আড়চোখে রোশনিকে দেখল আলেয়া। কোনোদিকে হুঁশ নাই মেয়ের। নিবিষ্ট মনে লিপস্টিক লাগাচ্ছে ঠোঁটে। চোখ আয়নায়। সরাসরি তার দিকে না তাকিয়ে আয়নায় চোখ রাখল আলেয়া। বাপের মতো দেখতে হয়েছে মেয়েটা। অবিকল। মেয়ে বাপের মতো দেখতে হলে ভাগ্যবান হয়, সুখ মেলে কপালে, দাদি গহরজান বলত আলেয়াকে। তাকে বুকের কাছে নিয়ে চুমু দিত আর একথা বলত বুড়ি। বাপের মতো দেখতে হওয়ায় বুড়ি আলেয়াকে আদর করত খুব। মৃত ছেলের ছায়া আলেয়ার মুখে দেখে বড় খুশি হতো গহরজান। বুড়ির কথায় আলেয়ারও আস্থা ছিল তখন। ভবিষ্যতের সুখ আর সৌভাগ্য কল্পনা করে স্বপ্নে বিভোর হতো সে তখন। এখন সেসব ভেবে দীর্ঘশ্বাস ফেলে আলেয়া। কী বোকামি চিন্তাই না করত তখন। সৌভাগ্যের ছিটেফোঁটাও ধরাছোঁয়ার বাইরে থাকল তার। সুখ তো আরো বহুদূর। তবু রোশনির মুখের দিকে তাকিয়ে বহুদিন বাদে দাদি গহরজানকে মনে পড়ল আলেয়ার। মনে পড়ল রোশনির বজ্জাত হাড়হাভাতে বাপটাকেও। রোশনির জন্মের পর সেই যে বউ আর সদ্যজাত মেয়ে ফেলে লাপাত্তা হল লোকটা, আর এ তল্লাট কখনও মাড়ায়নি সে। আবার বিয়ে করে সংসার পেতেছে বদমাস লোকটা, লোকমুখে তেমন খবরও পৌঁছেছে আলেয়ার কানে। করুক বিয়ে, পাতুক সংসার। ওসবে কিচ্ছু যায় আসে না আর আলেয়ার। বজ্জাত লোক ছিল রোশনির বাপ, ছোঁকছোঁকানি স্বভাব ছিল খুব। আলেয়ার সাথে বনত না মোটেই। তারচে এই বরং বেশ আছে সে। নিশ্চিন্ত, নির্ভার। জগতে লুচ্চা মানুষ পাহারা দেয়ার মতো অসম্ভব কাজ আর নাই। লোকটাকে নিয়ে অশান্তির শেষ ছিল না তার। আপদ গেছে। আয়নায় পড়া রোশনির ছায়ার দিকে তাকিয়ে আনমনে লোকটাকে ভাবছিল আলেয়া। হঠাৎই সেদিকে চোখ গেল রোশনির। আয়নার ভেতর দিয়ে তার দিকে তাকিয়ে আছে মা, দেখে খানিকটা লজ্জা পেল সে। লাল হয়ে উঠল মুখ। আলেয়া চোখ সরিয়ে নিল তখন তখনই। অন্যদিকে চোখ রেখে বলল, ব্যাপার কী? সাজনগোজনের খুব ঘটা দেখতাছি যে আইজ? কই যাইবা এই সাতসকালে?
সাজনগোজন কই দেখলা তুমি? ঠোঁটে লিপস্টিক লাগাইলেই সাজনগোজন করা হইয়া যায়? -ঠোঁটমুখ বাঁকিয়ে মুখ ঝামটা দিল রোশনি।
রোশনির কথায় নড়েচড়ে বসল আলেয়া। এতকাল চুল সিঁথি কেটে বেনী করা, ঠোঁটে লিপস্টিক, আর চোখে কাজল মাত্রকেই সাজুগুজু জেনে এসেছে সে। মেয়ে যে আজ উল্টো গীত গায়!
তাইলে সাজনগোজনডা কী? -কণ্ঠে বিদ্রুপ ঢেলে প্রশ্ন করে আলেয়া।
মুখে মেকাপ লাগাইছি? চোখে মাশকারা, আই শ্যাডো কিছু দিছি? গয়না পরছি? সাজনগোজন দেখলা কোথায় কও দেখি! -এক নিঃশ্বাসে কথাগুলো শেষ করে কড়া চোখে মার দিকে তাকাল রোশনি। হাসি পেল আলেয়ার। হাসতে হাসতে রোশনির পাশে গিয়ে বসল সে। আয়নার ভেতরের রোশনিকে দেখতে দেখতে বলল, হ, এইগুলা কিছু না কইরাই আমার মাইয়াডারে আকাশের চাঁন লাগতাছে পুরা। লাগাইলে না জানি কেমন লাগব তারে! তা এই সাত সকালে যাইবা কই তুমি?
কলেজে যামু। কাম আছে। একজনের থিকা নোট নিতে হইব। পরীক্ষায় লাগব।
আইবা কখন?
আইতে আইতে বিকাল পড়ব। দুপুরে বাইরে খামু। তুমি খায়া নিও।
কাঁধে ব্যাগ ফেলে হেলতে দুলতে চলে গেল রোশনি। সেদিকে তাকিয়ে অজানা কী এক আশঙ্কায় টলকে উঠল আলেয়া। পুরোনো দিনের স্মৃতি ভেসে উঠল মনে। রোশনির বাপ তখন তাগড়া জোয়ান। মন মজেছিল অতঃপর। লোকটাও আলেয়ার প্রেমে দিওয়ানা ছিল তখন। কত যে পিরিতির আলাপ জমাত। যেন আলেয়া ছাড়া ভুবন অন্ধকার তার, দিন-দুনিয়া আন্ধাইর। একদিন দেখা না হলে এমন তড়পাত, যেন জল থেকে ডাঙায় তোলা মাছ। প্রেমের নেশায় আলেয়াও প্রশ্রয় দিয়েছিল তাকে। বাপ-মার নিষেধের বেড়ি ভেঙে আগুনে ঝাঁপ দিয়েছিল সে, পাখা গজানো পতঙ্গপ্রায়। অতঃপর পুড়ে মরেছিল পাখাসমেত। অল্প কিছুদিন যেতে না যেতেই আলেয়া স্বরূপ চিনেছিল রোশনির বাপের। মৌ লোভী মাছি ছিল লোকটা। এ ফুল থেকে ও ফুলে ওড়ার নেশা ছিল তার। এক আলেয়ায় মন ভরেনি, আরও বহু আলেয়ার নেশায় ছুটত সুযোগ পেলেই। সে কারও কাছে দায়বদ্ধ নয়, এক নারীতে বাঁধা থাকতে প্রতিজ্ঞাবদ্ধ নয় মোটেও, ইত্যাকার বহুবিধ যুক্তি দেখাত লোকটা। আলেয়াও অতিষ্ট ততদিনে। মন থেকে উবে গেছিল তার পিরিতের খায়েশ। লোকটার ছোঁকছোঁকানি অসহ্য হয়ে উঠছিল ক্রমশ। তেমন সময়ে রোশনি জন্মালো। মেয়ের জন্মের পর লোকটা ছুটল যেন লাগাম ছাড়া ঘোড়া। আলেয়াও তাকে আটকানোর চেষ্টা করেনি আর। ক্যান্সার পুষে রাখতে নেই, জানত সে-ও। বিশ্বাসঘাতক পুরুষের চে বরং বিশ্বস্ত কুকুর ভালো, নিজেকে প্রবোধ দিত আলেয়া। রোশনির মুখে লোকটার আদল স্পষ্ট। মেয়ের স্বভাবটা বাপের মতো না হলেই হয়। অবশ্য অধিকাংশ পুরুষই ভেতরে ভেতরে রোশনির বাপ। রোশনির বাপের রাখঢাক ছিল না, বাকীরা ভেজাবেড়াল টাইপ। মাছ খায়, মুখে ‘উল্টাতে পারি না’ ভাব লঠকে রেখে আদর্শ স্বামী সাজে বউয়ের চোখে, সমাজের চোখে সাজে আদর্শ মানুষ। নিজের জীবন দিয়ে এসব জেনেছে আলেয়া। রেজাকেও দেখছে বহুদিন হল। একই মুদ্রা সব। এপিঠ ওপিঠ তফাৎ শুধু। রোশনিও তেমন কারও পাল্লায় পড়ল না তো! প্রেমে পড়েছে মেয়ে, মেয়ের ইদানীংকার হাবভাবে এটা স্পষ্ট বোঝে সে। ছেলেটা ডাক্তারি পড়ে, দেখতে শুনতেও বেশ। রোশনিকে আকারে ইঙ্গিতে বোঝানোর চেষ্টা করেছে আলেয়া, তেলে আর জলে কখনও মিশ খায় না। ও ছেলে নির্ঘাত রোশনিকে নিয়ে দিনকতক ফূর্তিফার্তা করবে তারপর উড়াল দেবে ডানা মেলে। ঠিক দেখেশুনে ভালো ঘর দেখে বিয়ে করে নেবে নিজের সমগোত্রীয় কাউকে। তার কী দায় পড়েছে আলেয়ার মতো আয়ার মেয়ে রোশনিকে বিয়ে করার, যে কিনা মাত্রই ভর্তি হয়েছে নার্সিং এ! কিন্তু রোশনির চোখে ঝলমলে রঙিন চশমা এখন। আলেয়ার কথা কানেই তোলে না মেয়ে। ধুমসে প্রেম করে বেড়াচ্ছে ছেলেটার সাথে। আজও গেল ছেলেটার সাথেই দেখা করতে নোটের বাহানা দিয়ে। মেয়ের মুখের দিকে তাকিয়েই সেটা বুঝেছে আলেয়া। কিন্তু কী-ই বা করার আছে তার। মেয়ে তো ছোটটি নেই এখন। ভালো-মন্দ বুঝতে শিখেছে, ডানা গজিয়েছে তারও। তাছাড়া এসব ক্ষেত্রে বাধা দিতে গেলে বাঁধন বরং আলগা হয় আরও, আপন অভিজ্ঞতা থেকেই এ কথা শিখেছে আলেয়া। সে তাই সবকিছু ছেড়ে দিয়েছে সময়ের হাতে। সময় বড় আশ্চর্য দাওয়াই। রোগ বুঝে সারিয়ে তোলে যে কোনো ক্ষত, মোক্ষম সমাধান দেয় যে কোনো সমস্যার। আলেয়া তাই অপেক্ষা করে চুপচাপ। তাছাড়া শরীর নিয়ে অত শূচিবাই বাতিকও নাই তার। যা করে করুক রোশনি, কোনো উটকো ঝামেলা না বাধালেই হল। আর কেউ একজন বিশ্বাস ভেঙে চম্পট দিলেই অন্যসব মেয়েদের মতো হেঁদিয়ে মরবে না রোশনি। ঘুরে দাঁড়াবে, ঠিকই খুঁজে নেবে নিজের পথ।
মায়ের কাছ থেকে আর কিছু না পেলেও ঘুরে দাঁড়ানোর লড়াকু ইচ্ছেটুকু অন্তত পেয়েছে সে। রোশনির চলে যাওয়া পথের দিকে তাকিয়ে এটা ভেবে বড় একটা স্বস্তির শ্বাস ছাড়ে আলেয়া। তবু মনের কোনো এক কোণে কী যেন এক অমূলক শঙ্কা কাঁটা হয়ে বিঁধে থাকে তার। কোথায় ঠিক ঠাওর করতে পারে না সেটা কিন্তু কাঁটার অস্তিত্ব স্পষ্ট টের পায় আলেয়া। কেমন টলকে ওঠে মন।