সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে শম্পা রায় বোস (পর্ব – ৫)

হায়দ্রাবাদ ভ্রমণ (স্নো ওয়ার্ল্ড)
একটা বিরাট হল! তেমনি প্রচণ্ড ঠাণ্ডা। হলের দেওয়ালের চারদিকে একদম উঁচুতে বিরাট বিরাট এসি চলছে। সেখান থেকে বেরিয়ে আসছে হাড় হিম করা বাতাস। বাপরে একেবারে ডিসেম্বর মাসের কাশ্মীর!
চোখটা বুলিয়ে নিলাম ভালোকরে। কতগুলো যে এসি চলছে! তার উপর আরও নানা রকমের মেশিন যেগুলো আবার স্নো ফলেরও কাজ করছে।
তবে একটা ব্যাপার আছে, হলের ভেতরটা খুব ঠাণ্ডা ঠিক কথা। কিন্তু সে ঠাণ্ডা বেশ সহনশীল। ঢুকেই একেবারে অসম্ভব অসহনীয় ঠাণ্ডা তা কিন্তু নয়। প্রত্যেকেই যাতে ধীরে ধীরে মাইনাস ডিগ্রি তাপমাত্রায় নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে তার সুব্যবস্থা চোখে পড়ার মতো। প্রত্যেকেই ধাপে ধাপে ২০° সেন্টিগ্রেট (৬৮°ফারেনহাইট) থেকে ০° এবং তারপর একটি মহাশূন্য তাপমাত্রায় নিম্ন তাপমাত্রার সাথে ঠিক মানিয়ে নিতে পারে। এই পদ্ধতি আন্তর্জাতিক ভাবে অনুমোদিত তাই চিন্তার কোন কারণ নেই। আর দ্রুত তাপমাত্রার পরিবর্তনের সঙ্গে মানিয়ে নেওয়ার জন্যই সোয়েটার টুপি প্রয়োজনীয় গরম কাপড় দেওয়া হয় টিকিট কাউন্টারের পাশে রাখা একটি কাউন্টার থেকে।স্নো ওয়ার্ল্ডের গুহার এই ভেতরের জায়গাকে ক্রিও জোন বলা হয়। যেখানে -৫° সেলসিয়াস তাপমাত্রা বজায় থাকে।
যাইহোক হলের ভেতরে ঢুকে বিস্ময় কাটাতে কিছুক্ষণ সময় লেগেছিল আমার। কি নেই সেখানে! স্নো প্লে এরিয়া, স্নো ওয়ার স্নো টিউব স্কাইড আইস বাম্পিং কার মেরি গো রাউন্ড আইস স্কেটিং রিঙ্ক।
হলের শেষে একটা কোণে এই স্কি করার ব্যবস্থা রয়েছে। একটা কাশ্মীর কাশ্মীর ফিলিং আনতে কর্তৃপক্ষের যা যা করণীয় সবটাই মোটামুটি করার চেষ্টা করা হয়েছে তাই কিছুক্ষণের মধ্যেই সত্যিকারের কাশ্মীর দেখা আমরাও মানসিক ভাবে স্নো ওয়ার্ল্ডকেও শেষমেশ মিনি কাশ্মীর ভেবেই ফেললাম।
একটু ধাতস্থ হতেই হৈ হৈ শুরু হয়ে গেল। আমার ছোট কন্যা কোনও দিন বরফ দেখেনি। স্নো ফলও দেখে নি। অত বরফ দেখে ওর সে কী উত্তেজনা!! বড়ো বড়ো চোখ করে সব কিছু দেখে নিচ্ছে। এত আনন্দ হচ্ছে কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না।
এক একটা জায়গা আবার বেশ উঁচু বরফের আস্তরণ রয়েছে। বরফ জমে জমে উঁচু হয়ে রয়েছে। সেখানে বাচ্ছা বুড়ো সবাই বল নিয়ে খেলা করছে। বরফের পুতুল বানাচ্ছে। তারপর তাকে টুপি পরিয়ে সাজিয়ে গুছিয়ে পাশে দাঁড়িয়ে ছবি তোলা চলছে। চারপাশ শুধু বরফ আর বরফ। তেমন বেশ ঠাণ্ডা! এসবের মধ্যে কোন কোন বাচ্চা আবার বরফ খেয়েও নিচ্ছে। অবশ্য তাতে কোন অসুবিধে নেই। কর্তৃপক্ষের নজর সবদিকে। প্রতিদিন কৃত্রিম বরফের মেঝের স্তর পরিষ্কার করা হয়। চারবার ফিল্টার করা জল দিয়ে তৈরি এই বরফ। তাই বাচ্চারা খেলে কোন ক্ষতি হবে না। যাইহোক বরফ নিয়ে শুরু হয়ে গিয়েছে নানা ধরনের হুটোপুটি। কত রকম ভাবে ছবি তোলা হচ্ছে! বরফের বল হাতে বরফের উপর শুয়ে বসে নানা কায়দায় ছবি। দেখে ভালো লাগছিল বেশ। কাশ্মিরী জামা কাপড় পরে ছবি তোলার জায়গায় বেশ লম্বা লাইন পড়ে গেল। জায়গাটা এত নিরাপদ যে বাবা মা রাও বাচ্চাকে খেলতে দিয়ে নিজেরাও বেশ নিজের মতো করে আনন্দ করতে পারছিল। এক ঘন্টার জন্য তিনশো জন দর্শক এই স্নো ওয়ার্ল্ডে প্রবেশ করতে পারে। এই তিনশো জনের মধ্যে আমরাও ছিলাম সেইদিন। একঘন্টা যে কিভাবে কেটেছিল বলে শেষ করা যাবে না।
যাইহোক হঠাৎ করে দেখি স্নো ফল শুরু হল। বাপরে সে যে কী আনন্দ সবার! উত্তেজনায় হাততালি দিয়ে দিল কেউ কেউ। হলের মাঝে বিরাট বিরাট বক্সে হালকা করে মিউজিক বাজছিল। স্নো ফল শুরু হতেই পাঞ্জাবি গান শুরু হল। তার সঙ্গে বলিউডের পরিচিত গান। সেদিন পাঞ্জাবি পর্যটকের সংখ্যা তুলনামূলক বেশি ছিল। ওদের মতো এত হৈ হুল্লোর নাচানাচি করা আর কারোর মধ্যে নেই, বাঙালি দের মধ্যে তো নেইইই। শুরু হয়ে গেল নাচানাচি। সে যে কী পরিবেশ বোঝাতে পারব না। একটা ঘন্টা কিভাবে যে কেটে গেল ,,,কেটে যায় সত্যিই না দেখলে বিশ্বাস করা মুশকিল।
একঘন্টা সময় শেষ হয় পাঁচ মিনিটের স্নো ফল হয়ে। সময়টাকে, দিনটাকে আরও স্মরণীয় করে রাখার জন্য।
হলের বাইরে প্রচণ্ড গরম। জ্বলন্ত তাপ থেকে মুক্তি পেতে স্নো ওয়ার্ল্ড সেদিক থেকে নিখুঁত আদর্শ একটা জায়গা। সত্যিই দিনটা সবার মনে থাকে। যেমন আমার মনে আছে। পাঁচ বছরের পুরোনো স্মৃতি এখনও টগবগে হয়ে রয়েছে।
এখানে প্রত্যেকের বিনোদনের জন্য আলাদা আলাদা প্রায় সব রকমের ব্যবস্থা রয়েছে। সত্যিই কোন পাহাড়ে না গিয়েও একটা বাস্তব অভিজ্ঞতা নেওয়া যায় এখানে এসে। অসাধারণ পরিকল্পনা অসাধারণ শিল্প কলা যা প্রতি মুহূর্তে মনে করিয়েছিল আমাদের।অসাধারণ বললেও যেন কম বলা হয়। হায়দ্রাবাদ ভ্রমণ করতে এসে স্নো ওয়ার্ল্ড দেখেন নি এমন পর্যটক পাওয়া যাবে না। তাজা বাতাসের নিরবচ্ছিন্ন সরবরাহ নিশ্চিত করার জন্য একটি নিষ্কাশন ব্যবস্থা এবং একটি তাজা বাতাসের ব্যবস্থাও রয়েছে। আর এ সবই ভারতের মোটর স্পোর্টস্ অ্যাসোসিয়েশনের কাছ থেকে শংসা পত্র নেওয়া আছে বলে তাইতো কোন চিন্তার কারণ নেই।
একঘন্টা টেনশন থেকে মুক্তি পেতে শুধুমাত্র মস্তি করতে হলে স্নো ওয়ার্ল্ডে একবার ঢুঁ মারতেই হবে।
ক্রমশঃ