সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে শম্পা রায় বোস (পর্ব – ৩৯)

আমার মেয়েবেলা

কলেজ জীবন

তখন সেজেগুজে কলেজ যাচ্ছি। কোয়েডুকেশন কলেজ। তাই প্রচুর ছেলেমেয়ের ভীড়। কোয়েডুকেশন কলেজের একটা ব্যাপার থাকে। শরীর খারাপ বা কলেজ যেতে ইচ্ছে না করলেও কিন্তু কলেজ কামাই বলে কিছু নেই।
ক্লাস করতে ইচ্ছে না করলেও মরতে মরতেও সব কলেজে আসবে।
নতুনের উপর সব সময়ই একটা আকর্ষণ থাকে আমাদের। নতুন কে আমরা সবসময়ই আদরে রাখি। নতুন নতুন কলেজ, নতুন নতুন বন্ধু, একদম নতুন অপরিচিত কোন ছেলে বা মেয়েকে দেখা, এটার কিন্তু একটা আলাদা মজা ছিল সেইসময়। নতুন ক্লাসমেটের সঙ্গে আলাপ হল, কিছু কথা হল। একসঙ্গে সকলের মাঝে বসেও কোনও কথা হল না। শুধু আড়চোখে একটু দেখে নেওয়া সে আমায় দেখছে কিনা। এসব তখন আমাদের সময়ে বিশাল ব্যাপার ছিল। আমরা তখন আজকের জেনারেশনের মতো এতটা অ্যাডভান্স ছিলাম না। সিনেমায় ফুল লতাপাতা দেখে প্রেম করা শিখছি। ছেলেদের হাত ধরা মানেই প্র্যেগন্যান্ট হয়ে যাওয়া দেখতে দেখতে কৈশোর যৌবন কাটাচ্ছি। তখন আমাদের সময়ে বিশেষ করে মফস্বল শহরে ছেলেদের দিকে তাকানো বা চোখাচোখি হওয়াটাই বিরাট ব্যাপার। রাতের ঘুম চলে যেত একেবারে।
দু তিন মাস ছ মাস কাটার পর কিছুটা ধাতস্ত হওয়া যেত। প্রেম যদি বা হল অত সামনাসামনি দেখা সাক্ষাৎ হত না। আমাদের সময় হিট ব্যাপার ছিল চিঠি। পাতার পর পাতা চিঠি লিখে এবং চিঠি পড়েই দিন মাস বছর কেটে যেত। দেখা করার কথা ভাবতেই পারতাম না। আসলে সে যুগে এই বিষয়টাকে খুবই গর্হিত কাজ বলেই মনে করা হতো। যেহেতু মফস্বল শহর। সবাই সবাইকে চেনে। তাই কোত্থাও দেখা করার উপায়ও ছিল না। কলেজে দেখা হলেও কথা বলাও একটু রিস্কি হয়ে যেত। প্রফেসররা সমানে টহল দিতেন। তো যাইহোক আমাদের এই চিঠিটাই সবথেকে নিরাপদ বলে মনে হত। ক্লাসমেটের হাত ঘুরে তার কাছে পৌঁছে যেত অনায়াসেই। শুধু কলেজ ফেরত তাকে দূর থেকে দেখে নেওয়া।
এখন ভাবলে কী যে ভালো লাগে! তখন আমাদের চাওয়া গুলো কত ছোট ছোট ছিল। কত অল্পতেই আমরা খুশি হয়ে যেতাম।
কলেজ থেকে বেরিয়ে একসঙ্গে আমরা হৈ হৈ করতে করতে নৌকোয় উঠতাম। অত চওড়া গঙ্গা পার হতে বেশ সময় লাগত। দূর থেকে দেখতাম ওনারা তাদের বাহন নিয়ে দাঁড়িয়ে আছেন। সারি সারি সাইকেল। গঙ্গার ঘাটে তখন ছেলেদের আড্ডা ধীরে ধীরে জমে উঠছে।
আমরা নৌকো থেকে একপাল মেয়ে নামতাম। দেখে ওদের বুকেও দোলা লাগত।মোটামুটি একঝলক চোখের দেখা। তারপর দেখতাম এক সমুদ্র প্রেম বুকে চেপে হালকা লাজুক হাসিতেই ওদের চোখ দুটো যেন জ্বলে জ্বলে উঠত। তারপর বন্ধুর সঙ্গে এক বুক অপেক্ষায় বাড়ি ফেরা।
আমি খুব খেয়াল করতাম ওদের। যেন ঝকঝকে সকালের আকাশে মুক্তি ছড়ানো আনন্দ,,অনুভব করতাম আমিও। যেন উঠোন ভর্তি ঝলমলে রোদ মনের ভেতরের সব জানলা গুলো খুলে দিচ্ছে। মনে হচ্ছে মাথার উপর ঐ অনন্ত আকাশটা যেন রাস মঞ্চের সামিয়ানা। আলোর বিশ্বাস নিয়ে তার কথা ভাবতে ভাবতে যেন একটা গোটা রাত জাগার আনন্দ। আকুলিবিকুলি মন খারাপ, কলেজ না যাওয়া একটা হেমন্তের বিকেল।
সেদিন মনে হয়েছিল ভালোবাসা মানে শুধু ছুঁয়ে থাকা নয়। নয় কাছে পাওয়ার কোন রাত্রির অস্থিরতা। ভালোবাসা হল ফুরিয়ে যাওয়া মুহূর্তকে আঁকড়ে টেনে রাখা। ভালোবাসা হল জানালার কাচে থমকে যাওয়া কিছু অবুঝ কথা।
ভালোবাসা মানে একটা স্বস্তি। দুটো মনের মাঝে একটা অদৃশ্য হলুদ সবুজ সেতু। তীরে আসা গঙ্গার ঢেউয়ের ছলাৎ শব্দ। বুকের মধ্যে হু হু করে ঢুকে পড়া কিছু দমকা বাতাস। ভালোবাসা মানে এক বুক মেঘলা আকাশ, চাহনিতে একটা শিরশিরানি ছটফটানি এক পশলা বৃষ্টি। ভালোবাসা হল ফিরে পাওয়া হাজারটা বসন্ত। দক্ষিণের খোলা বারান্দা। ভালোবাসা মানে নীল নদের ওপারে অভিমানী হলুদ চতুর্দশীর গোল চাঁদের নরম আলো।
যাই হোক প্রেম যখন জমে ক্ষীর। তখন শুরু রাতের পর রাত জেগে চিঠি লেখা। কলেজে তখন অফ পিরিয়ডে আমরা বন্ধুরা একে অপরকে জড়িয়ে শুনছি ভালোবাসার কথা। কত রকমের ভালোবাসা! অভিমান অভিযোগ। ভালবাসলে যে এত কথা আসে সেই বুঝে ছিলাম। এক এক দিন এক একজন বন্ধু তার চিঠি পড়ত। আমরা শুনতাম এক মনে।
শুনতে শুনতে আমি যেন কোথায় হারিয়ে যেতাম। তখন আমার মনেও তো প্রেম। আমার মানস প্রমিক অনিকেত দা তখন উথাল পাথাল ঢেউয়ের মতো আমার সপ্তদশী কুমারী মনে এদিক ওদিক আছড়ে পড়ছে। তখন আমার বয়স মাত্র ষোল বছর কয়েক মাস। যাকেই দেখি তাকেই ভালো লাগে। মেলাতে চেষ্টা করি আমার অনিকেতদার সঙ্গে। কিন্তু পারিনা কিছুতেই। মেলেই না আমার অনিকেত দার সঙ্গে। কিন্তু মনের ভেতর ওদের মতোই ছটফটানি। অভিমানে ক্ষয়ে ক্ষয়ে যাওয়া আমার ছোট্ট মনটা একটু সেঁকে নিতে চায় একটু ভালোবাসায়। আমার আলটুসি ইচ্ছেরা যখন সোহাগে ছটফট করত তখন আমিও বলতে চাইতাম আমি তোমায় ভালোবাসি! আমি ঘুম চোখে আড়মোড়া ভেঙেই বলতে চাইতাম ভালোবাসি। মনে হত কেউ ডাকলেই আমি ঠিক ফিরতাম। ফিরতাম ই।
না। সেভাবে আমার কোনদিন কাউকেই বলা হয়নি। হয়তো আমি চাইলেই হতো। কিন্তু আমি অনিকেতদার মতো কাউকেই পাই নি। আর তাছাড়া আমার বাড়ি এতটাই রক্ষণশীল ছিল যে আমার এসব ভাবতে সাহসও হয় নি।
তবে একটা ব্যাপার ঘটেছিল। একটা প্রবাদ শুনেছিলাম দুধের স্বাদ ঘোলে মেটে। আমার ক্ষেত্রে তাইই ঘটেছিল।
স্কুল লাইফ থেকেই বন্ধু দের প্রেমের চিঠি পড়ে পড়ে আর লিখে লিখে মন এবং হাত পেকে গিয়েছিল। একদিন কলেজে আমার এক বন্ধু শ্যামলী (নাম পরিবর্তিত) অফ পিরিয়ডে একটু আড়ালে ডেকে বলল বন্ধু একটা উপকার করবি?
উপকার করতে হবে শুনে আমি তো আকাশে ভেসে চলে যাওয়ার মতো অবস্থা। কোন কথা বলা নয়, কোন কথা শোনা নয়। উপকার করতে হবে এটাই হল বড়ো কথা। আমি আর কিচ্ছু না শুনেই বললাম বল্ বল্ কী করতে হবে? জান্ হাজির হ্যায় মেরী দোস্ত্। বল্ কী করতে হবে? কথা দিচ্ছি করবইইইইই। উপকার করার চান্স পেয়েছি বলে আমি আনন্দে গোল গোল ঘুরে নিলাম।
না শুনে না বুঝে আমি যে কী একটা মারাত্মক ভুল করে ছিলাম। যার খেসারত আমাকে সারাজীবন ধরে চুকোতে হল।
বাবা বার বার বলত, ভাবিয়া করিও কাজ করিয়া ভাবিও না । সত্যিই আমি ভাবিনি বন্ধু বলল আমিও উপকার করার জন্য মেতে উঠলাম। একেবারে কথা দিয়ে ফেললাম।
শ্যামলি বলল, আরে কথাটা তো শোন্ আগে তারপর লাফাবি।
ক্রমশঃ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।