সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে শম্পা রায় বোস (পর্ব – ৩৭)

আমার মেয়েবেলা
শিবরাত্রি
শিবরাত্রি শুরু করেছিলাম খুব ছোট্ট বেলায়। মা কোলে বসিয়ে হাত ধরে শিবের মাথায় জল ঢেলে দিত। বেল পাতা আমার হাতে দিয়ে বলত। “শিবের মাথায় দে। আকন্দ ফুলের মালা টা ঠিক করে পড়িয়ে দে। মহাদেব সন্তুষ্ট হবেন।। ভাল বর দেবে। শিব ঠাকুর কে বল “তোমার মতো একটা বর চাই”।
আমি ও ঘটা করে নমস্কার করে বলতাম তোমার মতো যেন বর পাই ঠাকুর। তখন বিয়ে , বর বা স্বামী সম্পর্কে সে রকম কোনো ধারণাই ছিল না। তাই শিব ঠাকুর কে সন্তুষ্টির ব্যাপার টা অত গায়ে মাখতাম না। মা বলতে বলেছে। তাই বলতাম। সেই ছোট্ট বেলা থেকেই আমার ঠাকুর দেবতার প্রতি ভক্তি ভাব মায়ের জন্য ই।
বাবার কাজের সুবাদে একটা ছোট্ট আধা শহরে থাকতাম।গ্রামের মতো । তবে গ্রাম নয়। আবার শহর ও বলা চলে না।
মুর্শিদাবাদ জেলার একটা ছোট্ট আধা শহর। ফরাক্কা।
তখন সবে ফরাক্কাতে গঙ্গার বুকে বাঁধ তৈরি হচ্ছে। পর পর সারি সারি নতুন নতুন কোয়ার্টার। কোয়ার্টার এর সামনের এবং পাশের জমিতে মরশুমি ফল, ফুলে ভরা ছোট্ট বাগান।
খুব ই সহজ সরল জীবন ছিল আমাদের ।
চারজনের সংসার। তাই সেই ছোট্ট সংসারে অত কথার মারপ্যাঁচ, সংসার এর ছোটখাটো পলিটিক্স এর সম্মুখীন ও হই নি কোনও দিন।হেসে খেলেই কাটিয়ে দিয়েছি।
চারিদিকে গাছপালা, ঝকঝকে পিচের পরিষ্কার রাস্তা, ছোট্ট একটা স্কুল, তার পাশে খেলার মাঠ। ছিল একটা ছোট্ট বাজারও। বাবাদের অফিস পাড়ায় ছিল একটা বড়ো জলের ট্যাঙ্ক । কেউ বাড়ি তে বেড়াতে আসলে সেটা গর্বের সঙ্গে দেখাতে নিয়ে যেতাম।
আর ছিল রিক্রিয়েশন ক্লাব। যেখানে ছোটখাটো কোনও অনুষ্ঠান হতো। সপ্তাহান্তে সিনেমা দেখানো হত।।
এই নিয়ে ই কেটে যেত আমাদের সহজ সরল দিনগুলো ।জাতি ধর্ম বর্ণ নির্বিশেষে আমরা সবাই যেন একটা বৃহৎ পরিবারের মতো ছিলাম।
আমরা সবাই আত্মীয় ছাড়া থাকলেও যেন আত্মীয়ের মধ্যে ই থাকতাম।
এভাবেই এই রকম একটা পরিবেশে ধীরে ধীরে বড়ো হতে থাকলাম।
শিবরাত্রি আসার আগেই আমাদের মধ্যে যেন জল্পনার শেষ থাকত না। আমার বয়স তখন ১০|১১ ।
ফুল ফেজে তখন শিবরাত্রি শুরু করেছি। আগের দিন পাড়ার বন্ধু রা মিলে আলোচনা সেরে নিতাম। সবার ভেতরেই একটা উত্তেজনা । সবার থেকে ভাল শিব পুজো করতে হবে। শিব ঠাকুর কে সন্তুষ্ট করতে হবে। তাহলেই সেরা বর পাব আমি। শিব ঠাকুর কে আমার চাইই চাই।
বেশ মনে আছে সেই সব দিনের কথা।
খুব ভোরে ফুল তুলতে বেরোতাম। গাছে চড়তে পারতাম আমি। তাই আমার সাজি সব সময়ই ভর্তি থাকত। তারপর আকন্দ আর ধুতুরা ফুলের জঙ্গল থেকে বেশ অনেক ফুল পাড়তাম। এই ফুলের গাছ গুলো বেশি লম্বা হতো না। তাই ফুল পাড়তে অসুবিধাই হতো না।
ধুতুরা ফল নেওয়ার সময় নানা প্রশ্ন মাথায় আসত। এমন কাঁটা দেওয়া ফল যে কী করে একটা লোকের পছন্দ হয় বুঝতে পারতাম না। বন্ধুরা বোঝাত শিব ঠাকুর তো লোক নয়, ঠাকুর। তাই ই পছন্দ । ঠাকুর হোক আর যাই হোক এমন ফল কেউ পছন্দ করে? ফলের কাঁটা গায়ে ফোটে না? তারপর এত সুন্দর সুন্দর ফুল থাকতে ধুতুরা আর আকন্দ কিনা পছন্দ । দূর একটু গন্ধও নেই।
এরকম বর আবার কারোর পছন্দ হয় নাকি? তখন থেকেই একটু একটু করে বুঝে ছিলাম শিবের মতো বর হলে আমার অন্তত চলবে না।
যাইহোক তখন তো আমরা কেউই বাবা মার মুখের উপর কিচ্ছু বলার সাহসই পেতাম না। যা বলত তাই ই শুনতাম।
ফুল তুলে বাড়ি ফিরে সাজি ভর্তি ফুল বেলপাতা এনে মালা গাঁথতে বসতাম। একটা মোটাসোটা আনন্দ ফুলের মালা গাঁথতাম। যার মালা যত সুন্দর হবে শিব ঠাকুর তার কাছেই যাবে। কী যে মনের অবস্থা। শিব ঠাকুর কে পাওয়ার জন্য একটা যেন ছোটখাটো প্রতিযোগিতা।
গঙ্গায় স্নান করতে যেতাম। স্নান করেই যে কী ক্ষিদে পেত। কিন্তু পুজো না করে খাব কী? চন্দন বাটো, থালায় ফুল বেলপাতা মালা, পাঁচ রকমের ফল সন্দেশ সিদ্ধি পৈতে সব সাজিয়ে গুছিয়ে একটা কাচা জামা পরে বন্ধু দের সঙ্গে যেতাম শিবের মন্দিরে।
চারদিক জলে ঘেরা ছিল আমাদের ফরাক্কা। বড়ো গঙ্গার ধারে একটা শিব মন্দির ছিল। কিছুটা জল পেরিয়ে যেতে হত। মানে জলের মাঝখানে মন্দির টা ছিল। খুব সুন্দর মন্দির। কিন্তু চারদিক খোলা। একটু অন্যমনস্ক হলেই মন্দিরের চাতাল থেকে টুপ করে গঙ্গায়।। আর সাঁতার না জানলে একেবারে কৈলাশে শিবের পাশে চলে যেতে হবে।
দুধ গঙ্গা জল দিয়ে খুব ভক্তি ভরে আমরা সবাই পুজো করতাম। সবাই বলত শিব ঠাকুর তোমার মতো যেন একটা বর পাই।। আমিও বলতাম খুঁতখুঁতে মন নিয়ে।
তখন বয়স ১৩ কি ১৪। সে বছর আর বললামই না। আর সেই থেকে
আমি আর কোনও দিনও ঐ বর চাই নি। হয়তো জীবন সঙ্গী কথাটার অন্তর্নিহিত অর্থ জেনেছিলাম বলে?
আর তাছাড়া খালি গায়ে বাঘছাল পরে শ্মশানে মশানে ঘুরে বেড়াবে । মদ গাঁজা সিদ্ধি খেয়ে পড়ে থাকবে। এমন বর নিয়ে আমি কী করব? শেষে কী মা দুগ্গার মতো আগুনে ঝাঁপ দেব?
না ঠাকুর তুমি আমার উপর রাগ কোরো না। তোমার মতো বর আমার চাই না। যারা চাইছে তাদের দাও।
আমি চাই তোমার কাছ থেকে প্রেম। যে ভালোবাসায় যে প্রেমে তুমি তোমার পার্বতী কে বেঁধে রেখেছ? আমি ও চাই তেমন ই স্বামী। যে আমায় তার ভালোবাসায় বেঁধে বেঁধে রাখবে।
একদম অন্যরকম চাওয়া নিয়ে দুরু দুরু বুকে বন্ধু দের সঙ্গে ফিরে এসেছিলাম । মায়ের কথা অমান্য করে, সকলের থেকে একদম আলাদা পথে হেঁটে শিব ঠাকুর কে রাগিয়ে দিয়ে ছিলাম কিনা এই চিন্তায় আমি সেই প্রথম শিবরাত্রির দিন সারা রাত জেগে কাটিয়ে ছিলাম।
কৈশোরের একটা ছোট্ট মেয়ে জীবনের আসল অংকটাই যে কী ভাবে জেনে ছিল ভাবলে আজ সত্যিই অবাক ই লাগে। কোনও দিন সেকথা কাউকে বলি নি। শিবের মতো বর চাই না এমন আস্পর্ধার কথা কিনা সেই শিব ঠাকুর কেই বলছি। একথা কি কাউকে বলা যায়! আর কেই বা বুঝবে সে কথা? কেন আমি বলেছিলাম?
তারপর থেকে প্রতি শিবরাত্রি তেই ঐ বরই চেয়ে এসেছি।। জীবনে আর অন্য কিছু চাওয়ার ছিল না ।। এখন বসে ভাবি ভাগ্গিস বুদ্ধি করে শিব ঠাকুরের কাছে ঐ বর চেয়ে ছিলাম!