সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে শম্পা রায় বোস (পর্ব – ৪৫)

আমার মেয়েবেলা
এখন কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থাকলেই আমার মেয়েবেলার
কথা মনে পড়ে যায়। কত সুন্দর সুন্দর দিন,, রাত কাটিয়েছি! কত ছোট ছোট অসাধারণ সব মুহূর্ত!
আমার সকাল শুরু হত একটা ঝকঝকে ভালোলাগা দিয়ে,,, ঘুম থেকে উঠেই সাজি হাতে দৌড় দৌড়,,,ভেতরে ভেতরে একটা উত্তেজনা,,, কী জানি ফুল টুল কিছু আছে,, নাকি সব মুছে সাফ হয়ে গেছে।
সব ফুল যদি তুলে নেয়! আমার জন্য যদি কিচ্ছু না রাখে!
,,,,,,,,,, তাহলে অবধারিত আড়ি। কেউ ঠেকাতে পারবে না। কড়ে আঙ্গুল মোটামুটি রেডি করেই যেতাম। আর আড়ি মানেই আমার সব পুতল নিয়ে চলে আসতাম। সঙ্গে ওরটাও। মেয়ে চলে আসলে জামাই কী থাকবে? আবার আমার বৌমা কেও ছাড়তাম না। কথার প্যাঁচে বন্ধুর সব পুতুল তখন আমার। ভাল ব্যবহার কর আছি,,,নয়তো,,,,,
তাছাড়া মা পুতুল বানিয়ে দিত বলে সবার থেকে আমার অনেক বেশি পুতুল ছিল। তাই বন্ধু দের একটু চাপে রাখতে পারতাম।
একটা সুন্দর রাত পার করেই একটা অসাধারণ সুন্দর দিন পেতাম।
সকাল মানেই বাবার হাতের চা। না না সেসব আমার বা ভাই এর জন্য নয়। ভাল ছেলে মেয়েরা চা খায় না। আর চা খেলে চায়ের মতো রঙ কালো হয়ে যায়। মা খুবই বুদ্ধিমতি ছিল। কাউকে কিভাবে যে চাপে রাখা যায় সেটা খুব ভালো ভাবেই জানত।
চা খাওয়ার অনুমতি পেয়েছিলাম মাধ্যমিক পরীক্ষা দিয়ে,,,,,,
সকাল হলেই বাবা দরজায় জল দিয়ে কেটলিতে চা বসাত। সকালের চা টা বাবাই মাকে দিত। মায়ের তখন সুগার থাইরয়েড প্রেসার,,,,,,
বাবা খুব ভোরে উঠত। দরজা খুললেই আমি সাজি হাতে ছুট। বাবা বলত বেশি দূর যাবি না,,আর নির্জন ফাঁকা জায়গায় তো যাবিই না ,,,, নিশিতে ডাকবে। তখন বুঝবি ঠ্যালা। সত্যিই একবার ডেকেছিল! উফ্ কী যে ভয় পেয়ে গিয়েছিলাম!
আমাদের সময় রেপ হতো না। কোনদিন ধর্ষণ কথাটা শুনি নি। তাই মানুষ কে কোন দিন ভয় পাই নি। কিন্তু ভুত প্রেত ব্রহ্মদৈত্য,,নিশি এসব শুনে খুব একটা ভয় না পেলেও, একটু যেন গা টা কেমন ছমছম করত।
সকালে ফুল তুলে ফেরার সময় বাগানের গেটটা খুলেই শুনতে পেতাম,” কল্পা চা”,,,,,
বাড়িতে থাকলে বাবাই চা করত । মা চা খেতে খুব ভালোবাসত বলে বাবা বারংবার মায়ের সামনে চা ধরে কি বোঝাতে চাইত?,,,,, কল্পা আমি তোমাকে ভালবাসি! কারন বাবা মুখে তো কিছু বলত না।
বাবাকে কোনদিন ইমোশনাল হতে দেখিনি। জীবনে একবারই সন্টু (ভাই) চলে যাওয়ার সময় কেঁদেছিল খুউব।
বাবাকে কোনদিন ভালোবাসা নিয়ে নাটুকেপনাও করতে দেখি নি। চরম দুঃখও যেমন বুঝতে দেয় নি। ভালোবাসাও তাই।
বিয়ের পর দিন আমি শ্বশুর বাড়ি চলে যাচ্ছি। বাবাকে জড়িয়ে ধরে হাউমাউ করছি আর বাবা চিৎকার করছে ,,,,,সময় পেরিয়ে গেল,,,, তাড়াতাড়ি কর সবাই,,,বাবা আমার দিকে একবারও তাকালো না। যেই গাড়ি ছাড়ল আমি বাবা বলে কঁকিয়ে উঠলাম কিন্তু বাবাকে ধারেকাছে দেখতেই পেলাম না। কিন্তু চেয়েছিলাম বাবা থাকুক। খুব অভিমান হয়েছিল,,,বিয়ে হতেই বাবা আমাকে পর করে দিল?
এখন অনেকটা বয়স বাড়তে বুঝতে পারি,,
আসলে বাবা হয়তো সহ্য করতে পারত না তার সব থেকে কাছের ভালোবাসাকে ,, এভাবে চলে যাওয়া দেখতে। তাই ,,তাই হয়তো সরে গিয়েছিল,,,
কিন্তু আমি তো বাবার মুখটা দেখেই শ্বশুর বাড়িতে প্রথম পা রাখতে চেয়েছিলাম।
জীবনের আসল লড়াইটা তো সেই দিন থেকেই শুরু হয়েছিল আমার।
হয়তো ,,, হয়তো সেই লড়াই এ আমি জিততেও পারতাম! হয়তো!!
###
আমার বিয়ের দশ বছর পর বাবা চলে গেল। তারপর থেকে মা সেই চা এর কেটলিটা
খুব সামলে সামলে রাখত। ওটাতেই চা করত আর কাঁদত,, সকাল থেকেই শুরু হতো কান্না,,,আসলে বাবা প্রতিটা মুহূর্তে মার সঙ্গে,, ওদের সাজানো সংসারের সঙ্গে এমন ভাবে নিজেকে জড়িয়ে রেখেছিল যে কোন কিছুই ভোলা সম্ভব হয় নি মায়ের পক্ষে।
শুনেছি সময় নাকি সবটা না হলেও কিছুটা ভুলিয়ে দেয়,,,, কিন্তু ভাই আর বাবার শোকের কাঁটা মায়ের বুকের দুপাশে এমন ভাবে বিঁধেছিল,,যা সারাজীবনেও মা তার যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পায় নি। তিলে তিলে যন্ত্রণায় কুঁকড়ে যাওয়া,, শেষ হয়ে যাওয়া কাকে বলে সেটা আমি জানি,,,অমন ছটফটে,, অসম্ভব বেঁচে থাকতে চাওয়া আমার মা টা,,, ধীরে ধীরে যেন কেমন হয়ে গেল,,,
বাবার সমস্ত কাজ আমিই করেছিলাম,,, তারপর কাজ মিটে যেতে স্বার্থপরের মতো অত বড়ো বাড়িতে মাকে একা ফেলে আমার সংসারে ফিরে গিয়ে ছিলাম। কিন্তু পরবর্তীতে বুঝেছিলাম যে সংসার সামলাতে,, অসহায় এক সাতান্ন বছরের সব হারিয়ে যাওয়া আমার একমাত্র আপনজনকে একা কাঁদার জন্য ফেলে চলে এসেছিলাম,, সেটা আসলে আমার ছিল না।
আরো কিছুদিন পর আরও এক চমক অপেক্ষা করছিল,,,,আমার ভেবে নেওয়া সেই সংসারটা আমার তো নয়ই উপরন্তু আমি অন্যের এক সাজানো সংসারে সাধারণ এক অতিথি বৈ কিছুই না।
বাবার মৃত্যুর ঠিক বারো বছর দশ মাস পর মা চলে যায় আচমকাই,,,,,, একটুও বুঝতে না দিয়ে,,,,,
শাড়ি জামা কাপড় সব বিলিয়ে দিলেও কয়েক টা জিনিস আর ছাড়তে পারি নি,, রেখে দিয়েছি আমার কাছে,,,
স্মৃতির ধুলো লেগে থাকা পুরোনো মলিন,, কয়েকটা বাসন। যেগুলো মা খুব যত্নে সাজিয়ে রেখেছিল ফুলদানির মতো,,, বৃদ্ধাশ্রমের ঘরের টেবিলে। যেগুলো কাউকে দিয়ে দেওয়া আমার পক্ষে সম্ভব হয়নি।
শ্বশুর বাড়িতে একটা মেয়ের বাপের বাড়ির টাকা আর গয়না ছাড়া আর কিছু রাখা সম্ভব হয় না। ওগুলো ব্যাঙ্কে থাকে তাই কোন অসুবিধে নেই কিন্তু অন্য কোন জিনিস বাড়িতে থাকলে অসুবিধে হয় বৈকি। কিন্তু কিছুতেই এর সমাধান খুঁজে পাচ্ছিলাম না।
বাবা মা’র চায়ের কেটলি টার অবস্থা খুবই খারাপ হয়ে গিয়েছিল। কতবার শুনতে হয়েছে হয় ফেলে দাও নয়তো কাউকে দিয়ে দাও।
কিন্তু কাউকেই প্রাণেধরে দিতে পারিনি। আসলে কোন দিন কাউকেই বলতে পারি যে কেটলি টা থেকে এখনও আমি বাবা বাবা গন্ধ পাই। কেটলির গায়ে লেগে থাকা মায়ের চোখের জল আমি এখনও অনুভব করতে পারি।
অলস একটা একাকিত্বের দুপুরে কেটলি টা বুকে জড়িয়ে চোখ টা বন্ধ করে এখনও অনায়াসে আমি আমার মেয়েবেলায় ফিরে যাই,,,,
যেখানে সেই ঝাঁকড়া চুলের দুষ্টু মেয়েটা কেটলির তলানি চা নিয়ে তাতে একটু জল আর চিনি মিশিয়ে খাটের তলায় তার নিজের সংসার সামলাতে ব্যস্ত,,,,
#####
খাটের তলায় বস্তা বন্দি মায়ের কেটলি টার একটা গতি করেছি। এবার আমি একে আমার ড্রয়িং রুমে রাখব। একদম আমার চোখের সামনে থাকবে। বাবা বাবা গন্ধ পেতে আমাকে আর খাটের তলায় ঢুকতে হবে না।
সত্যিই লক ডাউন আমাকে কত কিছু শিখিয়ে নিল,,,,,,,