ছোটগল্পে শিল্পী নাজনীন

জন্ম বাংলা‌দে‌শের কু‌ষ্টিয়া জেলার কুমারখালী থানায়। জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ব‌বিদ্যাল‌য়ে আন্তর্জা‌তিক সম্পর্ক বিভা‌গে পড়া‌শোনা শে‌ষে ক‌লে‌জে রাষ্ট্র‌বিজ্ঞান পড়ান। শিক্ষকতার পাশাপা‌শি লেখা‌লে‌খি কর‌ছেন। প্রথম উপন্যাস '‌ছিন্নডানার ফ‌ড়িঙ' প্রকা‌শিত হয় ২০১৬ তে। পরবর্তী‌তে প্রকা‌শিত হ‌য়ে‌ছে দু‌টি ছোটগল্প ও এক‌টি শিশু‌তোষ গ‌ল্পের বই। বাংলা‌দে‌শের বেশ কিছু জাতীয় দৈ‌নিকসহ উ‌ল্লেখ‌যোগ‌্য সা‌হি‌ত্য ও‌‌য়েবম‌্যাগগু‌লিতে লেখ‌েন সচরাচর।

প্রমোশন

সকালটা ফাঁকা পে‌য়ে একম‌নে ল্যাপট‌পে রি‌পোর্টটা তৈরি কর‌ছিল পিউ। ডেভলপ‌মেন্ট স্টা‌ডি‌জের ওপর করা এই রি‌পোর্টটায় অ‌নেক কিছু নির্ভর কর‌ছে তার। রি‌পোর্টটা ঠিকঠাক কর‌তে পার‌লে একটা প্র‌মোশন পর্যন্ত বা‌গি‌য়ে নেয়া সম্ভব, নি‌দেনপ‌ক্ষে একটা এশীয় ট্যুর। ব‌সের কথায় তেমনই ঈ‌ঙ্গিত ছিল যেন। পিউ তাই খুব ক‌রে চেষ্টা কর‌ছে রি‌পোর্টটায় গতানুগ‌তিকতার বাই‌রের কিছু যোগ কর‌তে। সু‌যোগটা হাতছাড়া করা উ‌চিৎ হ‌বে না একদম। একটা প্র‌মোশন মা‌নে প্র‌তিমা‌সে থোক কিছু টাকা বাড়‌তি পাওয়া, একটা এশীয় ট্যুর মা‌নে তার সি‌ভি‌টা অ‌তি‌রিক্ত ভারী হওয়া। সে‌ক্ষে‌ত্রে অন্য এন‌জিও‌তে অারও বড় পো‌স্টে ডাক পাওয়ার সমূহ সম্ভাবনা। সু‌যোগটা তাই শতভাগ কা‌জে লাগা‌তে সকাল থে‌কেই খে‌টে মর‌ছে সে। অাজ তার অফ ডে। সুমন অ‌ফি‌সের কা‌জে দে‌শের বাই‌রে। একমাত্র মে‌য়ে সেঁজু‌তি স্কু‌লে। এই ফাঁ‌কে যতটা সম্ভব গু‌ছি‌য়ে নি‌তে চেষ্টা ক‌রে পিউ। নেট ঘেঁ‌টে, ইউ‌টিউব দে‌খে মোটামু‌টি একটা ফ্রেম দাঁড় ক‌রি‌য়ে ফে‌লে। বাংলা‌দে‌শের সামা‌জিক প্রেক্ষাপটে ক্রমবর্ধমান ধর্ষ‌ণের অন্ত‌র্নি‌হিত কারণ, ভয়াবহ এই অপরা‌ধ সম্প‌র্কে জনমানু‌ষের ভাবনা এবং এ‌ক্ষে‌ত্রে বিষয় হি‌সে‌বে ‘উন্নয়ন’ কতটা সম্পৃক্ত, কীভা‌বে উন্নয়ন এ সমস্যার সমাধা‌নে কার্যকর ভূ‌মিকা রাখ‌তে পা‌রে, তার সম্ভাবনাই বা কতটুকু, সেইসা‌থে উন্নয়ন অধ্যয়ন বিষয়টা‌তে কেন সরকা‌রের অারও গুরুত্ব দেয়া জরুরী ইত্যা‌দি বিষ‌য়ের ওপর মোটামু‌টি মা‌নের একটা হাই‌পো‌থি‌সিস দাঁড় ক‌রি‌য়ে ফেলল পিউ। নি‌জেই ম‌নে ম‌নে বাহবা দিল সে নি‌জের কা‌জে। খু‌শি‌তে ডগমগ হ‌য়ে বুয়া‌কে এককাপ ক‌ফি অান‌তে ব‌লে বিছানায় গা এ‌লি‌য়ে অাধ‌শোয়া হল পিউ। গুনগু‌নি‌য়ে ‘অা‌মি খোলা জানালা, তু‌মি ঐ দ‌খিনা বাতাস’ গাই‌তে গাই‌তে চোখ রাখল অাকা‌শে। জানালা দি‌য়ে খোলা অাকা‌শের অ‌নেকটাই চো‌খে প‌ড়ে। নীল-সাদা মে‌ঘের ভেলায় ভাস‌ছে। অাহ্। জীবন সুন্দর। বেঁ‌চে থাকা অারও। বিড়‌বিড় ক‌রে পিউ। এতটা মন ভাল অ‌নেক‌দিন হয় না তার। সকালটা খুব উপ‌ভোগ কর‌তে ই‌চ্ছে ক‌রে হঠাৎ। ই‌চ্ছে ক‌রে বে‌রি‌য়ে পড়‌তে দূ‌রে কোথাও। কিন্তু অাপাতত সেটা হওয়ার নয়। সংসার মা‌নে নিয়‌মের দাসত্ব, প্রাত্য‌হিকতার কড়া শাসন। ই‌চ্ছে কর‌লেই বে‌রি‌য়ে পড়া যায় না হঠাৎ হঠাৎ। একটু দ‌মে যায় মনটা। বুয়া ক‌ফির কাপটা টে‌বি‌লে না‌মি‌য়ে কিছু একটা বলার প্রস্তু‌তি নেয়। বিছানায় উপুড় হ‌য়েই ক‌ফির কা‌পে চুমুক দেয় পিউ। অ‌পেক্ষা ক‌রে বুয়া কী ব‌লে শোনার। বুয়ার বয়স ষা‌টের কোটায়। পিউ খালা ডা‌কে। বুয়াও পিউ‌কে ডা‌কে খালা। ম‌হিলা সদ্য গ্রাম থে‌কে এ‌সে‌ছে। শহু‌রে কেতায় তেমন অভ্যস্ত হ‌য়ে ও‌ঠে‌নি এখনও। অ‌তি‌রিক্ত সহজ-সরল, বোকা। একটু ইতস্তত ক‌রে ম‌হিলা ব‌লে, ও খালা!
‌চোখ বুঁ‌জে, ক‌ফি‌তে অা‌রেকটা চুমুক দি‌য়ে পিউ ব‌লে, হু। ব‌লো।
ইঁ খালা! নাদাগ‌রে‌ত্তে এ‌ট্টি তেলাপুহা বারায়‌চে, কী হর‌বো, ইঁ?
‌বে‌শি ক’‌রে ঝাল দি‌য়ে চচ্চ‌ড়ি ক’‌রে ফে‌লো। পেঁয়াজও বে‌শি দিবা, সা‌থে ধনে পাতা কু‌চি। -গম্ভীর, ভা‌রি‌ক্কি চা‌লে ব‌লে পিউ। ব’‌লে অাড়‌চো‌খে ম‌হিলার মুখভঙ্গী লক্ষ ক‌রে। বুয়াকে বিভ্রান্ত দেখায়। বড় বড়, অ‌বিশ্বাসী চো‌খে পিউ‌কে পরখ ক‌রে কিছুক্ষণ। চোয়াল ঝু‌লে প‌ড়ে অ‌নেকটা। তারপর রঙ ফে‌রে মু‌খে। হি হি হা‌সে। খালা যে কী কয়, বল‌তে বল‌তে চ‌লে যায় কা‌জে।
রান্নাঘ‌রে তেলা‌পোকার অাস্তানা হ‌য়ে‌ছে অ‌নেক‌দিন। বুয়া‌কে ব‌লে‌ছিল রা‌তে ওষুধ দি‌য়ে রাখ‌তে। তারমা‌নে ওষু‌ধে কাজ হ‌য়ে‌ছে। ওষু‌ধের কথা ম‌নে পড়‌তেই ওষুধ‌বি‌ক্রেতা লোকটা‌কে ম‌নে প‌ড়ে গেল হঠাৎ। ম‌নে পড়‌তেই হা‌সিও পে‌লো। গতকাল অ‌ফিস থে‌কে ফির‌তে লোকটার কা‌ছে তেলা‌পোকা মারার ওষুধ চাইল পিউ। ওষুধ এ‌গি‌য়ে দি‌য়ে লোকটা বলল, প‌নে‌রো টাকা দেন।
টাকা বের কর‌তে কর‌তে ‌পিউ বলল, তেলা‌পোকা মর‌বে তো, মামা?
‌লোকটা ঘাড় ত্যেড়া ক‌রে বলল, তা জা‌নি‌নেকো!
‌পিউ ভা‌রি অাশ্চর্য হ‌য়ে বলল, কী ব‌লেন মামা? অাপ‌নি ওষুধ বি‌ক্রি কর‌ছেন অার জা‌নেন না যে এই ওষু‌ধে তেলা‌পোকা মর‌বে কি-না? তাহ‌লে অা‌মি কিনব কেন এই ওষুধ?
না কিন‌লে না কিন‌বেন। -‌লোকটার তে‌ড়িয়া জবাব। পিউ কী বল‌বে ভে‌বে পে‌লো না। বিস্ম‌য়ে লােকটার মু‌খের দি‌কে হতভম্ব তা‌কি‌য়ে থাকল শুধু। লোকটা প্রবল বির‌ক্তি‌তে হাত নে‌ড়ে, এ‌দিকও‌দিক মাথা দু‌লি‌য়ে ব‌লে চলল, কাইল একজন অাই‌সে কয়, মামু কী ওষুদ দে‌চেন, তেলাপুহা তো ম‌রে না‌কো! শো‌নো কতার ছি‌রি! তেলাপুহা তো ম‌রে না‌কো! তা তেলাপুহা না মর‌লি অা‌মি কী হর‌বো? বাইত যেয়া মাই‌রে দিয়াস‌পো? ভা‌রি তো পুনা‌রো টাহার এক ও‌ষোদ! কতটাহা কত জাগা নষ্ট কর‌তে‌চে তার খবর নাই, অায়‌চে পুনা‌রো টাহার ওষো‌দি তেলাপুহা ম‌রে না সেই হি‌সেব নিবার! অামু সাফ সাফ কয়া দি‌চি, অামার ও‌ষোদ বেচার দরকার বে‌চি‌চি, তেলাপুহা মইর‌লে কি বাঁইচ‌লে তা দেহা অামার কাম না‌কো। অাপ‌নেকও ক‌চ্চি, কিন‌লি কে‌নেন, না কিন‌লি না কে‌নেন। অা‌মি গিরা‌ন্টি মিরা‌ন্টি দি‌বের পার‌বোনা‌নে।
ক‌ষ্টে হা‌সি চে‌পে লোকটার হা‌তে প‌নে‌রো টাকা গুঁ‌জে দি‌য়ে অতঃপর চ‌লে এ‌সে‌ছিল পিউ। বুয়ার কথায় মনটা ভা‌ল হ‌য়ে গেল অাবার। তার মা‌নে, ওষু‌ধে কাজ হ‌য়ে‌ছে, তেলা‌পোকা ম‌রে‌ছে অ‌নেক। লোকটা‌কে অাবার কখনও পে‌লে খবরটা জানাতে হ‌বে। ভাব‌তে ভাব‌তেই ফেসবু‌কের একটা খব‌রে চোখ অাট‌কে গে‌ল। দু বছ‌রের এক শিশু‌কে ধর্ষণ শে‌ষে ছুঁ‌ড়ে দেয়া হ‌য়ে‌ছে ছ তলার ছাদ থে‌কে। রাস্তায় প‌ড়ে অা‌ছে শিশু‌টির রক্তাক্ত, থেঁতলে যাওয়া মৃত‌দেহ। বীভৎস। মুহূ‌র্তে সেঁজু‌তির মুখটা ভে‌সে উঠল ম‌নে। এই এক যন্ত্রণা হ‌য়ে‌ছে তার। যে কো‌নো খারাপ খব‌রেই সেঁজু‌তি‌কে নি‌য়ে ভয় হয়। বুক কাঁ‌পে শঙ্কায়। মা সম্ভবত এজন্যই বল‌তেন, এখন বুঝ‌বি না, মা হ‌লে বুঝ‌বি মা‌য়ের কী জ্বালা!
তখন হাসত পিউ। তা‌চ্ছি‌ল্যে উ‌ড়ি‌য়ে দিত মা‌কে। কিন্তু এখন! নাহ। সময়টা খারাপ যা‌চ্ছে খুব। ফেসবুক থে‌কে বে‌রো‌বে স‌বে, ঠিক তখনই অা‌রেকটা নিউ‌জে দমবন্ধ হ‌য়ে এ‌লো তার। নবজাত এক শিশু‌কে উঁচু বি‌ল্ডিয়ের কো‌নো এক বাথরু‌মের জানালা দি‌য়ে ছুঁ‌ড়ে ফেলা হ‌য়ে‌ছে রাস্তায়। রাস্তায় ছিট‌কে প‌ড়ে‌ছে শিশু‌টির না‌ড়িভূঁ‌ড়ি, মগজ। একতাল রক্ত-মাংস ছ‌ড়ি‌য়ে অা‌ছে রাস্তাজু‌ড়ে। অার নি‌তে পারল না পিউ। উ‌ঠে গি‌য়ে বে‌সি‌নে বমি করল হড়হড়। মাথা ঘুর‌ছে রী‌তিমত। বাথরু‌মে ঢু‌কে ঠান্ডাজ‌লে অ‌নেকক্ষণ শাওয়ার নিল সে। সদ্য বি‌দেশ থে‌কে সুম‌নের অানা শ্যাম্পু দিল চু‌লে, সা‌থে ক‌ন্ডিশনার। সাবান, শ্যাম্পু অার ক‌ন্ডিশনা‌রের ত্রিভূজ স্মে‌ল মি‌লে দারুণ একটা সুবাস ছড়া‌ল বাথরু‌ম জুড়ে। প্র‌তি‌দি‌নের ম‌তোই ভয়ঙ্কর সব খব‌রের রেশ একস্না‌নে মু‌ছে ফে‌লে ফুরফু‌রে মেজা‌জে বের হ‌লো পিউ। হেয়ার ড্রায়া‌রে চুল শুকাে‌তে শু‌কো‌তে অাড়‌চো‌খে ঘ‌ড়ি দেখল। রিব‌ন্ডিং করা চু‌লের অ‌নেক হ্যাপা। এক‌দিন অযত্ন ক‌রেছ তো ঝর‌তে শুরু কর‌বে বৃ‌ষ্টির ম‌তো। সাবধা‌নে চিরু‌নি চালা‌লো চু‌লে। অন্যহাত মু‌খে রুজ মাখ‌তে ব্যস্ত। কামা‌লের সা‌থে এপ‌য়েন্ট‌মেন্ট কাঁটায় কাঁটায় দেড়টায়। এখন স‌বে বা‌রোর কাঁটা ছুঁ‌য়ে‌ছে ঘ‌ড়ি। তবু অা‌গে অা‌গে বে‌রো‌তে হ‌বে। ঢাকা শহ‌রের জ্যা‌মের কো‌নো মা-বাপ নেই। ইন্টারক‌মে ড্রাইভার‌কে গা‌ড়ি বের কর‌তে ব’‌লে চো‌খে কায়দা ক‌রে মাশকারা অার অাইশ্যা‌ডো লাগা‌লো পিউ। চো‌খের নি‌চে কা‌লি পড়‌ছে ইদানীং। দু পা‌শে হালকা ভাঁজ। বির‌ক্তি‌তে চোখ কুঁচ‌কে ফেলল পিউ। ভাঁজটা তা‌তে গাঢ় হ‌লো অারও। বয়স কামড় বসা‌চ্ছে চেহারায়। অাটকা‌তে হ‌বে। ডা‌বের জল অার টক দই‌য়ের প‌রিমাণ বাড়া‌তে হ‌বে অারও। ঠোঁট কাম‌ড়ে ভাবল ম‌নে ম‌নে। গা‌ড়ি‌তে ব‌সে কামা‌লের মনস্তত্ব বোঝার চেষ্টা করল সে। কী চাই‌ছে অাস‌লে কামাল তার কা‌ছে? তার বস। অ‌ফি‌সের বাই‌রে এটা প্রথম এপ‌য়েন্ট‌মেন্ট তা‌দের। তার প্রথম এপ‌য়েন্ট‌মেন্ট ছিল বছর তি‌নেক অা‌গে, দ্বিতীয় প্র‌মোশ‌নের ঠিক অা‌গের হপ্তায়, পুর‌নো ব‌সের সা‌থে। প্রথম প্র‌মোশনটা পে‌তে ঢের দে‌রি হ‌য়ে‌ছিল পিউ‌য়ের, দ্বিতীয়টাও হ‌বে, হ‌চ্ছে ক’‌রে ক‌’রে শেষতক হ‌য়ে উঠ‌ছিল না অার। অা‌গের বস অবশ্য এপ‌য়েন্ট‌মে‌ন্টের কথা তা‌কে ব‌লে‌নি কখনও, তার ক‌লিগ ম‌নিকা, রাকা‌দের না‌কি ব‌লে‌ছিল শোনা যায়। হাওয়ায় তেমন কিছু কথা ভে‌সে বেড়া‌চ্ছিল সে সময়, তা‌দের প্র‌মোশনও হ‌চ্ছিল তরত‌রি‌য়ে, শুধু পিউ অার তার ম‌তো গাড়ল কজন এ‌গো‌চ্ছিল কচ্ছ‌পের গ‌তি‌তে। ম‌নিকা‌দের তিনটে প্র‌মোশ‌নের জায়গায় তা‌দের কারও একটা কারও বা তাও নয় নি‌য়েই সন্তুষ্ট থাক‌তে হচ্ছিল। তারপর হুট ক‌রেই অা‌গের বস ডে‌কে পাঠাল এক‌দিন। ম‌নিকা, রাকা অার বাকী ক‌লিগ‌দের বাঁকা হা‌সি মা‌ড়ি‌য়ে সেও প্র‌মোশন পে‌য়ে‌ছিল সেবার হপ্তাখা‌নে‌কের মাথায়। কীভা‌বে, সেটা নি‌য়ে ধোঁয়াশা ছিল অ‌ফিস জু‌ড়ে। সে ধোঁয়াশা কাটার অা‌গেই তখনকার বস অন্য এন‌জিও‌তে জ‌য়েন ক‌রে‌ছিল অ‌নেক বে‌শি স্যালা‌রি‌তে। নতুন বস অর্থাৎ কামাল জ‌য়েন করার সা‌থে সা‌থে ধামাচাপা প‌ড়ে গে‌ছিল পিউ‌য়ের প্র‌মোশন প্রসঙ্গ। পিউও কুলুপ এঁ‌টে‌ছিল মু‌খে। ব‌সের সা‌থে কী কথা হ‌য়ে‌ছিল তার, অত ত্ব‌রিৎ প্র‌মোশ‌নের শা‌নে নুযুলই বা কী ছিল, সে নি‌য়ে য‌দিও কল্পনার ডানা উড়া‌তে চে‌য়ে‌ছিল বাকীরা, কিন্তু পিউ‌য়ের ক‌ঠিন মৌনব্র‌তে তারা সে চেষ্টায় ইস্তফা দি‌য়ে‌ছিল অগত্যা। গতকাল কামা‌লের কথায় য‌থেষ্ট রহ‌স্য ছিল। খোলাসা ক‌রেনি কিছু অাজ‌কের বিষ‌য়ে।
সাবধা‌নে অায়নাটা বের ক‌রে নি‌জে‌কে দে‌খে নেয় পিউ। টিপটা ঠিক ক‌রে, লিপ‌স্টিকটা ঠোঁট দি‌য়ে চে‌পে নেয় অা‌রেকবার। ম‌নে ম‌নে মি‌লি‌য়ে নেয় হি‌সেবটা। এখন পর্যন্ত বস হি‌সে‌বে কামাল‌কে মন্দ লা‌গে‌নি তার। কো‌নোরকম বে‌হি‌সে‌বি অাচরণও চো‌খে প‌ড়ে‌নি অাজ পর্যন্ত। তাহ‌লে এই এভা‌বে তার সা‌থে অফ ডে তে রী‌তিম‌তো অা‌য়োজন ক‌’রে ‌দেখা করার কারণ কী হ‌তে পা‌রে! যেখা‌নে এসাইন‌মেন্টটা তা‌কে বু‌ঝি‌য়ে দেওয়া গে‌ছে অ‌ফি‌সেই!
গা‌ড়ি‌তে অাচমকা ব্রেক করায় ভাবনার সু‌তোটা ছিঁ‌ড়ে গেল পিউ‌য়ের। ছোট্ট এক শিশু, সাত কী অাট হ‌বে বয়স, দৌ‌ড়ে রাস্তা ক্রস কর‌ছে, অা‌রেকটু হ‌লেই চাপা পড়ত তারই গা‌ড়ির নি‌চে।
ড্রাইভার বির‌ক্তি‌তে খি‌স্তি শুরু ক‌রে ভিউ মির‌রে ‌চোখ রে‌খে পিউ‌য়ের চোখে চোখ পড়‌তেই দাঁ‌তে জিব কে‌টে থে‌মে গেল। সাম‌নে চোখ রে‌খে ব্যাখা দেওয়ার সু‌রে বলল, পোলাডা চোর ম্যাডাম। রাস্তার এই পাশের এক ম‌হিলার হাত থেইকা মোবাইল কাইড়া নি‌য়া পলাইল। অা‌রেকটু হইলেই গা‌ড়ি চাপা পড়ত। অবশ্য এ‌গোর ট্রে‌নিং অা‌ছে। এরা এত সহ‌জে মইরব না।
‌সেঁজু‌তির মুখটা অাবার ভে‌সে উঠল চো‌খের সাম‌নে। ছে‌লেটা সেঁজু‌তির বয়‌সী। অথচ… কপাল কুঁচ‌কে সাম‌নে তাকাল পিউ। বির‌ক্তির এক‌শেষ। রাস্তা ব্লক ক‌রে রাজ‌নৈতিক বক্তৃতা চল‌ছে। কতক্ষ‌ণে শেষ হ‌বে কে জা‌নে! ড্রাইভার‌কে সাবধা‌নে গা‌ড়ি পেছন কে‌টে ঘু‌রি‌য়ে নি‌য়ে বিকল্প পথ খুঁজ‌তে বলল পিউ। কামা‌লের সা‌থে এপ‌য়েন্ট‌মেন্টটা সময়ম‌তো সার‌তে চায় সে। সুম‌নের অনুপ‌স্থি‌তি‌তে সেঁজু‌তি‌কে একটু বে‌শি সময় দি‌তে হ‌বে। অন্য‌দিনগু‌লো‌তে ভীষণ ব্যস্ত থা‌কে তারা দুজনই। ছুটির দিনগু‌লো‌তে মে‌য়েটা‌কে সময় দেয়া উচিত, যতটা সম্ভব।
অ‌ফি‌সের এই বাং‌লো বাড়িটা নির্জন। সচরাচর ব্যবহৃত হয় না। দে‌শের বাই‌রে থে‌কে ডোনার এ‌লে, কিংবা খুব জরুরী কো‌নো মি‌টিং পড়‌লে, এখা‌নে অা‌য়োজন করা হয়। ছুটির দিন ব’‌লে দা‌রোয়ান ছাড়া অার কাউ‌কেই দেখা গেল না। পিউ তরত‌রি‌য়ে উ‌ঠে গেল দোতলায়। ব‌সের রু‌মে নক কর‌তেই ভেতর থে‌কে গম্ভীর, মৃদুস্বর ভে‌সে এ‌লো, ভেত‌রে অাসুন!
সাচ্ছ‌ন্দ্যে ভেত‌রে গেল পিউ। বসল চেয়ার টে‌নে। তা‌দের অ‌ফি‌সে কাউ‌কে স্যার ব’‌লে তোয়াজ করার নিয়ম নেই। ভাইয়া, অাপু ব’‌লে কাজ চালায় তারা। কামা‌লের মু‌খোমু‌খি ব‌সে সোজা তার মু‌খে চোখ রাখল পিউ। জিজ্ঞাসু চো‌খে তা‌কাল। কামাল ল্যাপটপ থে‌কে চোখ তু‌লে অানম‌নে তাকাল একবার। অাবার চোখ রাখল স্ক্রি‌নে। অাপনার রি‌পোর্টটা দেখ‌ছি পিউ। ফ্রেমটা মন্দ দাঁড় করান‌নি, ত‌বে খাট‌তে হ‌বে অারও। ম‌নে রাখ‌বেন অাপনার ভাবনাটা ইউ‌নিক হ‌তে হ‌বে। প্রে‌জে‌ন্টেশনটা দে‌খেই যেন ম‌নে হয় যে অাপ‌নি গতানুগ‌তিক চিন্তা-চেতনায় প্রভা‌বিত নন। অা‌মি মোটামু‌টি অাপনা‌দের সবার প্রোফাইল স্টা‌ডি ক‌রে‌ছি। অাপনা‌কে এ কা‌জের যোগ্য ম‌নে হ‌য়ে‌ছে অামার। অাশা ক‌রি অাপ‌নি অামা‌কে হতাশ কর‌বেন না পিউ। অাফটার অল অাপনার ব্যাকগ্রাউন্ডটা এই প্রে‌জে‌ন্টেশ‌নের বিষয়বস্তুর সা‌থে ম্যাচ ক‌রে।
অামা‌কে যোগ্য ম‌নে করায় ধন্যবাদ ভাইয়া। অা‌মি প্রাণপণ চেষ্টা কর‌ছি প্রে‌জে‌ন্টেশনটায় একটা ব্য‌তিক্র‌মি টাচ অানার। এ ক্ষে‌ত্রে অাপনার সহ‌যো‌গিতা অাশা করব।
স্মার্ট‌লি উত্তর দিল পিউ। ভুরু কুঁচ‌কে পিউ‌য়ের চো‌খে চোখ রে‌খে কিছু একটা ভাবল কামাল। খুঁজল হয়ত কিছু। নিচু, অন্যমনস্ক ক‌ণ্ঠে বলল, অা‌মি অন্য কা‌জে ব্যস্ত থাকব পিউ। কাজটা অাপনা‌কে দি‌য়ে‌ছি, নি‌জে‌কে প্রমাণ করার দা‌য়িত্বটা অাপনার। অাশা ক‌রি বু‌ঝে‌ছেন।
‌জ্বি ভাইয়া, অবশ্যই। তবু প্র‌য়োজ‌নে অাপনার সা‌জেশান চাইব।
‌পিউ‌য়ের অাহ্লা‌দি সু‌রে হে‌সে ফেলল কামাল। দায়সারাভা‌বে, অাচ্ছা, দেখা যা‌বে, ব’‌লে মা‌ছি তাড়া‌নোর ভ‌ঙ্গি করল সে। প্রে‌জে‌ন্টেশ‌নের অা‌দ্যোপান্ত নি‌য়ে লম্বা একটা বক্তৃতা দিল। পিউ‌য়ের অ‌স্তিত্ব পু‌রোপু‌রি উ‌পেক্ষা ক’‌রে, অথবা ভু‌লে গি‌য়ে, টানা ব‌কে গেল। কথা শেষ ক‌রে পিউ‌য়ের মু‌খে স্থির চোখ রে‌খে বলল, এবার অাপনার কিছু প্রশ্ন থাক‌লে করুন। -ব‌লেই অাড়‌চো‌খে ঘ‌ড়ি দেখল কামাল। ঈ‌ঙ্গিতটা প‌রিষ্কার। তোয়াক্কা না ক’‌রে নি‌জের ম‌নে জমা প্রশ্নগু‌লো এ‌কে এ‌কে ক’‌রে গেল পিউ। যথাসম্ভব গু‌ছি‌য়ে, সং‌ক্ষে‌পে উত্তর দিল কামাল। দুঃ‌খিত পিউ, অামাকে জরুরী একটা মি‌টিং এ‌টেন্ড কর‌তে হ‌বে বি‌কেল নাগাদ। অার সময় নেই হা‌তে, উঠ‌তে হ‌চ্ছে এবার, ব’‌লে উ‌ঠে দাঁড়াল সে। অফ ডে তে অাপনা‌কে বের হ’‌তে হ‌লো ব‌লে স‌রি। অাশা ক‌রি কিছু ম‌নে ক‌রেননি।
না না ভাইয়া, এটা তো অামারই প্র‌য়োজ‌নে। কিছু ম‌নে ক‌রার প্রশ্নই নেই, -বল‌তে বল‌তে রুম থে‌কে বের হ‌য়ে দরজার বাই‌রে গি‌য়ে দাঁড়াল পিউ। ততক্ষ‌ণে দ্রুতহা‌তে দরজা লক ক‌রে সিঁ‌ড়ি পর্যন্ত এ‌গি‌য়ে গে‌ছে কামাল। সিঁ‌ড়ি ভাঙতে ভাঙ‌তে কামাল বলল, অাপনা‌কে কি ড্রপ কর‌তে হ‌বে পিউ? যে‌তে পার‌বেন একা?
‌হে‌সে ফেলল পিউ। এইসব লোক দেখা‌নো ভদ্রতায় ভা‌রি হা‌সি পায় তার। অামার সা‌থে গা‌ড়ি অা‌ছে ভাইয়া, চিন্তা কর‌বেন না, ব’‌লে কামাল‌কে পাশ কা‌টি‌য়ে তরত‌রি‌য়ে নে‌মে গেল পিউ। রাস্তায় বের হ‌য়ে শ্বাস নিল প্রাণভ‌রে। গতবা‌রের ম‌তোই এবারও অ‌ফি‌সে কল্পনার শাখাপ্রশাখা গ‌জি‌য়ে যা‌বে বিস্তর। ভে‌বে ম‌নে ম‌নে অারও এক‌চোট হাসল সে। ড্রাইভা‌রের খু‌লে দেয়া দরজা গ’‌লে গা‌ড়ি‌তে উ‌ঠে অা‌য়েশ ক‌রে ব‌সে চোখ বুঁজল নি‌শ্চি‌ন্তে। গুনগু‌নি‌য়ে উঠল অানম‌নে, অা‌মি খোলা জানালা, তু‌মি ঐ দ‌খিনা বাতাস… সকাল অ‌ব্দি গানটা অাজ পে‌য়ে ব‌সে‌ছে তা‌কে। ম‌নের ম‌ধ্যে সেঁজু‌তির মুখটা হুস ক’‌রে ভে‌সে উঠল অাবার। সুমন দে‌শের বাই‌রে। দ্রুত বাসায় ফির‌তে হ‌বে তা‌কে। বির‌ক্তি‌তে চোখ মে‌লে রাস্তার জ্যাম অার কোলাহ‌লে অ‌স্থির হ‌য়ে উঠল সে।
‌ঠোঁট কাম‌ড়ে তবু ব‌সে থা‌কল স্থির। গন্তব্য ঠিক এ‌সে যা‌বে, জা‌নে পিউ। বহুল প্রত্যা‌শিত প্র‌মোশন অার প‌নে‌রো দি‌নের জাপান ট্যু‌রের ম‌তোই সম‌য়ের ক্ষ‌ণিক ব্যবধা‌নে নাগা‌লে অাস‌বে সমস্ত সুন্দর। প্রত্যাশায় চক‌চক ক’‌রে ও‌ঠে শ্যা‌ডো, মাশকারার প্র‌লেপের অাড়া‌লে পিউ‌য়ের ডাগর চোখ। অাগামী‌কাল তা‌কে অার বস‌কে নি‌য়ে অ‌ফি‌সে ফিস‌ফিসা‌নির হাওয়া গা‌য়ে এ‌সে লা‌গে এখনই। বিদ্রু‌পের হা‌সি‌তে ভ‌’রে ও‌ঠে ঠোঁট।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!