T3 || স্বাধীনতার খোঁজে || বিশেষ সংখ্যায় সুপ্রসা রায়

স্বাধীনতা হীনতায় কে বাঁচিতে চায়

“জানিস বাপ , আইজকে ইস্কুলে ইত্তিহাসের দিদিমুণি পঢ়াইছ্যা কি আম্মোদিগের দ্যাশট বহোত দিন পরাধীন ছিল । অইন্য দ্যাশের লকরা সাগর পিরায়ে আইস্যা আম্মোদের দ্যাশট দখ্‌খল কইর‍্যা রাইখ্যাছিল । কিন্তুক ইখন সাধ্‌ধীন বটে । মুরা সব্‌বাই স্বাধ্‌ধীন দ্যাশের মানহুস্‌ বটি ।“
শিবেন আর বিমলা তাদের এই মেয়েকে বেশ সমীহ করে । ছোটথেকেই মাথায় বুদ্ধির প্রাচূর্য দেখে ওকে গ্রামের স্কুলে ভর্তি করে দিয়েছিল ওরা । দেখতে দেখতে মেয়ে এখন ক্লাস সেভেনে । স্কুলের দিদিমণি মাস্টারমশাইরা খুব ভালোবাসে ওকে । প্রত্যেক বছর পরীক্ষার ফল বেরোলে হেডমাস্টারমশাই নিজে বাড়িতে এসে খবর দিয়ে যান ,”এ সিবু তুর সুসীলা ইবারকার পরীক্ষাতেও পথ্‌থম হইছে র‍্যা । তুর এই বিটি আম্মোদের ইস্কুলের আর গাঁয়ের নাম বহোত উঁচাথে লিয়েঁ যাব্যাকই যাব্যাক , কথাট বইল্যা দিলম হঁ ।“
প্রথম হওয়ার অর্থ শিবেন বা বিমলা কেউই জানে না । তবে , হেডমাস্টারমশাইয়ের চোখে মুখে উপচে ওঠা খুশি দেখে বুঝে নেয় সেটা ভালো কিছুই হবে ।
স্কুল থেকে নতুন কিছু শিখে এলেই সেটা বাবাকে শেখানো চাই সুশীলার । বাবা বুঝতে না পারলে রাগ করে না । ধৈর্য ধরে শেখাবার চেষ্টা চালিয়ে যায় । আরও তিনটে ছেলে মেয়ে আছে শিবেনের । বড়ো ছেলেটাকেও স্কুলে ভর্তি করেছিল । তবে পড়াশুনোয় ওর মন নেই । স্কুলে যতো দিন দুপুরের খাবার পেয়েছে , ততোদিন গেছে । এখন শিবেনের মতোই পাথরের খনিতে কাজ করে । ছোট ভাই বোনদুটোকে সুশীলাই ধরে বেঁধে পড়ায় ।
সুশীলার মুখের দিকে মুগ্ধ দৃষ্টিতে চেয়ে থেকে শিবেন শুধোয় ,”ই পারাধীন সাধ্‌ধীনট কি বট্যাক র‍্যা বিটি ?”
বাবাকে বোঝাতে শুরু করে সুশীলা । শুনতে শুনতে কল্পনার জগতে যেন এক স্বর্গরাজ্যের ছবি দেখতে পায় শিবেন । সেখানে দুঃখ নেই , দারিদ্র নেই , অপ্রাপ্তি নেই । কেবলই সুখ সাফল্য আর প্রাপ্তির দুনিয়া সেটা । কিন্তু সেই জগতের সঙ্গে নিজের জীবনের ছবি মেলাতে গিয়েই বদলে গেল মুখচ্ছবি । শুকনো মুখে ধরা গলায় বলল ,”নারে বিটি , মুরা কুথ্থায় সাধ্‌ধীনট হইথ্যা পাইরলম ? আম্মোদের সব জমিন তো দিকুর কাছকে জম্‌মা আছেক । মুরা বাপ্‌ বেটায় খাদানে খাইট্যে ঝেটুকচা কামাই করি , উ তো আম্মোদের সক্‌কলকার খাইত্যে আর দিকুর সুদ্‌ট দিথ্যেই খতম হইয়্যাঁ যেছে । সাধ্‌ধীন হওয়াট মুদের পারা গরীবের লেইগ্যা লয় রে ।“
বাবার পাশটিতে বসে সুশীলা বলে ,”জানিস বাপ , অ্যানেক বৎসর আগে আম্মোদের পারাই গরীব মানহুষ সিধু কান্‌হু আরও অ্যানেক গরীব মানুহুষকে সাথ্যা লিয়ে লাল্মুখা সায়েবদের সাথে দম্যা লড়াই দিঁইছিল । জিত্যা নাই উয়ারা । সায়েবদের বন্দুক গুলির সামনে তীর ধ্নুক লিয়্যাঁ উয়ারা পাইরব্যাক কেনে ? কিন্তুক লড়াই উয়ারা থামায় নাই ।“
“ই লাল্মুখা সায়েব কারা বট্যাক ? আম্মোদের খাদানের মেনিজার সায়েব তো লাল্মুখা লয় ! উ তো মুদের পারা কালা কুচকুচ্যা ।“ বাবার কথা শুনে হি হি করে হেসে গড়িয়ে পড়ে সুশীলা । মেয়ের হাসি দেখে শিবেনের সরল মুখে অবুঝ হাসি ছড়িয়ে পড়ে । হাসি থামিয়ে সুশীলা বলে ,”হুই মেনিজার তো নকলি সায়েব বট্যা র‍্যা । লাল্মুখারা ছিল আসলি সায়েব । সাগরের হুইপারের অ্যানেক দূর দ্যাশের থিক্যা আইসেছিল উয়ারা । তাবাদে আম্মোদের দ্যাশের ভালা মানহুষগুলানকে ভয় দিখ্যায়েঁ , মাইরে ধইর‍্যা দ্যাশটর দখল লিইছিল । লিজির দ্যাশের কুছুর উপর আম্মোদের দ্যাশের লোকের কুনো অধিকার ছিল নাই । সায়েবরা ঝা বইলথ উয়াদিগে তাই মাইনথ্যা হইথ । না মাইনলেই বেদম অত্যাচার ।“
শুনতে শুনতে শিবেন আবার কোথায় হারিয়ে গিয়েছিল । বিড়বিড় করে বলে উঠল ,”আম্মোদিকে ঝিমন দিকুর সব হুকুম মাইন্যা চলথ্যা হয় । লিজের জমিনের উপ্‌রে আম্মোদের কুনো দাবি লাই , তুদের মাকে জীবনভর বিনা ব্যাতনে দিকুর ঘরকে কামিন খাইটত্যা হব্যাক । মুদের জীবনগুলানকেও দিকুরা দখ্‌খল লিয়্যাঁ লিইছ্যা রে বিটি ।“
সুশীলা বলতে থাকে ,“জানিস বাপ্‌ , উ সায়েবদিগের দখ্‌খল থিক্যা লিজের দ্যাশকে ছিনাই লিতে অ্যানেক মানহুস লড়্যাছিল । আম্মোদের গাঁয়ের গগন দাদার মতন কত্ত কত্ত সিপাই , বাবুদিগের ঘরের লিখাপড়া জানা ছেল্যা মেয়্যারা ধূম লড়াই দিইছিল । সুরু সুরুতে উয়ারা জিততে লাইরল । কত্ত লক জীবনট জেহ্‌লে কাটাইল , কত্ত লক ফাঁসি গেল , সায়েবদের বন্দুকের গুলিতে পরাণ চইল্যা গ্যাল কত্ত মানহুশের ।“
এই পর্যন্ত শুনে শিবেন করুণ গলায় বলে ,”পরাণটই চইলে গ্যাল ! লাভট কী হইল ইয়াতে !”
সুশীলা গাঢ় কন্ঠে বলে ,”কিন্তুক লড়াইট থাম্যা নাই । কুছু লক মরে তো আরও লক আইস্যা লড়াই আগায় লিয়ে যায় । এই কত্তে কত্তে এক সুময় লাল্মুখাগুলান ভয় পাইয়েঁ আম্মোদের দেশট ছাইড়্যে প্ল্‌হাইঁ গ্যালেক ।“
শেষ কথাগুলো শুনে শিবেনের চোখ মুখ ঝিকিয়ে উঠল । তাদের মেয়ে কতো কিছু জানে ভেবে গর্বে বুক ফুলে উঠল ওর । সুশীলা উপসংহার টানে ,”অখন আম্মোদের দ্যাশের সব কুছুতেই আম্মোদের সক্কলকার সমান অধিকার বট্যা ।“
শিবেন অন্যমনস্ক হয়ে ভাবে ,ওর মতো আরও যাদের জমি মহাজনের কাছে বাঁধা পড়ে আছে , তাদেরকে কী স্বাধীন বলা যায় । তাদের কি নিজের নিজের সম্পত্তির উপর কোনো অধিকার আছে ? নিজের সন্তানদের পাতে ভরপেট খাবার দেবার ক্ষমতাও নেই ওদের । সুশীলা যেমন শোনালো , তেমন করে কী মহাজনদের কবল থেকে নিজেদের জমি উদ্ধার করতে পারবে ওরা ? মুখ দেখে বাবার মনের কথা বুঝতে পারে সুশীলা । বাবার গলা জড়িয়ে দৃঢ় কন্ঠে ও বলে ,”শুন্‌ বাপ , অ্যানেক লড়াই কইর‍্যাছিস তুরা । কিন্তুক লড়াইট থামাইল্যা চইলব্যাক নাই । আর কটা বৎসর কাইটথ্যা দাও কেনে । ত্যাখন তুমাদের লড়াইয়ের নিশানট মুর কান্ধে লিয়ে লুব । ইস্কুলের সার আর দিদিমুণিরা বইল্যাছ্যা , আম্মোকে বহোত বড় চাকরির লেইগ্যা তৈয়ার কইর‍্যা দিব্যাক । বহোত খ্যাম্‌তা হব্যাক মুর । অ্যানেক ট্যাকা ব্যাতন পাব । ত্যাখন দিকুর কবল থিক্যা আম্মোদের জমিন ছাড়াইঁ আইনব । তুকে আর দিকুর কাছকে সুদট দিত্যা হব্যাক নাই র‍্যা বাপ । মাকেও আর দিকুর ঘরকে কামিন খাইটত্যা হব্যাক নাই । তুদিকে আর দিকুর হুকুমের দাস থাইকত্যা দিব নাই । মুই তুদিকে সাধ্‌ধীন কইরবই কইরব । ইট মুই বইল্যা রাইখলম্‌ হঁ ।“
এতক্ষণ নানান ঘরকন্নায় রত থেকে বাবা মেয়ের কথা শুনছিল বিমলা । বেশিরভাগ কথাই মাথার অনেক উপর দিয়ে ভেসে চলে যাচ্ছিল । মাঝে মাঝে কিছু না বুঝেই মেয়ের মুখের পানে চেয়ে তৃপ্তির হাসি হাসছিল ও । কিন্তু শেষ কথাটা কানে যেতেই সজাগ হয়ে উঠল ওর মস্তিষ্ক । এমন কথা যে ওরা স্বপ্নেও ভাবে না ! এমনটা কি হতে পারে কখনও ! দিকুর কবল থেকে মুক্ত হবে ওরা ? হাতের কাজ ফেলে গুটি গুটি ওদের পাশে এসে বসে বিমলা । অবাক হয়ে মেয়ের মুখের দিকে চেয়ে থাকে । সুশীলার চোখে শপথের আগুন ঝলসাতে দেখছে শিবেন আর বিমলা । দেখতে দেখতে নিজেদের নতুন দেখতে থাকা স্বাধীন হওয়ার স্বপ্নটাকে সেই আগুনের তাপে জারিয়ে নিতে লাগল ওরা দুজন ।“
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।