গল্পেরা জোনাকি তে সুতপা পূততুণ্ড

নমক হালাল

সব সময়ের কাজের লোক আজকাল পাওয়াই যায় না,কেউ রাখেও না,কিন্তু আগেকার কিছু জমিদার বাড়িতে আজও রাখার চল আছে,জমিদারি নেই ঠিকই কিন্তু আদত টা রয়ে গেছে।
সেই কাজের মানুষ টিকে তার যৌবনকাল থেকেই চিনি।বাড়ির সমস্ত ফাইফরমাশ সেরে বাগান পরিস্কার থেকে, তাদের বাড়ির ছোটো সদস্য কে ঘোরানো,সব কাজই করে,দিনান্তে জোটে আগের রাতের বাসি রুটি,সাদা আলুনা তরকারি,কখনো দু একটা মিষ্টি, বা কাটা ফল,দু একটুকরো।
সে খুব বিশ্বাসী, রাত্রেও পাহাড়া দেয়,গ্যারেজ ঘরে ঘুমোতে দেয়, এরা আবার কুকুর পোষে,তার অবশ্য বেশ বড় একটা গাড়িবারান্দা লাগোয়া ঘর আছে।
এই সেবা পরায়ন মানুষটির বয়েস বাড়তে বাড়তে কর্মক্ষমতা হারিয়ে ফেলল।তাকে দিয়ে আর সেরকম কাজ পাওয়া যায় না! বুড়ো মানুষ, ঐ প্রাক্তন জমিদার কে তেল মালিশ করে দেওয়া আর পুকুর ঘাটে কে আসে কে যায়,নজরে রাখা,কেউ নারকেল বা জামরুল, আম,এইসব ফলগাছ থেকে মাটিতে,বাদুরে,পাখিতে খাওয়া সেগুলোও দেখে রাখা,কোনো অযাচিত, বা অপছন্দের ছেলেপুলে যে উৎপাৎ না করে, সেগুলো নজরে রাখা,ভাঙা টিনের টুকরো,লোহার পাত সবই তার নজরে থাকত।
দীর্ঘ ৬য় বছর পাড়ায় না থাকার দরুন ঐ বুড়ো মানুষ রবি দার আর খোঁজ নেওয়া বা দেখাও হয় নি,হঠাৎ আমি আর আমার ছোটো বোন ইছাপুর এক নং প্লাটফর্মে বসে আছি,দেখি রবিদার মতো এক বুড়ো মানুষ! আমি ত অবাক! আমার বোন ও বিশ্বাস করতে পারছে না ঐ সেই জমিদার বাড়ির কাজের মানুষটার এই পরিণতি। খেতে পায় না,থাকার যায়গা বলতে প্লাটফর্মের বেঞ্চ,আর এক পোটলা,তাতে খাকী রঙের ড্রাইভারদের বা সিকিউরিটি গার্ডদের একটা জামা,গায়েও তাই,আর একটা ছেড়া চাদর। অবাকের আরো বাকি ছিল,কাছে গিয়ে দেখি চোখেও খুব কম আলো পৌঁছোয়,ক্ষীণ দৃষ্টি। আমার দুচোখ জলে ভরে এলো,পরিচয় দেওয়াতে চিনতে পারলো! নিজের কাজের জন্যে লজ্জিত, চোখ বেয়ে জল পরছে ঐ বুড়ো মানু্ষটার,একদিন ওই জমিদার গিন্নির কথায় আমাদের পুকুরে সাঁতার কাটার জন্যে না বলেছিল,বলেছিল সাঁতার কটেলে মাছ মরে যাবে।ছেলে মেয়েকে ওদের পুকুরে সাঁতার শেখাতে নিয়ে যেতাম। আমরা বললাম জানি তুমি কষ্ট পেয়োনা! দোষ ত ওদের তুমি কেন অপরধে ভুগছো? ওরা বাবু মানুষ।এত দিন নুন খেয়েছি।
আমরা প্লাটফর্ম ছাড়ার আগে কিছু খাবার কিনে দিয়ে বাড়ি ফিরলাম।
নামি মানুষ কতটা অমানবিক হতে পারে!
রবি দা এখনো প্লাটফর্মে শুয়েও কত নমক হালাল।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!