ক্যাফে ধারাবাহিকে সুকুমার রুজ (পর্ব – ৫)

ম্যারিটাল প্লাস্টার

হঠাৎ সংঘের সম্পাদক ভ্যাবলা বলে — সরখেল ডাক্তারের বাড়িতে বিশাল ডাকাতি হয়ে গেল। পাঁচজন ছিল। প্রত্যেকের কাছে এ-কে ফর্টি সেভেন।
সাংঘাতিক ক্লাবের ক্যাসিয়ার হরে বলে — শুনলাম, ডাক্তারকে কিডন্যাপ করে নিয়ে গেছে। আর একজন মেয়ে-পেশেন্টকে রেপ করেছে।
ভ্যাবলার উঁচু গলা — না-না, কিডন্যাপ-টিডন্যাপ বাজে কথা, তবে রেপ-কেসটা হলেও হতে পারে।
তুই সব জানিস! ডাক্তারকে পাওয়া যাচ্ছে না। সিওর কিডন্যাপ। একটা পাঁইট বাজি রইল।
নেপাল এতক্ষণ কাছাকাছি কোথাও লুকিয়ে ছিল। ষণ্ডামার্কাগুলো চলে গেছে জানতে পেরে, ও সুড়ুত করে ঘরে ঢোকে। প্রথমেই চোখে পড়ে লক্ষ্মীমনিকে। লক্ষ্মীর তখনও জ্ঞান ফেরেনি। ওর ওই অবস্থা দেখে নেপাল ভয় পেয়ে যায়। কী করবে ঠিক করতে পারে না। নেপালের পেছন পেছন গোটাকতক কৌতূহলী লোকও ঢুকেছে। ওদের মধ্যে কয়েক জন বলে ওঠে — ধর্ষণ ও খুন। শিগগির পুলিশে খবর দাও। কয়েকজন বলে — বেঁচে আছে মনে হচ্ছে। শিগগির হাসপাতালে নিয়ে যাও।
নেপাল কিছুটা সাহস করে লক্ষ্মীর কাছে যায়। হাতের কজি ধরে, ডাক্তারের ভঙ্গিতে পালস দেখে বলে— বেঁচে আছে।
চোখে মুখে জলের ঝাপটা দিতে লক্ষ্মীর জ্ঞান ফেরে। ও উঠে সামনে এত লোকজন দেখে কেমন ভড়কে যায়। সবাই অচেনা। শুধু নেপালকে চিনতে পারে। ওকে দেখে বলে ওঠে — খুব গরম লাগছে।
সমবেদনা জানাতে একজন বলে — গরম লাগবারই কথা। শরীরের ওপর দিয়ে যা ধকল গেল!
অন্যজন বলে — জল খাবেন?
আর একজন বলে — এক গ্লাস গরম দুধ হলে…।
নেপাল বলে — আমি জল, ওষুধ সব দিচ্ছি। এমিলি দিদিমনি! আপনি, জামা-কাপড় ঠিকঠাক করে পড়ে নিন তো! ওরা কি কিছু করেছে?
হ্যাঁ, ওরা সেই টাকলুটাকে মেরেছে আর ওই ঘরে ঢুকে ভাঙচুর করেছে।
সে ঠিক আছে। বলছি আপনাকে কিছু করেছে?
সমবেদনা জানানো লোকটা বলে— বলুন, বলুন না, লজ্জা কী।
ওরা আমাকে শুয়ে পড়তে বলেছিল।
হ্যাঁ, হ্যাঁ, তারপর-তারপর…! বলুন! শুয়ে পড়ার পর কী করল?
একজন আওয়াজ দেয় — আরে মশাই! তার পরের ঘটনা কী কেউ নিজে মুখে বলতে পারে!
এমন সময় একজন এসে আওয়াজ দেয় পুলিশ আসছে। কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গে ঘর ফাঁকা। হুড়মুড় করে বেরোতে গিয়ে দু’একজন হুমড়ি খেয়ে পড়ে। নেপাল ভেতরের ঘরের দরজায় ঘা মারতে থাকে প্রাণপণে — বাবু, দরজা খুলুন, ডাক্তারবাবু দরজা খুলুন! ওরা সব পালিয়েছে।
দরজা সহসা খোলে না। নেপাল পেছনে তাকায়। দেখে পেছনে দাঁডিয়ে এমিলি দিদিমনি। নেপাল দাঁত কিড়মিড় করে বলে ওঠে — আরে, আপনি আবার পেছন পেছন কেন? শুনলেন পুলিশ আসছে। আপনার তো এখন জ্ঞান ফিরেছে। পালিয়ে যান। পুলিশ আসছে। জানেন তো— বাঘে ছুঁলে আঠারো ঘা আর পুলিশে ছুঁলে ছত্রিশ ঘা।
লক্ষ্মীমনি বলে — পুলিশ তো ওই দরজা দিয়ে ঢুকবে। সে জন্যেই তো আমি পুলিশের ছোঁয়া বাঁচাতে এ দরজা দিয়ে পালাতে চাইছি। তাছাড়া আমার খুব গরম…!
এমন সময় ডাক্তার সরখেল ভেতরের দরজা খোলেন।
নেপাল বলে — স্যার! সবাই চলে গেছে। আমি ভালো করে দরজা লাগিয়ে দিয়েছি। এবার পুলিশ আসবে। এখন সব ঠিক আছে। শুধু এই এমিলি দিদিমনি গরম হয়ে গেছে।
তুই থাম, হতচ্ছাড়া! মা রে! তুই আমাকে বাঁচিয়ে দিলি। আমি ফুটো দিয়ে সব দেখেছি। তুই না থাকলে আরও কী যে করত! আচ্ছা! তোর কিছু হয়নি তো?
ডাক্তারবাবু! আমার খুব গরম লাগছে। মনে হচ্ছে ঠাণ্ডা জলে চান করি।
চান করবি! ঠিক আছে আয়, ভেতরে আয়। ওই দ্যাখ বাথরুম। যা তুই ভালো করে চান করে নে। তোর হাইপারটেনসিভ সিমটম্ তো! কোল্ড-বাথে আরাম হবে।
লক্ষ্মী ধীর পায়ে ভেতর ঘরে ঢুকে যায়। ডাক্তার সরখেল বলেন— ন্যাপলা! এই ছড়িয়ে পড়ে থাকা শিশিগুলোর মধ্যে দ্যাখ তো এমিলিনাম নাইট্রোসামের শিশিটা খুঁজে পাস কী না!
এমন সময় বুবাই আর টুকুন এসে ডিসপেনসারির দরজার সামনে দাঁড়ায়।
সাত

তখন বাইরে তিখখর রোদুর। জজসাহেবের ঘর থেকে অনিমেষ আর অনুরাধা বেরিয়ে আসেন। সিঁড়ি দিয়ে নীচে নামছেন অনুরাধা, পিছনে অনিমেষ। এতক্ষণ দাঁড়িয়ে থেকে অনুরাধার হাঁটুর ব্যথা বেড়েছে। বেশ খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। পিছন থেকে অনিমেষের সাবধানবাণী— রেলিং ধরে ধরে নামো। আস্তে নামো, পড়ে যেও না যেন!
অনুরাধা বলে ওঠেন — আমাকে নিয়ে তোমাকে এত চিন্তা করতে হবে না। নিজে সাবধানে নামো। চশমাটা কি চুষে চুষে খাবে! পকেটে কেন, চোখে দাও। সিঁড়িতে পা ফসকালে তো আমার সঙ্গে আর ঝগড়া করতে পারবে না।
আমি চশমা ছাড়াই দেখতে পাচ্ছি। শুধু একটা অসুবিধা, কখন থেকে …।
ও বুঝেছি। আমি ওঠার সময় দেখেছি, নীচে নেমেই ডানদিকে সুলভ কমপ্লেক্স আছে। এত ঘন ঘন পায় কেন?
অনিমেষ বেশ কড়া করে কিছু একটা বলতে গিয়েও থেমে যান। সিঁড়ি থেকে নেমে একটু জোর কদমে ঢোকেন সুলভ কমপ্লেক্স-এ৷
কিছুক্ষণ পরে দেখা যায়, অনুরাধা অনিমেষের হাত ধরে একটু খুঁড়িয়ে হাঁটছেন। হাঁটতে হাঁটতে ওঁরা কোর্টের পার্কিং জোন-এ পৌঁছন। নিজেদের গাড়িখানা খুঁজতে থাকেন। এদিক ওদিক দেখেও নজরে পড়ে না। প্রায় দশমিনিট চেষ্টা করার পর হাল ছেড়ে দিয়েছেন। এমন সময় অনুরাধা বলেন — ড্রাইভারকে একটা ফোন করতে পারছ না!
অনিমেষ যেন হালে পানি পান — হ্যাঁ, ঠিক বলেছ তো! কিন্তু ওর নম্বরটা? ও! বেরোনোর আগে ও একবার ফোন করেছিল। দেখি, মোবাইলেই থাকবে।
খুঁজে পেতে নম্বরটা বের করে কল করেন— হতভাগা, তুই কোথায়? কখন থেকে খুঁজে মরছি।
ওপাশ থেকে উত্তর আসে — দাদাবাবু আর দিদিমনিকে ডাক্তারবাবুর বাড়ি পৌঁছোতে এসেছি। আপনারা একটু অপেক্ষা করুন, আসছি।
অনিমেষ তেলে-বেগুনে জ্বলে ওঠেন। দাঁত কিড়মিড় করে বলে ওঠেন — ওই ডাক্তারটাই যত নষ্টের গোঁড়া! আর ছেলেমেয়েদুটোর ওর সঙ্গেই যত দহরম মহরম! ডিভোর্সটা হয়ে যাক একবার, তারপর ওই ব্যাটা ডাক্তারকে একহাত দেখে নেব।
অনিমেষকে গজগজ করতে দেখে অনুরাধা বলেন — এত গজগজ করার কী আছে! আজ হয়নি, একমাস পরে না হয় ডিভোর্স হবে। তোমার যে আর তর সয় না দেখি! তুমি থাম! আমি কি ডিভোর্সের কথা বলেছি?
বলনি! মিথ্যুক কোথাকার! জজসাহেবের সামনে ইনিয়ে বিনিয়ে আমার নামে গুচ্ছের মিথ্যে বলে ডিভোর্স চাওনি!
এ তো মহাজ্বালা! জজসাহেবের সামনে তো বলেছি। এখন কি ডিভোর্সের কথা বলছি? এখন তো …। ও! জজসাহেবের সামনে একরকম, আর এখন একরকম! তোমার হাড়ে হাড়ে বদমাইসি! এখন বলবে কেন? এখন যে তোমার খিদে পেয়েছে, তা কি আর আমি বুঝিনি! সেই কোন সকালে দুটো রুটি আর একটু ঢ্যাঁড়স-চচ্চড়ি পেটে পড়েছিল। তা কি আর এখন পেটে আছে। মুখ ফুটে তো বলবে না, খালি গজগজ করবে! আমার হয়েছে জ্বালা। ডিভোর্সটা যে এখনো হয়নি।
কথা বলতে বলতে অনুরাধা ফুপিয়ে কেঁদে ওঠেন। অনিমেষ বেশ অস্বস্তিতে পড়েন— দ্যাখো, আরে বাবা! কান্নার কী হল? এ তো মহা মুশকিল! আশপাশের লোকজন কী ভাববে! আহাহা, ছিচকাঁদুনি থামাও তো! আমি তো খেতে চাইনি। ডাক্তারের কথা বলছিলাম। ওই ডাক্তারটাই যত নষ্টের গোড়া!
অনুরাধার কান্নাভেজা গলা আর একপ্রস্ত চড়ে — হ্যাঁ, ডাক্তারের দোষই তো দেবে! নিজের কোনও দোষ নেই?
না না, ডাক্তার নয়, ড্রাইভারের কথা বলছি৷ ওই ড্রাইভারটাই মহা-ত্যাঁদড়। ওকে গাড়ি নিয়ে এখানে অপেক্ষা করতে বললাম, আর ও ..!
ওর কী দোষ!
অ্যাঁ! ওর কী দোষ? দেখ, তোমার আদুরে মেয়েই হয় তো ওকে বলেছে কোথাও ঘুরিয়ে আনতে। ওর তো এখানে এলেই টইটই করে ঘোরা অভ্যেস।
কেন তোমার এমন মনে হল! অ্যাঁ! কেন তোমার এমন মনে হল? শোন, তোমার গুণধর ছেলেই ওকে বলেছে ডাক্তারের বাড়ি পৌঁছে দিতে৷ গুণের তো শেষ নেই ওর! ডাক্তারের সঙ্গে পরামর্শ করবে, কী করে আমাদের ডিভোর্সটা ঠেকানো যায়।
আর তোমার মেয়ে গুণবতী সরস্বতী! উনিও তো সঙ্গে গেছেন। দেখো কখন ফেরেন। আমরা এই দুপুর রোদে এখানে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে ভাজা-ভাজা হই।
না না, এখানে আমরা বসে থাকব না। ট্যাক্সি ধরে বাড়ি চলে যাবো। তুমি একটুখানি বসো। আমি ট্যাক্সি ডেকে আনছি।
অনিমেষ গুটিগুটি পায়ে বড় রাস্তার দিকে এগোন। প্রায় পনেরো মিনিটের চেষ্টায় তিনি একখানা ট্যাক্সি ধরতে পেরেছেন। সেটাও মিটারে যা উঠবে, তার চেয়ে কুড়ি টাকা বেশি দিতে রাজি হয়ে।
এর মধ্যে ড্রাইভার গাড়ি নিয়ে কোর্ট-চত্বরে হাজির হয়েছে। এদিক-ওদিক খুঁজে, অপেক্ষা করতে থাকা অনুরাধাকে আবিষ্কার করেছে — এই তো পেয়েছি! মাসিমা! চলুন, পার্কিং-এ গাড়ি। বাবু কোথায়?
তোমাকে না খুঁজে পেয়ে তোমার বাবু ট্যাক্সি ধরতে গেছে। তারা কোথায়?
দাদাবাবু আর দিদিমনি বললেন, ওদের দেরী হবে। ওরা ট্যাক্সি ধরে বাড়ি ফিরবেন। আমাকে এখানে পাঠিয়ে দিলেন।
ঠিক আছে চলো। তোমার বাবু তো রেগে লাল। দেখো, ফোন করে ডেকে নিয়ে এসো।
অনুরাধা গিয়ে গাড়িতে বসেছেন। ড্রাইভার অনিমেষবাবুকে ফোনে ধরার চেষ্টা করে। যখন ফোনে পেল, তখন অনিমেষ ট্যাক্সি নিয়ে কোর্ট-চত্বরে সিমেন্টের বেঞ্চির কাছে পৌঁছে গেছেন। বেঞ্চিতে অনুরাধা নেই। এমন সময় ড্রাইভারের ফোন — মাসিমাকে গাড়িতে বসিয়ে নিয়েছি। আমি পার্কিং প্লেসে আছি। ট্যাক্সি নিতে হবে না চলে আসুন।
অনিমেষ বলে ওঠে— এই! রোককে রোককে! ট্যাক্সিওলা জোর ব্রেক কষে— কেয়া হুয়া? কিছু নেহি হুয়া। ট্যাক্সিতে নেহি জায়েগা। গাড়ি আ গিয়া।
ট্যাক্সিওলা গজগজ করতে থাকে। কাঁহা সে আতা হ্যায় ইয়েলোগ. রুপাইয়া দিজিয়ে!
কিসের রুপিয়া! বোলা না নেহি জায়েগা! নেহি জায়েঙ্গে, ঠিক হ্যায়। বড়ে রাস্তা সে মিটার ডাউন করকে ইহা তক আয়ে হ্যায়। ভাড়া নেহি দিজিয়েগা?
ঠিক আছে, যাবো বলে উঠেছিলাম যখন, দশ টাকা নাও।
কাহে কা দশ রুপাইয়ে! ভিখ দে রহে হ্যায় কা?
ফোরটি ফাইভ রুপইয়ে দিজিয়ে, অউর উতরিয়ে।
কাহে কা ফরটি ফাইভ? মিটার ডাউন করলে তো পঁচিশ রুপিয়া হোতা হ্যায়!
আপ হি তো মান লিয়ে বিশ রুপইয়ে জাদা দেঙ্গে। কিতনা হোতা হ্যায়?
অনিমেষের সঙ্গে ট্যাক্সিওলার বচসা বাড়তে থাকে। পেছনে গোটা পাঁচেক গাড়ি। সেগুলো তারস্বরে হর্ন বাজাচ্ছে। বচসা থামে না। পেছনের গাড়িগুলোর ড্রাইভার নেমে আসে। মধ্যস্থতা করার চেষ্টা করে — কাকা, ট্যাক্সি চড়েছেন ভাড়া দেবেন না!
চাপে পড়ে অনিমেষ গাড়ি থেকে নেমে একটা পঞ্চাশ টাকার নোট দেন ট্যাক্সিওলার হাতে।
ট্যাক্সিওলা, ‘পাঁচ রুপাইয়া খুল্লা নেহি হ্যায়’ বলে একরাশ ধোঁয়া ছেড়ে হুশ করে বেরিয়ে যায়। অনিমেষ হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকেন ট্যাক্সিটার দিকে। এমন সময় গাড়ির ড্রাইভার, অনিমেষকে দেখতে পেয়ে ছুটে আসে — এই তো পেয়েছি।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।