সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে শিবদেব মিত্র (পর্ব – ৩)

আছে – আছে – নাই রে

“বরফ জলই হয়। আগুন ছাই।
কী হবে খানাতল্লাসে?
নিজেকে এত বড় ভাবে সবাই,
পৃথিবী ছোট হয়ে আসে।”

লাইনগুলো মনে পড়ে , মুচকি হাসে শ্রীরাজ মাস্টার । ক্লাস শেষে কলেজের করিডর ধরে হাঁটতে থাকে লোকটা । কয়েকটা মুগ্ধ অনুগত চোখের তৃষিত চেয়ে থাকাও, এক সুখ! এক অনির্বচনীয় জীবন তৃপ্তি। তার মনে হয়। আর সেইটুকু জুড়েই বেঁচে আছে সে। কয়েক জোড়া চোখ, কয়েকটা প্রাণ আর তাদের মুগ্ধতায় ভিজে যাওয়া মুহুর্তেরা…

মুগ্ধতার আরেক নামই তো প্রেম । যেখানে হৃদয় জোড়ায় প্রাণের । রবি ঠাকুরের লাইনগুলো আউড়ে ওঠে সে- “আঁখি মেলে যারে ভালোলাগে/তাহারেই ভালো বলে জানি/সব প্রেম প্রেম নয়/ছিলো নাতো সংশয়/যে আমারে কাছে টানে/তাহারে কাছে টানি……….”!! কি দৃপ্ত জীবন কৌশল।

জীবন যেন নদী। প্রতি বাঁকেই তার কত ক্ষয়, কত না সঞ্চয়! শ্রুতিকে আমি মনে করিনা আর। তবু শ্রুতি আমার জীবনের মাইল স্টোন। আমার আত্মদীপ। যে আমায় চিনিয়েছিল আমাকে নিজেকে । অস্বীকার করিনা, শ্রুতিই সে যে আমায় ভালোবেসেছিল কখনও। ভালোবাসার সুখ বোধহয় এটাই যা সমস্ত প্রতিরোধকে অতিক্রম করে মানুষকে অপ্রতিরোধ্য করে তোলে।

শ্রুতি চলে যাওয়ার পর তাই জীবন জুড়ে অপরিসীম অভিকর্ষশূন্যতা অনুভূতি করা শুরু করলাম আবার। যা আমায় বৈরাগী করতে শুরু করল জীবনের প্রতি। আমি চিনতে শিখলাম আমার অবস্থান। কই আমি? কে আমি?
কে আমার?

“তার মানে আরও কেউ জিজ্ঞাসা করেছিল আপনাকে, তাই তো?” জিজ্ঞাসা করেছিল সে। মৃদু হেসে প্রসঙ্গ এড়িয়ে গিয়েছিল শ্রীরাজ মাস্টার। আমাদের জীবন শুধুই একটা রূপকথা নয়। তবে কারোর কারোর জীবন সত্যিই রূপকথার মতন হয়! মাস্টারদা সূর্য সেনকে একটা জ্বলন্ত রূপকথা মনে করে শ্রীরাজ মাস্টার। কেউ তাকে মাস্টারদা বলে ডাকলে লাজুক ভঙ্গিতে ‘দুর্ , আমি কি আর তাঁর মত’ বললেও, মনে মনে সে যে বেশ আত্মপ্রসাদ পায় এ সম্বোধনে – তা আমরা জানি ।

একদিন সকালে প্রাইভেট টিউশন পড়াতে গিয়ে, শ্রীরাজ মাস্টার এক ছাত্রকে বলল – জানিস, মাস্টারদাও ছোট ছোট ছেলে মেয়েদের অংক শেখাতেন আমার মত !! কতবারই না ছাত্রছাত্রীদের কাছে গল্পের ছলে মাস্টারদার অমিত বীরগাথার কাহিনী বলেছে যে সে তার ইয়ত্তা নেই। একদিন গল্প বলছিল মাস্টার।

সেদিন ছিল ২২ এপ্রিল ১৯৩০ । বিকেল পাঁচটা। পশ্চিম আকাশে বিদায়ী সূর্যের অস্তরাগ মেখে জালালাবাদ পাহাড়ে ছোট ছোট দলে ভাগ হয়ে বিশ্রাম করছেন ইন্ডিয়ান রিপাবলিকান আর্মির প্রায় জনা সত্তর যুবা।

সর্বাধিনায়ক মাস্টারদা, নির্মল সেন-অম্বিকা চক্রবর্তী আর লোকনাথ বলের সাথে আলোচনায় মগ্ন পরবর্তী পদক্ষেপ নিয়ে। অনন্ত সিং আর গণেশ ঘোষ সেই যে বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো, আর তাদের কোন খবর নেই। নীচে পাহাড়ের কোল ঘেঁষে একেবেকে চলে গেছে রেললাইন। যেতে যেতে একটা ট্রেন হঠাৎ ওখানে দাঁড়িয়ে গেলো। ওটা তো কোন স্টেশন নয়। তবে ? এ কি! ট্রেন থেকে লাফিয়ে লাফিয়ে নামছে অগণিত বৃটিশ সেনা । হাতে ধরা অস্ত্র নিয়ে তারা যে এগিয়ে আসছে তাদের দিকেই !‌

ঝটিতি উঠে দাঁড়ালেন সূর্য সেন। গলা চড়িয়ে বললেন- ‘বন্ধুগন, সামরিক শক্তির সাথে আজ স্বাধীনতাকামী বিপ্লবী শক্তির লড়াই। দেখা যাক কে জেতে ! আজকের এই সংগ্রামে নেতৃত্ব দেবে লোকনাথ বল । সবাই পজিশন নাও।’

ইস্টার্ন রাইফেলস এর দুই কোম্পানি সেনা ততক্ষনে বন্দুক উঁচিয়ে পৌঁছে গেছে সামনের খোলা ধানক্ষেতে। তারা কিছু বুঝে ওঠার আগেই জেনারেল বলের হুঙ্কার শোনা গেল…..হলট্!! আর তারপরেই আদেশ দিলেন……ফায়ার ! একসাথে গর্জে উঠলো সবকটা রাইফেল। পড়িমড়ি করে পালাতে বাধ্য হল ইংরেজ সেনা। আনন্দে ফেটে পড়লো যুব বিদ্রোহীর সৈনিকরা।

বেশিক্ষণ স্থায়ী হলনা অবশ্য তাদের সে আনন্দ। দক্ষিণ পূর্ব কোণের একটা উঁচু টিলা থেকে ভেসে এলো ভাইকার মেশিনগানের শব্দ। গুড়ুম!! গুড়ুম!! বৃটিশ সেনা উচ্চতার সুবিধা নিয়ে টানা গুলিবর্ষণ করতে লাগল বিপ্লবীদের ওপর। তাতে অবশ্য ঘাবড়ে গেলোনা মৃত্যু পাগল যুবারা। কিন্তু সমস্যা এলো অন্যদিক থেকে। টানা গুলিবর্ষণের ফলে তাদের মাস্কেট অসম্ভব গরম তো হচ্ছিলই সাথে কার্তুজগুলোও ঠিকমতো চেম্বারে ঢোকানো যাচ্ছিলনা। তা সত্বেও জেনারেল বল হুকুম দিলেন – যে করেই হোক মেশিনগানটাকে থামাতে হবে !‌

এদিকে একনাগাড়ে গুলি চলছে তাদের লক্ষ্য করে, লায়িং পজিশন থেকে মাথা উঁচু করাই মুস্কিল। তারমধ্যে এক দুরন্ত কিশোর মাঝে মাঝেই লাফ দিয়ে উঠে গুলি চালাচ্ছে মেশিনগান লক্ষ্য করে। শেষপর্যন্ত পারলো না তাঁর অনিবার্য পরিণতিকে ফাঁকি দিতে। পাহাড় কাঁপিয়ে আর্তনাদ করে উঠলো সে, ‘সোনাদা আমি চললাম। তোমরা কিন্তু থেমোনা!!’ একটা গুলি এসে বিঁধেছে ঠিক তার পাঁজরের নিচে ।

পাহাড়ের বুকে ঢলে পড়লো জালালাবাদ যুদ্ধের প্রথম এবং কনিষ্ঠতম শহীদ, হরিগোপাল বল।‌‌ পনেরো বছর বয়স হতে তখনও কিছুদিন বাকি তার।হরিগোপাল বললে অবশ্য অনেকেই চিনতে পারবেন না। চট্টগ্রাম মিউনিসিপ্যাল স্কুলের ক্লাস নাইনের এই ছেলেটি ছিল লোকনাথ বলের ছোটভাই। ফুটবল মাঠে প্রতিপক্ষের প্রতিরোধ বাঘের মতো ছিন্ন করে গোল করত বলে মাস্টারমশাইরা আদর করে বলতেন টাইগার। বন্ধুদের মুখে সেটাই হয়ে গিয়েছিল ‘টেগরা’ ! আর স্বাধীনতা সংগ্রামের ইতিহাসে এই নামেই অমর হয়ে রইলেন তিনি।‌

গুলি বিদ্ধ টেগরা কে বুকে তুলে নিলেন দাদা লোকনাথ বল । একটা ঝোপের পিছনে নিয়ে গিয়ে নাকের নিচে হাত দিয়ে দেখলেন সব শেষ! আর কোন দিন সোনা দা বলে ডাকবে না তাঁর আদরের ছোটভাইটি । তার কপালে একটা চুম্বন দিয়ে থামালেন বুক ভাঙা চোখের জল। তারপর বলেছিলেন, ‘কে সোনাদা ? যুদ্ধক্ষেত্রে দাদা বলে কেউ নেই। আমরা সৈনিক, আমাদের একটাই কর্তব্য…..হয় মারো, নয় মরো ! ‘

এবার রুষ্ট বাঘের মতো গর্জে উঠে বললেন, ফায়ার আনটিল দি এনিমি মেশিনগান ইজ কমপ্লিটলি সাইলেন্সড । ‌সত্যিই সেদিন মেশিনগান কে হার মানতে হয়েছিল সামান্য মাস্কেট রাইফেলের তেজের কাছে। তবে তার জন্য মূল্য দিতে হয়েছিল বারোটি তাজা প্রাণ।
এবার শহীদদের সম্মান জানানোর পালা।

সবকটি দেহকে সারিবদ্ধভাবে রেখে জেনারেল বল আহ্বান করলেন- Comrades in close column of groups, in single rank. Fall in ! শ্রেণিবদ্ধ ভাবে দাঁড়ালেন তাঁরা রাইফেলের নল নীচের দিক করে। অভিনন্দন জানালেন গোটা পাহাড় কাঁপিয়ে। বিদায় বন্ধু, তোমাদের কথা আমরা ভুলবো না !

জ্বলন্ত সংগ্রামের গল্প বলতে বলতে চোখটা কেমন জ্বলে জ্বলে ওঠে তার। বন্ধুরা মজা করে বলে – শ্রীরাজ আসলে ঊনবিংশ শতকের সংগ্রামী বিপ্লবী একটা চরিত্র! যে ভুল সময়ে জন্মেছে…

ক্রমশ

কা হি নী র প্র তি টি চ রি ত্র কা ল্প নি ক । কা হি নী র স্বা র্থে সং ব ন্ধি ত ।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।