সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (অন্তিম পর্ব)

রেকারিং ডেসিমাল

বুকের মধ্যে উথালপাতাল করে তিরিশ পেরোনো মহিলার।

এই ত সেদিন বেরোলাম। সুটকেস গুছিয়ে কত আনন্দ, কত হই হই।

আর যাবার আগের দিন যশো-র সঙ্গে কী গণ্ডগোল হল!

যশো মানে যশোমতী। খড়কে কাঠির মত চেহারা কিন্তু ভীষণ তেজ আর যাকে বলে চোপা। গলার জোরে আকাশ ছোঁয় যশোমতী। আড়াল থেকে কেউ শুনলে ভাবতে ও পারবে না,, যে এই বিপুল হুংকার আর তার সপ্তকে ওঠা গলা, একজন গাছকোমর করে বাংলা শাড়ি পরা কংকালসার ক্ষীণকায় মহিলার ভিতর থেকে বেরোচ্ছে।
সে সর্বদাই প্রতিবাদী।
এখন যা দিনকাল, ভাবতে বসলে মনে হয়, যশোমতীকে রাজনীতিতে নামানো উচিৎ ছিল।
মস্ত বড় নেতা হয়ে যেত এদ্দিনে।

যশোমতী ঠিকে কাজ করে এ বাড়িতে। মানে ঘর মোছা, বাসন মাজা, কাপড় কাচা।
দু বেলা আসে।
পাড়ার আরো অনেক বাড়িতেই দৌড়ে কাজ করে। তার ঘরে অনেক চাহিদা। অনেক খিদে।

তা, সেই যশো-র এক পিস ছোটো মেয়ে ছিল, মামনি।
নিচের ঘরে ছোটো কাকু কাকিমার কাছে কাজ করত সে।
তার জন্যই যশো-র যত চিন্তা।
সেই পুচকি হঠাৎ বিয়েও করে ফেলল একদিন পট করে। আর অল্প দিনের মধ্যেই তার একখানা ছানাও হল। সে নিয়ে সে মায়ের কাছেই ফিরে এল।

যশোমতীর কাজ বাড়লো। পয়সার প্রয়োজন বাড়ল। এতো গুলি খিদেসহ মুখ।
মামনি ও কাজ করে পাড়ার বাড়িতে বাড়িতে।
এর মধ্যে মামনির আবার ছানা হবে সে খবরও পাওয়া গেলো। আর পাশের বাঙুর হাসপাতালে নিয়ে যাবার সময় রিকশাতেই সে দু নম্বর ছানা বেরিয়ে ও এলো।

বাড়িতে খবর শুনে সবাই হাউমাউ, খালি ডাক্তার বউ অবাক হল না। সে বলল, জানা কথা। এতো প্রেসিপিটেট লেবার। দু নম্বরের বেলায় শরীর ত জানে কি করতে হবে, আর ও অত শারীরিক পরিশ্রমের কাজ করে, ফিটনেস দুর্দান্ত। আমাদের গ্রামের মেয়েদের ক্ষেতে কাজ করতে করতে বাচ্চা ডেলিভারি হয়। তারা কাস্তে দিয়ে নাড়ি কেটে ছানা কোলে করে বাড়ি যায়। প্রথমটার বেলাতেই অনভিজ্ঞ শরীরে কষ্ট খুব।

যশো এ সব শুনে গম্ভীরমুখে মাথা নাড়ে। তার এতো কথায় কাজ নেই, সে আসল কথা বলে ছোটো বউকে, পয়সা দাও না দুটো, বাচ্চাটার জামাকাপড় কিনি।
বউ পঞ্চাশটা টাকা আনতে আনতে দেখে রান্নাঘরে ধুন্ধুমার।
খেপে লাল হয়ে শ্বাশুড়ি বকা দিচ্ছেন।
বললাম এই পাশে বেসিনের ধারে বাসনের খাপে চামচ ধুয়ে রাখতে, সেই ওদিকে কেন রাখলে?
যশো বলছে, বরাবর ত সেইখেনেই রাখি, এখন আবার নতুন নিয়ম কেন।
রান্নাঘরের মালকিন একখানা বাসন রাখার তারের খাঁচা লাগিয়েছেন নতুন। সেইটার ঠিকঠাক ব্যবহার না হলে মুশকিল।
সামান্য ব্যাপার।
কিন্তু উত্তরোত্তর সওয়াল-জবাব চলতে চলতে মারাত্মক কাণ্ড।
সেই দিনই যশোমতীর বিতাড়ন হয়ে যায় আর কি।
নেহাৎ পরের দিন বেড়াতে যাওয়া তাই, বাড়ির দু চার জন এসে থামিয়ে দিল তর্কাতর্কি।
যশো চলে গেল কোমরে কাপড় গুঁজে।
চিরকালই বাংলা ধরনে গাছকোমর করে শাড়ি পরে আসে সে।

আজ ট্যাক্সিতে যেতে যেতে ভেতরটা উদাস হয়ে যায় পুত্রবধূর।
কানে বাজে দাপুটে মানুষটার গলা।
–এত কথা কিসের। এটা আমার সংসার। এখানে আমার নিয়মই নিয়ম। আমার কথাই শেষ কথা।

মা, শ্বাশুড়ি, আগের প্রজন্মের নারীদের সামনে রেখেই ত নতুন বউয়েরা নিজেদের সংসার করার স্বপ্ন তৈরী করে।
সমাজের অন্দরমহলে মাতৃতন্ত্রই রাজত্ব চালায়।
সব নতুন বউ স্বপ্ন দেখে একদিন আমিও সংসারের সবচেয়ে জরুরী মানুষ হব। আমার কথাতেই চলবে সংসারের চাকা। কারণ, এইটা আমার সংসার।
এই আকিঞ্চনে ঘোরে দিনরাত্রির চাকা, যত যত ঘর গেরস্থালি।
এ দেশে ত বটেই, হয়ত বিদেশেও?

এই নিয়ে যত ঝগড়া, যত ঝামেলা, যত মনোমালিন্য।
আমি এখানে রাখতে চেয়েছি, সে চাওয়াকে অগ্রাহ্য করে তুমি ওখানে রাখলে। কেন?
আমি এটা রান্না করলাম সখ করে, তুমি বললে, না ওই অন্যরকম হলে ভালো হত।
আমি লাল পর্দা চাইলাম, তুমি বেগুনি নীল নিয়ে এলে। আমি বললাম পাপোশটা ডানদিকে রাখতে, তুমি রোজ ইচ্ছে করে বাঁ দিকে সরিয়ে দিচ্ছো।

আলাদা আলাদা করে দেখলে কি সামান্য ক্ষুদ্র কথারা।
কিন্তু সেই অসন্তোষ পুঞ্জীভূত হয়ে তুষের আগুনের মত জ্বলে।

জ্বলতে থাকে মন, প্রসন্নতা, ভালো লাগা, ভালো থাকা।
ছটফট করে ওঠে মেয়েরা, যার যার ঘরের খাঁচায়। তাদের যে ওটাই পৃথিবী। ওতেই অসামান্য তৃপ্তি।
কি, না নিজের ঘর।
নিজের ঘর, রান্নাঘর, আর গুটিকয়েক মানুষ; যারা তার রান্না, তার গৃহিনীপনা, তার ঘর সাজানোতে, আহা খাসা, বলে সুখে দিন কাটাবে।
একেই স্বর্গ বলে মেনে নেয় তাবৎ মহিলামহলের মনের গভীরতম স্তর। এইটুকু পাওয়ার জন্য কত প্রাণপণ খাটুনি, কত আত্মত্যাগ, নিরন্তর নিজের সখ আল্লাদ ছুঁড়ে ফেলে দিয়ে শহীদ হওয়া। একখানা নিটোল ছবি আঁকার লোভে।

এই ছবিতে রঙ ঠিকঠাক না মিললেই ছবি ছিঁড়ে যায়। কখনো জোড়াতাপ্পি লাগাতে সেলোটেপ দিতে হয়, কখনো দু টুকরো কাগজ খসে পড়ে দু দিকে।
নয় তো, অভিমানে গাল ফুলিয়ে কোনো মহিলা বলেন, বেশ, তবে রহিল তোমার এ ঘর দুয়ার, আমি আমার নিজস্ব স্পেসে একাই থাকবো। কাউকে চাই না।

এইসবই ঘরকন্নার গোড়ার কথা। একেবারে শিকড় যাকে বলে।

কোলের ওপর কাগজে ছাপা বাঁধানো ছবিটা ধরে রেখে কেবলই এলোমেলো হয়ে যায় চিকিৎসক, নতুন মা, আধুনিক সংসারের সূচনা করা এক নারী।

তবে আমার সংসার বলে লাভ কি?
কাল, চামচটাও আমার পছন্দের জায়গায় থাকুক, বলে সমস্ত মনপ্রাণ দিয়ে ঘর সাজানোর কি মানে, যদি আজ আর আমিই না থাকি?
নেই হয়ে যাই যদি, কে জানতে চায়, আমি কি চেয়েছিলাম ?
আমার আশা, ভরসা, চাওয়া পাওয়া কিছুর আর ত অস্তিত্বই থাকে না।
তবে কিসের লড়াই।
বিপুল প্রাণশক্তি এই রান্নাবাটির খেলনাপাতির পিছনে অপচয় করে কি হবে?
কেউ মনে রাখবে না।
যে চলে যায়, সে চলেই যায়।
ফিরে আসে না আর।

এত রঙিন, এত জোরদার প্রাণের উচ্ছাসে উচ্ছ্বসিত একটা মানুষ, কোথাও রইল না তো।

মনের গভীরে কোথাও সুতোরা আলগা হয়ে যেতে থাকে বউয়ের।
“আমার” বলার অভ্যাস ছাড়তে হবে। খুব কঠিন যদিও। তবু। নিজেকে বলতে হবে রোজ।

কিছুই আমার না। কেউ-ই আমার সম্পত্তি নয়। জবরদস্তি জোর খাটানোর কোনো মানে নেই।
মুঠো ঢিলে করার অভ্যাস করো হে ।
ক্রমশ অভ্যেস করতে হবে পিছনে ফিরে না তাকিয়ে এগিয়ে যাবার। এগিয়ে চলো। এগিয়ে চলো।

বুকের মধ্যে ভেসে ওঠে বাবার গলার গান। রবীন্দ্রনাথ।

“আগুন জ্বালো, একলা পথের অন্ধকারে আমি চাই পথের আলো…. “

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।