গারো পাহাড়ের গদ্যে এস এম শাহনূর (পর্ব – ২০)

রবীন্দ্রনাথের স্মৃতিধন্য ঢাকা:

(দৈনিক আনন্দবাজারে প্রকাশিত খবর)

রবীন্দ্রনাথ যেবার ঢাকা-নারায়নগঞ্জে সংবর্ধিত হয়েছিলেন তখনকার দৈনিক আনন্দবাজারে প্রকাশিত খবর ও রবীন্দ্রনাথের নিজের অভিব্যক্তি যা পত্রিকায় প্রকাশিত হয়েছিল তা নিয়েই এই বিশেষ ফিচার। প্রকাশিত ভাষারীতি অনুযায়ী অবিকৃতভাবেই লেখাটি প্রকাশ করা হলো-
ঢাকায় রবীন্দ্রনাথের আগমন উপলক্ষে বেশ একটু দলাদলি ও কোলাহলের সৃষ্টি হইয়াছিল। তিনদিন ক্রমাগত বাক্যুদ্ধের পরে, তাহাতে শান্তির যবনিকা পড়িয়াছে। আমরা এই বিষয় লইয়া আর কোনও আলোচনা করিব না। রবীন্দ্রনাথ ঢাকা আগমন করিয়া কি কি কার্য্য করিবেন, পাঠক সাধারণের অবগতির জন্য এখানে তাহার কর্মসূচী যথাযথরূপে প্রকাশ করিলাম:
৭ই ফেব্রুয়ারি—তিনি ঘটিকার সময় ঢাকা আগমন, জনসাধারণের অভ্যর্থনা। মিউনিসিপ্যালিটি নথব্রুক হলে ৪টার সময় অভিনন্দন দিবেন, তত্পর জনসাধারণ ৫ ঘটিকার সময় করোনেশন পার্কে অভিনন্দন দিবেন, তত্সহ রেট পেয়ার্স পিপলস এসোসিয়েশন প্রভৃতি সাধারণ প্রতিষ্ঠান সমূহও অভিনন্দন দিবেন।
৮ই ফেব্রুয়ারি—প্রাতে কবির সহিত তাঁহার বাসস্থানে জনসাধারণ দেখা সাক্ষাত্ করিবেন। অপরাহ্ন ৬-৩০ মিনিটের সময় ‘দীপালি’র প্রতিষ্ঠান বক্তৃতা দিবেন, কেবলমাত্র মহিলাদের জন্য।
৯ই ফেব্রুয়ারী—প্রাতে মহিলারা দেখা সাক্ষাত্ করিবেন। অপরাহ্ন ৬টায় বিশ্বভারতী সম্মিলনী, ৬-৩০ ইন্টারমিডিয়েট কলেজ প্রাঙ্গণে বক্তৃতা—সর্বসাধারণের জন্য।
১০ই ফেব্রুয়ারী—প্রাতে ব্রাহ্মসমাজ। অপরাহ্ন ৪-৬টায় মোসেলম হলে প্রীতিসম্মিলনী। ৬-৩০টার সময় কার্জন হলে বিশ্ববিদ্যালয়ের বক্তৃতা।
১১ই ফেব্রুয়ারী— প্রাতে ৬টা-৯টা ছাত্র সম্মিলনী। অপরাহ্ন ৪-৬টা জগন্নাথ হল, (ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়) ৬টা—৬—৩০ ঘটিকায়। ছাত্রসঙ্ঘের অভিনন্দন গ্রহণ। (বিশ্ববিদ্যালয়) ৬-৩০ মিনিট। অধ্যাপক ফোরমিসি বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা প্রদান করিবেন।
১২ই ফেব্রুয়ারী—প্রাতে জনসাধারণের দেখা সাক্ষাত্। ২—৩-৩০ মিনিট। ইডেন বালিকা বিদ্যালয় প্রদর্শন ৪টা—৬টা সাহিত্য-পরিষদের অভিন্দন গ্রহণ। জলযোগের ব্যবস্থা ৬-৩০—৭-৩০ মিনিট; অধ্যাপক তুচ্চি বিশ্ববিদ্যালয়ে বক্তৃতা দিবেন।
১৩ই ফেব্রুয়ারী— প্রাতে দেখা সাক্ষাত্—৪টা—৬টা। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় ভাইসচ্যান্সেলর প্রদত্ত প্রীতিসম্মিলন ৬-৩০ মিনিট কার্জন হলে বক্তৃতা। (বিশ্ববিদ্যালয়)
১৪ই ফেব্রুয়রী ৪টা—৬টা শিক্ষকসঙ্ঘের প্রীতি সম্মিলন। ৮টা—১০টা ঢাকা হল ভোজ দান।
৯ ফেব্রুয়ারি ১৯২৬/২৬ মাঘ ১৩৩২
ঢাকা রবীন্দ্রনাথ
নারায়ণগঞ্জে বিপুল অভ্যর্থনা
ঢাকা, ৮ই ফেব্রুয়ারী।
গতকল্য রবীন্দ্রনাথ ঢাকায় পৌঁছিয়াছেন, ঢাকার অধিবাসীবৃন্দ তাঁহাকে বিপুল অভ্যর্থনা করিয়াছেন। প্রকৃতপক্ষে বলিতে গেলে এইবারই রবীন্দ্রনাথ সর্ব্বপ্রথম ঢাকায় আসিয়াছেন। ইতিপূর্ব্বে তিনি ভালরূপে ঢাকা প্রদর্শন করেন নাই। স্থানীয় অভ্যর্থনা-সমিতি নারায়ণগঞ্জে বহুসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক প্রেরণ করিয়াছিলেন। নারায়ণগঞ্জ স্টীমার স্টেশন সেদিন জনসমুদ্রে পরিণত হইয়াছিল। স্টীমার ঘাটে আসিবার বহু পূর্ব্ব হইতেই তথায় জনসমাগম হইতে আরম্ভ হয়। দেখিতে দেখিতে এত লোক জড় হয় যে, কি ঘাটে, কি জেটিতে একটুও স্থান ছিল না। রবীন্দ্রনাথের ষ্টীমার ঘাটে পৌঁছিলে চতুর্দিক হইতে ঘন ঘন আনন্দধ্বনি উত্থিত হয়। কয়েকজন বিশিষ্ট নেতা অগ্রসর হইয়া তাঁহাকে পুষ্পমাল্যে বিভূষিত করেন এবং ষ্টীমার হইতে নামাইয়া আনেন। ষ্টেশন ঘাটে সুসজ্জিত মোটর অপেক্ষা করিতেছিল। অতঃপর রবীন্দ্রনাথ তাঁহার দলবলসহ সেই মোটরে চড়িয়া ঢাকা অভিমুখে যাত্রা করেন। ঢাকা শহরের পূর্ব্ব সীমান্তে একদল স্কাউট, বহুসংখ্যক স্বেচ্ছাসেবক ও শহরের বিশিষ্ট ভদ্রলোক উপস্থিত ছিলেন। রবীন্দ্রনাথের মোটর দৃষ্টিপথে প্রবিষ্ট হইবামাত্র ঘন ঘন জয়ধ্বনি উত্থিত হয়। রবীন্দ্রনাথ সেই অপূর্ব্ব অভ্যর্থনা লাভ করিয়া ঢাকা শহরে প্রবেশ করেন।
অতঃপর এক বিরাট শোভাযাত্রা করিয়া বুড়ীগঙ্গা নদীর উপর ভাসমান ‘তড়াগ’ নামক বজরাতে তাঁহাকে লইয়া যাওয়া হয়। রবীন্দ্রনাথ নদীর উপর সেই বজরায়ই অবস্থান করিবেন।
মিউনিসিপ্যালিটির অভিনন্দন
অপরাহ্ন চার ঘটিকার সময় নথব্রুক হলে এক বিরাট জনসভায় অধিবেশন হইয়াছিল। ঐ সভায় মিউনিসিপ্যালিটি এবং “পিপলস্ এসোসিয়েশনের” পক্ষ হইতে দুইখানি মানপত্র রবীন্দ্রনাথকে প্রদান করা হয়। রবীন্দ্রনাথকে দেখিবার জন্য এতলোক জড় হইয়াছিল যে, নর্থব্রুক হলে একটু স্থান ছিল না। বহুলোক বাহিরে দাঁড়াইয়াছিলেন।
রবীন্দ্রনাথের উত্তর
উপরোক্ত উভয় অভিনন্দনের উত্তর দিতে দণ্ডায়মান হইয়া রবীন্দ্রনাথ বলেন,—‘আমি নিতান্ত দুর্ব্বল ও ক্লান্ত। এইজন্য ঢাকায় আসার নিমন্ত্রণ গ্রহণ করার পূর্ব্বে আমাকে অনেক কথা চিন্তা করিতে হইয়াছিল। সে যাহাই হউক, অনেক চিন্তার পর আমি ঢাকায় আসা স্থির করি। আপনাদের এখানে আসিয়া আমি বাস্তবিকই সুখী হইয়াছি। তবে একটি কথা বলিয়া রাখি,—কতকগুলি গতানুগতিক নিয়ম রক্ষার জন্য আমি এখানে আসি নাই। আপনাদের হূদয়ের সহিত পরিচিত হওয়াই আমার উদ্দেশ্য। আমি অল্পসময় যাবত্ ঢাকা পৌঁছিয়াছি, কিন্তু ইহার মধ্যেই আপনাদের স্নেহের পরিচয় পাইয়াছি, ইতিপূর্ব্বে আমি আর একবার ঢাকায় আসিয়াছিলাম। সে সময় আমি বলিয়া গিয়াছিলাম যে, ভিক্ষা দ্বারা মুক্তি আসিবে না। অদ্য মিউনিসিপ্যালিটি আমাকে যে মানপত্র দিয়েছেন, তাহাতে সে কথার উল্লেখ আছে। একদল রাজনীতিক ক্ষমতালোভের জন্য উপর্যপরি আবেদন নিবেদন করিতেছিলেন। আমি তাঁহাদিগকে লক্ষ্য করিয়াই সেই কথা বলিয়াছিলাম। আমি দেশবাসীকে বুঝাইতে চাহিয়াছিলাম যে, সেবা ও আত্মত্যাগ ব্যতীত প্রকৃত কাজ হইতে পারে না।’
অতঃপর রবীন্দ্রনাথ বলেন :—‘অবিরত চেষ্টা এবং আত্মত্যাগের বলে নিজের দেমের উপর যে শক্তির প্রতিষ্ঠা হয় সেই শক্তি যতদিন পর্যন্ত আমরা লাভ করিতে না পারিব, ততদিন পর্যন্ত শাসকবর্গের সহিত আদান-প্রদানে মর্যাদা রক্ষা করিয়া আমরা চলিতেও পারিব না, আর সেই আদান-প্রদানে কোন খাঁটি লাভও আমাদের হইবে না। সম্প্রতি আমি আর একটি কথা বলিয়াছি, তাহাও মিউনিসিপ্যালিটি প্রদত্ত মানপত্রে উল্লেখ করা হইয়াছে। আমি বলিয়াছি যে, লুপ্ত না হইয়া যাওয়াই একটা দেশ বা জাতির পক্ষে যথেষ্ট নহে। স্বীয় অফুরন্ত ধন-ভাণ্ডার হইতে অপরকে কিছু কিছু দিবার ভার তাহাকে লইতে হইবে। অতীত ভারত এই কর্তব্যকে স্বীকার করিয়া, গিরিকন্দর, সাগরপ্রান্তর ভেদ করিয়া স্বকীয় দানের পশরা দূরদেশে বহন করিয়া লইয়া গিয়াছিল। সেই ভারতের আজ একই নিশ্চয়ই বলা উচিত নহে যে, তাহার ভাণ্ডার আজ শূন্য—সে নিঃস্ব ভিখারী। অন্ততঃ আমি সে কথা বলিবার মত হীন কখনও হইব না। ‘জগতের যে যেথায় আছে, আমার কাছে এস’, ভারতের এই সনাতন আহ্বানের বাণী বহন করিয়া আমি পৃথিবীর শেষপ্রান্ত পর্যন্ত ভ্রমণ করিয়াছি। নিঃস্ব কৃপণ কখনও এ আহ্বান দিতে পারে না। কিন্তু আমার ভারতের প্রাচুর্য্য এবং চিরন্তন আতিথেয়তার উপর বিশ্বাস আছে বলিয়াই আমি ভারতের নামে ভারতের পক্ষ হইতে একটি অতিথিশালা খুলিয়াছি, যে কোন পর্য্যটক আসিয়া এখানে বিশ্রাম করিতে পারে এবং ভারতের চিরপ্রবাহিত উত্সবের সুধাধারা পান করিতে পারে।
আপনারা আমাকে স্মরণ রাখিয়াছেন দেখিয়া আমি অতীত আনন্দিত হইলাম। আমার প্রতি আপনার যে প্রীতি আছে, সেই প্রীতির এবং আমি চলিয়া গেলে আমার স্মৃতির সহিত যদি আপনারা আমার একান্ত প্রিয়কার্য্যকে স্মরণ রাখেন তবে আমি কৃতজ্ঞ থাকিব।’
তথ্য ঋণ:
নারায়নগঞ্জে রবীন্দ্রনাথ
দৈনিক ইত্তেফাক
৮মে ২০১৫
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!