সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৮২)

রেকারিং ডেসিমাল

লীলার থেকে জামা কাপড় ঘর সাজানোর জিনিস ছাড়াও আরও কিছু পেত ঘরোয়া অন্দরমহল।
ফল্গু নদীর মত সাহস।
নিপাট বশ্যতা বাধ্যতার তলায় বিদ্রোহের জ্বলন্ত সুতো।
নারকেল দড়িতে আগে যেমন চা, বা সিগারেটের দোকানে আগুন ঝোলানো থাকতো।
এই লিখতে লিখতেই খেয়াল হল।,আজকের বাচ্চারা ত জানেই না, দেখেইনি এ জিনিস।

আমাদের ছোট বেলায়, এইটাই তো সবচেয়ে আটপৌরে দৃশ্য ছিল চোখে।
আগুন যে এত নিরীহ ভাবে পোষ মেনে দড়িতে ভাল মানুষের মত অষ্ট প্রহর ঝুলে থাকে, এটা হাতের পাঁচ ছিল সব্বার কাছে। যে কেউ সিগারেট বিড়ি কিনেই বলত, আগুন?
দেয়ালের গায়ে ঝুলে বসে থাকা দোকানদার দড়িটা দেখিয়ে দিত, বা বাড়িয়ে দিত হাতে।
সেই দড়ির ডগায় ধিকধিক করে জ্বলে থাকত অনির্বাণ আগুন।

সংসারের, ” দিন যাপনের প্রাণ ধারণের গ্লানি”র তলায় ও এমনি করেই অহর্নিশ জ্বলে থাকত মহিলা জাতীয় মানুষের নানান প্রতিবাদ।
লীলা, তার হাসি মুখ, তার হিসেবের খাতায়, পয়সা পড়ে মিটিয়ে দিও, আশ্বাস, অর্থনৈতিক স্বাধীনতাহীন, সমাজের একটা বড় অংশকে সাহস জোগাতো।

পুজোর কাছাকাছি সময়ে ডাক্তার বৌয়ের বাপের বাড়িতে তার বাবা মায়ের কাছে নালিশ পৌঁছে ছিল তাঁদের মেয়ের পুজোর বাজারের ফিরিস্তি নিয়ে।

-মা হতেও চলেছে, আর কি সালোয়ার ইত্যাদি পরা মানায়?
মেয়ের বাবা মা হিসেবে, অরুচিকর মনে হলেও তাঁরা মৃদু কণ্ঠে জবাব দিয়েছিলেন।
-অনেক বড় হয়েছে মেয়ে। একে বিবাহিত, তায় ডাক্তার।
সে কি পরবে এ ব্যাপারে আমাদের কিছু বলা উচিৎ না। আপনারাই কথা বলে নিন।

খবর এ বাড়ি অবধি ফিরে আসতে, শাশুড়ি মা বৌকে ঘরে ডেকে বলে দিলেন, তুমি কোন কথা বলবে না।
আমি নিজে কিনে দেব সালোয়ার। তার পরে ত আর কোন কথা চলে না?

পরের দিন লীলা আসতেই কেনা হল লাল টুকটুকে সালোয়ার সেট। রমেশদার হাতের শিল্পকর্ম পরে দাঁত বের করে পুজোয় ঘুরে বেড়ালো নতুন বউ।
আর প্রতি বছর সবার দেয়া শাড়ির সঙ্গে শাশুড়ি মার দেয়া একখানি সালোয়ার থাকবে, এটা একেবারে নিয়ম হয়ে গেল।
শাশুড়ি মায়ের ছেলে আহ্লাদিত হয়ে বলল, তবে ত কিস্তিমাত।

বউ বুঝতে পারল, দড়ির ডগায় ঝুলে থাকলেও আগুন জিনিসটি ফেলনা নয়। যথাযোগ্য সময়ে সে অগ্নিসংযোগ করেই ফেলে নিঃশব্দে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।