সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সোনালি (পর্ব – ৬৯)

রেকারিং ডেসিমাল

ননদিনী বৌদির চেয়ে ন মাসের ছোট।
কিন্তু যে হেতু তাঁর বিয়েটা বেশ খানিক আগে হয়েছে, এবং তিনি দাদার বিয়ের আগেই কন্যারত্নের জননী, তাই পাকা গিন্নীসুলভ গাম্ভীর্য মেইনটেন করার একটা সদিচ্ছা সবসময়ই থাকে।
তবু, তার ফাঁকে ফাঁকে তুই তোকারি আর হ্যা হ্যা করারা ফসকে বেরিয়ে আসে অনবরত।
বৌদির নার্সিং হোমের বড় ডাক্তার জুরাসিক পার্ক সিনেমা দেখতে নিয়ে যান যখন দু জনে হাত ধরে টি রেক্স দেখে কি সুরেলা চীৎকার।
মাঝেমধ্যে নিকো পার্কে দাদার হাতে মেয়েকে ধরিয়ে দিয়ে দুই সিল্কের শাড়ি পরিহিতা মুন রেকারেও চড়ে।
আর সেখানে ও।
উরে বাপ রে, যেই না নিচে স্পিডে নামা, দু জনে দু জনের হাত ধরে তার সপ্তকে গলা ছাড়ে।
ওরে, বাবা রে,  কি হবে গো!!

ত সেই  দুই ওস্তাদ গেছে ইভল্যান্ড নার্সিং হোম।
এক বার এসে পরীক্ষা করেই বড় ডাক্তার এবং ছোট ডাক্তার মানে আরএমও,  জানিয়ে দিলেন, এক্ষুনি ভর্তি হবে। ওপরে চলে যান।
পেটে, “স্কার টেন্ডারনেস ” হচ্ছে।
মানেটা, গাইনোকোলজি ডিপার্টমেন্টে দু বছর সিনিয়র হাউসস্টাফ হিসেবে সামলে আসা বৌদি ভালোই জানে।
পুরোনো সিজারের সেলাইতে চাপ পড়ছে।
বেশি চাপ পড়লে খুলে বা ফেটে যেতে পারে জরায়ু। মাকে এবং ছানাকেও বাঁচাতে মুস্কিল হয়ে যাবে।
এই পুচকের ত ওজন ও কম। মা চেক আপেও আসেনি বিশেষ। এত দৌড়ে চলার ফাঁকে সময়ই পায়নি।

কিন্তু সে সব ভাবার সময় নেই।
ভর্তি শুনেই মায়ের মাথায় ছোট্ট মেয়ের মুখটা ভেসে ওঠে।
কাল থেকে সর্দি লেগে ঘ্যানঘ্যান করছে। এ বাড়িতে এত বাইরের লোক। সব আত্মীয় স্বজন সাধের জন্য  এসেছেন।
এর মধ্যে ত কেঁদে অস্থির হয়ে যাবে মেয়ে, মা কাছে নেই দেখলে।
একমাত্র রাখতে পারেন মায়ের বাবা মা। মা চেম্বারে থাকলে দাদা আম্মুই ত সামলান তাকে।
মা ভাবে, ফোন করি।
বাবা মায়ের বাড়িতে ল্যান্ড ফোন এসেছে তত দিনে।
নার্সিং হোমের একতলায় পয়সা দিয়ে কল করা যায়।
মা ফোন করে।
তিন বারের পর ফোন তোলেন তার মা হাঁফাতে হাঁফাতে।

হ্যালো! কে বলছ।

মা মা–

হ্যাঁ কি হল মা?

ট্যাক্সি ছেড়ে দিয়েছ?

এই ত বাবা নিচে টাকা দিচ্ছেন। আমি এতবার ফোনটা বাজছে শুনে দৌড়ে উঠলাম, যে, কারো কোন বিপদ নাকি।

শিগগিরই বাকে ডাকো বারান্দা দিয়ে। বল ট্যাক্সি ছাড়তে না।
এক্ষুনি চলে এস টালিগঞ্জ।

কি হয়েছে?  কেন?

আগে বাবাকে বলো। নইলে এখান থেকে গাড়ি পাবে না।

আচ্ছা, আচ্ছা…

ফোনে এইসব কথা বলতে বলতেই হবু মা দেখে ননদিনীর চোখে জল, ফ্যাকাসে মুখ।
ফোন ছাড়তেই খপ করে হাতটা ধরে বলে, কি হবে এবারে?

মা নিজের ভয় পাওয়া চেপে রেখে সাহস দেয়।

— দাঁড়া না, কিছু চিন্তা নেই। এখান থেকে বের হই আগে।
— কি করে যাবি?  ডাক্তার যে ওয়ার্ডে নিয়ে যাবেন বলে গেলেন।

ডাক্তার যত ক্ষুদ্রই হোক, নার্সিং হোম, হাসপাতাল তার ঘরবাড়ি। সে অন্তত এখানের লোকজনকে নিয়ে বিচলিত হয় না। সুতরাং বৌদি  মেজো ডাক্তারদের কাছে গিয়ে হাঙ্গামা লাগায়।

— আমি ড্রেস নিয়ে আসিনি, বাড়িতে ঘুরে এখুনি আসবো। যাচ্ছি। এই ত পাশেই।

ডিউটিতে থাকা লোকেরা হইহই করে ওঠে।

এই এই, কোথায় চললি। স্যার বেডে যেতে বলেছেন!!
আরে স্কার টেন্ডারনেস, কি রে। বেরতে দেওয়া যায়?

ততক্ষণে দৌড় দিয়েছে পেশেন্ট।

— স্যারকে বোলো না কিছু, এই এলাম বলে। ব্যাগ গুছিয়ে নিয়েই।  দশ মিনিট।

লিফটে নেমে ননদের হাত ধরে টেনে বাইরে ফুটপাতে।

চল চল, পালাই। শিগগির চ।

কোন রকমে ট্রামে উঠে বাড়ি।

এসে সবাইকে হাউমাউ করে ননদ সব বলতে বলতে  মায়ের নিজের আর মেয়ের ব্যাগ গোছানো চলে।
এরমধ্যেই বাবা মা ফ্যাকাসে মুখে এসে পৌঁছে গেলেন।

সারা বাড়ির লোক অস্থির।

মা মেয়েকে বাবা মায়ের কোলে তুলে দিয়ে আদর করে, বলল, দাদার সঙ্গে একটু মজা করে এসো। তারপর আমি আসছি, কেমন?

এদিকে বর আরেকটা ট্যাক্সি নিয়ে এসে দাঁড়িয়েছে নিচে।

এক দিকের রাস্তা দিয়ে বাবা মায়ের কোলে মেয়ে ট্যাক্সিতে এগিয়ে গেল
আর অন্যদিকের গলি দিয়ে রওনা হল নার্সিং হোম যাবার ট্যাক্সি।
আর ঠিক সেই সময়েই লোড শেডিং।
ঝপাৎ করে আলো নিভে যেতে মা বলল, যাক, মেয়েটা দেখতে পায়নি এদিকে আমি গাড়িতে উঠছি।
নইলে ত এক্ষুণি মা কোথায় যাচ্ছে ; বলে তিনি ভ্যাঁ করে পাগল করে দিতেন সবাইকে।

হাত জোড় করে কপালে ঠেকাতে গিয়ে ধক করে ওঠে ভেতরে।
আজ নয় তারিখ।
পনেরো তারিখে মেয়ের দু বছরের জন্মদিন।
থাকতে পারব তো?
আবার দেখতে পাবো তো মেয়েটাকে?

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।