T3 || আমার উমা || বিশেষ সংখ্যায় সংযুক্তা মজুমদার

টেক নো…
ঝিরঝির বৃষ্টি পড়ছিল একটানা। আবছা কাঁচের জানলা দিয়ে রঙিন বাড়িঘরগুলো আরও স্বপ্নময় লাগছিল। হেলসিঙ্কি এয়ারপোর্টে নেমে রুচিরা বেশ হতভম্ব হয়ে গেছিল। কোলে ছোট্ট সৌরভকে নিয়ে অবাক চোখে দেখেছিল এই অসম্ভব কর্ম ব্যস্ত বিমানবন্দরটিকে, মনে হয়েছিল যেন ফাস্ট ফরোয়ার্ড মোডে চলছে সব কিছু। ইমিগ্রেশন ক্লিয়ার করে লাজেগ নিয়ে বাইরে আসতেই শুনতে পেয়েছিল “রুচি…দিস ওয়ে“, সামনে দাঁড়িয়েই প্রেমাংশু হাত নাড়ছিল। প্রায় চারমাস পরে দেখা হয়েছিল, একত্র হতেই একটা হ্যাপি ফ্যামিলি ম্যান্ডেটারি সেলফি তুলে নিয়েছিল প্রেম… আর সাথে সাথে ফেসবুক, ইনস্টাগ্র্যমে আপলোড হয়ে গেছিল সব। সৌরভ কিন্তু দিব্যি ছিল, মায়ের কোলের নিশ্চিন্ত আরামে। বাবাকে দেখে ওর বিশেষ হেলদোল হয়েনি। এই চারমাসে তো দেখেওনি বাবাকে, তাই কোলে যে যাবেনা সেটা রুচি জানত।
ঝকঝকে সুন্দর শহর ক্যাম্পি। সব যেন ছবির মত। ক্যাম্পি সেন্টারের কাছেই একটা অ্যাপার্টমেন্টে ওদের সংসার। বেশ কিছুদিন হল গুছিয়ে বসেছিল রুচিরা। ওর পি এইচ ডির কাজটাও আবার স্ট্রীমলাইন হয়েছিল। একবছর পরে দেশে ফেরা, ততদিনে পেপারগুলো প্রায় শেষ হয়ে আসবে। সারাদিনই প্রেমাংশু বাড়ির বাইরে, আর বাড়িতে থাকলেও ল্যাপটপে মুখ গোঁজা। নতুন প্রোজেক্ট, দিন নেই রাত নেই প্রেম তাতেই বুঁদ হয়ে থাকত। আর এইদিকে ছোট্ট সৌরভ, সারাদিন নিজের মনেই খেলত, একেবারে নির্ঝঞ্ঝাট বাচ্চা। একজন ন্যানি আসত, বাড়ির সাফসাফাই করে, খানিকক্ষণ বেবি সীট করে চলে যেত।
প্রায় ন’ মাস বয়েস তখন রো-এর… হ্যাঁ, রুচি ওকে এই নামেই ডাকত তখন থেকেই, ডাকলে ও যে সবসময় সাড়া দিত তা নয়, তবে রুচির চিন্তা অন্য জায়গায় ছিল। রো তখনও মা বলতনা, ইনফ্যাক্ট কিছুই বলতনা … ‘অ্যা উউউ’ ছাড়া আর কিছুই ওর মুখ দিয়ে বেরতনা। ওর ভ্যাকসিন দিতে রুচি বুলেভারডিন হসপিটালে যেত… একবার জিজ্ঞেসও করেছিল ডাক্তারকে, “ডাজ হি হ্যাভ আ স্পীচ প্রবলেম?”
হাত পা কাঁপছিল রুচির। এমন কিছু ও আগে কখনও দেখেনি। কি হয়েছিল, কেন রো এরকম রিঅ্যাক্ট করছিল, কিছুই বুঝতে পারছিলনা ও। কেবল যখন দেখল রো চিৎকার করতে করতে অজ্ঞান হয়ে গেল, তখন ও প্রেমকে ফোন করেই ছেলে কোলে সোজা হসপিটালে চলে গেছিল। প্রেমের অফিস হসপিটাল থেকে অনেক দূরে, ওর পৌঁছাতে সময় লাগবে রুচি জানত, তাই অপেক্ষা করার কথা ভাবেও নি ও। বেশ রাত, রুচি একাই পেডিয়াট্রিক ওয়ার্ডে বসে। রো ঘুমাচ্ছে। একদম শান্ত, স্নিগ্ধ। প্রেম এসে গেছে, মাথায় হাত দিয়ে বসে আছে, একদম চুপ করে।
রোর প্রায় দেড়বছর বয়স এখন। ও কোনও কোথাই বলেনা, কেবল ল্যাপটপ দেখলে একটু খুশি হয়… আজকাল ও সব কিছু ছুঁড়ে ফেলে আনন্দ পায়, যা কিছুতে আওয়াজ হয় সেই সব জিনিস। নরম সরম টেডি ছুঁড়ে কোনও আনন্দ নেই… কিন্তু বই, স্টীলের কাটলারি, এইসব ছুঁড়তে খুব ভালবাসে রো, আর আওয়াজ হলেই একটু হাসে। রুচির খুব ভাল লাগে। এমনিতে রুচিও বাড়িতে ব্যস্তই থাকে নিজের রিসার্চের কাজ নিয়ে। নানান খেলনা আর গ্যজেটে ভর্তি রো-এর বেবি রুম, সে নিজের মনে খেলা করে… কেবল খওয়ার সময় খাওয়া পেলেই হল। মায়ের সাথে যখন ফোনে কথা হয় মা বারবার জিজ্ঞেস করেন, ”হ্যাঁ রে, রো কথা বলছে?” বাবা একদিন জিজ্ঞেস করলেন, “আচ্ছা, তুই ওর সাথে কথা বলিস তো? না হলে তো ওর ল্যাংগুয়েজ ডেভেলপ করবেনা। ওদেশে ত কেবল ফিনিশ, সুইডিশ এইসব চলে। ও কি ভাষা শোনে? কি বোঝে? বাংলা বোঝে?”
দুবছরের রোকে নিয়ে রুচি দেশে ফিরে এল, তার প্রিয় চেনা শহর কলকাতায়। বাবা নিতে এসেছিলেন এয়ারপোর্টে। রো স্ট্রোলারে বসে, নিজের মনে খেলায় মত্ত। প্রেম এখন আসতে পারবেনা। বিরাট প্রোজেক্ট, অনেক কাজ, দ্বায়িত্ব। গাড়ি ছুটছে, রাজারহাটের রাস্তা খুব সুন্দর, পরিষ্কার, সবুজ, এই দেড় বছরে প্রায় অনেকটাই পালটে গেছে শহর।একদৃষ্টিতে রুচি বাইরের দিকে তাকিয়ে ছিল। সেদিন হসপিটালে ডাক্তার বলেছিলেন, “উইথিংক ইওর সন ইস হ্যাভিং সম চ্যালেঞ্জেস. মিসেস চ্যটারজি। প্লীজ সী ডক্টর মিলা টুমরো।“ এরপর নানান মিটিং, পরামর্শ, নানা টেস্ট সব কিছু করে জানা গেল যে সৌরভঅটিস্টিক।
রুচি আর প্রেমের প্রাণের রো পুরোপুরি স্বাভাবিক নয়। রো-এর ট্রীটমেন্ট শুরু হয়। কিন্তু ফিনল্যান্ডে ভাষা একটা বড় বাধা। বাবা ঠিকই বলেছিলেন। ইওরোপ বা আমেরিকা হলে এই সমস্যা হতনা। তাই অনেক ভেবে রুচি ছেলেকে নিয়ে দেশে ফেরার সিদ্ধান্ত নিল।প্রেম অনেক বুঝিয়েছিল তাকে, কিন্তু রুচির মন বলছিল কলকাতাই তাকে শান্তি দেবে, রোকে একটা আশ্রয় দেবে। তার ওপরে রুচির মামাতো বোন মিমিন, ন্যাশনাল হিউম্যান জেনোম রিসার্চ ইন্সটিটিউট – মেরিল্যান্ড থেকে পড়াশোনা করে চ্যালেঞ্জড বাচ্চাদের নিয়েই কলকাতায় কাজ করছে। মিমিনও বলল ফিরে আসতে। এইসব ভাবতে ভাবতে কখন যে নিজের অজান্তে সব ঝাপসা হয়ে উঠল, বুঝতে পারেনি রুচি। সম্বিৎ ফিরল যখন বাবা বললেন, ”চিন্তা করিসনা মা, সব ঠিক হয়ে যাবে।“
বাবা আর মিমিন মোটামুটি সব ব্যবস্থা করেই রেখেছিলেন। স্পীচ থেরাপি ফর অটিস্টিক চিলড্রেন থেকে শুরু করে সব চিকিৎসা ব্যাবস্থারই ভার মিমিন নিয়ে নিয়েছিল। দু এক জন নামকরা সাইকিয়াট্রিস্ট বাবার বন্ধু, তাদের সাথে কিছু সেশনও করল রুচি। মানসিক দিক থেকে খুবই ভেঙে পড়েছিল ও নিজে।
প্রেমাংশু আই আই টির গোল্ড মেডলিস্ট, রুচি নিজে প্রেসিডেন্সী থেকে সোশিয়লজি নিয়ে পাশ করে, মাস্টার্স করে, যাদবপুরে পড়াতে পড়াতে ভাবছে থিসিস-এর কাজ শুরু করবে। এই সময় প্রেমাংশুর সাথে একটা সেমিনার এ আলাপ হয়েছিল ওর। আজকাল তো পৃথিবী হাতের মুঠোয়… ফেসবুক, হোয়াটসঅ্যাপ-এ গল্পে গল্পে খুব তাড়াতাড়ি ওরা খুব কাছে চলে এসেছিল। দুই বাড়িতেই কোন আপত্তি ছিল না। বেশ প্রেমের জোয়ারে ভেসে, স্বপ্নের জাল বোনা শুরু হয়ে গেছিল। বিয়ের পর বছর দু’এক ওরা কলকাতাতেই ছিল। এর মধ্যেই রুচি ওর ফেলোশিপটাও পেয়ে গেছিল। সারাদিন কেবল লেগে থাকত ল্যাপটপ নিয়ে। এই সময় নিজের মধ্যে নতুন প্রাণের সঞ্চারের উপস্থিতি টের পেল রুচি। প্রেম আর বাড়ির সকলে এই খবরে একেবারে উচ্ছ্বসিত। সারাদিন সবাই প্ল্যান করত, কি করবে, কি নাম দেবে, ছেলে মেয়ে যাই হোক যেন সুস্থ হয়। কোন স্কুলে পড়বে, কি কি শিখবে… সব ভেবে রেখেছিল প্রেম, প্রতিবার চেষ্টা করত যেন সোনোগ্রাফির সময় ও থাকতে পারে। মা অবশ্য বিরক্ত হতেন, বলতেন, “এত সোনোগ্রাফির বহর আজকাল হয়েছে! আমাদেরও তো বাচ্চা কাচ্চা হয়েছে, এইসব তো ছিলনা। তা বলে কি খারাপ হয়েছে কিছু?”
পুরো প্রেগন্যান্সি রুচি আরামেই ছিল। কেবল সারাদিন ল্যাপটপে থিসিসের কাজ করত। আজকাল অনেক কাজই স্মার্ট ফোনে হয়, তাই তার সদ্ব্যবহারও রুচি ভালই করেছিল। সেই সময় প্রথমদিকে শ্বশুরবাড়িতেই ছিল ও। বাবা মায়েরই মতন ওঁরা, রুচি ওঁদের বড়ই আদরের। বাবা, মানে শ্বশুরমশাই বললেন, “রুচিমা, তোমার কি বাপের বাড়ি গিয়ে থাকতে ইচ্ছে করে? এই সময় শুনেছি মেয়েদের সেরকমই ইচ্ছে হয়। তা তুমি কদিন ঘুরেই এসো।“ উনি ঠিকই বুঝেছিলেন। প্রেম নেই, রুচির এইসময় বড্ড মনখারাপ হত। অকারণেই চোখ জলে ভরে যেত, ওই প্রেগন্যান্সি ব্লুজ আর কি। ও শিক্ষিত মেয়ে, সব বুঝত। তাই খানিকটা সামলেও নিত। বাপের বাড়ি গেলে আবার আরেক বিপত্তি! বাবার শাসনে রুচি অস্থির হয়ে যেত। আর কেন যেন বাবা সেলফোন দেখলেই রেগে যেতেন, বারবার বলতেন, “তোরা বুঝিস নারে, এর রেডিয়েশন কতটা ক্ষতিকারক।“
একবছর হয়ে গেল কলকাতায়, রো এখন তিনবছরের। হাঁটাচলা করে, কিন্তু কথা সবই অস্পষ্ট। ডক্টর বলেছিলেন, অনেক ধৈর্য ধরতে হবে, আর সৌরভ যে একেবারে স্বাভাবিক হয়ে যাবে তাও হয়তো নয়। কিন্তু যতটা করা যায়। সারাজীবন তো রুচি আর প্রেম থাকবেনা, কে তখন দেখবে ওদের রো কে?
ডক্টরেট পেয়ে গেছে রুচি। নিজেকে ব্যস্ত রাখে সবসময়, তাহলে নানা দুশ্চিন্তার হাত থেকে রেহাই পাওয়া যায়।
অনেকগুলো মেইন্সট্রিম স্কুলে রুচি রো-এর অ্যাডমিশনের জন্য চেষ্টা করেছিল। মা বাবার যোগ্যতা দেখে ডাকও পেয়েছিল ইন্টার্ভিউয়ে। কিন্তু ফাইনাল লিস্টে নাম আসেনা। মিমিন রুচিকে “বাব্লস”-এর কথা বলেছিল – স্কুল ফর চ্যালেঞ্জড চিলড্রেন। বেশ কয়েকবার যাতায়াতের পর রো ভর্তি হয়ে গেল সেখানে। খানিকটা নিশ্চিন্ত হল রুচি আর প্রেম। রো বাবাকে এখন একটু একটু চেনে… মাথা ঝাঁকিয়ে বাবাবাবাবাবাবাবা বলতে থাকে।
রুচির বাবাই বেশিরভাগ যান রোকে স্কুল থেকে আনতে। তবে মাঝে মাঝে রুচিও যায়। বেশ অনেকের সাথেই আলাপ হয়েছে ওর ইতিমধ্যে। সুস্মিতা, বাসবী, বাবলি। এদের সাথে বেশ বন্ধুত্ব হয়ে গেছে রুচিরার। সুস্মিতা ডাক্তার, বাসবী সফ্টওয়্যার ইঞ্জিনিয়ার আর বাবলি জূলজি তে ডকটরেট। মাঝে মাঝে ভাবে রুচি, যেই বাচ্চারাই এখানে আসে সবাই বেশ ওয়েল টু ডু ফ্যামিলি থেকে। তবে কি গরীবদের বাচ্চাদের এইসব অসুখ হয়না? সেদিন বিড়লা একাডেমি থেকে একটা আর্ট এক্সিবিশন দেখে ফিরছিল। রাস্তায় কতগুলো ভিখিরির বাচ্চা একটি অল্পবয়সী মেয়েকে মা, মা বলে ঘুরছে। মেয়েটির কোলেও একটি বাচ্চা… সুন্দর স্বাস্থ্য, কি মিষ্টি! রুচি গাড়িতে উঠে যতক্ষণ পারা যায় ওদের দেখছিল আর ভাবছিল, এরা তো সবাই নর্মাল, এদের এইসব অসুখ হয়না তো।
বাবলস-এ সবাই কোয়ালিফায়েড স্পেশাল এডুকেটর। তাঁরা কোন বাচ্চার কি প্রয়োজন সেটা বোঝেন, আর সেই ভাবেই বাচ্চা এবং পেরেন্টসদের গাইড করেন। প্রেমাংশু কলকাতায় ফিরে এসেছে। দুই বাড়ির দুই বাবা মার সাহচর্যে রো এখন অনেকটাই ভাল।নিজের দেশ, নিজের ভাষা, নিজের মানুষজনেদের মাঝে রুচিও খুশি। মা মাঝে মাঝে বলেন, “রুচি, রো এখন তো আগের চেয়ে ভাল, এইবার তোরা আর একটার কথা ভাবনা।সে এলে তো রো-এরও একটা সঙ্গী হবে।“ রুচি অনেকবার এইকথা ভেবেছে। কিন্তু ভয় করে। আবার যদি…
আজকাল যেন এই অটিসম, এডি এইচ ডি, মেন্টাল রিটারডেশন আগের থেকে অনেক বেশি বেড়ে গেছে। কই, ছোটবেলায় স্কুলে একটাও এমন বাচ্চা চোখে পড়েছিল বলে তো মনে পড়েনা। কি জানি, হয়তো সেলফোনের রেডিয়েশন ক্ষতি করে, হয়তো এত গ্যাজেট প্রেগ্ন্যান্সিতে ব্যবহার না করাই ভাল, হয়তো…
চিন্তার তার কেটে যায়, বাইরে মুষলধারে বৃষ্টি পড়ছে, রো চিৎকার করছে, ওয়াতারররররররররর………