সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে শম্পা রায় বোস (পর্ব – ৮)

আমার মেয়েবেলা 

এক্সিডেন্ট

আমার মেয়েবেলায় সেরকম কিছু অসুখ বিসুখ করে নি। একবার শুধু জ্বর হয়েছিল। তবে আমাকে প্রতি মাসেই হসপিটালে যেতে হত হাত পা ভাঙার জন্য। প্রতি মাসেই রক্তপাত । বাবা মার আমাকে নিয়ে একেবারে নাজেহাল অবস্থা। এমাসে
মাথা ফাটল তো পরের মাসে হাঁটুর ছাল উঠে গেল, কিংবা হাত ভেঙে গেল, কিংবা ভলি বল খেলতে গিয়ে ডান হাতের আঙুল মট্ হয়ে গেল , কিছু না কিছু লেগেই ছিল।
ছোটবেলায় আমি নাকি ছিলাম আলুর পুতুলের মতো। (ধবধবে সাদা, কাল কোঁকড়ানো চুল, গোলাপি ঠোঁট।নাক নেই বললেই চলে।) সেইজন্য মা খুব যত্নে রাখত। শরীরের কোথাও যেন একটু দাগ না থাকে সেদিকে খুব খেয়াল রাখত। কিন্তু এত খেয়াল রাখা সত্ত্বেও প্রতিমাসে আমি বিভিন্ন ভাবে শরীরের বিভিন্ন জায়গা কাঁটাছেঁড়ার দাগ লাগিয়েই ছাড়তাম।
একবার আখ কাটতে গিয়ে বাঁ হাতের কব্জি এমন ভেবে কেটে গেল যে সাদা চর্বি বেড়িয়ে এসেছিল। একদম হাঁ হয়ে গিয়েছিল জায়গাটা।একেবারে রক্তারক্তি কাণ্ড, তখন আমরা ১০ নম্বরের আরও ভিতরে আর একটা ১০ নম্বরে থাকতাম। গোলক ভট্চার্য (ভট্টাচার্য। আসলে সবাই ঐ ভাবেই ডাকত) কাকুর কালি মন্দিরের কাছে। কব্জির কাটা জায়গার ভেতরটা ভাল করে দেখা টেখার পর হাত ভর্তি রক্ত নিয়ে মার কাছে গেলাম। কান্নাকাটি নেই। খুব শান্ত গলায় বললাম সাদা সাদা এগুলো কি? চর্বি?
মা হাতের কব্জিটা চেপে ধরল,রক্ত বন্ধ করার জন্য। তারপর দু গালে ঠাস ঠাস,,, রান্না ফেলে হসপিটালে ,,,, এবং চারটে সেলাই। মার দুঃখ হাতে দাগ থেকে যাবে। আমার দুঃখ মা মারল।
পাঁচটা সেলাই দিলেই ভাল হত। কিন্তু আমি এত ছটফট করছিলাম যে সেলাই করাই যাচ্ছিল না। আরে এই রকম জ্যান্ত অবস্থায় মোটা বড় ছুঁচ নিয়ে যেন কাঁথা সেলাই করছে ডাক্তার কাকু। আমি তো মানুষ! না কি কাঁথা।
অবশ পর্যন্ত করে নি। বাবা ততক্ষণে খবর পেয়ে গেছে। পাঁচ জন মিলে আমাকে চেপে ধরেছিল। উফ্ কী যে লেগেছিল! মা বলেছিল বেশ হয়েছে। আখ ছাড়িয়ে,, সুন্দর করে কেটেকুটে দিলাম, উনি আবার নিজে নিজে কাটতে গেছেন। দেখ কেমন শাস্তি। যত বলছে ততই যেন বুক ফেটে কান্না,,,
তখন আমার বয়স আট। এখনও সেই দিনের কথা স্পষ্ট মনে আছে। রান্না ঘরের পাশে অনেক গুলো সিমেন্টের তাক ওয়ালা একটা ছোট্ট স্টোর রুম ছিল । সেখানে একদিকে আমাদের ঠাকুর থাকত। আর একদিকে থাকত তরকারির ঝুড়ি আর বঁটি।। তরকারি কাটার সময় মা কে খুব ফলো করতাম। অনেক বার বলেওছিলাম,,, আমি কিছু কাটি না?পারব। মা বলত,” না, হাত কেটে যাবে।”
একদিন সুযোগ বুঝে,,, কিন্তু প্রথম কাটতে গেলাম কিনা আখ।।
যাকগে সেবার বাবার কোলে চেপে ফোঁপাতে ফোঁপাতে বাড়ি এসেছিলাম।বাবার কেনা দুটো লজেন্স দু হাতে নিয়ে। ভাই এর সঙ্গে খাব। আর ভাইকে বলব আমার কষ্টের কথা, দুঃখের কথা, সেলাই এর যন্ত্রণার কথা।
সেদিন বাড়ি ফিরে অভিমানে আর মার কাছে যাই নি। রাতে বাবার পাশে শুয়ে ছিলাম। বাবা মাথায় হাত বুলোতে বুলোতে আর কানে সুড়সুড়ি দিয়ে ঘুম পাড়িয়ে দিয়েছিল আমাকে।আমাদের দুই ভাইবোনের এই একটা নেশা ছিল। ঘুমোনোর সময় বাবাকেই চাই। বাবা আমাদের মাথার কাছে বসে কানে সুড়সুড়ি দিত,, মাথায় হাত বুলিয়ে দিত।আমরা আরামে খুব তাড়াতাড়ি ঘুমিয়ে পড়তাম।
আজ বড্ড মিস করি মাথার কাছে বসে থাকা ঐ কিছু না পাওয়া মানুষটার জন্য। তার সঙ্গে আরও মিস করি আমার ঐ ছোট্ট ভাইটাকে। বড্ড তাড়াতাড়ি চলে গেল ওরা! আজ এই মধ্য বয়েসে এসে আমার এমন কোনও আপনজন নেই যার সঙ্গে আমি আমার শৈশবের বা আমার কিশোরী বেলার স্মৃতিচারণ করব। ঐ তিনটে স্বার্থপর আমাকে একা ফেলে বড্ড অসময়ে চলে গেল। যাওয়ার সময় একবারও ভাবল না আমার কথা। আমি কীভাবে কাটাব বাকি জীবনটা!
স্মৃতিই তো আমাদের বাঁচিয়ে রাখার রসদ। তাইনা? ছোটবেলার দিনগুলো ভাবতে কার না ভালো লাগে? মনটা কেমন আনন্দে ভরে ওঠে। কিন্তু আমি প্রতিদিন চেষ্টা করি আমার মেয়েবেলার প্রতিটি মুহূর্তকে ভুলতে। কিচ্ছু মনে রাখতে চাই না আমি। যে কথা মনে করলে কষ্ট হয়। যন্ত্রণায় গলা বুঁজে আসে সেকথা মনে করে কী লাভ?
কিন্তু কিছুতেই হয় না ভোলা। ভুলতেই পারি না। এত পুঙ্খানুপুঙ্খরূপে আমার জীবনের প্রতিটি মুহুর্ত মনে আছে যে নিজেই মাঝে মাঝে দিশেহারা হয়ে যাই। একটা দিনও যায় না যে আমার চোখ ভেজে না।
####
যাক্ গে যা বলছিলাম
গাছ থেকে পরে গিয়েও অনেকবার আমার হাত পা ভেঙেছে। বিশেষ করে ফুল পাড়তে গিয়ে।
কত ফুলের গাছ ছিল ফরাক্কায়। ভোরবেলায় ফুল তুলতে যাওয়া ছিল আমার একটা মারাত্মক নেশা। এই নেশার জ্বালায় রাতে ভাল করে ঘুমোতেই পারতাম না। বার বার ঘুম ভেঙ্গে যেত। মনে হত কেউ যদি আমার আগে উঠে পড়ে! সব ফুল তুলে নেয়! বার বার জানলা দিয়ে দেখতাম কখন রাত ভোর হবে।
বরাবরই আমি রাতে ভীষণই কম ঘুমোই।ছোট থেকেই আমার মনে হতো ঘুমোলে কত কিছু মিস হয়ে যাবে। রাতটা কতো বড়ো! কত সুন্দর! কত স্বপ্ন দেখা যায়! অবাস্তব সব কিছুই যেন বাস্তব মনে হয়। নিজের জন্য কতটা সময় পাওয়া যায়! একদম একা। কেউ ডিসটার্ব করার নেই।
ঘুমোলে চলে?
যে কথা বলছিলাম আমার ফুল তোলার সঙ্গী ছিল আমারই ক্লাসমেট মানসের বোন মানসী (শিখা),, আর ছিল বাবার বন্ধু পল্টন কাকুর মেয়ে মামনি,,,
ফুল তোলা আর ফুল চুরি করা,, এটাকে কিন্তু এক করে দিলে হবে না,,,
প্র্যাকটিক্যালি আমরা ফুল চুরি করতাম,,,উফ্ এই চুরি করার মধ্যে যে কী আনন্দ ছিল,,, আজও ভাবলে শিহড়িত হই। তবে
ফুল কম পেলে যেমন মন খারাপ ছিল,,,আবার বেশি পেলেও ভাগ করে নেওয়ার আনন্দও ছিল,,,
আমাদের বাড়ির পিছনেও বাগান ছিল।তারপরেই একটা বড়ো ড্রেন টপকালেই ছোট্ট একটা টগর ফুলের গাছ। এত ফুল হত যে পাতা দেখা যেত না।ফুল গুলো সাইজে একটু ছোট ছিল। আর গাছটা একটু বেঁটে মত ছিল বলে আমিও মনের সুখে ফুল তুলতে পারতাম। তবে সব তুলতাম না, কিছু রেখে দিতাম। বাবা বলত , ফুল শোভা পায় গাছেতেই।
আমাদের কোয়ার্টার এর উল্টো দিকেই একটা কোয়ার্টারের পাশেই ছিল একটা কাঠ চাঁপার গাছ। প্রচুর ফুল ফুটতো গাছটাতে।
একবার সেই কাঠ চাঁপার গাছ থেকে পড়ে গিয়েছিলাম। উফ্ সেকি যন্ত্রণা! জোরে কাঁদতেও পারি নি,,, গলায় আওয়াজ করতে পারি নি ,,, মুখটা হাঁ করে যন্ত্রণা সহ্য করেছিলাম,,, চোখ দিয়ে দরদর করে জল পড়ছে! সে যে কী কষ্ট! বিনা চিৎকারে চোখের জল ফেলেছি । গলার আওয়াজ বার করলে সবাই তো ধরা পড়ে যেতাম!!
মামনি বলল কাঠ চাঁপার ডাল নরম হয় তুই জানিস না? অত উঁচুতে উঠতে গেলি কেন?
কোনও মতে ওরা চ্যাংদোলা করে বাড়ি পৌঁছে দিল,,,
বাবা জোরে কান মলা দিয়ে হসপিটালে নিয়ে গিয়েছিল,,,
পা টা সেবার ভাল মতই ভেঙে ছিল,,,,, প্ল্যাস্টার করিয়ে বাবার সাইকেলে চেপে বাড়ি আসার সময় বাবা দুটো লজেন্স কিনে দিয়ে বলেছিল,,বেশি লাগে নি তো??
বাবাকে কানে হাত দিয়ে বলেছিলাম,” বাবা পায়ে লাগে নি,, কানে ব্যথা”। বাবার চোখটা ভিজে গিয়ে ছিল। সেই প্রথম বাবা আমার কান মলে দিয়েছিল।
সেদিন এই ব্যথাটার মানে টা বুঝতে পারি নি,,তবে আজ বুঝি। আপন জনের দেওয়া আঘাত সহ্য করা যেন বেশি কষ্টের,,,
যাকে সব থেকে বেশি ভালোবাসি,, তার দেওয়া কষ্টটাই যেন বেশি যন্ত্রণাদায়ক হয়।
সেদিন তো এত সব বুঝি নি। কিন্তু সত্যি সত্যিই আমার ভাঙা পায়ের যন্ত্রণার থেকে,,বাবার হাতে কানমলাটায় যেন বেশি কান্না পেয়ে গিয়ে ছিল।
একবার সাইকেলে রেস দিতে গিয়ে হাত ভেঙেছিল।
আর সেটা ঠিক হতে না হতেই সাইকেলের পেছনের চাকায় পা ঢুকে সে কী কান্ড!! ভাঙেনি তবে পা এর কচি চামড়া একেবারে উঠে এসেছিল।। একসঙ্গে আমার ডান হাত আর বাঁ পা প্লাস্টার করার একটা ছবি মা আমাকে দেখিয়েছিল।
একবার বেশ বড়সড় বিপদ ঘটেছিল।এক্সিডেন্টই বলা যায়। আমি তখন ক্লাস এইটে পড়ি।
ডান দিকের নাকের পাশে পাথরকুচি ঢুকে গিয়েছিল। পিচের রাস্তায় মুখ থুবড়ে পড়েছিলাম।
তখন বাবার সাইকেলের প্যাডেলে পা পেতাম না। বেশ উঁচুই ছিল সাইকেল টা। বাবার সাইকেল আমার তো বড়ো হবেই। খুব অসুবিধাই হত। সেই সাইকেল নিয়ে রেস দিচ্ছিলাম। পেছনের দাদাটাকে কিছুতেই সাইড দিচ্ছিলাম না। আমি আগে যাব। আমাকে টপকাতে গিয়ে ব্যাস,, পেছনে এমন ধাক্কা দিল যে আমি আমার সাইকেলের হ্যান্ডেলের উপর দিয়ে উড়ে গিয়ে পড়েছিলাম রাস্তায় । খুব রোগা ছিলাম আমি। তাই সাইকেলের ধাক্কায় আমার উড়ে যেতে একটুও অসুবিধা হয় নি।। অবশ্য তারও কোনও দোষ ছিল না। চ্যালেঞ্জ দিয়েছিলাম।আঙুল নেড়ে বলেছিলাম তুই আমাকে হারাতে পারবি না। একটু ইগোতে লেগে গিয়েছিল। যতই হোক ছেলে বলে কথা।
যাই হোক তখন আমাদের দশ নম্বরের রাস্তাটা সবে সারানো হয়েছে। পাথর গুলো তখনও উঁচু উঁচু হয়ে আছে ঠিক প্লেন হয় নি তখনও । মুখটা রাস্তায় একেবারে থুবড়ে গিয়ে ছিল। যখন উঠে দাঁড়ালাম ডান দিকের নাকের পাশে একটা সরু লম্বা পাথর ঝুলছে। সারা মুখ টা রক্তে ভেসে যাচ্ছে। হঠাত্ টেনশন হয়ে গেল এই তো নাক। সবাই পেঁচি বলে ডাকে। তার উপর এইভাবে পড়লাম। শুনেছি নাকের হাড় নরম হয়। যদি থেবড়ে গিয়ে আর না ওঠে?
মাটি থেকে উঠে জামা টামা ঝেড়েঝুড়ে,, ঠিকঠাক করে, পাথরটা হাত দিয়ে উপড়ে তুলে ফেলে দিয়ে,,, আগে ওটাকে মারলাম এক চড়।
ও ই কিন্তু আমাকে হাত ধরে টেনে তুলেছিল। আমার বন্ধুর দাদা। তাতে কি? আমার যদি এখন বোঁচা নাক আরও বোঁচা হয়ে যায়?
তখন কী হবে? কী করে আমার বিয়ে হবে?
সাইকেল হাঁটিয়ে হাঁটিয়ে নিয়ে আসতে হল। কারণ সাইকেলের হ্যান্ডেল ফ্যান্ডেল সব ভেঙেচুরে একশেষ। চাকার কাছটাও বেঁকেও গেছে। সেবার খুব বড়ো একটা এক্সিডেন্ট হয়েছিল আমার। আমি টেনশনে কী করি! বারান্দায় বসে আছি। বাবা হঠাত্ গেটের ভেতর বাগানে সাইকেল দেখতে পেয়ে বলল কিরে তুই হঠাত্ এখন বারান্দায় বসে আছিস,,, কী হল? এত তাড়াতাড়ি সাইকেল চালিয়ে চলে এলি? কী ব্যাপার রে?
আমি মুখ ঘুরিয়ে বললাম এমনি। তাকাব কি করে গোটা মুখ তো লাল হয়ে আছে রক্তে। জামা দিয়ে সমানে মুছছি। তাও বন্ধ হচ্ছে না রক্ত । বাবা বলল মুখ ঘুরিয়ে কথা বলছিস কেন? দেখি?
কল্পা ডাকে মা ছুটে এল। আমাকে দেখে মা কী করবে বুঝে উঠতে পারছে না। মানে কীভাবে মারবে। কতটা বেশি বেশি মারলে মনের ঝালটা যাবে সেটা বুঝতে না বুঝতে বাবা আর একটা সাইকেল নিয়ে আমাকে ক্যারিয়ারে বসেই ধাঁ। যাওয়ার সময় শুধু
বলল হসপিটালে যাচ্ছি।মনে হচ্ছে সেলাই করতে হবে। সেদিন বাবা মাকে দেখেই বুঝতে পেরেছিল আজ আমার উপর কী হতে চলেছে। কিংকর্তব্যবিমূঢ় মা কিছু বুঝে ওঠার আগেই বাবা আমাকে কীভাবে যে বাঁচিয়ে ছিল সেটা আজও আমার স্পষ্ট মনে আছে। সেবার মা পিঠের ছাল হয়তো তুলেই নিত। পারেনি বাবার জন্য।
তবে দু চার ঘা খেতেই হয়েছিল। ওইটুকু মার খাওয়া থেকে বাবা আমাকে বাঁচাতে পারেনি।
আসলে মা রেগে গেলে একদম জ্ঞান থাকত না। হয়তো মেরেই ফেলত আমাকে।।
পরের দিন আমার জীবনবিজ্ঞানের মৌখিক পরীক্ষা। বাবা ঘরে গেল জামা পরতে। তারই মাঝে মা তখন আমাকে আচ্ছা করে দিচ্ছে। আর বাবা জামা পরতে পরতে বলে যাচ্ছে মেরো না,,ওকে মেরো না। মরে যাবে আমার মেয়েটা।
সবশেষে মা পিঠে গুম গুম করে দুটো কিল মেরে কাঁদতে বসল, এতদিন হাতে পায়ে দাগ ছিল এবার মুখে। আমি যে এই মেয়ে কে নিয়ে কী করব!
সেবার তিনটে সেলাই পড়ল মুখে। ঠান দিকের নাকের পাশটা খুব ডিপ হয়ে কেটেছিল। ডাক্তার বাবু বলেছিল তাতু দা মুখের দাগ থেকে যাবে। হাতটা প্লাস্টার হল। মাথায় ব্যান্ডেজ । নাক টা ফুলে কমলালেবু হয়ে গেল। মুখটা এমন ফুলে গিয়ে ছিল যে চোখ টাই ঢেকে গিয়েছিল। সারা শরীরে ব্যথা। দুটো হাঁটু একেবারে যাচ্ছে তাই ভাবে কেটে গিয়েছিল। তবে সেলাই পড়ে নি। কিন্তু চামড়া বলে কিছু ছিল না। আসলে আমি উড়ে গিয়ে মুখের ভারে পড়েছিলাম। তাই পা টা আর ভাঙে নি। পা ভাঙলে মা বোধহয় আমাকে মেরেই ফেলত।।
বাবা সাইকেলটা বাজারে সারাতে দিল। সতুকাকুর দোকানে নিয়ে গিয়ে একটা ক্রিম চপ খাওয়াল। আর সিঙাড়া জিলিপি নিল মায়ের মাথাটা ঠান্ডা করার জন্য।
চোখ বন্ধ করে বাবার কাঁধে মাথা রেখে কালু কাকুর রিক্সায় চেপে বাড়ি ফিরলাম। বাবা আমাকে পিছন থেকে জড়িয়ে ধরে রেখেছিল।
ততক্ষণে আমার জ্বর এসে গেছে যন্ত্রণায়। ছুঁচে আমি বরাবরই ভয় পাই। সেই কিনা আমার মুখে তিনটে সেলাই। হাতে টেডভ্যাক(Td-Vac) ইংজেকশনের ব্যথা।
উফ্ কী যে কষ্ট হয়েছিল। বাবা রিক্সায় আসতে আসতে বলেছিল সামনের মাসে ডি এ র টাকাটা পেলে তোকে একটা লেডিস সাইকেল কিনে দেব। আমি বুঝতে পেরেছি আমার সাইকেলটা চালাতে তোর খুব অসুবিধে হয়। পা পাস না তো। বাবাকে বলেছিলাম মা আর সাইকেল চালাতে দেবে না। বাবা বলেছিল চিন্তা করিস না আমি তো আছি।
হ্যাঁ বাবা ছিল। যতদিন ছিল ততদিন ছিল। কাছে থেকেও ছিল। দূরে থেকেও ছিল। আসলে বাবারা এমন ই হয়। বাবাদের থাকাটা এতটাই নিঃশব্দে, আড়ালে যে উপস্থিতিটা বোঝাই যায় না। একদম বট গাছের মতো। সব ঝড় ঝাপটা নিজের উপর নিয়ে শাখা প্রশাখা দিয়ে আগলিয়ে রাখে। আমার বাবা ছিল মায়ের মতো।
আমাদের বেশির ভাগ বাবারাই এমন হয়। আমরাই বুঝতে পারি না। প্রচারের উল্টো দিকে থাকা বাবারা যেন এক একটা প্রদীপ। নিজেকে অন্ধকারে রেখে সবাইকে আলো দেয়।
রিকশায় আসতে আসতে বাবা বলেছিল আজকে একটু কষ্ট হবে। দেখবি কাল ঠিক হয়ে যাবে। আমি অমন কত পড়ে গেছি। ফুটবল খেলা মানে তো পা ভাঙা।আর ফুটবল খেলব হাঁটু ভাঙবে না?
ভাঙবেই। পায়ে লেগে গেলে ঐ অবস্থাতেই খেলেছি। মাঝ পথে ম্যাচ ছেড়ে তো বেরিয়ে আসা যায় না। বাড়িতে এসে চুন হলুদ গরম করে লাগিয়েছি। পরদিন ব্যথা হাওয়া। তোর ওষুধ ইংজেকশন পড়েছে কাল দেখবি ঠিক হয়ে গেছে।। কাল তো তোর আবার মৌখিক পরীক্ষা । এখন খেয়ে ঘুমিয়ে যা। মার সঙ্গে কথা বলার দরকার নেই।।
নাকের পাশে দাগটা এখনও আছে। আয়নায় তাকিয়ে ওটার ওপর পরম যত্নে হাত বোলাই। একবারও মনে হয় না ইশ্ দাগটা এখনও রয়ে গেছে!
আর ঐ যে বাঁ হাতের কব্জির চারটে সেলাইয়ের দাগ? সেটাও রয়েছে এখনও। হাঁটুর দাগটাও মনে করিয়ে দেয় আমায় কত কিছু! দাগ গুলো আমার কাছে বেঁচে থাকার অক্সিজেনের মতো। যখন দেখি সেগুলো আমার ফেলে আসা মেয়েবেলার সুখের মুহূর্তগুলোকে
মনে করিয়ে দেয়। আমার মেয়েবেলার কোনও ছবি নেই কিন্তু সেই কাটা দাগ গুলো আমার মেয়েবেলার সুখস্মৃতি রয়ে গেছে পরম যত্নে আমার বাইরে,,, ভেতরেও।।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।