• Uncategorized
  • 0

ধারাবাহিক কিশোর উপন্যাসে সুদীপ পাঠক (পর্ব – ৩)

বুন্দি ও তার অলৌকিক চশমা

কিন্তু ঠিক এই কারণেই শাশুড়ি বিউটিদেবীর কাছে দামিনীকে নিত্যদিন কথা শুনতে হয় । বেশ রসিয়ে রসিয়ে খোঁচা দিতে তিনি সিদ্ধহস্ত ।
– বুঝলে বৌমা তোমার ছেলের জুড়ি মেলা ভার । ওর দাদু ঠিক নামই রেখেছে , তবে সেটা অর্ধেক । লাড্ডুগোপাল হলে ঠিক হতো । অবশ্য ঢেঁড়স কিম্বা রাঙামূলো বললেও ভুল হবে না । গান বাজনা অনেকেই করে আমারও করেছি , তাই বলে এমন ঘরকুনো বাচ্চা দুনিয়ায় দ্বিতীয় দেখিনি বাপু ! বাড়িতেও কুটোটি ভেঙে দুটোটি করে না । একের নম্বরের কুঁড়ের বাদশা তৈরী হয়েছে । এতোটুকু ছেলে সমবয়সীদের সঙ্গে মাঠে গিয়ে খেলতে ভালোবাসে না এমন অলক্ষুণে কথা কেউ কখনো শুনেছে ? ওমন ঢের ঢের ছেলেপুলে মানুষ হতে দেখেছি । নিজেও পেটে ধরেছি দু’ দু’টো । কিন্তু তারা কেউ ওমন গোবর গণেশ হয় নি ।
এহেন গঞ্জনা মুখ বুজে সহ্য করে থাকেন দামিনী কারণ তিনি আশায় বুক বেঁধেছেন । ছেলে তার একদিন জগৎ বিখ্যাত শিল্পী হবে , দেশের দশের একজন হবে । ছেলেকে নিজের হাতে মনের মতো করে গড়ে তুলতে পেরেছেন এই তাঁর পরম তৃপ্তি । কিন্তু পাঁচ বছরের ব্যবধানে যখন কন্যা সন্তানের জন্ম দিলেন তখন শাশুড়ি মা নাতনির নাম করণের সুযোগ হাত ছাড়া করতে মোটেই রাজী হলেন না । সকলের উদ্যেশ্যে পেল্লাই এক ধমক দিয়ে বললেন
– চুপ , থামো সবাই , কেউ কোনো কথা বলবে না । যখন নাতি হয়েছিল তখন দাদু নাম রেখেছে । এবার নাতনি হয়েছে এখন ঠাকুমা নাম রাখবে । নাও ইটস মাই টার্ন । আমি এই পুঁচকি মেয়ের নাম দিলুম ‘বুন্দি’ ।
– এ্যাঁ সেকি !
শুনে সবাই চমকে উঠলো ! কিন্তু বিউটিদেবী গম্ভীর মুখে বললেন
– হ্যাঁ ঠিকই । দাদার নাম লাড্ডু হলে বোনের নাম বোঁদে হবে । এতে আশ্চর্য হওয়ার কি আছে শুনি ?

বলিহারি যুক্তি বটে ! কিন্তু এ বাড়ীতে কার ঘাড়ে কটা মাথা আছে যে ওনার আদেশ অমান্য করে । দামিনী পুনরায় প্রমাদ গুনলেন ! মেয়ে তার চিরটাকাল একরত্তি থাকবে না । যখন বড় হবে তখন ঐ নামে সকলে ডাকবে আর সে যে কি লজ্জার ব্যাপার হবে সে কথা কল্পনা করেই তাঁর মাথা ঝিমঝিম করে ওঠে । তবু ভালো ডাক নামের ওপর দিয়ে গেছে । এবারেও পোষাকি নাম তিনিই দিলেন তাই রক্ষে ! তবে এতো কিছুর পরেও তিনি একটি কারণে মনে মনে দারুন পুলকানুভব করেন । সে তার একেবারে নিজস্ব , এ ব্যাপারে কারোর কাছে হৃদয় মেলে ধরতে চান না । স্বামী তার জলধর ; অর্থাৎ মেঘ । তিনি নিজে দামিনী অর্থাৎ বিদ্যুৎ । মেঘের মধ্যেই তো বিদ্যুৎ লুকিয়ে থাকে । মেঘ ঝর্নার মতই জল ঝরায় তাই পুত্র হল নির্ঝর আর বিদ্যুতের কন্যা হল বিদ্যুৎপর্না । আশ্চর্য কি অলৌকিক সমাপতন ! তাই না ?

এবার পরিবারের বাকী সদস্যের পরিচয় দেওয়া যাক । তিন তলার পশ্চিমের ঘরে যিনি বসবাস করেন সেই উদ্ভিন্ন যৌবনা রূপসী , ডাকসাইটে সুন্দরীর নাম কোজাগরী । ডাক নাম তার কাজু । ইনি হলেন দামিনীর একমাত্র ননদ । উচ্চ মাধ্যমিকের গণ্ডি পেরিয়ে জয়েন্ট এন্ট্রান্সে ভালো ফল করে মেডিক্যালে অ্যাডমিশন নিয়েছে । কাজুর বৌদি অন্ত প্রাণ । যত আব্দার বায়না সব তার কাছে । বৌদিরও অফুরন্ত প্রশ্রয় আছে আদরের ননদিনির প্রতি । ভাইপো ভাইঝিদের সঙ্গে অল্প অল্প খুনসুটি , মজা , খেলা ছাড়া বাকি তিনজন অবিভাবকের সঙ্গে তার কোনো সংযোগ নেই । কারন জেনারেশন গ্যাপ । কাজু খুব ভালো করেই জানে যে বাবা মা দাদা কারোর সঙ্গে কথা বলে কোনো লাভ নেই । কেউ কিছু বুঝবে না , শুধু ফ্রীতে জ্ঞান দেবে । সুতরাং তার একমাত্র ভরসা স্থল হলো বৌদি । ফেসবুকের ইণ বক্সে কিম্বা হাওয়াটস এ্যাপে রোজ কতজন প্রেমাস্পদ , প্রণয়াকাঙ্খি তার পানিপ্রার্থী হয় তার ডিটেল বর্ণনা যতক্ষণ না সে দামিনীকে শোনাতে পারছে ততক্ষণ তার পেটের ভাত হজম হয় না । সে সংসারের সাতে পাঁচে থাকে না । নিজের জগৎ নিয়ে সে এ্যাকম্প্লিষ্ট । তার বিশেষ একটি শখ হলো নিত্য নতুন ফ্রেমের চশমা বানানো ও সেটি পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে বহুক্ষণ নিজেকে দেখা এবং সেল্ফি তুলে এফ বি তে পোষ্ট করা ।

চলবে

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।