সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৫১)

রেকারিং ডেসিমাল

দু জন চল্লিশ পেরোনো মানুষ প্লেনে ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম পৌঁছে গেল।
স্যারের অফিসের গাড়ি চট্টগ্রাম অফিসারস ক্লাবের সামনে দিয়ে ঘুরেফিরে নামিয়ে দিল মস্ত হোটেলে। পাশেই কক্স বাজার বিচ। পৃথিবীর দ্বিতীয় দীর্ঘতম প্রাকৃতিক সমুদ্র তট,  দেড়শ কিলোমিটার লম্বা।
বিচে হেঁটে, দৌড়ে, ছবি তুলে হদ্দ হয়ে আবার হোটেলে ফেরা।
বিকেলে হোটেলের লম্বা গাড়ি নিয়ে বেরোনো হল। এদিক ওদিক দেখে গাড়ি পৌঁছে গেল গাছপালায় ঢাকা টিলার ওপর।
সানসেট পয়েন্ট দেখতে অনেক লোকের ভীড়। তার মধ্যেই আরও খানিকটা উঠে দাঁড়িয়ে পড়লেন দু জনে।
ধাতব বেড়ায় ঘেরা বাংলো।
সামনের লনে বাগান। সেখানে প্ল্যাকার্ড।
লেখা আছে, এটি চিফ ম্যাজিস্ট্রেটের বাসস্থান।
গেটে ঠেলতেই খুলে গেল।
কি উত্তেজিত হয়ে বাংলোর সামনে দাঁড়িয়ে ছবি তুলছেন দু জনে।
লুঙ্গি পরা, মাথায় পাগড়ি, দাড়িওয়ালা দারোয়ান হই হই করে ছুটে এল।
কি কি ? কি করতাসেন? হেইডা জজ সাহিবের ঘর। কুন ছবি না।
তাকে যখন বলা হল, এই সাহেব ইন্ডিয়া থেকে এসেছেন এইখানে নিজের জন্মস্থান দেখতে,  তার কি চওড়া হাসি।
কয়,  লয়া যান। ছবি এক দুইটা উঠ্যায়া লন। হ, এই ডা না করুম না।
কিন্তু অন্য লুকের আসন মানা ছ্যার।
বুকের মধ্যে আকুলিবিকুলি নিয়ে নেমে এসে গাড়িতে বসা হল।
সন্ধ্যে নেমে আসা আলোয় পিছনে দেখা গেল টিনের ঢালু ছাদ,  দোতলা সাহেবি বাংলো, বারান্দা,  আর ফেলে আসা মানুষদের স্মৃতি।
পুরোনো হওয়া নতুন বউয়ের মনে পড়ে, তার সংগ্রহে থাকা সেই পোস্টকার্ডদের, যাতে ঝরঝরে ইংরেজিতে সম্বোধন আছে, সোনালি ডার্লিং।
সেই মিতভাষী স্মিত হাসির মানুষটি, যিনি তার শ্বাশুড়িকে বলেছিলেন, ট্রাস্ট দিস গার্ল ব্লাইন্ডলি।
আর সেই গার্লকে বলেছিলেন এক অমোঘ অভিজ্ঞতালব্ধ বাক্য, আইনজীবী এবং প্রাজ্ঞ মানুষ হিসেবে।
মানুষ যে কাজ একবার করে, তা বারবার করে। চাপে পড়ে থেমে থাকতে পারে। কিন্তু জানবে, চরিত্র বদলায় না। আবার সুযোগ পেলে সেই কাজ করে ধরা পরবে। আমি এতখানি জীবনে কখনও এর অন্যথা দেখিনি।
পেশা এবং সংসার জীবনে কতবার বুড়ো হতে হতে মিলিয়ে নিয়েছেন কথাটা ডাক্তার।
প্রণাম আর মন কেমন পিছনে রেখে হোটেলে এসে নামেন এখন এই দেশের কাছে বিদেশি হয়ে আসা দম্পতি।
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!