ভোর দুটো। ঘুম ভাঙতেই তাঁবুর বাইরে অনেক লোকের গলার আওয়াজ পেলাম। সব তাঁবুতেই ব্যস্ততা আর হুড়োহুড়ি। কে আগে যাবে বাবার দর্শন পেতে তার জন্য সবাই উদগ্রীব। সেদিন আবার শ্রাবণ মাসের পয়লা সোমবার, পঞ্জিকা অনুসারে পূণ্য তিথি। তাই ভিড় আজ একটু হলেও বেশী।
স্লিপিং ব্যাগের মায়া কাটিয়ে তাড়াতাড়ি প্রস্তুত হলাম। বাকিরাও সবাই কম বেশী প্রস্তুত। কিন্তু সমস্যা হলো এক জায়গায়। আগের দিন ডাক্তার টুকু কাকিমাকে পরদিন পুরো শুয়ে থাকতে বলেছে। কিন্তু ওনাকে কে বোঝাবে? অগত্যা আমাকেই যেতে হলো। ওনার তাঁবুতে ঢুকে দেখি বসে আছেন, আমাকে দেখে জড়িয়ে ধরে হাউহাউ করে কেঁদে ফেললেন। তোরা সবাই যাচ্ছিস, আমি কি এমন পাপ করেছি, যে এতো কাছে এসেও আমার যাওয়া হবে না। অনেক কষ্টে ওনাকে শান্ত করে সবার সাথে কথা বলে ঠিক হলো, আজ আমরা যাই, পরেরদিন উনি ডুলি করে গিয়ে দর্শন করে আসবেন। আমরা আজ রাত নয় কাল সকালে ফিরবো, উনি দর্শন করে এলে তারপর শ্রীনগর ফেরা হবে। সবাই রাজি। এক এক করে জড়ো হলাম স্টার্টিং পয়েন্টে। ঠাকুর মশাইয়ের ড্রেস আজ দেখার মতোন। গরম উলিকটের উপর গেরুয়া রঙের পাঞ্জাবি, ঐ এক কালারের ধুতি। মাথায় ছাই রঙা ক্যাপ, পায়ে কেডস, হাতে লাঠি। আমি আগ বাড়িয়ে বললাম, যাত্রা শুরুর আগে একবার শিব মন্ত্র জপ করার কথা। উনি সানন্দে রাজি। পৈতে বার করে শিব মন্ত্র পাঠ করে সবার উদ্দেশ্যে আশীর্বাণী দিলেন। এতে সবাই ভালোই উৎসাহিত হলো। আমরা ঘোড়া ভাড়া করলাম। এর পর যাওয়া। আমি তার আগে দুবার কেদারনাথ দর্শন করায় ভেবেছিলাম যে এখানকার রাস্তাও সেরকমই হবে। যাবো, দর্শন করবো, বিকেলের মধ্যে বালতাল ব্যাক। কি যে ভুল ভেবেছিলাম তা মালুম পেতে বেশী নয় আর আধ ঘন্টা লেগেছিল। সেই যে লালমোহনবাবুর মাস্টার মশাই লিখেছিলেন ‘তবে শুনো এবে দৈবেগ্যের বাণী, দেব দর্শন হবে যেনো বহু কষ্ট মানি’ তা যেন প্রতি মুহূর্তে অনুভব করেছিলাম। ছোটবেলা থেকে অনেক তীর্থ ভ্রমণ করছি, কিন্তু সেদিনের যাত্রা পথ সব কিছুকেই ছাপিয়ে গেছিলো।