সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে শিবদেব মিত্র (পর্ব – ৪)

আছে, আছে, নাই রে …

 

সে, খুশি । হ্যাঁ, খুশি বলেই মানি তাকে আমি। আসলে সে কেউ না , তবে এ গল্প শুরুর প্রথম দিকটায় কেমন যেন সেইই ছিল অনুপ্রেরণা আমার । সাড়ে সাতির দ্বিতীয় চরণে আমায় যে নিঃসঙ্গতার বিধুরতা কাতর করে তুলেছিল, এখন তা অনেকটাই প্রশমিত। এইই বোধহয় সময়ের নিজস্ব গুণ! সে তার আপন হাতের ডোলে, চরিত্রদের আত্মসংযমে বেঁধে নির্মান করে তোলে প্রতিটি একক অনন্যতায়।

তাই খুশি, আমার শুধুই অনুপ্রেরণা। তার বেশি না। খুশির স্পর্শ আমি হৃদয়ে অনুভব করি তবে তা আমার বাঁধ ভাঙতে পারেনা। খুশির প্রতি ভালোবাসা তাই স্নেহ আর প্রীতির নিগড়ে বাঁধা। তাতে সুখ আছে , প্রেম নাই। ভালোবাসা আছে, তবে তার কাছে কোনো প্রত্যাশা নাই। এমন বন্ধুত্ব দৈবে মেলে। দৈবে মিলিয়ে যায়।

তবে এ অস্বীকার করিনা, এক আশ্চর্য দৈবি ক্ষমতার অধিকারী খুশি। যা হয়তো সে নিজেও জানে, মনের গভীর প্রত্যয়ে। আমি সব ঝড় ভুলে যাই তার দিকে চেয়ে। এসব সে জানেনা। আমিও বলিনি তাকে। তবু মনে হয় সব জানে সে। যেমন করে আমার মনের অতল সঞ্জীবনীটুকু চিনে নিত শ্রুতি, সমস্ত অব্যক্ততা ফুঁড়ে।

 

••

গোলাম মুরশিদ এর ‘প্রমিলার প্রতীক্ষা’ বইটা দিয়েছিল, মহুয়াই। শ্রীরাজ মাস্টার গল্পের ছলে নজরুল জয়ন্তীর অনুষ্ঠান শেষে কাজী নজরুল ইসলামের সাহিত্য সাধনা প্রসঙ্গে অন্যতম অনুপ্রেরণাদায়িনী প্রমীলা দেবীর কথা বলছিলেন ছাত্রছাত্রীদের।

নজরুল যদি কোন নারীকে সবচেয়ে বেশী ভালোবেসে থাকেন তিনি তাঁর দ্বিতীয়া স্ত্রী প্রমীলা দেবীকে। প্রমীলা দেবীর আসল নাম ছিলো আশালতা সেনগুপ্ত। ডাকনাম দোলনা। তবে আদর করে অনেকে ডাকতেন দুলি নামে। প্রমীলা দেবী ছিলেন তাঁর বাবার দ্বিতীয় স্ত্রীর একমাত্র সন্তান। বাবাকে হারিয়েছিলেন শৈশবেই। কাকার সংসারে বেড়ে ওঠা তাঁর।

কুমিল্লায় যখন রাজনৈতিক মিছিল বেরিয়েছে, তখন কিশোরী দুলি তাতেও অংশ নিয়েছেন বলে জানা যায়।
সেই সময় এক চৈত্র মাসের শেষে কান্দিরপাড়ের সেই বাড়িতেই এসেছিলেন নজরুল। মাত্র কদিনের জন্য এসেছিলেন নজরুল কিন্তু সেই কদিন বাড়ির হাওয়ায় ঝড় তুলে তিনি আবার ঝড়ের গতিতেই চলে গেলেন দৌলতপুর নামে এক গ্রামে।

সেখান থেকে দেড় মাস পরেই খবর এল, নুরুদার বিয়ে। বাড়ির অন্যদের সঙ্গে প্রমীলাও গিয়েছিলেন। কিন্তু দুঃখের বিষয় হলো, সেই রাতেই বিয়েটা হতে হতে ভেঙে গেল। তার পরই নুরুদা আর প্রমীলার চাচাতো ভাই বীরেন্দ্রনাথ সেনগুপ্ত আষাঢ়ের সেই জোছনারাতে কান্দিরপাড়ে চলে যান। পরের দিন প্রমীলাও ফিরে আসেন।

এই দুর্ঘটনার প্রচণ্ড আঘাতে নুরুদা মুষড়ে পড়েন। কিন্তু সপ্তাহ তিনেক পর কলকাতা থেকে আসা এক বন্ধুর সঙ্গে নজরুল কলকাতায় ফিরে যান। তবে মাস তিনেক পর, অক্টোবর মাসে, নজরুল আবার কান্দিরপাড়ে বেড়াতে আসেন। সেবারে পাঁচ-ছয় সপ্তাহ ছিলেন।
তারপর প্রমীলাদের বাড়িতে নজরুল এসেছিলেন
পরের বছর মাসে ১৯২২ সালের ফেব্রুয়ারিতে।

নজরুল একদিন তাঁকে একটা কবিতা উপহার দিলেন, যার প্রথম পঙ্‌ক্তিতেই আছে—‘হে মোর রানী, তোমার কাছে হার মানি আজ শেষে।’ এ কথার মানে দুলি বোঝেন, আবার বোঝেন না। এ কি তাঁকেই বলা? সেবার এসে নজরুল কান্দিরপাড়ে ছিলেন প্রায় চার মাস। শেষ দিকে তাই নিয়ে রক্ষণশীল হিন্দুরা কুৎসা রটাতে আরম্ভ করেন, তাঁকে অপমান করতে উদ্যত হয়েছিলেন। ওদিকে কলকাতা থেকেও কাজের ডাক আসে। তাই মে মাসের শেষে নজরুল কলকাতায় ফিরে যান।

১৯২২ সালের নভেম্বর মাসে নজরুল এবং প্রমীলার দেখা হয় বিহারের সমস্তিপুরে, প্রমীলার মামার বাড়িতে। নজরুলের কাছ থেকে প্রমীলা শুনলেন, তাঁর পেছনে পুলিশ লেগেছে। প্রমীলার হৃদয় আশঙ্কায় দুলে ওঠে। নজরুল তাঁদের সমস্তিপুর থেকে কান্দিরপাড়ে পৌঁছে দিলেন। কিন্তু সেখানে যাবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গে কবিতায় কী একটা কথা লেখার অভিযোগে নুরুদা গ্রেপ্তার হলেন পুলিশের হাতে। মামলা হলো, মামলায় তাঁর সাজা হলো এক বছরের।

জেল থেকে ছাড়া পেলেন ১৯২৩ সালের ডিসেম্বরে।
তার তিন-চার দিনের মধ্যেই প্রমীলার মিলন হলো।
কিন্তু কদিন পরই নজরুলের আরেকটা মামলা ছিল। তাই কান্দিরপাড়ে বেশি দিন থাকা সম্ভব হলো না। তা ছাড়া বর্ণ হিন্দুরা ঝামেলা করছিলো। তাই প্রমীলা আর তাঁর মাকে সমস্তিপুরে পৌঁছে দিয়ে নজরুল কলকাতায় চলে যান।

নজরুল এবং প্রমীলার বিয়ে হয় ১৯২৪ সালের ২৫ এপ্রিল। এবারও সমস্তিপুর থেকে দুলি আর তাঁর মাকে কলকাতায় নিয়ে এসেছিলেন নজরুল। নজরুল স্ত্রীর দোলনা নাম পাল্টে রাখলেন প্রমীলা। বিয়ের আগে প্রমীলাকে পার হতে হয়েছিল দুস্তর সমুদ্র। প্রথমেই ছাড়তে হয়েছিল তাঁর পরিবারকে, যে পরিবারের আশ্রয়ে তিনি বড় হচ্ছিলেন, যে পরিবারের লোকেরা ছিলেন তাঁর একমাত্র আপনজন। তাদের সকলকেই। তাছাড়া প্রবল বাধা এসেছিল সমাজের তরফ থেকেও। কারণ, হিন্দু আর মুসলমানের মধ্যে বিয়ে হয় না। যদিও তখনকার একাধিক রাজনীতিক এ বিয়ের প্রতি তাঁদের সমর্থন জানিয়েছিলেন। তা সত্ত্বেও বেশ গোপনীয়তা অবলম্বন করে মুসলমান-অধ্যুষিত সড়কের এক বাড়িতে তাঁদের বিয়ে হয়েছিল। বিয়ে হতে আইনের বাধাও কম ছিল না। বাধা থাকত না যদি প্রমীলা ইসলাম ধর্মে দীক্ষিত হতেন অথবা তাঁর বয়স অন্তত আঠারো হতো। কিন্তু তাঁর বয়স ছিল ষোলো বছরেরও সপ্তাহ দুয়েক কম। তিনি মুসলমান হতে চাননি, নাকি তাঁর মা গিরিবালা দেবী তা চাননি, নাকি নজরুলই তা চাননি—জানা যায় না। কিন্তু আইনের বাধাকে গোঁজামিল দিয়ে অতিক্রম করেন নজরুল ও তাঁর বন্ধুরা। শেষ পর্যন্ত তাঁদের বিয়ে হয় ইসলামি রীতি অনুযায়ী। নজরুলের বেশির ভাগ বন্ধুই ছিলেন হিন্দু। কিন্তু বিয়েতে তাঁদের একজনও উপস্থিত ছিলেন না।

বিয়েতে ধুমধাম করার মতো টাকাপয়সা নজরুলের ছিল না। বিয়ে হয়েছিল মাসুদা রহমান নামের এক বিশিষ্ট নারীর সার্বিক আনুকূল্যে। বিয়ের সঙ্গে যুক্ত আনন্দ-উৎসবও বলতে গেলে কিছুমাত্র ছিল না। সবচেয়ে বড় সংকট দেখা দেয় বিয়ের পর। ‘বিদ্রোহী কবি’ হিসেবে বিখ্যাত হলে কী হবে—মুসলমান নামধারী নজরুলের পক্ষে বাড়ি ভাড়া পাওয়া প্রায় অসম্ভব হলো। আর প্রমীলা ও গিরিবালা দেবী পড়লেন নিজেদের স্বরূপের সংকটে। তাঁরা না মেশার সুযোগ পাচ্ছিলেন হিন্দু পাড়া-প্রতিবেশীদের সঙ্গে, না পারছিলেন মুসলমানদের সঙ্গে স্বচ্ছন্দে মিশতে। সংসারের মধ্যে থেকেই তাঁরা একেবারে নিঃসঙ্গ হয়ে পড়লেন। এই নিঃসঙ্গতা আংশিকভাবে তাঁরা কাটিয়ে উঠতে পারতেন নজরুল যদি ঘরমুখী হতেন। কিন্তু তিনি বেশির ভাগ সময়ই থাকতেন ঘরের বাইরে। তাঁর জগৎটা ছিল সংসার থেকে অনেক দূরে—বন্ধুদের মধ্যে। তাঁর সময় কাটত আড্ডা দিয়ে, গান গেয়ে, হইচই করে। তাঁর ধারণা ছিল ‘বেলা যাবে এবে (গান গেয়ে আর) পান খেয়ে।’ স্ত্রীকে সঙ্গ দেবার মতো অফুরন্ত সময় কোথায় তাঁর?

শেষ জীবনে পক্ষঘাতগ্রস্থ হয়েছিলেন প্রমীলা দেবী। রোগ সারানোর জন্য কবি নজরুল কোনো চিকিৎসাই বাদ রাখেননি। প্রমীলার প্রতি নজরুলের কতটা দরদ ও প্রেম ছিল সে সম্পর্কে অনেক নজরুল গবেষকও অবগত নন। দেব-দেবী, ভূত-প্রেত, সাধু-সন্ন্যাসীর মন্দির, পীর-ফকির, তাবিজ-কবজ, মাজার, পানিপড়া এসব নিয়েও কবি প্রমীলাকে সারিয়ে তোলার প্রাণপণ চেষ্টা করতে থাকেন। কবি জসীম উদ্দীনের বিবরণী থেকে জানা যায় কোন এক দরবেশের পরামর্শে নজরুল শত বছরের কচুরী পানাভর্তি এক পচাডোবায় সন্ধ্যা থেকে সকাল পর্যন্ত শরীর নিমজ্জিত রেখে অতঃপর দরবেশের তাবিজ নিয়ে প্রমীলাকে দিয়েছেন। কিন্তু কিছুতেই কিছু হয়নি। প্রমীলা দেবীও ঐ অসুস্থ অবস্থার মধ্যেও যতদিন পেরেছেন, ঐ অচল অবস্থাতেও তিনি নিজ হাতে স্বামীকে খাইয়ে দিয়েছেন। কবির ভক্ত ও বন্ধুবান্ধবদের সঙ্গে তিনি একান্ত আপনজনের মতো ব্যবহার করতেন। ১৯৬২ সালের ৩০ জুন মারা যান প্রমীলা। তাঁকে কবর দেওয়া হয় চুরুলিয়ায় নজরুলের পৈতৃক বাড়িতে। তাঁর ইচ্ছা অনুসারে তাঁর কবরের পাশে জায়গাও রাখা হয়েছিলো নজরুলের জন্য। যদিও তাঁর শেষ ইচ্ছেটা পূরণ হয়নি। ১৯৭৬ এ নজরুলের ঢাকায় মৃত্যু হলে, তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ক্যাম্পাসেই মাটি (কবর) দেওয়া হয়।

কাহিনীর বিশ্লেষণ দিতে দিতে আবেগে গলা ধরে আসে শ্রীরাজ মাস্টারের।

 

ক্রমশ..

* কাহিনীর প্রতিটি চরিত্র কল্পনাপ্রসূত। বাস্তবে সাজুয্য আকস্মিক বৈ তো না !

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।