ক্যাফে ধারাবাহিক ভ্রমণ সিরিজে সুব্রত সরকার (পর্ব – ১১)

রবি ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ির গ্রাম – দক্ষিণডিহি
বাংলাদেশ ভ্রমণে যশোর, কুষ্টিয়া হয়ে খুলনায় পৌঁছেই খবর নিলাম রবি ঠাকুরের শ্বশুর বাড়ির গ্রাম দক্ষিণডিহি – ফুলতলার।
রবি ঠাকুরের জীবনের অনেক কিছু দেখেছি। কিন্তু শ্বশুর বাড়ি দেখার সৌভাগ্য যখন হাতের কাছে এসেই গেছে, এটাও দেখে যাব। শ্বশুর বাড়ি বলে কথা!.. তার ওপর আবার রবি ঠাকুরের শ্বশুর বাড়ি!..
বাংলাদেশের দুই বন্ধু সইফুর মিনা ও সৈয়দ খায়রুল আলম খবর যোগাড় করে দিলেন। এবং সফরসঙ্গী হতেও চাইলেন খায়রুল। সে বাংলাদেশ সড়ক পরিবহনের একজন মানবিক সমাজকর্মী। আর সইফুর মিনা হলেন খুলনা নতুন তারা সমাজকল্যাণ ও সাহিত্য সংস্থার কর্ণধার।
খুলনার দৌলতপুর পরিদর্শন বাংলোয় এক রাতের অতিথি ছিলাম। সেখান থেকে দক্ষিণডিহি- ফুলতলা খুব সহজেই অটো করে পৌঁছে গেলাম। পথের হিসেবে কমবেশি কুড়ি বাইশ কিমি হবে।
পাকা সড়ক শেষ করে গ্রামের সরু পথে ঢুকে পড়ল আমাদের অটো। বাংলাদেশের আর পাঁচটা পরিচিত গ্রামের মতই সবুজ শান্ত এক পল্লীগ্রাম এই দক্ষিণডিহি – ফুলতলা। চেনা পরিচিত সব গাছপালা, ছোট ছোট পুকুর, পানের বরোজ দিয়ে সাজানো এই দক্ষিণডিহি – ফুলতলা। পথ যত ছোট হয়ে আসছে, আমার মনের গহন অন্তরালে ঠাকুরের শ্বশুর বাড়ি দেখার কৌতুহল তীব্র হচ্ছে। কল্পনায় কেবলই ভাবতে চেষ্টা করছিলাম, একদিন রবিঠাকুর এই গ্রামে বরবেশে বিয়ে করতে এসেছিলেন! নিশ্চয়ই এই পথ দিয়েই পালকি করে নয়তো ঘোড়ার গাড়ি করে এই সৌখিন সুপুরুষ কবি বরবেশে এসেছিলেন। সময়কালটা তখন ছিল, ১২৯০ বঙ্গাব্দের ২৪ অগ্রহায়ণ, ইংরেজির ১৮৮৩ সাল। রবি ঠাকুরের বয়স তখন মাত্র ২২ বছর ৭ মাস। আর তাঁর সাথে যার বিবাহ হয়েছিল সেই বেণীমাধব রায় এর কন্যা ভবতারিণী দেবী ওরফে পদ্ম, ওরফে ফুলি, ওরফে ফেলীর বয়স সবে ১০/১১! সে সময়ের বাল্যবিবাহ। এই ভবতারিণী দেবীর নামই পরে ঠাকুরবাড়িতে এসে হয় মৃণালিনী দেবী। তাই রবীন্দ্র – মৃণালিনীর স্মৃতি বিজড়িত এই বাড়িটি আজ পর্যটকদের কাছে খুবই আকর্ষণীয়। সারাবছর দেশ – বিদেশের পর্যটকরা আসেন। প্রতিবছর এখানে কবির জন্মদিন ( ২৫ শে বৈশাখ) ও প্রয়াণ দিবস ( ২২ শে শ্রাবণ) পালন করা হয়। রবীন্দ্র মেলা হয়।
খুলনা উপজেলা প্রশাসন থেকে দক্ষিণডিহি – ফুলতলা গ্রামের রায়চৌধুরীদের এই ৬৭ একর জমি সহ বসতবাড়িটাকে অত্যন্ত যত্ন করে পর্যটকদের জন্য সাজিয়ে গুছিয়ে এক জাদুঘর করে তুলেছেন। এটাই রবিঠাকুরের শ্বশুর বাড়ি!বর্তমানে এর পোষাকি নাম- রবীন্দ্র কমপ্লেক্স।
এই যাদুঘরে প্রবেশ করার জন্য টিকিট সংগ্রহ করলাম। টিকিটের মূল্য বাংলাদেশের নাগরিকদের জন্য দশ টাকা। সার্কভুক্ত দেশের জন্য পঁচিশ টাকা ও বিদেশীদের জন্য একশো টাকা। টিকিট কেটে ভেতরে প্রবেশ করে অদ্ভুত এক অনুভূতি হয়। দালান কোঠার স্হাপত্যে ব্রিটিশ শৈলী রয়েছে। ভবনের প্রবেশমুখে কবি ও কবি পত্নীর আবক্ষ মূর্তি রয়েছে। যদিও মূতিটা দেখে মন ভরে না। এখানে প্রবেশ করে কেবলই মনে হচ্ছিল রবি-ছায়া যেন আমার পাশে পাশে ঘুরছেন! সারা বাড়ি জুড়ে রবি ঠাকুর। একদম শ্বেত শুভ্র দ্বিতল দালান কুঠিটা রবি ঠাকুরের বহু ছবি ও তথ্য দিয়ে সযত্নে সাজানো। ঠাকুরের শ্বশুর বাড়ির বংশপরিচয়ও জানা যায়। এই বাড়ি সংস্কারের আগের সেই প্রাচীন ছবি ও সংস্কারের পরবর্তী নতুন ছবি পাশাপাশি সুন্দর সাজানো রয়েছে। অনেক মূল্যবান ছবি ও কবির ব্যবহৃত জিনিস চাক্ষুষ দেখার আনন্দ ও রোমাঞ্চ সারা জীবনের অমূল্য স্মৃতি।
এই দক্ষিণডিহি- ফুলতলা শুধু রবিঠাকুরের শ্বশুরবাড়ির গ্রাম নয়। এই গ্রামের জামাই ছিলেন স্বয়ং প্রিন্স দ্বারোকানাথ ঠাকুর ও মহর্ষি দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরও। দ্বারোকানাথ ঠাকুরের স্ত্রী ছিলেন দিগম্বরী দেবী ও দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুরের স্ত্রী ছিলেন সারদাদেবী। এরা দু’জনই ছিলেন দক্ষিণডিহির বিখ্যাত রায়চৌধুরী বংশের কন্যা। রবীন্দ্রনাথের কাকিমা ত্রিপুরা সুন্দরীদেবীও ছিলেন এই গ্রামের কন্যা।
রবি ঠাকুরের শ্বশুর বাড়ির দালান কোঠার ঘরে ১৯১৩ সালে প্রাপ্ত কবির নোবেল বক্তৃতার প্রতিলিপি রাখা রয়েছে। সেখানে রবি ঠাকুর লিখেছেন..”এ হচ্ছে আমার ভেতরকার প্রাচ্য, যা আমি পাশ্চাত্যকে দিলাম।” আরও এক জায়গায় তিনি লিখেছেন, ” মানুষের কর্তব্য অন্য মানব সম্প্রদায় বা ব্যক্তিসমূহের সঙ্গে যুদ্ধ করা নয় বরং মানুষের কর্তব্য প্রীতি ও শান্তির বাতাবরণ রচনা করা এবং বন্ধুত্ব ও ভালবাসার সম্পর্ককে পুনরুজ্জীবিত করা, মানুষ তো কলহপ্রবণ পশু নয়।”
এই জাদুঘরের দেওয়াল জুড়ে রবি ঠাকুরের সাহিত্য কর্ম ও জীবনী সুন্দর করে লিখে রাখা রয়েছে। সেখানে জানা-অজানা অনেক তথ্য সাজিয়ে দেওয়া রয়েছে- রবীন্দ্রনাথ মোট দু’বার ঢাকায় এসেছিলেন। প্রথমবার ১৮৯৮ সালে, তখন তাঁর বয়স ৩৭। দ্বিতীয়বার ১৯২৬ সালে, তখন তিনি পৃথিবী বিখ্যাত কবি, বয়স তাঁর ৬৫। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে এসেছিলেন বক্তৃতা দিতে। তিনি গান লিখেছিলেন প্রায় আড়াই হাজার। ছবি এঁকেছিলেন দু’হাজার। ছোটগল্প ১১৯ টি। উপন্যাস ১৩ টি। নাটক, নৃত্যনাট্য, প্রহসন সব মিলিয়ে ৫০ টি। ভ্রমণগ্রন্থ মোট আটটি। এবং সর্বশেষ রচনা ৭৩ বছর বয়সে ” চারঅধ্যায়”। আর বিদেশযাত্রা করেছিলেন মোট বারোবার। ভ্রমণে এসে এইসব জানা ও শিক্ষালাভ করার আনন্দে ভ্রমণ আরও সুন্দর ও সার্থক হয়ে যায়।
একটা বেলার দু’চার ঘন্টা ঠাকুরের শ্বশুর বাড়ির রৌদ্রছায়ায় ঘুরে বেশ কেটে যায়। গ্রামটা এখনও সেই পল্লীগ্রামের মতই সবুজ ও শান্ত নিরিবিলিময়। শ্বশুবাড়ির দালান, চাতাল, বাগানও খুব পরিষ্কার, পরিচ্ছন্ন। ঠাকুরের এই শ্বশুরবাড়ি ভ্রমণ এক অনন্য অনুভূতির জন্ম দেয় হৃদয়ে।
পায়ে পায়ে এঘর ওঘরগুলো ঘুরে দেখলাম। আর অতীতের সেই সব জানার ছলে কল্পনায়ও দেখলাম কবির এখানে বসবাসের দিনরাত্রি গুলোকে। এই ছোট্ট ভ্রমণ খুবই মধুর ছিল।
ভ্রমণ শেষে গ্রামের পাশ দিয়ে বয়ে যাওয়া ভৈরব নদীর ঘাটে চলে গেলাম। নদীতে জল টলটল করছে। এবার ফেরি নৌকোয় পেরিয়ে চলে যাব ওপারে সিকিরহাটে। তারপর শুরু হবে নতুন পথে পা দেওয়া। বাস কন্ডাক্টর হাঁক মারছে, ‘নড়াইল। নড়াইল।’এই বাসে করে এবার চলে যাব বাংলাদেশের আরও এক বিখ্যাত জেলা নড়াইল। অনেক কৃতী বাঙ্গালির জন্মভূমি হল নড়াইল। সেখানে দুটো রাত থাকব। নড়াইলের বিখ্যাত নৌকো বাইচ প্রতিযোগিতা দেখব চিত্রা নদীর জলে।
রবি ঠাকুরও নিশ্চয়ই শ্বশুরবাড়ি বেড়াতে এলে এই ভৈরব নদীর জলে নৌকোয় ভাসতেন!..গুণ গুণ করে নিজের গানই হয়তো গাইতেন, “আকাশ আমায় ভরলো আলোয়, আকাশ আমি ভরব গানে / সুরের আবির হানব হাওয়ায়, নাচের আবির হাওয়ায় হানে../ ওরে পলাশ, ওরে পলাশ…”
কিভাবে যাবেন – বাংলাদেশের খুলনা রেল স্টেশন থেকে বা খুলনা শহর থেকে খুব সহজেই পৌঁছে যাওয়া যায় দক্ষিণডিহি- ফুলতলা।