T3 || আমি ও রবীন্দ্রনাথ || সংখ্যায় এস এম শাহনূর

রবীন্দ্রনাথের শ্বশুর বাড়ি ও আদি পুরুষের জন্মভিটার প্রেমে:

[১]
রবীন্দ্রনাথ মানেই বাঙালীর মনন ও সাহিত্যের আরেক নাম।এই নাম শুনতেই আমাদের আন্তর চোঁখে ভেসে ওঠে কত আবেগ, অসংখ্য গান, কবিতা, উপন্যাস আর ছোট গল্পের সমাহার।আর কবিগুরু যার প্রেমে মুগ্ধ হয়ে এত ভালোবাসার গান রচনা করেছেন তিনি কি না আমাদের বাংলাদেশি এক নারী।হ্যাঁ! কবিপত্নী মৃণালিনী দেবীর কথাই বলছি।মৃণালিনী দেবীর বাড়ি অর্থাৎ রবি ঠাকুরের শ্বশুরবাড়ি বাংলাদেশের খুলনা জেলার ফুলতলা উপজেলার দক্ষিণডিহি গ্রামে।কবিগুরুর স্মৃতি বিজড়িত একটি জায়গা হল খুলনার দক্ষিণডিহি।চাইলেই খুব সহজে ঘুরে আসতে পারেন কবিগুরুর শ্বশুরবাড়ি থেকে।খুলনা শহর থেকে ১৯ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে দক্ষিণডিহি গ্রাম। যশোর ও খুলনা জেলার উপর দিয়ে বয়ে যাওয়া ভৈরব নদের তীরে অবস্থিত এই গ্রাম। গ্রামের ঠিক মধ্যখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে রবীন্দ্র-মৃণালিনীর স্মৃতি ধন্য একটি দোতলা ভবন। এটাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুর বাড়ি। বর্তমানে এটি ‘রবীন্দ্র কমপ্লেক্স’ নামে অধিক পরিচিত।গত ১৭ জুন ২০১৯ ইংরেজী,দিনটি ছিল বেশ আলোকোজ্জ্বল।আমার স্ত্রী,কন্যা সহ আরো কয়েকজন ভ্রমন পিপাসু খুলনা শহরের অলিগলি ও বিভিন্ন দর্শনীয় স্থান সমূহে ঘুরে বেড়াই।আমাদের জার্নির এসি কোস্টারের বাহিরে ছিলো প্রচন্ড তাপদাহ,মনে ছিল নতুন ও অজানাকে দেখার আকাঙ্খা। আমার একমাত্র তনয়া প্রিন্সেস সামীহা নূর জারাও দিনটিকে বেশ উপভোগ করেছে।আলো ঝলমল দুপুর বেলা গ্রামের পিচঢালা আঁকাবাঁকা সরু পথ দিয়ে আমরা সেখানে যাই। শতাধিক বছর আগে এ পথ নিশ্চয়ই এমন সুগম ছিল না। দুই পাশে তরুসার। ছায়াময়। তার ফাঁকে ফাঁকে নয়ন মনোহর গ্রামীণ দৃশ্যপট। সবুজ ধানখেত। পাখিদের কলকাকলি।গাছ-গাছালির ঘেরাটোপে বন্দী পুরনো দোতলা বাড়ি। বাড়ির থামগুলো বেশ চৌকস। রয়েছে প্রাচ্যরীতি লেখা অনুলিপি। এটির সিঁড়ির কারুকার্য আপনাকে মুগ্ধ করবে।দোতলা বাড়িজুড়েই আছে রবি ঠাকুরের বিভিন্ন সময়ে ধারণকৃত ছবি এবং কবির সাহিত্যকর্মের হাতে লেখা অনুলিপি।নিচতলায় রয়েছে ছোট্ট পরিসরে একটি পাঠাগার যেখানে কবির লেখা সমগ্র সংরক্ষিত আছে।
ভ্রমণ যাদের নেশা তাদের বলছি, জীবনে একবার হলেও বেড়িয়ে যাবেন বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আদি বাড়ি ও শ্বশুরবাড়ি। যেখানে গেলে আপনার পরিচয় হবে ইতিহাসের সাথে। জানতে পারবেন বাংলা সাহিত্যাকাশের এ উজ্জ্বল নক্ষত্র সম্পর্কে অনেক অজানা কথা।নোবেল বিজয়ী অমর কবির আদি আত্মীয়তা ছড়িয়ে আছে খুলনা জেলাতে। রবীন্দ্রনাথের শ্বশুরবাড়ি খুলনার দক্ষিণডিহিতে এলে দেখবেন, বাংলাসাহিত্যের প্রবাদপুরুষ বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের আবক্ষ ভাস্কর্য, কবিপত্নীর আবক্ষ ভাষ্কর্য, শ্বশুর বাড়ির দ্বিতল ভবন।

সঞ্চয়িতা বইয়ে প্রকাশিত “প্রাণ”কবিতাটির হস্তলিপি দোতলার দেয়ালে টানানো আছে।কবিতাটি হল-
মরিতে চাহি না আমি সুন্দর ভুবনে,
মানবের মাঝে আমি বাঁচিবার চাই।
এই সূর্যকরে এই পুষ্পিত কাননে
জীবন্ত হৃদয়-মাঝে যদি স্থান পাই!
ধরায় প্রাণের খেলা চিরতরঙ্গিত,
বিরহ মিলন কত হাসি-অশ্রু-ময় –
মানবের সুখে দুঃখে গাঁথিয়া সংগীত
যদি গো রচিতে পারি অমর-আলয়!
তা যদি না পারি, তবে বাঁচি যত কাল
তোমাদেরি মাঝখানে লভি যেন ঠাঁই,
তোমরা তুলিবে বলে সকাল বিকাল
নব নব সংগীতের কুসুম ফুটাই।
হাসিমুখে নিয়া ফুল, তার পরে হায়
ফেলে দিয়ো ফুল, যদি সে ফুল শুকায়।।

[২]
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শৈশবের একটি ছবি সম্বলিত “জন্মকথা” কবিতাটিও দেখতে পাবেন।যা পড়লে হারিয়ে যাবেন আপনার শিশুকালে।
খোকা মাকে শুধায় ডেকে–
“এলেম আমি কোথা থেকে,
কোন্‌খানে তুই কুড়িয়ে পেলি আমারে।’
মা শুনে কয় হেসে কেঁদে
খোকারে তার বুক বেঁধে–
“ইচ্ছা হয়ে ছিলি মনের মাঝারে।

দেখবেন কাঁচের গ্লাসে রাখা রবি কবির নিজের হাতের লিখা গীতাঞ্জলি কাব্যের পুনমুদ্রিত কপি।
আপনার চোঁখ আটকে যাবে দেয়ালে টানানো কবির বিভিন্ন বয়সী ছবির পানে।দেখবেন মৃণালিনী দেবীর ছবিও।

এছাড়া রয়েছে সবুজ-শ্যামল ঘন বাগান, পান-বরজ ও নার্সারি।এ অঞ্চলে আছে ছোট-বড় অনেকগুলি নার্সারি। এই নার্সারিগুলিতে ঘুরে ঘুরে পরিচিত হতে পারবেন বাহারি সব প্রজাতি,ফুল, ফল ও ঔষধি বৃক্ষের সাথে।ফুল, ফল আর বিচিত্র গাছগাছালিতে ভরপুর সৌম্য-শান্ত গ্রাম দক্ষিণডিহি। কলকাতার জোড়াসাঁকোর বিখ্যাত ঠাকুর পরিবারের সঙ্গে দক্ষিণ ডিহির সম্পর্ক নিবিড়। রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের মা সারদা সুন্দরী দেবী আর কাকি ত্রিপুরা সুন্দরী দেবীর জন্ম এ গ্রামেই। আর রবীন্দ্রনাথের স্ত্রী মৃণালিনী দেবীও দক্ষিণ ডিহিরই মেয়ে। তার আরেক নাম ভবতারিণী। বিয়ের পর নাম রাখা হয় মৃণালিনী দেবী। কিশোরী বধূর উদ্দেশ্যে কবি লিখেছেন,
‘এই তনুখানি তব আমি ভালবাসি,
এ প্রাণ তোমার দেহে হয়েছে উদাসী’।

বেণীমাধব রায় চৌধুরী। তিনি ছিলেন কলকাতার জোড়াসাঁকোর ঠাকুর এস্টেটের সেরেস্তাদার। তাঁর স্ত্রী দাক্ষায়ণী দেবী। তাঁদের একমাত্র কন্যা ভবতারিণীর জন্ম সম্ভবত ১৮৭৪ সালের ১ মার্চে। ফুলি নামেই কাছের মানুষদের কাছে পরিচিত ছিলেন। জোড়াসাঁকো পরিবারের প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের পুত্র দেবেন্দ্রনাথ ঠাকুর দক্ষিণদিহি গ্রামের রামনারায়ণ চৌধুরীর কন্যা সারদা দেবীকে বিয়ে করেন। উভয় পরিবারই ছিলেন পিরালি বংশোদ্ভূত। এই দম্পতির কনিষ্ঠ সন্তান রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর।

১৮৮২ পুজার ছুটির সময় জ্ঞানদানন্দিনী দেবী উৎসাহী হয়ে বাস্তভিটা দেখবার অজুহাতে যশোরের নরেন্দ্রপুর যান। উদ্দেশ্য কাছাকাছি পীরালী পরিবারের মধ্য হতে বধু সংগ্রহ।জ্ঞানদানন্দিনীর সঙ্গে কাদম্বী দেবী, বালিকা ইন্দ্রানি, বালক সুরেন্দ্র নাথ ও রবীন্দ্রনাথ আসেন পুরাতন ভিটা দেখতে।সে সময় ফুলতলা গ্রামের বিনিমাধব রায় চৌধূরীর কন্যা ভবতারিনীকে তারা দেখেন।যৌবনে কবিও কয়েক বার তাঁর মায়ের সঙ্গে দক্ষিণডিহি গ্রামের মামা বাড়িতে এসেছিলেন।

সারদা দেবীর পিসি আদ্যাসুন্দরীর ঘটকালিতে ভবতারিণীকে বিয়ে করেন রবি। ১৮৮৩ সালের ৯ ডিসেম্বর ব্রাহ্ম মতে বিয়ে হয়েছিল জোড়াসাঁকোর মহর্ষি ভবনে রবিদের পৈত্রিক নিবাসে। এটি ছিল ব্যতিক্রমধর্মী এক ঘটনা। বিয়েতে কোনো আড়ম্বর ছিল না। এমনকি নিজের পৈত্রিক নামটিও হারিয়ে ফেলতে হয় ভবতারিণীকে। বিয়ের পর স্বামী তাঁর নামকরণ করেন মৃণালিনী।

“তুমি কি কেবলি ছবি
শুধু পটে লেখা? ”
রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর তাঁর প্রিয়তমা পত্নী মৃণালিনী দেবীকে নিয়ে এ কবিতার চরণ কখন লিখেছিলেন আমার জানা নেই তবে এতটুকু জেনেছি যে,রবীন্দ্রনাথের ২২ বছর ৭ মাস বয়সে বিবাহ হয় দক্ষিনডিহি গ্রামের বেনীমাধব রায় চৌধুরীর ১১ বছর বয়সী মেয়ে ভবতারিনী দেবী ওরফে পদ্ম ওরফে ফুলি ওরফে ফেলি ওরফে মৃণালিনী দেবীর সাথে। ১৯ বছরের বিবাহিত জীবন ছিল আড়ম্বরহীন।আন্তরিকতা, নিষ্ঠা ও সারল্য দিয়ে পরিবারের সবার হৃদয় জয় করতে সক্ষম হন তিনি। বিত্তবান পরিবারের পুত্রবধূ হয়েও তাঁর মধ্যে দেখানদারি ভাব একদমই ছিল না। পাঁচ সন্তানের জননী হন তিনি। তিন কন্যা ও দুই পুত্র মাধুরীলতা, রথীন্দ্রনাথ, রেণুকা, মীরা ও শমীন্দ্রনাথ। বিয়ের পরই একবার নিজ বাড়ি দক্ষিণডিহিতে এসেছিলেন ভবতারিণী।

রবীন্দ্রনাথের আদিপুরুষ জগন্নাথ কুশারী ষোলো শতকের গোড়ার দিকে খুলনার পিঠাভোগ ছেড়ে এসে দক্ষিণ ডিহির জমিদার দক্ষিণানাথ রায় চৌধুরীর পুত্র রায় চৌধুরীর কন্যা সুন্দরী দেবীকে বিয়ে করে এই দক্ষিণডিহিতে বসতি স্থাপন করেন। এবং তারা বংশপরম্পরায় প্রায় দুই শত বছর এই দক্ষিণডিহির স্থায়ী বাসিন্দা ছিলেন। লেখা বাহুল্য, এই দক্ষিণা নাথের নামানুসারে এলাকাটির নাম দক্ষিণ ডিহি। অতঃপর জগন্নাথ কুশারীর অধস্তন পঞ্চম পুরুষ পঞ্চানন কুশারী দক্ষিণ ডিহি ত্যাগ করে কলকাতার উপকণ্ঠে গোবিন্দপুরের আদি গঙ্গার পাড়ে জেলেদের চৌহদ্দির মধ্যে বসবাস শুরু করেন। পঞ্চানন কুশারীর পৌত্র নীলমণি ঠাকুর জীবনের প্রান্ত-সীমায় এসে ১৭৮৪ খ্রিস্টাব্দে রবীন্দ্রনাথের জন্মের ঠিক সাতাত্তর বছর আগে জোড়াসাঁকোয় বাড়ি নির্মাণ করেন। এই নীলমণি ঠাকুর রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষ প্রিন্স দ্বারকানাথ ঠাকুরের পিতামহ। দেশত্যাগ করলেও বিয়ের কাজসহ অন্যান্য পারিবারিক কারণে ঠাকুর পরিবারকে বারবার দক্ষিণডিহিতে আসতে হয়েছে।

[৩]
২৫ বৈশাখ ও ২২ শ্রাবণ এখানে নানা আয়োজনে রবীন্দ্র জন্মজয়ন্তী ও কবিপ্রয়াণ দিবস পালন করা হয়।

এক জীবনে কত কিছু নিয়েই না লিখেছেন। বলতে গেলে হেন কোনো বিষয় নেই, যা তাঁর লেখার বিষয়বস্তু হয় নি। তাঁর লেখার পরিমাণ হয়ে আছে অনন্ত এক বিস্ময়। এক জীবনে একজন মানুষ এত লেখেন কী করে? এত এত লেখার পরও অনেক বিষয় রয়ে গেছে অনালোচিত। অনালোকিত। অনাবিষ্কৃত। ব্যক্তিগত অনেক কথাই তিনি ঊহ্য রেখে গেছেন। পারিবারিক জীবন নিয়ে খুব বেশি মুখ খোলেন নি। বিশেষ করে স্ত্রী আর শ্বশুরালয় নিয়ে বোধকরি তাঁর এক ধরনের অস্বস্তি ছিল। ছিল নির্লিপ্ততাও। না হলে এ বিষয়ে তিনি কেন এত নিশ্চুপ ছিলেন?

তাঁর লেখনি, তাঁর কর্মকাণ্ড ও তাঁর জীবন নিয়ে বিস্তারিত লেখা হয়েছে এবং হচ্ছে। তাঁকে নিয়ে গবেষণাও তো কম হচ্ছে না। নিত্য-নতুনভাবে উম্মোচিত হচ্ছেন তিনি। কত কত বিষয় নিয়ে আলোকপাত করা হচ্ছে। তাঁর মন মজেছে, এমন নারীদের নিয়েও তো লেখার কমতি নেই। কিন্তু তাঁর শ্বশুর বাড়ির বিষয়ে খুব বেশি তথ্য বা লেখা পাওয়া যায় না।

অথচ শ্বশুর বাড়ি নিয়ে তাঁর অনেক স্মৃতি, অনেক মুগ্ধতা, অনেক নস্টালজিয়া থাকার কথা। সেটি তো শুধু শ্বশুরালয় নয়, তার সঙ্গে জড়িয়ে আছে তাঁদের বংশের অনেক ইতিহাস, অনেক ঐতিহ্য, অনেক গৌরব। তাঁর শ্বশুর বাড়ি যে গ্রামে, সেই গ্রামটি তো তাঁর মাতুল বাড়িও। এ গ্রামের সঙ্গে পারিবারিক বন্ধন অনেক আগে থেকেই। এমনকি তাঁদের পূর্বপুরুষ পিঠাভোগের জমিদার জগন্নাথ কুশারী এ গ্রামের পতিত ব্রাহ্মণের ঘরে বিয়ে করার অপরাধে জাতচ্যুত হয়ে শ্বশুরালয়ে ওঠেন এবং সেই সুবাদে এখানে দীর্ঘ দিন বসবাসও করেছেন। একটা সময় পূর্বপুরুষদের কেউ কেউ জ্ঞাতি কলহে বিরক্ত হয়ে কলকাতা যান এবং সেখানেই স্থায়ী হন।

পরবর্তীকালে অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে তাঁরা ঠাকুর পরিবার হিসেবেই বিখ্যাত হন। কিন্তু তার আগে যে গ্রামটিতে বসবাস, সেখানকার আলো-হাওয়া-জল-মাটি তো বংশানুক্রমে তাঁর দেহ-মনে প্রবাহিত হওয়ার কথা। আর কিছু না হোক, অন্তত মায়ের জন্মস্থান বলে কথা। মামা বাড়িতেও কতবারই এসেছেন। খেয়েছেন দুধ ভাত। সেই স্মৃতি কি তাঁকে উদ্বেলিত করেনি? তাহলে এ নিয়ে উচ্চবাচ্য নেই কেন?

রবি মামার বাড়ি এলেও শ্বশুরবাড়ি এসেছেন কিনা জানা যায় না। তবে বিয়ের আগে পাত্রী দেখার উছিলায় একবার বোধকরি ঘুরে গিয়েছিলেন। বাধ্য হয়ে নিজেদের এস্টেটের কর্মচারীর মেয়েকে বিয়ে করায় বোধকরি একরকম অস্বস্তি ছিল। অস্বাচ্ছন্দ্য অনুভব করতেন হয়তো। রবির পিতৃব্য ও চিত্রশিল্পী অবনীন্দ্রনাথ ঠাকুর জানিয়েছেন, বিয়ের ব্যাপারে এক রকম চাপে পড়েই শেষ পর্যন্ত নিমরাজি হয়েছিলেন রবি। তাহলে তিনি কি অন্য কারও প্রতি গভীরভাবে অনুরক্ত ছিলেন?

একটি সূত্রে জানা যায়, একটি মামলার কারণে খুলনা মহকুমা হাকিমের আদালতে তাঁকে হাজিরা দিতে হয়। সেই সুবাদে ১৯০৮ সালের ৪ ডিসেম্বর শ্বশুরবাড়ি নাকি বেড়াতে আসেন। অবশ্য তার আগেই ১৯০২ সালের ২৩ নভেম্বর ভবতারিণীর মৃত্যু হয়। দক্ষিণডিহির কোথায় রবির মামাবাড়ির ভিটা, তা সঠিকভাবে জানা যায় নি।

ভবতারিণীর পরিবার অনেক আগেই কলকাতা চলে গেলেও সেখান থেকেই সম্পত্তির দেখভাল করা হতো। কিন্তু দেশভাগের পর এই সম্পত্তি আস্তে আস্তে বেদখল হতে থাকে। তারপরও ১৯৬৫ সাল পর্যন্ত ক্ষীণ হলেও তাঁদের একটা যোগাযোগ ছিল। ক্রমান্বয়ে তা চলে যায় দখলদারদের কবজায়। একপর্যায়ে এটি হয়ে পড়ে ঠিকানাবিহীন।
পত্র-পত্রিকায় লেখালেখি হওয়ার কারণে ১৯৯৫ সালে খুলনা জেলা প্রশাসনের উদ্যোগে বাড়িটি উদ্ধার করা হয়। এটি এখন পরিচিত ‘দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্স’ নামে। ১৯৯৯ সালের ১৯ নভেম্বর বাড়িটিকে সংরক্ষিত পুরাকীর্তি হিসেবে ঘোষণা করা হয়। তখন থেকে এটি পরিচালনা করে আসছে প্রত্নতত্ত্ব অধিদপ্তর।

[৪]
★দূর থেকেই দ্বিতল সাদা একটি বাড়ি দৃষ্টি কেড়ে নেয়। পারিপার্শ্বিক পরিবেশের মধ্যে ব্রিটিশ ঘরানার বাড়িটির আভিজাত্য ও পরিপাট্য নজর না কেড়ে পারে না। নিচের তলায় চারটি ঘর। উপরের তলায় দুটি। সামনে বড় একটি খোলামেলা বারান্দা। তাতে মনের আনন্দে দৌড়ে বেড়িয়েছে আমার ২০ মাস বয়সী কন্যা। আর আমরা প্রাণ ভরে নিয়েছি গ্রামের বিশুদ্ধ বায়ূ।

জানা যায়,প্রথমে বাড়িটি ছিল দোচালা টিনের। ভবতারিণীর সঙ্গে রবির বিয়ের পর সেখানে দ্বিতল পাকা ঘর নির্মাণ করা হয়। বর্তমান কাঠামোটি সে সময়ের। নিজেদের মর্যাদার খাতিরে ঠাকুর পরিবারই এটা নির্মাণ করে দেয়। এখন বাড়িটির অবয়ব আর আগের মতো নেই।খানিকটা বদলে ফেলা হয়েছে। তবে বেড়েছে সীমানা। সাংস্কৃতিক কর্মকান্ড পরিচালনার জন্য গড়ে তোলা হয়েছে মঞ্চ। ভবনটির অবকাঠামো ছাড়া অতীতের তেমন কিছু নেই। হাল আমলে সংযোজিত হয়েছে কিছু ফটোগ্রাফ।এই দ্বিতল ভবনের উপর একটি চিলেকোঠা রয়েছে। মূল ভবনের নীচ তলায় ৪টি এবং দ্বিতলে ২টি কক্ষ রয়েছে। দক্ষিণ দিকে একটি বারান্দা আছে। পূর্ব-পশ্চিমে লম্বা এই ভবনটি বাহ্যিক পরিমাপ ১৫.৫৫মিটার (দৈর্ঘ্য) ও ৭.৮৮ মিটার (প্রস্থ)। বারান্দার পরিমাপ ৮.১২ মিটার (দৈর্ঘ্য) ও ৩.৪২মিটার (প্রস্থ)। ভবনের দেয়ালের পুরুত্ব ০.৬০মিটার। ভবনের নীচতলার উচ্চতা ৪.০১মিটার। উপর তলার উচ্চাতা ৪.২১ মিটার। ভবনটির দেয়ালের গাথুনীতে ব্যবহৃত ইটের পরিমাপ ২৫সেমি, ১২সেমি ও ৭সেমি। ভবনের স্থাপত্য ও গঠন কাঠামোতে বৃটিশ যুগের স্থাপত্য রীতিনীতির প্রভাব সুস্পষ্ট। সম্ভবত উনবিংশ শতাব্দীর শেষ দিকে এই ভবন নির্মিত হয়েছিল।

দক্ষিণ দিকে ৫ টি ধাপ বিশিষ্ট সিঁড়ির সাহায্যে ৩টি অর্ধবৃত্তাকার খিলানপথের মধ্যে দিয়া বারান্দায় প্রবেশের পথ রয়েছে। খিলান তিনটি দুটি গোলাকার স্তম্ভের উপর স্থাপিত। পূর্ব-পশ্চিম দিকেও বারান্দায় দুটি অর্ধ বৃত্তাকার খিলান আছে। ভবনটির ছাদ লোহার কাড়িকাঠ ও বর্গার সমন্বয়ে নির্মিত। ভবনের ছাদের তলদেশ লোহা ও কাঠের বর্গার উপর স্থাপিত। একতল ও দ্বিতলা ছাদ বরাবর সমান্তরাল কার্ণিস আছে। ছাদের উপরে দক্ষিণ দিকে একটি প্যারাপেট আছে। প্যারাপেটের মধ্যে চুন বালির কাজ করা নকশা রয়েছে। নীচ তলায় ৮টি দরজা ও ২১টি জানালা আছে। ভবনের দরজা জানালায় কাঠের খড়খড়ি রয়েছে। জানালা ও দরজায় পিতলের কব্জা আছে। নীচতলার বারান্দায় প্রবেশের পর মূল ভবনে প্রবেশের জন্য ১টি দরজা ও ২ পার্শ্বে ২টি জানালা আছে। জানালায় মোটা লোহার গরাদ আছে। ভিতরে ও বাহিরে ২টি করিয়া প্রতি জানালায় কাঠের মোট ৪টি পাল্লা আছে। কোন কোন জানালায় কাঠের খড়খড়ি দেখা যায়। নীচ তলায় একটি কক্ষে কাঠের পাল্লা যুক্ত দেয়াল আলমিরা আছে।

দ্বিতলে মোট ৭টি দরজা এবং ৬ট জানালা আছে। দোতলায় নীচ তলার অনুরুপ কাঠের পাল্লাযুক্ত তিনটি দেয়াল আলমিরা আছে। দ্বিতলের বারান্দার সম্মুখ ভাগে ৬টি গোলাকার স্তম্ভ ক্যাপিটালসহ দৃশ্যমান। বারান্দার পূর্ব, পশ্চিম ও দক্ষিণ পাশে লোহার রেলিং রয়েছে। দ্বিতলের বারান্দার উভয় পার্শ্বে লোহার রেলিং এবং উপরে ড্রপওয়াল হিসাবে ব্যবহৃত কাঠের খড়খড়ি আছে। সিঁড়ির সাহায্যে দোতলায় ও তিনতলার চিলিকোঠায় ওঠার ব্যবস্থা আছে। লোহার কারুকার্য খোচিত নকশার উপরে কাঠের নির্মিত সিড়ির রেলিং রহিয়াছে। মূল ভবনের পূর্বদিকে চারটি অর্ধবৃত্তকার প্রবেশপথসহ একটি কক্ষ রহিয়াছে। উত্তর দিকের দেওয়ালের বাহিরের দিকে নীচতলার ছাদ বরাবর অনেকগুলি লোহার কড়া সমান্তরাল ভাবে লাগানো আছে। পূর্বে সম্ভবত: ইহার সহিত একটি চালা সংযুক্ত ছিল। এই দিকের দোতালার জানালাগুলির বাহিরের দিক কাঠের সানশেড দ্বারা আচ্ছাদিত ছিল। ইহাতে বৃষ্টির পানি ঘরে প্রবেশ করিতে পারিত না।

★বহুকাল আগে থেকেই ইতিহাসের পাতায় দক্ষিণ ডিহি এবং পিঠাভোগ নামক দুটি গ্রামের মধ্যে সৃষ্টি হয় আত্মীয়তার বন্ধন। এর ফলে বদলে যায় ইতিহাসের ধারাক্রম। খুলনা জেলার রূপসা উপজেলার ৫ নম্বর ঘাটভোগ ইউনিয়নে অবস্থিত পিঠাভোগ গ্রাম। এ গ্রামের কুশারী বাড়িতে বসবাস করতেন রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষরা।প্রত্যন্ত এলাকায় দর্শনার্থীদের স্বাগত জানায় নবনির্মিত একটি ফটক।কিন্তু দুঃখজনক হলেও সত্য, রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের পূর্বপুরুষের কারুকার্যখচিত আদি ভিটাবাড়ি ১৯৯৪ সালে ভেঙে ফেলা হয়। হারিয়ে যায় ইতিহাসের একটি অমূল্য নিদর্শন। এ নিয়ে পত্রিকায় রিপোর্ট প্রকাশিত হলে এই ভিটা সংরক্ষণের উদ্যোগ নেয় জেলা প্রশাসন। শূন্য ভিটায় নির্মাণ করা হয়েছে রবীন্দ্র সংগ্রহশালা। একতলা এই ভবন সংলগ্ন গড়ে তোলা হয়েছে উম্মুক্ত একটি মঞ্চ। আদি ভিটাবাড়ি না থাকলেও অনেকটাই অকৃত্রিম আছে এ এলাকার গ্রামীণ পরিবেশ ও প্রকৃতি। অসংখ্য গাছগাছালি। পেছনে মস্ত একটি নির্জন পুকুর। তাতে মুগ্ধতা ছড়াচ্ছে শাপলা। পাশে ছন আর টিনের ঘর। গোধূলি চারপাশে ছড়িয়ে দিতে থাকে তার মাধুরী। যেন থমকে আছে আবহমানকালের চিরায়ত বাংলা।

পূর্বপুরুষের ভিটায় রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর কখনও এসেছিলেন কিনা জানা যায় না। তবে ভিটা সংলগ্ন এলাকায় এখনও বসবাস করেন কুশারী পরিবারের বংশধররা। তাঁদের আর্থিক অবস্থা মোটেও স্বচ্ছল মনে হলো না। তাঁরাই দেখভাল করেন সংগ্রহশালা।

দর্শনার্থীরা এলে খুলে দেন ইতিহাসের সিংহদ্বার। তবে লতা-পাতায় কবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের বংশধর হতে পেরেও তাঁরা খুবই গর্ব অনুভব করেন। যত দূরের সময়ের হোক না কেন, এই মাটিতে পোতা বীজের এক সন্তান আলোকিত করেন বিশ্ব সাহিত্যের ভুবন। এ গর্বটুকু আমাদেরও ছুঁয়ে ছুঁয়ে যায়।

[৫]
★যেভাবে যাবেন দক্ষিণডিহি:
দেশের যে কোনো স্থান থেকে খুলনা মহানগরীতে এসে ১৯ কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিম ফুলতলা উপজেলা সদর থেকে তিন কিলোমিটার উত্তর-পশ্চিমে গেলে দক্ষিণডিহি গ্রাম। গ্রামের ঠিক মধ্যখানে মাথা উঁচু করে দাঁড়িয়ে আছে রবীন্দ্র-মৃণালিনীর স্মৃতিধন্য একটি দোতলা ভবন। এটাই রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের শ্বশুর বাড়ি। খুলনা শহর থেকে বাস বা সিএনজি তে করে প্রথমে ফুলতলা এবং তারপরে সেখান থেকে ভ্যান বা অটো তে করে সহজেই চলে যেতে পারবেন দক্ষিণডিহি রবীন্দ্র কমপ্লেক্সে।

★যেভাবে যাবেন পিঠাভোগ:
খুলনা জেলার রূপসা নদীর পূর্ব তীর ঘেঁষে দাঁড়িয়ে আছে একটি সুপ্রাচীন গ্রাম। নাম তার পিঠাভোগ, বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথের পূর্ব পুরুষের আদিনিবাস ছিল এই গ্রামের কুশারী বাড়ি । খুলনা মহানগরী থেকে প্রায় ১৩ কিলোমিটার পূর্বে রূপসা উপজেলায় অবস্থিত এ পিঠাভোগ গ্রামে। খুলনা আঞ্চলিক প্রত্নতত্ত্ব অধিদফতরের পরীক্ষামূলক সমীক্ষায় পিঠাভোগ গ্রামে রবীন্দ্রনাথের পূর্ব পুরুষের ভিটার ভিত্তিপ্রস্তরের সন্ধান পাওয়া গেছে। এখানে কবিগুরুর একটি আবক্ষ ভাস্কর্য স্থাপন করা হয়েছে। প্রতি বছর এখানে রবীন্দ্র জন্মবার্ষিকী উদযাপন করা হচ্ছে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।