সাপ্তাহিক ধারাবাহিক কথা সাগরে শম্পা রায় বোস (পর্ব – ১)

হায়দ্রাবাদ ভ্রমণ (১)

হায়দ্রাবাদ তেলেঙ্গানা রাজ্যের অতি প্রাচীন বৃহত্তম একটি রাজধানী শহর। দক্ষিণ ভারতের উত্তর অংশে দাক্ষিণাত্য মালভূমির মুসি নদীর তীরে ৬৫০ বর্গ কিলোমিটার স্থান জুড়ে এটি অবস্থিত।

অসম্ভব সুন্দর সাজানো গোছানো ফুলে ফুলে ভরা এ যেন এক প্রেমের শহর। এক দেখাতেই প্রেমে পড়ে যাওয়ার মতো ক্ষমতা রাখে, মহম্মদ কুলি কুতুব শাহর এই রাজধানী শহর।

সত্যিই এয়ারপোর্ট থেকে বেড়িয়েই পর পর সাজানো নানা রঙের ফুলগাছ দেখে মনটা অদ্ভুত এক ভালোলাগায় ভরে উঠল। মনে হল যা বাব্বা এখানে তো এখনও বসন্ত! যেন চির বসন্তের শহর! মে মাসের মাঝামাঝি। কলকাতা থেকে বসন্ত কবেই বিদায় নিয়েছে সেখানে শুধু গরম আর গরম। আর রোদে গরমে গাছপালা গুলো সব শুকিয়ে গেছে পাতাগুলো পুড়ে গেছে। ফুল কোথায়?

এয়ারপোর্টটাকে এত সুন্দর ভাবে সাজানো যে ফ্লাইট থেকে নেমে লাগেজ নিয়ে বাইরে এসে দাঁড়ালেই সবার মনটা যে খুশিতে ভরে উঠবে এ আমি হলফ করে বলতে পারি। আমারও তাই হল আহা কি সুন্দর কি সুন্দর। চারিদিকে শুধু ফুল আর ফুল। চারদিক অত্যন্ত সাজানো গোছানো পরিষ্কার পরিচ্ছন্ন।

গাছে গাছে ভর্তি ভর্তি সাদাফুল কমলা ফুল গোলাপি ফুল বেগুনি ফুল। এত সুন্দর যে লাগছিল কী বলব। বুঝলাম এখানের মানুষ জন খুব ফুল ভালোবাসে। আসলে দক্ষিণ ভারতের যে কোন রাজ্যে আসা মানেই তো শুধু নানারকমের ফুল দেখা। দক্ষিণীদের ফুল প্রিয়। মাথায় ফুল দেওয়া এদের সামাজিক রীতিনীতির মধ্যেই পড়ে। বেশ ভালো লাগে রাস্তার পাশে দাঁড়িয়ে থাকা ফুল উলিদের দেখে। বড়ো ঝুড়িতে নানা রঙের ফুলের মালা বিক্রি করছে নিজের খোঁপায় পছন্দ সই মালা জড়িয়ে। দক্ষিণী স্টাইলে বেশ রঙিন একটা শাড়ি পরে সোনার গয়না হাতে অবশ্য সবুজ চুড়ি বড়ো লাল টিপ এবং অবশ্যই একটা সুন্দর হাসিমুখে যখন তোমাকে বলবে ‘বঙ্গালি? মালা লো মাই’ তখন তুমি নিতে বাধ্য। ওরাই তোমার মাথায় ক্লিপ দিয়ে আটকে দেবে তোমার পছন্দের ফুলের মালা। ওদের দেশে সুহাগনরা (সধবা) মাথায় ফুল দেবেই।

যাইহোক যা বলছিলাম, একটা গাড়ি বুক করে আমাদের চললাম আমাদের হোটেলের উদ্দেশ্যে। অসাধারণ সাজানো গোছানো এই শহর এবং সেটা যেভাবে এই শহরের বাসিন্দারা বজায় রেখেছে আরও ভালো করে বলা যায় শহরটাকে রক্ষা করে চলেছে সবাই মিলে এটা দেখে খুব ভালো লাগল। ওদের প্রশংসা করতে ইচ্ছে করে। এদের এতো ঠুনকো ইগো নেই। চলতে চলতে কোন ইঁট বা পাথরে হোঁচট খেলে পাশ কাটিয়ে চলে যায় না এরা। নিজেরাই সরিয়ে দেয়। আমি যেখানেই যাই সেখানকার সব কিছুই খুব ভালো করে দেখি। শুধু হায়দ্রাবাদ শহর দেখলাম আর বাহ্ বলে চলে গেলাম তা তো নয়। একটা শহর দেখতে হলে কিছুটা পায়ে হেঁটেও দেখতে হয়। সেখানকার মানুষ দোকান পাট তাদের ব্যবহার তাদের ভাবনা তাদের বক্তব্য সবকিছুই তো দেখার জিনিস জানার বিষয়। হায়দ্রাবাদের চারমিনার দেখা মানে কি শুধুই চারমিনার আর কিছু নয়? তার চারপাশে এই যে এতবড় একটা বাজার, এই যে মুসলিম সম্প্রদায়ের মানুষ তাদের পসরা সাজিয়ে বসে আছে তাদের সংস্কৃতিটাও তো জানতে হবে। মিনারের পরিবেশটাও দেখতে হবে তাদের সঙ্গে কথা বলে তাদের নিজেদের শহর সম্পর্কে কি ভাবনা কি অনুভূতি সেটাও তো জানার বিষয় বলে আমার মনে হয়। তাই যেখানেই যাই আমি থাকি সবার পিছনে। তাড়া খেতে খেতে তারই মধ্যে যতটুকু জেনে নেওয়া যায় দেখে নেওয়া যায়। শুধু উপর উপর দেখলে আমার একদম মন ভরে না।

চলেছি হোটেলের উদ্দেশ্যে। অনেকটা চলে এসেছি। দূর থেকে দেখতে পাচ্ছি রাস্তার দুপাশটা কেমন লাল আর লাল। সিংহ মশাই বলল দেখ দেখ কি সুন্দর! একটু কাছে আসতেই দেখি রাস্তার দুদিকে শুধু কৃষ্ণচূড়া গাছ। উফ্ চারিদিকটা লালে লাল হয়ে আছে। এদিকে ওদিকে তাকিয়ে আমি শুধু দেখছি আর দেখছি। গাছ দেখা যাচ্ছে না। কৃষ্ণচূড়া ফুলগুলো, গাছগুলোকে ঢেকে রেখেছে। গাড়ি চলছে ষাট সত্তরে। কোনো জ্যাম নেই। লাল কৃষ্ণচূড়ার মাঝে আবার কমলা ফুলও রয়েছে। সঙ্গে হলুদ সাদা বেগুনি। রাস্তার দুদিকে পর পর ঠিক যেন ম্যাচ করে সাজানো।
আবার দেখলাম দুপাশে চওড়া রাস্তার মাঝে বড়ো বড়ো টবে ফুলের গাছ ডিভাইডার হিসেবে রাখা। অদ্ভুত ব্যাপার চুরিও তো হয় না। ড্রাইভার দাদাকে জিজ্ঞেস করলাম টবে এত গাছ চুরি হয় না? “না না মেমসাব হামারা শহরমে ইয়েসব হোতা নহি।”
চুরি হয় না শুনে খুবই অবাক হয়ে গিয়েছিলাম। অথচ আমার শহরে,, না আমি তুলনায় যাচ্ছি না। তবু একটু তো মন খারাপ হয়ই। আমাদের শহর ! যেন একটা চুরির শহর। সবাই যেন চুরি করতেই ব্যস্ত।
যাকগে আমি কলকাতাবাসীকে ছোট করছি না। আমিও তো থাকি এখানে। কিন্তু দুঃখ হয় এইসব সাজানো গোছানো শহর দেখলে।

একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলে আবার বাইরেটা দেখতে দেখতে চোখে পড়ল সারি সারি নারকেল গাছ রাস্তার দুপাশে। আবার দুটো রাস্তার মাঝেও। বুঝলাম এরা আমাদের মতো ডিভাইডার হিসেবে লোহার রেলিং লাগায় না। ভালোই তো পরিবেশ সুন্দর থাকে দূষণও কম হয়। এত গাড়ি চলে কিন্তু কোথাও শ্বাস নিতে অসুবিধে হয় না।
এয়ারপোর্ট থেকে প্রায় ২৭/২৮ কিলোমিটার রাস্তা ফ্লাইওভার দিয়ে ছুটে চলার সময় নানা রকমের ফুল দেখতে দেখতে মন যেভাবে একের পর এক ভালো লাগায় ভরে গেল যে আমি এই সদ্য পা দেওয়া অচেনা শহরটাকে একদম ভালোই বেসে ফেললাম।

ভাবছিলাম একসময় অন্ধ্রপ্রদেশের রাজধানী ছিল এই হায়দ্রাবাদ। কুতুব শাহর এই শহর অনেক গুরুত্বপূর্ণ পর্যটন স্থান প্রাসাদ দুর্গ হ্রদ নিয়ে সমৃদ্ধ। সমৃদ্ধ তার সংস্কৃতি বাজার হাট। এবং বিখ্যাত সুস্বাদু খাবারের জন্য। এমন একটা শহর যেখানে পুরোনো নতুনের সমন্বয়ও রয়েছে।

চলেছি হোটেলের পথে। হোটেল “শ্রী ভেঙ্কটেশ্বরা”। বুকিং করাই আছে। তাই টেনশন নেই। বাইরেটা দেখছি চারিদিকে শুধু গাছ আর গাছ। আমি সায়েন্সের স্টুডেন্ট নই। তাই গাছের নাম ঠিকঠাক বলতে পারছি না। রাস্তার দুধারে যে সমস্ত গাছ রয়েছে তারমধ্যে ফুলের গাছই বেশি। নানা রঙের বোগেনভিলিয়া যাকে আমরা ছোটবেলায় কাগজ ফুল বলতাম সেই গাছই বেশি। মাঝেমধ্যে আমার ফরাক্কার কথা মনে পড়ে যাচ্ছিল। আমাদের ওখানেও কত যে নানা জাতের নানা ধরনের ফুলের গাছ ছিল! কথাটা বলতেই আমার কত্তা মশাই একেবারে ফোঁস করে উঠল। বলল এবার লন্ডন আমেরিকায় গিয়েও তুমি ফরাক্কার সঙ্গে মিল পাবে। বাড়াবাড়ির একটা সীমা থাকে।
মনটা খুব খারাপ হয়ে গেল। আমি না হয় আবেগের বশে একটু বেশিই বলে ফেলেছি। তাইবলে আমার শৈশব কৈশোর কাটানোর ঐ ছোট্ট শহরটাকে এমন অবহেলা করবে? দূর ঐ জন্যই ওকে আমি সিংহ মশাই বলি। বাজে লোক। একটা দীর্ঘশ্বাস ফেললাম। কতদিন দেখিনা আমার প্রানের শহরটাকে।

যাইহোক দারুণ দৃশ্য। কিভাবে যে একটু একটু করে শহরে ঢুকছি টেরই পেলাম না। না দেখলে ঠিক বোঝানো যাবে না।
রাস্তার কোথাও কোনও নোংরা চোখে পড়ল না। না কোনও ট্র্যাফিক জ্যাম। একসঙ্গে ৫/৬ টা গাড়ি পাশাপাশি সার বেঁধে চলতে পারবে এমনই সব চওড়া রাস্তা।

এয়ারপোর্টের রাস্তা ধরে যেতে যেতে কখন যে মাসব ট্যাঙ্ক রাস্তায় পড়লাম বুঝতেই পারলাম না। কি অদ্ভুত নাম না? এরপর মিউনিসিপ্যালিটির অফিস পার করে উড ব্রিজ গ্র্যান্ড। তার পাশেই হোটেল সাহি আফগান দরবার। এটা দেখেই সঙ্গে সঙ্গে মনে পড়ল হায়দ্রাবাদি বিরিয়ানি টা আজকের মেনুতে রাখতেই হবে।

ছুটে চলেছি আমরা। এয়ারপোর্ট শহর থেকে বেশ খানিকটা বাইরেই বলা যায়। বাঁদিকে লোটাস হসপিটাল দেখতে দেখতে একটু এগিয়েই এরপর “সন্ত নিরংকারী সৎ সঙ্গ্ ভবনের”পাশ দিয়ে গাড়ি ডান দিকে ঘুরল। বেশ বড়ো ভবন। বোঝা গেল খুব নাম গান হয় এখানে। এরপর “স্নেহা সিলভার জুবিলি ভবন”পার করেই চোখে পড়ল যে রাস্তাটার উপর দিয়ে যাচ্ছি তার নাম “লকরি কা পুল।”

একটু এগিয়ে যেতেই বেশ বড়ো একটা হোটেল ‘হ্যাম্প শায়ার প্লাজা’। এর ঠিক পাশেই আমাদের হোটেল”শ্রী ভেঙ্কটেশ্বরা”। এর সামনে ভাসভি হসপিটাল এবং বাজাজ ইলেকট্রনিক্স। আর পাশে শ্রী সন্তোষ ফ্যামিলি ধাবা।

আবার এই হোটেলের সঙ্গেই যুক্ত—“হোটেল অ্যাবোড।” বেশ ভাল হোটেল।

যাইহোক হোটেলের ঘর বেশ পছন্দই হল। বাথরুমটাও দারুণ। হোটেলের বাথরুম পছন্দ না হলে ঠিক ভালো লাগে না আমাদের মতো বাঙালিদের।

ক্রমশঃ

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।