গদ্যের পোডিয়ামে সংযুক্তা পাল

দয়াময়ীর কথা ‘ : এক অন্তহীন শিকড়ের টান

“জীবন অফুরান, জীবনের মূলে আছে এক অকারণ আনন্দ। তাই বোধহয় আধপেটা অভুক্ত মানুষও হাসে। এত বিধি নিষেধ সত্ত্বেও মানুষের পাশে দাঁড়ায়, ভুলে যায় জাতপাতের ব্যবধান। আসলে মানুষের সঙ্গে মানুষের আত্মীয়তা অনেক গভীরে প্রোথিত”
কিন্তু এই আত্মীয়তার ইতিবাচকতার মধ্যেও কখনো কখনো যে মর্মাহত জীবন যন্ত্রণার দলিল সত্য হয়ে ওঠে তাকেই যেন অকপট সরল স্বীকারোক্তিতে ফুটিয়ে তোলা হল ‘দয়াময়ীর কথায়’।
কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয় ২০০৮ লীলা পুরস্কারপ্রাপ্ত এবং ১৪১৬ বঙ্গাব্দে আনন্দ পুরস্কারপ্রাপ্ত এই আত্মজীবনীমূলক রচনায় সুনন্দা সিকদার তার ফেলে আসা যে শৈশব জীবনের স্মৃতি রোমন্থন করেছেন সেখানে দেশভাগকে কেন্দ্র করে গড়ে ওঠা পারস্পরিক দূরত্বেও অনন্য এক ঐক্যসূত্রের গল্পকেই আরও বড় হয়ে উঠতে দেখা যায়।

ক্ষুন্নিবৃত্তির সংকট, ভেদবুদ্ধির স্বার্থান্ধতা, নিরাশ্রয় নিরাবলম্ব জীবনযাপনের মধ্যেও বেঁচে থাকতে পারে স্নেহের টান; দেশভাগ যে আসলে মানচিত্রের ভাগ, মনের ভাগ নয়, সম্পর্কের ভাগ নয় তা যেন লেখিকা তাঁর স্মৃতিচারণের প্রথম পর্বেই জানিয়ে দেন। প্রথাগত ধর্মান্ধতার পরিবর্তে যে ধর্মের কথা এই লেখায় প্রাধান্য দাবি করেছে তা হল ভালোবাসার ধর্ম, মানবতার ধর্ম। সাম্প্রদায়িকতার সূত্রে দেশভাগের মত দুর্ঘটনার ক্ষত ও ব্যাথা বাঙালি বহুকাল ধরে বহন করে এসেছে ; তাছাড়াও এই সিদ্ধান্ত যে আসলে সাধারণ মানুষের মানসিক অভিপ্রায়ের বিরোধী ছিল তাকেও যেন লেখিকা স্পষ্টভাবে চিহ্নিত করে দেন। জীবনের, ধর্মের এক স্বাভাবিক সহজ সত্যকে স্পষ্ট হতে দেখা যায় লেখিকার দাদার বক্তব্যে –
“ও মা দয়া, তুই কি পাগুলনি! আল্লাহর সঙ্গে দুগগা লক্ষীর কুন কাজিয়া নাই। বেহেশতে সগগলের মইধ্যে ভাব-ভালোভাসা। কুন কাজিয়ার জায়গা নাই।ও সব মাইনষে করে।”

প্রকৃতির সঙ্গে একাত্মীকরণের মতই সম্পর্কের সঙ্গেও ধীরে ধীরে একাত্মতার প্রবণতা বার বার প্রতিফলিত। যে সম্পর্ক রক্তের সম্পর্ক নয় অথচ চেনা প্রকৃতির মতই তা নির্ভরযোগ্য। শৈশব থেকেই যার বুকে আশ্রয় সেই বাংলাদেশের প্রকৃতি আর দাদার কোল দুটোই পশ্চিমবঙ্গের ইট-কাঠ- কংক্রিটের জঙ্গলেও তার অনুভূতি এবং পূর্বস্মৃতিকে বাঁচিয়ে রেখেছে। এখানে শৈশবের স্মৃতি রোমন্থন যেন শিকড়ের প্রতি এক অন্তহীন টান।

দেশ ভাগের পটভূমিতে লেখা এই রচনায় হিন্দু ও মুসলমান এই দুটি সম্প্রদায়ের মধ্যে ছোট ছোট পার্থক্য, আচার- আচরণের ছোট বড় অমিল চিরাচরিত ভাবে থাকলেও লেখিকার মূল অভিপ্রায় আমাদের বুঝতে অসুবিধা হয় না যে মানসিক নৈকট্যের কাছে ভৌগলিক দূরত্ব, ব্যবহারিক জীবনের দূরত্ব কিছুই নয়। ভীষন তুচ্ছ হয়েও আমাদের গড়পরতা সমাজ জীবনে যা আসলে তুচ্ছ নয়, তাকে মানুষ চাইলে তার সহৃদয়তা, মানবতা, উদারতার দ্বারা তুচ্ছ করে দিতে পারে কিন্তু ব্যাক্তির ইচ্ছে সমাজের কাছে, রাষ্ট্রের কাছে বারবারই পর্যুদস্ত হয়, হেরে যায়।

ইতিহাস বদলায় আর তার সঙ্গে বদলে যায় মানুষের সামাজিক অবস্থান। দেশ ভাগের আকষ্মিকতা এভাবেই বদলে দিয়েছে মানুষের বৃত্তি এবং মনোবৃত্তি দুই-ই। এই দেশভাগ হাত দিয়েছে মানুষের ভাত -কাপড়ে, রুজি- রোজগারে। মায়া- মমতায়, হৃদয়ের ঐকান্তিকতায় জীবনের এই খন্ড খন্ড দুঃস্থতার দিকেও লেখিকা আলোকপাত করেছেন। সুনন্দা দেবী তাঁর জীবন ও চারপাশে এক ওলট -পালট সময়কে প্রত্যক্ষ করেছেন, এ হেন সময় তাঁকে তাঁর নিজের মায়ের থেকে দূরে সরিয়ে তার পালিকা মা অর্থাৎ পিসিমাকে মা বলতে শিখিয়েছে। এই সময় লেখিকার কানে রেখে গেছে অজস্র কান্নার রোল, চোখের সামনে সব কিছুকে পরিনত করেছে শূন্যতে। দেশ বদলের মত করে চলতে থাকে বাড়ি বদল, জমি- জায়গা বদল। গন্তব্যের লক্ষ্যে পথ চলতে থাকা মানুষগুলো কখন যে ‘রিফিউজি’ নামে অভ্যস্ত হয়ে যায় তা তারা নিজেরাও বুঝতে পারে না হয়তো। সামাজিক বিধি-নিষেধে অনভ্যস্ত শৈশব মন বুঝতে পারে না শনি কিংবা সত্যনারায়ণের পুজো আগে যে জায়গায় হত সেখানে নামাজ পড়া কিংবা ফজরের আজান দেওয়ায় আপত্তিসূচক অভিব্যক্তি আসলে কিসের ইঙ্গিত দেয়। মানুষের দেশ একটাই, শিরায় শিরায় যার অস্তিত্বকে সে বহন করে চলে; কিন্তু এই চেনা উপলব্ধি কখন যে ভেঙে টুকরো হয়ে যায় আর ওই টুকরো হয়ে যাওয়া এক খন্ড থেকে আরেক খন্ডে সমূলে উৎপাটিত হয়ে যেতে হবে কেন এই প্রশ্ন, সংশয় লেখিকার থেকেই যায়, যা আমাদের মনে করিয়ে দেয় ‘আগুন পাখি’ , ‘সূর্য দীঘল বাড়ি ‘ এই সব রচনার কথা। বছরের পর বছর যারা নিজেদের ভালোবাসা ভাগ করে নিয়েছিল, সুখ -দুঃখের অবিরাম আদান- প্রদানের ওপর নির্ভর করে ছিল যাদের সহাবস্থান তারাই কিনা একে অপরের বিনাশের খেলায় মেতে উঠল! ঐতিহাসিক রায়টে ধ্বংস হয়ে গেল পারস্পারিক সৌহার্দ্য! “হিন্দু মুসলমান বচ্ছরের পর বচ্ছর একসাথে থাইক্যা শ্যাষ্টায় শয়তান ভর করছিল মাইনষের উপর।”
এই শয়তান অভিমানের নাকি প্রলোভনের সেই প্রশ্নের উত্তর খোঁজার তাগিদ সম্পূর্ণ রচনাটি জুড়ে। আবার সেই শয়তানকে প্রশ্নয় না দিয়ে অন্তরের ভগবানকে সারাজীবনের সাধনায় প্রতিষ্ঠিত করতে পারেন, পথকে ঘর, পথ চলাই প্রকৃত জীবন এবং পথের মানুষ কে আত্মীয় হিসেবে মনে করার এই বিশ্বাসকে বহন করার স্পর্ধা রাখেন লেখিকার দেখা এমন একটি চরিত্র ‘ভুলিপিসিমা’ (পালিতা মায়ের ননদ) এক অনন্য জীবনদর্শনের প্রতীক যাঁকে দাঙ্গা, দেশভাগের মত ঘটনাও বিচলিত করতে পারেনি। তিনি অনায়াসে বলতে পারেন– “বুঝলিরে দয়া, মাঝে মইধ্যে এমুন সময় আইসে, যখন মাইনষের ভিতরের শয়তানটা জাইগা উঠে, তখন আর তারে ঘুম পাড়ান যায় না। তবে বেশির ভাগ সময় ভগবানটাই মাইনষের মধ্যে জাইগা থাকে। দেখস্ না মানুষ মানুষরে কত ভালবাসে।”

দেশভাগের ট্র্যাজেডির সঙ্গে সঙ্গে যে প্রশ্নটি একাধিকবার ঘুরে ফিরে এসেছে তা হল পাপ -পুণ্যের প্রশ্ন। পাপ- পুণ্যের বিচার যে আসলে কে করেন তা বোধের অতীতেই থেকে যায় কিন্তু পাপ -পুণ্যের হিসেব নিকেষে মানুষের যে ষোলো আনার মধ্যে প্রায় বারো থেকে চোদ্দ আনাই ফাঁকি তা বুঝতে দেরি হয় না। খিদের যন্ত্রণা সহ্য করতে করতে মরে যাওয়া পুণ্য নাকি উঁচু জাত হয়ে নীচু জাতের ছোঁয়া খেলে কিংবা বেঁচে থাকার রসদ গ্রহনে পাপ– দরিদ্র ব্রাহ্মণের বিবাহযোগ্যা মেয়ে নিয়ে না খেয়ে বেঁচে থাকা পুণ্য নাকি মুসলমানের ঘরে অন্নগ্রহন বা তার কাছে সাহায্য প্রার্থনায় পাপ এ প্রশ্নের উত্তরে লেখিকা সরাসরি তাঁর মনোভাব ব্যক্ত করেননি ঠিকই কিন্তু যে ইঙ্গিতটা রেখে গেছেন তা যথেষ্ট অর্থবহ। হিন্দু জমিদারতন্ত্র বা সামন্ততন্ত্রের আবহমান অভিজাত্যের প্রকোপ আর নিজের বলতে কিছু না থাকা, “মাটি চাইট্যা ” খাওয়া মানুষের মধ্যে শোষক ও শোষিতের চিরকালীন স্বরূপ নির্দ্বিধায় বর্নিত ।

‘দয়াময়ীর কথা’ য় শুধু লেখিকার নিজের বেদনার একমুখীনতা নয়, উৎসারিত হয়েছে তাঁদের গ্রামে আসা অসংখ্য ‘রিফিউজি’ পরিবারের বেদনা, যারা অধিকাংশই কোচবিহার থেকে এসেছিলন। তাদের নিরন্তর সংগ্রাম, ঘটনা -দুর্ঘটনার ছোটো -বড় ইতিহাস, সময়ের এলোমেলো করে দেওয়া সুনিশ্চিত ,নিরাপদ জীবন থেকে এক অতল নিরাপত্তাহীনতার যন্ত্রণা যা ‘দয়াময়ী’র মত আজও আমাদের অনেকেরই শরীরে-মনে গুমরে কেঁদে বেড়ায়।

এই স্মৃতিচারণ কোন নির্দিষ্ট ধর্ম বা ধর্মীয় সম্প্রদায় বা নির্দিষ্ট বঙ্গের ইতিহাস নয়, আপামর বাঙালি জীবনের সমকালীন যন্ত্রণার ইতিহাস যা লেখিকার আত্মসত্তার সঙ্গে মিলে মিশে একাকার হয়ে গেছে। লেখিকার পূর্ববঙ্গীয় জীবনের অজস্র দলছুট সঙ্গীরা তাই একেকটি চরিত্র হয়ে মাঝেমধ্যেই আত্মপ্রকাশ করেছে। এদের অতীত যেন নকশী কাঁথার, জীবনের পরতে পরতে যা গাঁথা হয়ে থাকে। পাকিস্তান – হিন্দুস্থান এর এই ভেদ কেড়ে নিয়েছে জন্মের মাটি, প্রিয়জন, স্বপ্ন ও ভালোবাসা। এই ভালোবাসাময় অতীত, মাটি ও শিকড়ের অতীত কি কখনো ভোলা যায়! তাইতো আজকের শহুরে জীবনে অভ্যস্ত সুনন্দারা ‘দয়াময়ী’ দের একান্ত নিজস্ব
সংস্কারটুকুকে লালন পালন করে চলে নিজেদের মধ্যে। ‘দয়াময়ীর কথা’ তাই ‘দয়াময়ী’ থেকে সুনন্দা হয়ে ওঠার ইতিবৃত্ত। সর্বোপরি অসংখ্য গ্রাম্য ভাষা, লোকছড়া, প্রবাদ -প্রবচনের ব্যবহার সমগ্র রচনাটিকে পাঠকের কাছে মৃত্তিকাগন্ধী রূপে আস্বাদ্য করে তোলে।

আত্ম উদারতার এক প্রগাঢ় প্রসারতা যা মানুষকে মানুষ হিসেবে চিনতে শেখায়, বুঝতে শেখায় প্রথাগত বিধিনিষেধের উর্ধ্বে উঠে মানবাত্মার নিরপেক্ষ মননশীলতার মধ্যেই আসলে মানবতার জয়। তাই হিন্দু -মুসলমানের পারস্পরিক সংস্কারাচ্ছন্ন অন্ধত্বকে লেখিকা সহজেই অস্বীকার করতে পেরেছিলেন। স্বভাবসিদ্ধ আবেগ এবং কৌতুহলের আকর্ষণে অনায়াসেই ইয়েদালিকাকার সঙ্গে রোজা রেখেছেন। নামাজের মন্ত্র না জানলেও খোদাতালার কাছে প্রার্থনা করেছেন – “সকলের ভালো করো, সকলকে খিদের অন্ন দাও, পাশপোর্ট-ভিসা তুলে দাও, ঝগড়া-কাজিয়া বন্ধ করে দাও।”

যে দ্বিজাতিতত্ত্বের ভিত্তিতে দেশভাগ হয় তার ভ্রান্ত দর্শন ক্রমাগত মানুষের ভাবনাকে, বুদ্ধিকে, দৃষ্টিভঙ্গীকে বিচলিত করেছে। প্রকৃত ধর্ম কি? কি তার স্বরূপ? একাধিক বার সেই দিক নির্দেশ করেছেন লেখিকা যা তাঁর আত্মোপলব্ধির সঙ্গে সমীকৃত হয়ে গেছে। তাই অসংখ্য মানুষের হয়ে তিনিই প্রশ্ন রাখেন বৃহত্তর সমাজের কাছে
“যারা বর্ষার ঢলের সময় মাইনষেরে ঘরে ঢোকায় না তাগো সঙ্গে কিসের আত্মীয়তা?” হৃদয়ের স্বতোৎসারিত আনন্দ, সম্পর্কের প্রতি আনুগত্য আবার দুর্বৃত্তের কূটকৌশলী শাসন, দুঃস্থ মনের কৃপণতা, এক টালমাটাল সময়ের অস্থিরতা –এসব কিছু বুকে চেপে আশ্রয়ের সন্ধানে কখনো ঘর ছাড়ার তাগিদ কিংবা বিদেশ- বিভুঁই এ ঘর বাঁধার তাগিদ, অসংখ্য মানুষের মাঝে হারিয়ে যাওয়ার আনন্দ আবার ভিড়ে একা হয়ে যাওয়ার যন্ত্রণা– শিক্ষা, বুদ্ধি আর অর্থের মিশেলে সম্পন্ন মানুষের জয়জয়কারে প্রতিনিয়ত দীর্ঘশ্বাস ফেলতে থাকা ভিখিরি , রিফিউজি জীবনের কালিমা, নিজের মা- বাবা- ভাই -বোন সত্ত্বেও একান্ত যে ‘আমি’ তার সঙ্গে যোজন দূরত্ব, ধর্ম -অধর্মের জটিল হিসেব, যুক্তি ও সংস্কারের বিরোধ আর অন্দরমহলের বন্দীত্ব তথা বহমান নিঃসঙ্গতায় উথলে ওঠা কান্নার ফেনায় ভাসমান নারীর জীবন… প্রকৃতির দেওয়া –কেড়ে নেওয়া, সর্বোপরি ক্রমবর্ধমান পরিত্যক্ত ভিটে আর তাকে কেন্দ্র করে পড়ে থাকা মানুষের স্মৃতির হাড়গোড় — প্রতিটির অভিজ্ঞতাই এক নিরাসক্ত কথকের ভঙ্গিতে যেন বর্ণনা করে চলেছেন লেখিকা। তাঁর এই স্মৃতিচারণ আসলে এক আত্ম আবিস্কার বা আত্ম উন্মোচন যা একটি মাইগ্রেশনের কাহিনীকে পরিনত করে একটি জীবনদর্শনে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।