সাপ্তাহিক ধারাসম্পাতে সিদ্ধার্থ সিংহ (পর্ব – ২৮)

দেবমাল্য

রণোই ব্যারাক স্কোয়্যারে নিয়ে গেল দেবমাল্যকে। ওখানেই বহরমপুর থানা। দেবমাল্যর মাথার ভেতরে তখন হাজার রকমের চিন্তা-দুশ্চিন্তা কিলবিল করছে। তাই ফিরেও তাকাল না অত বড় মাঠটার দিকে। এই মাঠেই এখন রমরম করে বইমেলা হয়। যাত্রা উৎসব হয়। ইংরেজ আমলে নাকি সিপাইরা এখানে থাকত। নিয়ম ছিল কোনও ভারতীয় এই মাঠের ওপর দিয়ে পালকি করে যেতে পারবে না। গেলেই ফাইন।

বিখ্যাত লেখক বঙ্কিমচন্দ্র চট্টোপাধ্যায় তখন এখানকার ডেপুটি ম্যাজিস্ট্রেট। আশপাশে আরও অনেক রাস্তা থাকলেও, শোনা যায়, তিনি নাকি প্রত্যেক দিন ইচ্ছে করেই এই মাঠের ওপর দিয়ে পালকি করে যেতেন। আর রোজই জরিমানা দিতেন। এটা ছিল ইংরেজদের প্রবর্তিত ওই আইনের প্রতি তাঁর প্রতিবাদ। তাঁর চপেটাঘাত।

দেবমাল্যর মাথা আর কাজ করছে না। কী যে হচ্ছে, কিছুই বুঝতে পারছে না। তাই থানায় এসেছে সে। জানাশোনা না থাকলে কোনও কাজ হয় না। তাই অপেক্ষা করছে, রণোর সঙ্গে আলাপ আছে যে পুলিশ অফিসারের, তাঁর জন্য। তিনি নাকি রাউন্ডে বেরিয়েছেন। অনেকক্ষণ তো হয়ে গেল, কখন ফিরবেন তিনি! উসখুস করতে লাগল ও। কাঁহাতক আর চুপচাপ বসে থাকা যায়!

না, বেশিক্ষণ বসতে হল না। মিনিট পনেরোর মধ্যে এসে পড়লেন তিনি। খুব মিশুকে লোক। তাঁর টেবিলের সামনের চেয়ারে বসতে বললেন ওদের। তার পর রণোর দিকে তাকিয়ে বললেন, তা, হঠাৎ কী মনে করে, বলো?

দেবমাল্যকে দেখিয়ে রণো বলল, ইনি আমার দাদার মতো। হাওড়ায় থাকেন। কালীবাজার না কী যেন বললেন? দেবমাল্যর দিকে ঘুরে জিজ্ঞেস করতেই, দেবমাল্য বলল, না না, কালীবাজার না, কালীবাবুর বাজার।

রণো তখন বলতে যাচ্ছিল, ওখানে ওর একটা কারখানা আছে। কিন্তু তার আগেই পুলিশ অফিসারটি তাকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, চা খাবে তো?

রণো দেবমাল্যর দিকে তাকাতেই, দেবমাল্য মাথা নাড়িয়ে ‘না’ জানিয়ে দিল। রণোও বলল, না, থাক। এই একটু আগেই খেয়েছি। হ্যাঁ। যা বলছিলাম… তা ওখানে নানা রকম সমস্যা হচ্ছে দেখে, উনি ওঁর কারখানাটা অন্য জায়গায় সরিয়ে নিতে চান। তো, সেই কারখানা করার জন্যেই উনি এখানে জমি দেখতে এসেছেন।

— সে তো খুব ভাল কথা। তার পর?

— কাল রাতে শিয়ালদা থেকে লালগোলা প্যাসেঞ্জারে উঠেছিলেন এনার বউ।

— ও।

— তা, আজ সকালে তাঁর বহরমপুরে নামার কথা। কিন্তু আমরা গিয়ে দেখি, উনি আসেননি।

— উনি ওই ট্রেনেই উঠেছিলেন তো? পুলিশ অফিসারটি প্রশ্ন করতেই দেবমাল্য বলল, হ্যাঁ হ্যাঁ, আমার কারখানারই একটি ছেলে ওকে তুলে দিয়ে গেছে।

— তুলে দিয়ে গেছে আপনাকে কে বলল?

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।