সাপ্তাহিক ধারাসম্পাতে সিদ্ধার্থ সিংহ (পর্ব – ৮)

দেবমাল্য
দুই
ঘরের মধ্যে এতগুলো চিল এল কোথা থেকে! চিল না শকুন! বিশাল বিশাল ডানা ঝাপটানোর আওয়াজ। ওরা কি বেরোনোর রাস্তা পাচ্ছে না! ধড়মড় করে বিছানায় উঠে বসল দেবমাল্য। দেখল, চিল-শকুন নয়, দরজা-জানালার ভারী পর্দাগুলো উথাল-পাথাল খাচ্ছে।
দেবমাল্য অবাক! তার স্পষ্ট মনে আছে, শুতে যাওয়ার আগে কাল রাতে ও খুব ভাল করে দরজা-জানালাগুলো আটকে দিয়েছিল। তা হলে এগুলো খুলল কে! না খুললে পর্দাগুলো ও ভাবে উড়ছে কী করে! প্রথমে ঢুকে একটুক্ষণ পাখা চালিয়েছিল ঠিকই, তখন খুব গরম লাগছিল। এসি চালানোর পর ঘর ঠান্ডা হয়ে যেতেই সে-ই যে পাখা বন্ধ করেছিল, আর খোলেনি।
তা হলে কি রাতে লোডশেডিং হয়েছিল! অনেক ডেকেও তাকে তুলতে না পেরে, গরমের জন্য যাতে ঘুম ভেঙে না যায়, সে জন্য হয়তো হোটেলের লোকেরাই বাইরে থেকে ডুপ্লিকেট চাবি দিয়ে খুলে দরজা-জানালাগুলো হাট করে খুলে দিয়েছিল।
কিন্তু তা-ই বা কী করে হবে!এত বড় একটা হোটেল সেখানে কি জেনারেটর নেই! না, সেটা কিছুতেই হতে পারে না। তা হলে কী হয়েছে!
চোখ মেলে ভাল করে তাকিয়ে দেখে, চিল-শকুন-পর্দা নয়, সারা ঘর জুড়ে মাথার ওপরে বনবন করে চক্কর মারছে কতগুলো মানুষের কাটা মুন্ডু। কারও চোখ আগুনের গোলার মতো জ্বলছে। কারও মুখ পোড়া কাঠকয়লার মতো বীভৎস। আবার কারও মুখে বিকট হাসি। কারও মুখের দিকেই তাকানোই যাচ্ছে না।
দৃশ্যটা দেখে অজ্ঞান হয়ে যাওয়ার মতো অবস্থা হয়েছিল তার। তবু কোনও রকমে মাতালের মতো খাট থেকে নেমে ঘরের লাইটটা জ্বালিয়ে দিল দেবমাল্য। আর তখনই দেখল, সব ভো ভা। কোথায় সেই কাটা মুন্ডুগুলোর ওড়াউড়ি! কোথায় চিল-শকুনের ডানা ঝাপটানো, আর কোথায় সেই পর্দার দাপাদাপি। বারবার দেওয়ালে আছড়ে পড়া। আর পাঁচটা ঘরের মতোই স্বাভাবিক, শান্ত।
তখনও ভয়ে তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আছে। গলা থেকে শব্দ বেরোচ্ছে না। শুকিয়ে কাঠ। কেউ যেন দু’হাত দিয়ে তার গলা টিপে ধরেছে।
বাড়ির বাইরে বেরোলে যদি তেষ্টা পায় তা হলে মিনারেল ওয়াটার ছাড়া দেবমাল্য খায় না। একবার ডুলুং বেড়াতে গিয়েছিল ও। জঙ্গলের আঁকাবাঁকা রাস্তায় গাড়ি চালাতে চালাতে নানান গল্প বলছিল ড্রাইভার। কবে কোন ট্যুরিস্ট জঙ্গলের অপরূপ সৌন্দর্য দেখে এতটাই মুগ্ধ হয়েছিলেন যে, মাঝ জঙ্গলে গাড়ি থেকে নেমে এদিক ওদিক তাকাচ্ছিলেন। সেও নেমে পড়েছিল গাড়ি থেকে। হঠাৎ তাকিয়ে দেখে, তাদের গাড়িটাকে ঘিরে রয়েছে এক দঙ্গল বুনো হাতি। শুঁড় দিয়ে গাড়িটাকে তোলার চেষ্টা করছে। কেউ মাথা দিয়ে ধাক্কা মারছে। সে যাত্রায় সে যে কী করে বেঁচেছিল, সেটা সে-ই জানে। একবার জোড়া খড়্গওয়ালা একটা গন্ডার তার গাড়ির সামনে এসে দাঁড়িয়েছিল। নট নড়নচড়ন।