গারো পাহাড়ের গদ্যে এস এম শাহনূর (পর্ব- ৬)

রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য পতিসর:

মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে,
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবার চাই’

বাংলা ভাষার এক হিমালয়প্রতিম ব্যক্তিত্ব রবীন্দ্রনাথ তাঁর অসংখ্য সাহিত্য কর্মের মাধ্যমে আজও বেঁচে আছেন।আজ আমরা তাঁর টুকরো টুকরো স্মৃতিতে হারিয়ে যাব দেড় হাজার বছর পূর্বের পুণ্ড্রবর্ধনখ্যাত (বগুড়ার)নওগাঁ জেলার আত্রাই উপজেলার নাগর নদের তীরে পতিসর কুঠিবাড়ির রবীন্দ্রভুবনে।

“বোট ভাসিয়ে চলে যেতুম পদ্মা থেকে কোলের ইছামতিতে, ইছামতি থেকে বড়ালে, হুড়ো সাগরে, চলনবিলে, আত্রাইয়ে, নাগর নদীতে, যমুনা পেরিয়ে সাজাদপুরের খাল বেয়ে সাজাদপুরে।” রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের ছিন্নপত্রাবলীর চিঠিপত্রে শিলাইদহ থেকে শাহজাদপুর ও পতিসরে যাওয়ার এই বর্ণনা মেলে। ১৮৯১ থেকে ১৯০১ প্রায় ১০ বছর একনাগাড়ে থেকেছেন এই বাংলায়। এরপর ১৯৩৭ সাল পর্যন্ত জমিদারি দেখতে মাঝে মধ্যেই নওগাঁর পতিসর আসতেন কবি।

আত্রাই নদীর কারণে রেলস্টেশনের নামকরণও হয় আত্রাই রেলস্টেশন। কবি রবীন্দ্রনাথ প্রায়শ ট্রেনে কলকাতা থেকে সরাসরি আত্রাই রেলস্টেশনে এসে নামতেন। এর পর তিনি তাঁর বিখ্যাত পদ্মা বোট`-এ নদীপথে সোজা চলে যেতেন পতিসরের কাচারি বাড়িতে। কখনও কখনও পালকি ব্যবহার করতেন কবি। কিন্তু এখন না আছে পদ্মাবোট, না আছে পালকি। জলপথে তাঁর সঙ্গী ছিল প্রিয় বোট ‘পদ্মা’। আরও একটি ছোট নৌকা ছিল। নাগর নদীতে প্রিয় ‘পদ্মা বোট’-এ বসে তিনি রচনা করেছিলেন তাঁর বিখ্যাত কবিতা
‘তালগাছ এক পায়ে দাঁড়িয়ে,
সব গাছ ছাড়িয়ে উঁকি মারে আকাশে’।
কবিতার তালগাছটি নেই। তবে তাঁর স্মৃতিঘেরা নাগর নদী আজো প্রবাহমান। পতিসরের তাঁর কাচারিবাড়ির কোল ঘেঁষেই আঁকাবাঁকা বয়ে গেছে নাগর। স্থানীয়রা নাগরকে ডাকে ‘ছোট নদী’। পতিসরে বসে এই নাগর নিয়েই তিনি লিখেছেন তাঁর সেই কবিতা ‘আমাদের ছোটো নদী’।

আমাদের ছোটো নদী
আমাদের ছোটো নদী চলে বাঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।
পার হয়ে যায় গোরু, পার হয় গাড়ি,
দুই ধার উঁচু তার, ঢালু তার পাড়ি।”

পূর্ববঙ্গে কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের জমিদারির মোট তিনটি পরগণা ছিল।একটি নদীয়া জেলার বিরাহিমপুরে, তার কাচারি ছিল শিলাইদহে; দ্বিতীয়টি রাজশাহী জেলার কালিগ্রামে, তার কাচারি ছিল পতিসরে; তৃতীয়টি ছিল পাবনা জেলার শাজাদপুরে, তার কাচারি শাজাদপুর গ্রামেই ছিল।ক্রয়সূত্রে ১৮৩০ সালে রবীন্দ্রনাথের পিতামহ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুর কালিগ্রাম পরগনাটি জমিদারির অন্তর্ভূক্ত করেন।নওগাঁ, বগুড়া ও নাটোর জেলার ৬ শ টি গ্রাম নিয়ে কালিগ্রাম পরগনা গঠিত। এর আয়তন ছিল ২৩০ বর্গমাইল। রাতোয়াল ও ভান্ডারগ্রামে আরো দুটি সাব কাচারী ছিল। রাতোয়াল পতিসর থেকে ১০ কিলোমিটার আর ভান্ডারগ্রাম ২০ কিলোমিটার উত্তরে অবস্থিত। কালিগ্রাম পরগনার সীমানা ছিল উত্তরে মালশন আদমদিঘী; দক্ষিণে আত্রাই নদী; পূর্বে নাগর নদীর পশ্চিম তীর আর পশ্চিমে নাগর বিধৌত বাঁকা-কাশিয়াবাড়ি গ্রাম।

রবীন্দ্রনাথ জোড়াসাঁকোর ঠাকুর পরিবারের জমিদারি দেখা শোনার দায়িত্ব নিয়ে শিলাইদহে এসেছিলেন ১৮৮৯ সালে এবং পতিসরে ১৮৯১ সালের জানুয়ারীতে। গোলাম মুরশিদের মতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর জমিদারির দায়িত্ব নিয়ে পতিসর আসেন ১৮৯০ সালের ডিসেম্বর মাসে। আহমদ রফিকের মতে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৮৯১ সালের ১৩ জানুয়ারী শাহাজাদপুর হতে পতিসর অভিমুখে রওনা হয়ে সম্ভবত ১৬ জানুয়ারী পতিসর পৌঁছান। পতিসর থেকে স্ত্রী মৃণালিনী দেবীকে পত্রে লেখেন-‘‘আজ আমি কালীগ্রামে এসে পৌঁছালুম, তিন দিন সময় লাগল।’’
পতিসরে কবিগুরুর আসা কিন্তু ইচ্ছাকৃত ভাবে নয়,অনেকটাই ভাগ্যক্রমে। ১৯২২ সালে দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর উত্তরসূরীদের মাঝে জমিদারি ভাগ করে দেন। এজমালি সম্পত্তির সবশেষ ভাগে বিরাহিমপুর ও কালিগ্রাম পরগনার মধ্যে সত্যেন্দ্র পুত্র সুরেন্দ্রনাথকে তাঁর পছন্দের অংশ বেছে নিতে বললে সে তখন বিরাহিমপুরকে পছন্দ করে। তখন স্বভাবতই রবীন্দ্রনাথের ভাগে পড়ে কালিগ্রাম পরগনা। যার সদর দপ্তর ছিল পতিসর।

রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য পতিসরে একটি দো-তলা কুঠিবাড়ি রয়েছে। ভবনে প্রবেশের জন্য রয়েছে নান্দনিক একটি প্রবেশপথ।ভবনের সামনেই রয়েছে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের একটি আবক্ষ মূর্তি। এছাড়াও কুঠিবাড়ি ঘিরে বেশ কিছু ভবনের ধ্বংসাবশেষ দেখতে পাওয়া যায়। কাচারী বাড়ির পাশেই রয়েছে একটি পুকুর। কালক্রমে এটি মাটি ভরাট হয়ে যাচ্ছে। এই স্থানটির চারপাশেই রবি ঠাকুরের পরিবার কর্তৃক স্থাপিত বেশ কিছু স্থাপনা রয়েছে। এর মধ্যে উল্লেখযোগ্য হল, একটি বিদ্যালয়(কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইন্সটিটিউশন), দাতব্য হাসপাতাল ও পুরাতন একটি কৃষি ব্যাংক যা ১৯০৫ সালে স্থাপিত হয়েছিল।

কালীগ্রাম পরগনার প্রজাদেরকে শিক্ষার আলোয় আলোকিত করার জন্য রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯১৩ সালে পতিসর, রাতোয়াল ও কামতা ৩টি বিভাগে ৩টি মধ্য ইংরেজী (এম.ই) স্কুল ও পতিসরে ছেলে রথীন্দ্রনাথের নামে ১টি হাইস্কুল স্থাপন করেন। স্কুলের ভবন, ছাত্রাবাস নির্মাণ ও অন্যান্য খরচ এস্টেট থেকে বহন করা হতো। পতিসরে অবস্থিত কালীগ্রাম রথীন্দ্রনাথ ইনষ্টিটিউশনের প্রথমে নাম ছিল পতিসর এম.ই স্কুল। পরবর্তীতে ১৯৩৭ সালে বিদ্যালয়টি হাইস্কুলে রুপান্তরিত হয়। প্রসঙ্গত উল্লেখ্য এটি ছিল নওগাঁর জেলার তৃতীয় হাইস্কুল। ১৯১৩ সালের জানুয়ারী মাসে রাতোয়াল বিভাগে একটি বিদ্যালয় এবং কামতায় আরো একটি বিদ্যালয় প্রতিষ্ঠিত হয়। প্রতিষ্ঠান গুলোর প্রতিষ্ঠাতা বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজেই।স্বর্গ হইতে বিদায়’ নিয়ে মানুষের কাছে তাঁর অবস্থান নির্ধারণ করে কবি ধূলিধূসরিত মাটির পৃথিবীতে, তাঁর ভাষায় ‘সংসারের তীরে’ নেমে আসেন।এখানকার কৃষকদের কল্যাণে তাঁর নোবেল পুরস্কারের এক লাখ আট হাজার টাকা দিয়ে এখানে একটি ‘কৃষি ব্যাংক’ স্থাপন করেন। গঠন করেছিলেন কৃষি, তাঁত ও মৃৎশিল্পের সমবায় সংগঠন।১৯৩৭ সালে ২৬ জুলাই কবি শেষবারের মতো এসেছিলেন তার পতিসরের কাচারিবাড়িতে।

কবির ছেলে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর ১৯৩৪ সালে এ এলাকার প্রজাদের জন্য সর্বপ্রথম আধুনিক সময়ের কলের লাঙ্গল এনেছিলেন। পরবর্তী সময়ে তৎকালীন সরকার ১৯৫২ সালে এক অর্ডিন্যান্স বলে কালিগ্রাম পরগনার জমিদারি কেড়ে নিলে ঠাকুর পরিবারের এ জমিদারি হাতছাড়া হয়ে গেলে রথীন্দ্রনাথ ঠাকুর সস্ত্রীক পতিসর যাতায়াত বন্ধ করে দেন।

➤পতিসর রবীন্দ্র মিউজিয়াম :
শেষবার ১৯৩৭ সালে বোটে করে কবি পতিসরে আসেন। ফেরার সময় তিনি বোটটি পতিসরে রেখে যান। কবি রেলগাড়িতে কলকাতা ফিরে যান। বোটের খণ্ডিত অংশ এবং নোঙ্গর মিউজিয়ামে রক্ষিত আছে।
মিউজিয়াম বা কুঠিবাড়িতে দুটোঘরে দর্শনার্থীর জন্য সংরক্ষণ করা হয়েছে কবির দেয়াল ঘড়ি, লোহার সিন্দুক, খাট, টি-টেবিল, টি-পট, ট্রাক্টরের ভগ্নাংশ, কবির বাথটাব, চায়ের কেটলি, রাইস ডিশ, কবির বিভিন্ন বয়সের ছবি, কবির স্বহস্তে লিখিত ৬ পৃষ্ঠার চিঠির ফটোকপি, বিশাল আয়না, আরাম কেদারা, ওয়্যারড্রব, গ্লোব, সিন্দুক, খাজনা আদায়ের টেবিল, আলমারি, দরজার পাল্লা, জানালা, কবির বজড়ার রেপ্লিকাসহ নানা সামগ্রী। মিউজিয়ামে সংরক্ষিত পতিসরে লেখা বিশেষ দুটি কবিতা হচ্ছে-
‘আমাদের ছোট নদী চলে আঁকে বাঁকে
বৈশাখ মাসে তার হাঁটু জল থাকে।’ এবং
‘তালগাছ, এক পায়ে দাঁড়িয়ে
সব গাছ ছাড়িয়ে
উঁকি মারে আকাশে।

➤পতিসরে রবীন্দ্রনাথের লেখা
‘বিদায় অভিশাপ’, কাব্যগ্রন্থ চিত্রা,
উপন্যাস গোরা ও ঘরে বাইরে উপন্যাস-এর অনেকাংশ। ছোটগল্প
প্রতিহিংসা ও ঠাকুরদা।
প্রবন্ধ ইংরেজ ও ভারতবাসী।
গানের মধ্যে উল্লেখযোগ্য তুমি সন্ধ্যার মেঘমালা, তুমি আমার নিভৃত সাধনা, বধূ মিছে রাগ করো না, তুমি নবরূপে এসো প্রাণে ইত্যাদি।
এই পতিসরে বসেই চৈতালী কাব্যের ৫৪টি কবিতা লিখেছেন।
লিখেছেন সন্ধ্যা, দুই বিঘা জমি -এর মতো অনেক বিখ্যাত কবিতা।

➤পূর্ব বাংলায় এসে রবীন্দ্র প্রতিভা সৃজনশীলতার যথার্থ পথ খুঁজে পেয়েছিলো, একথা অধ্যাপক গোলাম মুরশিদ এবং আহমদ রফিকের মতো গবেষকরা বলেছেন। এটাও একটা আশ্চর্য ব্যাপার যে, রবীন্দ্রনাথের ভাগে জমিদারি দেখার দায়িত্ব পড়েছিলো পূর্ব বাংলায়। আহমদ রফিক বলেন, ‘এক দিকে তাই পদ্মা ইছামতি আত্রাই ও নাগরী নদী এবং এদের তীরবর্তী অঞ্চলের রূপবৈচিত্র্য রবীন্দ্রনাথের সাহিত্যসৃষ্টির ধারায় নতুন, বলিষ্ঠ ও প্রাণবস্তু উৎসমুখ খুলে দিয়েছিলো, তার সৃষ্টিকে বৈচিত্র্য সমৃদ্ধ করে তুলেছিলো। অন্য দিকে সেখানকার জীবন ও জনপদের প্রত্যক্ষ অভিজ্ঞতার প্রভাব রোমান্টিক কবির চেতনায় গভীর দাগ কাটে, দাগ কাটে কবি মনের সংবেদনশীল পলিস্তরে। কবির উপলব্ধি কর্মী রবীন্দ্রনাথের জন্ম দেয় পল্লী উন্নয়ন ও স্বদেশী সমাজ গঠন তার জন্যে অপরিহার্য হয়ে ওঠে। কবির স্বপ্ন হয়ে ওঠে আত্মশক্তিতে বিশ্বাসী গ্রামীণ মানুষের এক স্বনির্ভর সমাজ।’ (রবীন্দ্র ভুবনে পতিসর-সাহিত্য প্রকাশ- ১৯৯৮, পৃ: ১৩-১৪)।
প্রমথ নাথ বিশীও বলেছেন, ‘যে প্রতিভা এতকাল অসহায়ভাবে হাতড়িয়ে যোগ্য আসনটি খুঁজে মরছিল, ভুল আসনে বসতে গিয়ে ‘ভগ্নহৃদয়’ লিখছিল, আঁকছিল সেই সব নরনারী যারা …….. আজ কল্পনা রাজ্যের ছায়া উপচ্ছায়া মাত্র, কিংবা অনির্দিষ্ট ঐতিহাসিক জগতের অস্পষ্ট প্রেতমূর্তি মাত্র, হঠাৎ তার সম্মুখে উদঘাটিত হয়ে গেল ‘ঐঁসধহ যধনরঃধঃরড়হ ধহফ হধসব’- এর বাস্তব পৃথিবী।’ (ঐ-পৃ: ১৪)।
বিশী মহাশয় আর আহমদ রফিকের কথা মেনে নিলে স্বীকার করতে হয়, রবীন্দ্রনাথের মহৎ প্রতিভা বিকশিত হয়েছে পূর্ববঙ্গ তথা বাংলাদেশের মাটিকে ভিত্তি করে। বাউল সম্রাট লালন ফকিরও এই মাটির প্রতিভা। রবীন্দ্রনাথকেও বলা হয় ‘রবীন্দ্র বাউল’।

লালন ফকিরের মতো লৌকিক প্রতিভাকে রবীন্দ্রনাথ আবিস্কার করেছিলেন। তার শ্রেষ্ঠ উপন্যাস ‘গোরা’র শুরুই লালনের গান দিয়ে। ‘খাঁচার ভেতর অচিন পাখি কেমনে আসে যায়।’ ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি রচনা করেছেন তিনি বাউল সুর দিয়ে। লালনের শিষ্য গগন হরকরার গান, ‘আমার মনের মানুষ যে-রে, কোথায় পাবো তারে,’ যে সুরে রচিত, ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটিও সেই সুরে রচিত। বাউল গানের মধ্যে, বাউল সম্প্রদায়ের মধ্যে রবীন্দ্রনাথ সন্ধান পেয়েছিলেন মানবধর্মের সুর। বাউল ভক্ত রবীন্দ্রনাথকে বলা হতো ‘রবীন্দ্র বাউল।’

১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের দিন থেকে সাড়ে সাত কোটি বাঙালির হৃদয়ে ‘আমার সোনার বাংলা’ গানটি বেজে উঠেছিলো। একথা ভাবতে প্রসন্ন পুলক অনুভব করি যে পূর্ব বাংলার মাটিতে এই অমর গানটির সুর প্রোথিত। আর আমাদের রবীন্দ্র প্রেমিক বঙ্গবন্ধু এই গানটিকে জাতীয় সঙ্গীতের মর্যাদা দিয়েছেন।

রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্ন পত্রাবলী’র প্রতিটি চিঠি পূর্ব বাংলার কাদামাটি দিয়ে লেখা। সেখানে পাওয়া যাবে জীবন্ত বাংলাদেশ। তার এক চিঠিতে বলেছেন, ‘এই অতি ছোট নদী এবং নিতান্ত ঘোরো রকমের বহিঃপ্রকৃতি আমার কাছে বেশ লাগছে। ঐ অদূরেই নদী বেঁকে গিয়েছে ওখানটিতে একটি ছোটো গ্রাম এবং গুটি কতক গাছ, এক তীরে পরিপক্ব ধানের ক্ষেত …… অন্য তীরে শূন্যমাঠ ধূ ধূ করছে-নদীর জলে শ্যাওলা ভাসছে, ………. আকাশে উজ্জ্বল রৌদ্রে একপাল চিল উড়ছে …… গয়লাদের বাড়ীর কাছে এক খন্ড শর্ষে ক্ষেতে বিকশিত শর্ষে ফুল যেন আগুন করে রয়েছে। নিকোনো আঙিনায় বাঁধা গোরু, …… খড় স্তূপাকার, ……. এখানে সমস্তই খুব কাছাকাছি।’ (আহমদ রফিক-রবীন্দ্র ভুবনে পতিসর)।
না, রবীন্দ্রনাথ বাংলাদেশকে খন্ডিত, সৌখিন দৃষ্টিতে অবলোকন করেন নি। সমগ্র, অখন্ড এবং পূর্ণাঙ্গ দৃষ্টিতে, মন ও মননের চোখ দিয়ে দেখেছিলেন বাংলাদেশকে। সে ভাবেই সামগ্রিক মূর্তিতে উঠে এসেছে বাংলাদেশ রবীন্দ্রনাথের ‘ছিন্নপত্রাবলী’-তে আর গল্পগুচ্ছে।

পূর্ব বাংলার মাটিতে দাঁড়িয়ে রবীন্দ্রনাথ পল্লী উন্নয়ন ভাবনায় মগ্ন হয়েছিলেন। এক চিঠিতে বলেছেন, ‘পতিসরে আমি কিছুকাল হইতে পল্লী সমাজ গড়িবার চেষ্টা করিতেছি যাহাতে দরিদ্রচাষী প্রজারা নিজেরা একত্র মিলিয়া দারিদ্র্য, অস্বাস্থ্য ও অজ্ঞান দূর করিতে পারে।’ (আহমদ রফিক রবীন্দ্র ভুবনে প্রতিসর)।
এ প্রসঙ্গে আহমদ রফিকের কথাটা মূল্যবান, ‘রবীন্দ্রনাথ জমিদারি দেখা শোনার দায়িত্ব নিয়ে শিলাইদহে এসেছিলেন ১৮৮৯ সালে এবং পতিসরে ১৮৯১ সালের জানুয়ারীতে। এখানে এসে অশিক্ষা, অস্বাস্থ্য, চরম অর্থনৈতিক দুর্দশা দেখে কবির মাথায় আসে গ্রাম উন্নয়নের পরিকল্পনা। এটা তার কবি মনের কোনো সাময়িক আবেগের হঠাৎ প্রকাশ ছিল না। দিনের পর দিন অভিজ্ঞতাই বরং তাকে এদিকে দৃঢ় আকর্ষণে টেনে এনেছিলো। এবং শেষ পর্যন্ত, একাজ তার কাছে সামাজিক দায়িত্ব ও কর্তব্যে পরিণত হয়েছিল।’ (রবীন্দ্র ভুবনে পতিসর, সাহিত্যপ্রকাশ, ১৯৯৮, পৃ: ৭৪-৭৫)।
রবীন্দ্রনাথের মতো আপাদমস্তক কবি বলেন কিনা, ‘আমি গ্রামে গ্রামে যথার্থ ভাবে স্বরাজ স্থাপন করতে চাই।’ বিশ্ব কবি বলেছেন, ‘আজ সকলের চেয়ে বড় দরকার শিক্ষার সাম্য।’ বাংলার শিক্ষা বঞ্চিতদের লক্ষ্য করে কথাটি বলেছেন। রবীন্দ্রনাথের মতো কবি বলেছেন, ‘আমি দীর্ঘকাল ভদ্র সন্তানদের শিক্ষা নিয়ে হাবু ডুবু খেয়েছি। এবার চাষাদের সেবায় মন দিতে হবে।’
রবীন্দ্রনাথের বুকের গভীরে পূর্ববঙ্গের স্মৃতি জড়িত ছিলো। কখনো বিস্মৃত হননি।

রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নোবেল প্রাপ্তির পর সর্বশেষ ১৯৩৭ সালে পতিসরে আসেন।১৯৩৭ সালের ২৭ জুলাই পতিসরে ‘পূণাহ্য’ অনুষ্ঠানে।রবীন্দ্রগবেষক আহমদ রফিকের বইতে পেয়েছি, ১৯৩৭ সালে পূর্ববঙ্গের পতিসর থেকে শেষ বিদায় নেয়ার সময় কেমন হৃদয় বিদারক দৃশ্যের অবতারণা হয়েছিলো। বিদায় জানাতে এসেছিলো অধিকাংশই মুসলমান সম্প্রদায়ের চাষীরা। তারা কবিকে বিদায় সংবর্ধ জানিয়েছিলো। চোখের পানি ফেলেছিলো। এখান থেকে বিদায় নেবার সময় বলেছিলেন, ‘তোমরা নিজের পায়ে দাঁড়াও।’ আরো বলেছিলেন, ‘জন সাধারণের জন্য সবার আগে চাই শিক্ষা।’

১৯৩৭ সালে পতিসর থেকে বিদায়ের শেষ দিনটিতে। কুঠিবাড়ীর সামনের রবীন্দ্র সরোবর ঘাটে সমবেত প্রজাদের উদ্দেশ্যে বলেন,
“আমি অসুস্থ আর হয়তো তোমাদের কাছে আসতে পারবো না। তোমরা আমাকে অনেক দিয়াছো। আমি তোমাদের কিছুই দিতে পারি নাই। আমি প্রার্থনা করি তোমরা সুখী হও – শান্তিতে থাকো”।

Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!