিন্তু তারপরই আবার শুরু করে বাজে কথা বলা। প্রথমে বিড় বিড় করে আমাকে বলল, বুঝলি নবান্নে গিয়ে দিদিকে বলে আসব ভাবছি, একটা ‘জেঠুশ্রী’ পুরস্কার চালু করতে”।
-“ইশ!” আরতি দীর্ঘশ্বাস ফেলে বলল।
-“তন্ময়কে আমি তখন ইশারায় থামতে বলছি। কিন্তু ও আমার কথা শোনে না। উল্টে বলে, ভয় পাচ্ছিস নাকি? এই সব জেঠু মার্কা মালরা আমার . . . বলে পরপর দুটো খুব খারাপ কথা জুড়ে দেয়”।
-“আমি ভাবতে পারছি না। ছিঃ ছিঃ”। আরতি বিস্ময় আর লজ্জায় ভেঙ্গে পড়ে।
-“কাকিমা, ভদ্রলোক তখন রাগে কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘ছিঃ ছিঃ তুমি আবার . . . বাস থেকে নেমে যাও। তোমাকে আর বাসে বসতে দেব না। নেমে যাও বলছি!’ বাসের অন্য যাত্রীরাও তখন ক্ষেপে যায়। খুব হৈ চৈ শুরু হয়ে যায়। আমি তখন খুব ভয় পেয়ে ঘাবড়ে গিয়েছিলাম কাকিমা। বাসের মধ্যে একজন দিদি আমার দিকে আঙুল তুলে বলল, ‘এ তোমার বন্ধু হয়!’”
-“তারপর কি হল?”
-“তন্ময় তো নামবে না বাস থেকে। সিট আঁকড়ে বসে থাকে। ভদ্রলোক তখনই ওকে এক থাপ্পড় মারেন এবং জোর করে সিট থেকে তুলে বাস থেকে নামিয়ে দেন আমাদের”।
আরতির চিৎকার করে তখন যেন বলতে ইচ্ছে হয়, বেশ হয়েছে। ঠিক। একদম ঠিক কাজ করেছেন ভদ্রলোক। উচিত শিক্ষা একেই বলে।
অয়ন এবার ধীরে ধীরে বলে, “বাস থেকে নেমে তন্ময় আমার সঙ্গে খুব রাগারাগি করে। বলে আমি কেন চুপ করেছিলাম? কেন ওকে সাপোর্ট করি নি? ও রেগে চলে যায়। আমি হোস্টেলে ফিরে আসি। তারপর ও কোথায় গেল বুঝতে পারছিলাম না। অনেকবার ফোন করেছি। ফোন ধরেনি”।
-“ও তো খুব গুণধর ছেলে আমার। তাই মদ গিলে বাড়ি চলে এসেছে”। আরতি রাগে, দুঃখে কথাটা কামড়ে কামড়ে বলে।
অয়ন বলল, “কাকিমা, আমি কাল বাড়ি চলে যাচ্ছি। পুজোর ছুটিতে গ্রামের বাড়িতেই থাকব। ইউনিভার্সিটি খুললে আবার আসব”।
-“যাও। সাবধানে যেও। ভালো থেকো”।
আরতি এবার ছেলের ফোনটা ফেরৎ দিতে ফিরে আসে সোফার কাছে। এসে দেখে ছেলে নেই। একটু ঘাবড়ে যায়। এদিক ওদিক তাকায়। তারপর বুঝতে পারে তনু আবার টয়লেটে গেছে। এবং আশ্চর্য, টয়লেটের দরজাটা খোলা রেখে। আরতি ফুঁসে ওঠে ভেতরে ভেতরে। টয়লেট করে তনু টলতে টলতেই বেরিয়ে আসে। এবারও জল না দিয়ে। ফ্লাশ না করে। আরতি আর ধৈর্য্য ধরে রাখতে পারে না। মাথা গরম হয়ে যায়। ছেলেকে ধমক দিয়ে বলে, “কি হল জল দিলি না? ফ্লাশ করে আয়”।
তনু টলছে। বিড় বিড় করে বলল, “ধুৎ শালি, তুমি দাঁড়িয়ে দেখছো তো . . . একটু ফ্লাশ করে দিতে পারছো না?”
আরতি ভয়ঙ্কর রাগে গর্জে উঠে বলল, “কি বললি?”, তারপর দাঁত কামড়ে হুঁশিয়ার করে দিয়ে বলল, “ফের যদি বলিস একথা…”
তনু হাসছে। বিদ্রুপের হাসি। তাচ্ছিল্যের হাসি হাসতে হাসতেই বলে, “ফের বললে তুমি কি করবে? কিসসু করতে পারবে না!”
-“তুই বলেই দেখ না, কি করি?” আরতি প্রবল রাগে অপমানে কাঁপতে কাঁপতে চ্যালেঞ্জ ছুঁড়ে দেয়।
তনু বিদ্রুপের হাসিটা হেসে বলল, “ধুৎ শালি!”
শরীরের সমস্ত শক্তিকে জড় করে আরতি সপাটে মারল এক চড়। তনু ছিটকে পড়ে যেতে গিয়েও পড়ল না। টাল খেয়ে দাঁড়িয়ে গেল। তারপর গালে হাত দিয়ে অবাক চোখে স্থির হয়ে মাকে দেখছে। আরতির এই অচেনা রুদ্রমূর্তি দেখে তনু ঘাবড়ে যায়। কথা বলা থেমে যায়। আরতি এবার পুলিশি মেজাজে ধমকে ছেলেকে নির্দেশ দিল, “যা টয়লেটে গিয়ে ফ্লাশ করে আয়। যা বলছি।…” তনু গালে হাত দিয়ে থম মেরে দাঁড়িয়েই থাকে। আরতি আবারও কড়া ধমক দিয়ে নির্দেশ দিল, “এক্ষুনি যা বলছি”।
তনু টলতে টলতে নীরবে টয়লেটের দিকে চলে গেল। ফ্লাশের শব্দ হল। সিস্টান থেকে জল ঝর ঝর করে প্যানে ঝরে পড়ছে।…
আরতি দূরে দাঁড়িয়ে ছেলেকে দেখতে দেখতে ভাবছে, ঐ জেঠুর কাছে আমি কৃতজ্ঞ। দাদা, আপনিই আমাকে এই সাহসটা জোগালেন। আপনার মত জেঠুর সংখ্যা আরও বাড়ুক। আমরাও তবে এমন সাহসী হয়ে উঠতে পারব!