সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে শিল্পী নাজনীন (পর্ব – ১৮)

বেনু মশলাঘর

রেজার যখন জ্ঞান ফিরল তখন মাঝরাত্তির প্রায়। তার নিজের অবশ‍্য সেসব বোঝার মতো অবস্থা নয় তখন। যেন বহুকাল ঘুমিয়ে ছিল সে, বহুজনম বাদে তাকাল চোখ মেলে, তেমন একটা বোধ নিয়ে জেগে উঠল। ঘুমের ওষুধের প্রভাবে সব কেমন অনিত‍্য মনে হল তার। ঘোর লাগা। সব কেমন ঝাপসা দেখাল চোখে। ঘোলাটে। মনে করার চেষ্টা করল কোথায় আছে সে। কোথায় ছিল। মনে পড়ল না কিছুই। শুধু হলুদ একজোড়া আলো মনে পড়ল। মনে পড়ল হলুদ একজোড়া আলো ধেয়ে আসছিল তার দিকে। সে শুয়ে ছিল খোলা আকাশের নিচে। আর তখন একজোড়া হলুদ আলো ধেয়ে আসছিল বিপুল গতিতে। চোখ বন্ধ করে ঘুমিয়ে পড়ার আগে মাকে মনে পড়েছিল তার। মা তাকে বুকের ভেতর টেনে নিতে নিতে বলছিল, ভয় নাই সোনা। আছি। আমি আছি।
তারপরই প্রবল ঘুমে তলিয়ে গেছিল রেজা। কিন্তু সে কেন অমন খোলা আকাশের নিচে শুয়েছিল? মা-ই বা কোত্থেকে আসলো হঠাৎ তখন? ভাবনাটা মাথায় উঁকি দিল হুট করে। প্রশ্নের উত্তর খুঁজতে খুঁজতেই কড়া ঘুমের ওষুধের প্রভাবে গভীর ঘুমে সে তলিয়ে গেল আবার।
ফের ঘুম ভাঙল তীব্র অবসাদ আর ক্লান্তি নিয়ে। মাথাটা ভারী লাগল ভীষণ। চোখ খুলে তাকাল সে ধীরে ধীরে। প্রথমটায় অচেনা লাগল সব। দিন না রাত, সেটা ঠাওর করার চেষ্টা করল ফের চোখ বুঁজে। দূরে, অনেক দূরে কারা যেন কথা বলছে, শুনতে পেল সে। কারা যেন মৃদুস্বরে কথা বলছে কানে এল তার। কান পাতল রেজা।
জ্ঞান ফিরছে – কে যেন বলল কথাটা।
হু। তোর আশিকের জ্ঞান না ফিরে পারে! যেখানে স্বয়ং মাদার তেরেসা তার সেবায়! -এবারের কণ্ঠটা তরল, তাতে হাসি মিশে আছে।
হারামজাদি! ফাজলামি করার আর জায়গা পাস না, না? একটা লোক অসুস্থ হয়ে পড়ে আছে, জীবন-মরণ সমস্যা। কোথায় তার জন‍্য দোয়া করবি তা না, আছিস ফাজলামি নিয়ে। -ফিসফিস কণ্ঠটা কথাগুলো বলে গেল দ্রুতলয়ে। ফিসফিসে কণ্ঠটা চেনা মনে হল রেজার। মনে হল কোথায় যেন শুনেছে আগে। কোথায়, মনে করতে পারল না সহসা। সে কান পাতল আবার। অন‍্য কণ্ঠে হাসি জোরালো হল এবার। বলল, উ মা গো! কেয়ারানীর কেমন দয়ার শরীর দেখ! কে একজন অসুস্থ পড়ে আছে, আর তিনি তার জন‍্য কেঁদে বুক ভাসাচ্ছেন একেবারে! কেন রে হারামি, এত যে রোগী আসে রোজ, কই তখন তো এমন শুকনো মুখে দোয়া চেয়ে বেড়াও না তুমি সবার কাছে!

আহ কণা! কী ছেলেমানুষী করিস সবসময়! লোকটা আমাদের মেডিকেলের একজন স্টাফ। তার জন‍্য দোয়া চাওয়া যায় না? -ধমকে উঠল ফিসফিসে কণ্ঠটা। নামটা জানা গেল তার। কেয়া। অন‍্যজন কণা। মনে পড়ল রেজার। কিন্তু কেয়া এখানে কী করছে? আর এ জায়গাটাই বা কোথায়? বোঝার চেষ্টায় সে ভালোভাবে তাকাল চারপাশে। ছোট্ট একটা রুম। তার বিছানা-লাগোয়া স্টান্ডদুটোর দু পাশে দুটো ব‍্যাগ ঝুলছে। একটাতে স‍্যালাইন, অন‍্যটাতে রক্ত। তার মানে হাসপাতাল। সে শুয়ে আছে হাসপাতালের বেডে। সারা শরীরে এবার ব‍্যথা টের পেল রেজা। নাড়াতে গিয়ে বুঝল একহাতে রক্ত যাচ্ছে তার অন‍্যহাতে স‍্যালাইন। কিন্তু কী এমন হয়েছে তার যাতে এত আয়োজন তাকে নিয়ে? ভাবল রেজা। ভাবতে গিয়ে ঝাপসা মনে পড়ল তার। কোথাও যাচ্ছিল সে। মাঝে শরীর খারাপ লাগছিল ভীষণ। নেমেছিল কিছুক্ষণের জন‍্য। কারা যেন বসেছিল তার গাড়িতে। তারা হঠাৎ ডাকল তাকে। সম্ভবত তাদের দেরি হয়ে যাচ্ছিল। তাদের ডাকে নিজেকে কিছুটা সামলে নিয়ে রাস্তা পার হচ্ছিল সে। তারপর মাথার ভেতর আলো জ্বলে উঠল দ্রুত। হলুদ একজোড়া আলো ছুটে আসছিল তীব্র গতিতে। মা তাকে ডাকছিল। জড়িয়ে নিচ্ছিল বুকের ভেতর। তারপর অন্ধকার সব। ঝিঁঝির ডাকের মতো বিরক্তিকর শব্দ ছাড়া কানের কাছে আর কোনো শব্দ নেই এরপর থেকে। কথোপকথন লক্ষ্য করে মাথা ঘুরিয়ে সেদিকে তাকানোর চেষ্টা করল রেজা। ব‍্যথা। যেন সূঁচ ফুটছে শরীরে। দাঁতে দাঁত চেপে ব‍্যথাটা হজমের চেষ্টা করল রেজা। যতটা সম্ভব ঘাড় ঘুরিয়ে তাকিয়ে দুর্বল গলায় প্রশ্ন করল, কী হয়েছে আমার? আমি এখানে কেন?
নিজেদের মধ্যে আলাপে ব‍্যস্ত ছিল কণা আর কেয়া। রেজার কণ্ঠে চমকে তাকাল দুজনই। কণা তাকিয়ে থাকল চুপ করে। কথা বলল কেয়া। সহজ, স্বাভাবিক গলায় বলল, আপনি আরেকটু হলে ট্রাক চাপা পড়ে পটল তুলতে যাচ্ছিলেন। অল্পের জন‍্য এবারের মতো আপনার পটল তুলতে যাওয়াটা পিছিয়ে গেছে। পরের বারের জন্য প্রস্তুতি নিতে থাকুন। -কেয়ার কথাটা মাথায় ঢুকল না ঘোরগ্রস্ত রেজার। ওষুধের ঘোরে তখনও বোধ অনেকটাই এলোমেলো তার।কোথায় পটল তুলতে যাচ্ছিল সে, অত পটল দিয়ে সে করবেই বা কী, প্রশ্নটা মনে উদয় হল সহসা। কেয়ার কথায় হিহি হাসল কণা। রেজার কেমন ঝাপসা লাগল সব আবার। ক্লান্তিতে চোখ বন্ধ করল সে। ঘুমিয়ে পড়ল ফের।
আবার যখন ঘুম ভাঙল তখন ঘড়ির কাঁটা সাড়ে পাঁচটা ছুঁই ছুঁই, ভিজিটিং আওয়ার। চোখ খুলে কেবিনের দেয়ালে ঝুলানো ঘড়িতে সময় দেখল রেজা।মাথাটা খানিক হালকা লাগল আগের চে। পাশ ফেরার চেষ্টা করল। পারল না। ব‍্যথা। ঘরের ভেতরটায় চোখ বুলাল। নেই। কেয়া বা কণা কেউ নেই। চলে গেছে কোন ফাঁকে, টের পায়নি রেজা। মাথার দিকে তাকানোর চেষ্টা করল ঘাড় ঘুরিয়ে। প্রবল ব‍্যথা ছড়িয়ে গেল শরীরে। তার মধ‍্যেই শফিকুলকে দেখতে পেল রেজা। টুল পেতে বসে ঝিমাচ্ছে তার মাথার কাছে। ভিজিটিং আওয়ার চলছে, মনে পড়ল রেজার। কিন্তু মাথার কাছে এ সময় কাউকে প্রত‍্যাশা করে না রেজা। একদম না। শফিকুলকে তো আরও নয়। সংসারে শকুনি মামা বলতে যা বুঝায়, শফিকুলকে তারচে কম কিছু মনে করে না রেজা। মায়ের দিকের আত্মীয় বলতে কেউ ছিল না তার এই শফিকুল ছাড়া। মায়ের চাচাত ভাই। মার মৃত্যুর পর নিজের ভাসমান অবস্থায় কোনোদিন এই লোকটার ছায়া পর্যন্ত দেখেনি রেজা। কোনোদিন লোকটার কাছে ঠাঁই মেলেনি নিজের দুর্দিনে। আজকাল রেজার যখন পয়সার অভাব নেই আর, ভাগ্য যখন তার ততটা বিরুপ নয় আর তার প্রতি, তখন দুধের মাছির মতো কোত্থেকে প্রায়ই এসে হাজির হয় লোকটা। একথা সেকথা বলে নিজের অভাব অনটনের ফিরিস্তি বলে রেজার দয়া ভিক্ষা করে। লোকটার নাকি মালা নামে একটা মেয়ে আছে, তার সঙ্গে রেজার বিয়ের প্রসঙ্গ তোলে প্রায়ই। লোকটার হাতে দু চার পয়সা যা পারে গছিয়ে দিয়ে মাছি তাড়ানোর মতো তাড়িয়ে প্রতিবারই স্বস্তিতে হাঁফ ছাড়ে রেজা। কিন্তু লোকটা এখানে, এই হাসপাতালে কী করছে আর সে জানলই বা কী করে যে রেজা এখানে আছে, কিছুতেই সেটা বুঝে উঠতে পারল না রেজা। কিন্তু লোকটাকে দেখে বিরক্তির সীমা থাকল না তার।
হঠাৎ ঝট করে চোখ খুলল শফিকুল। রেজার চোখে চোখ পড়তেই অপ্রস্তুত হাসল। কৃত্রিম ধরা গলায় বলল, খবরটা শোনার পর থেকে আর স্থির থাকতে পারলাম না বাপু। ছুটে চলে আসলাম। তোমার মামী তো চিন্তায় অস্থির। মালাও কেঁদে খুন হচ্ছে সেই থেকে।
চোখ বন্ধ করল রেজা। লোকটার বকবকানি অসহ‍্য লাগছে। খবরটা কে দিল, প্রশ্নটা করতে গিয়েও করল না সে। শুয়ে থাকল চুপচাপ। গলা খাঁকারি দিল শফিকুল। একটু থেমে, খানিক আমতা আমতা করে বলল, তুমি তো একসিডেন্ট করে পড়ে আছ হাসপাতালে, অভিভাবকও আর কেউ নাই তোমার। টাকা-পয়সা কোথায় কেমন কী আছে, আমাকে বললে গোছগাছ করে রাখি। কখন কোথায় লাগে তোমার, বলা তো যায় না। কী বলো?
লোকটার ধান্দা বুঝে হাসি পেল রেজার। মনটা খারাপও হল একটু। লোকটা ভেবেছে রেজা বাঁচবে না আর। সে কারণে রেজার টাকা-পয়সার হিসাব পেতে চাইছে সে। কিন্তু লোকটাকে উত্তরসূরী কিংবা অভিভাবক কোনোটাই ভাবতে ইচ্ছে করল না রেজার। যতটা সম্ভব ধমকের সুরে বলল, আপনি চলে যান। এখানে আসবেন না আর। আমাকে এখানে দেখার লোক আছে অনেক। এ নিয়ে আপনাকে ভাবতে হবে না।
ভাবতে না চাইলেই কি পারা যায় রে বাপু! ভাবনা আপনাতেই এসে যায়। এখানে একলা আছ, যত্নআত্মির লোক নাই। এক কাজ করি, বাড়ি গিয়ে মালাকে পাঠিয়ে দেই। সে আসুক। কটা দিন তোমার সেবাযত্ন করুক। বুঝে নিক নিজের সব বিষয়-আশয়।
শফিকুলের কথায় ধৈর্য রাখা মুশকিল হল রেজার। চোখ বন্ধ করল ক্লান্তিতে। কড়া গলায় বলল, আপনি এখন যান। এখানে আর আসবেন না। কাউকে পাঠানোর দরকার নেই। আমার কাউকে প্রয়োজন নেই।
চোখ খুলল না রেজা। হতোদ‍্যম পায়ে বের হয়ে গেল লোকটা, পদশব্দে বুঝল। স্বস্তির শ্বাস ছাড়ল জোরে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।