Cafe কলামে সংগ্রামী লাহিড়ী – ১১

সংগ্রামী লাহিড়ী নিউ জার্সির বাসিন্দা, বৃহত্তর নিউইয়র্ক বলা যায় | পরিচয় - শিক্ষায় প্রযুক্তিবিদ, পেশায় কন্সাল্ট্যান্ট, নেশায় লেখিকা | শাস্ত্রীয় সংগীত নিয়ে বহুকালের সিরিয়াস চর্চা আছে, অল ইন্ডিয়া রেডিওর A গ্রেড শাস্ত্রীয় সংগীত শিল্পী | উত্তর আমেরিকায় করোনা ভাইরাসের এপিসেন্টারে বসে বদলে যাওয়া প্রবাস-জীবনের ডায়রী লিখছেন |

করোনা-ধারায় এসো – 11

মাস্ক ঢেকে যায় বিজ্ঞাপনে

সেদিন দেখি গ্রোসারি স্টোরে নমিতাদি খুব মন দিয়ে বাজার করছেন | পাশেই প্রবীরদা | বাধ্য স্বামীর মতোই কার্ট ঠেলে ঠেলে অর্ধাঙ্গিনীর পিছনে পিছনে যাচ্ছেন | কার্টে স্তূপাকৃতি জিনিস জমেছে | নমিতাদি অদম্য উৎসাহে মশলার গলিতে হাঁটছেন | শ্যেনদৃষ্টি মেলে জরীপ করছেন দুপাশের তাকে রাখা পাঁচহাজার রকমের মশলাপাতি |
লকডাউনের পর সবে একটু বাজার দোকান যাওয়া শুরু করেছি | চেনামুখ চোখে পড়ছে | আমি একাই তো আর কিছু বাজারবিলাসী নই ? অনেকেই হাঁপিয়ে উঠেছিলেন বাজারে আসতে না পেরে | ইন্সটাকার্ট ডেলিভারিতে কি বাজারুর মন ভরে ?
তা অনেকদিন পর নমিতাদিকে দেখে হাত নাড়লাম | বিধিসম্মত দূরত্ব থেকে |
নমিতাদি মধুর সুরে বাজলেন – “হাআআআআই |”
প্রথমটায় একটু ভেবড়ে গেলাম | অ্যাদ্দিন পর দেখা, উচ্ছ্বসিত হয়ে “আরে তুই?”-এর বদলে এমন সুরেলা সম্বোধন ? সঙ্গে সঙ্গেই অবশ্য ব্যাপারটা জলের মতো পরিষ্কার হয়ে গেল |
নমিতাদি আমায় চিনতেই পারেননি | মানে আমার এই মাস্ক-পরা মুখচন্দ্রিমার সৌন্দর্য তিনি সম্যক উপলব্ধি করতে পারেন নি | ভেবেছেন কে না কে | তাই অমন একখানি প্রলম্বিত, সংশয়াচ্ছন্ন সুরের টান |
সে কনফিউশন কাটতে দেরি হয় নি অবশ্য |
তখনি মনে পড়ে গেল ভেনিসের মাস্কের কথা | যা পরাই হয় নিজের পরিচয় লুকিয়ে রাখবার জন্যে | ভেনিসে গিয়ে বা না গিয়েও দুনিয়াশুদ্ধু লোকে ভেনেশিয়ান মাস্ক সংগ্রহ করে আর দেওয়ালে টাঙ্গিয়ে রাখে | আমিও রেখেছি |
মধ্যযুগের ভেনিসে মাস্ক ছিল উৎসবের অন্যতম অঙ্গ | কাগজের মণ্ড দিয়ে বানানো | তার ওপর সুন্দর কারুকার্য | কাপড়, পুঁতি, জরির কাজ | পুরো মুখটিই মাস্কে ঢাকা পড়বে | বড়জোর নিচে ঠোঁট আর থুতনি খোলা থাকতে পারে | এ মাস্ক পরে অভিসারে যাওয়ার খুব সুবিধে | ফষ্টিনষ্টি করলেই বা দেখছে কে ? কার্নিভ্যালে তাই মাস্ক পরে সাজসজ্জা অবশ্যকর্তব্য | এ ট্র্যাডিশনে কখনোই ছেদ পড়ে নি |
ভেনিস থেকে হেঁটে হেঁটে যাওয়া যাক সোজা এশিয়াতে | ভেনিস-নিবাসী মধ্যযুগীয় পর্যটক মার্কো পোলোর সঙ্গী হয়ে |
সুলতান আহারে বসেছেন| পাশেই হাজির বেগমকুল | কারোর হাতে সুদৃশ্য ভৃঙ্গারে পানীয়, সোনার থালায় আঙ্গুর-বেদানা-কিশমিশ তো আবার কারোর হাতে রূপোর তবক মোড়া বাদশাহী পান | রাজকীয় পাকশালা থেকে প্রস্থে প্রস্থে খাবার আসছে | ভৃত্য ও পাচকগণ সোনা ও রূপোর থালা বয়ে বয়ে নিয়ে আসছে | প্রতিটি ভৃত্যের মুখ আর নাক ঢেকে বাঁধা আছে সিল্কের রুমাল | তাদের নিঃশ্বাসের গন্ধে খাবারের স্বাদ-গন্ধ যাতে নষ্ট না হয় |
মার্কো পোলোর লেখা বিবরণী | মাস্ক-পরিহিত পরিবেশনকারী |
অবিশ্যি তার আগেও মাস্ক ছিল | এখনকার ইরান, মানে আদ্যিকালের পার্সিয়ান সমাধিতে দরজায় আঁকা আছে মাস্ক পরা মানুষের ছবি | তাদের মুখ ও নাক কাপড়ে ঢাকা | মনে হয় মৃতদেহ পাহারা দিতে মাস্ক পরা জরুরী ছিল | সংক্রমণের ভয় ছিল নিশ্চয়ই | সে সব যীশুর জন্মের ছ’শো বছর আগের কথা |
ইদানিংকালে কোভিড ভাইরাস ঠেকাতে মাস্ক যখন দৈনন্দিন জীবনের অঙ্গ, এক বন্ধু প্রথম শোনালো ডিজাইনার মাস্কের কথা | আমি তো চমৎকৃত | বিজনেস স্যুটের সঙ্গে মেলানো মাস্ক, শাড়ীর সঙ্গে ম্যাচিং ব্লাউজপিস আর মাস্কএর সেট, স্কার্ফের সঙ্গে রং মিলিয়ে মাস্ক – আইডিয়ার ছড়াছড়ি | লোকে কিনছেও | ফ্যাশানও হলো, আবার সুরক্ষাও হলো |
এখন মাস্কে সবাই সেট হয়ে গেছে | প্রস্থে প্রস্থে মাস্ক নানা জায়গায় রাখা থাকে | সদর দরজার পাশেই একটা (কেউ বেল বাজালে মাস্ক পরে দরজা খুলতে হবে তো?), পকেটে একটা, গাড়িতে দুটো (একটা যদি হারিয়ে যায়?), বাথরুমেও মাস্ক দেখলুম সেদিন | ভুলো এক দাদা আবার কান থেকে পৈতের মতো করে মাস্কটি ঝুলিয়ে রাখেন দরকারের সময় যাতে হাতের কাছেই মেলে |
তবে উল্টো চিত্রটিও কিন্তু এদেশে সমান সত্যি |
আমেরিকার হার্টল্যান্ড, মানে আমেরিকান হৃদয়ের খাসজমিতে সে এক অন্য ভুবন | ‘ঘরের কাছেই আরশিনগর, সেথা পড়শী বসত করে |’ সে পড়শী আবার বড়োই স্বাধীনচেতা | লিবার্টি লিবার্টি করেই ফাউন্ডিং ফাদার-রা এদের মাথাটি চিবিয়ে খেয়েছেন |
“কোভিড হলেও ডাক্তার আমি না-ই দেখাতে পারি, আমার স্বাধীনতা | তুমি কে হে আমায় হেলথ ইনস্যুরেন্স কিনতে বলার?”
“প্যান্ডেমিক তো কি হয়েছে, মাস্ক পরা-না-পরা আমার স্বাধীনতা| বেশি প্যানপ্যান কোরো না, স্বাধীনতার বন্দুকটি সঙ্গেই আছে | দেব ট্রিগার টিপে, বুঝবে ঠ্যালা |”
এসব উক্তি আমার টেক্সাস-বাসী বন্ধুর থেকে শোনা | স্বাধীনতাপ্রিয় টেক্সানরা অনেকেই মাস্ক বর্জন করেছে | কারণ ? সরকার বলেছে যে ! না বললে সে নিশ্চয়ই মাস্ক পরতো | কিন্তু একবার যখন গভর্নর বলেই ফেলেছে ভুল করে, তখন মাস্ক নৈব নৈব চ |
“তুমি কে হে আমায় কর্তব্যকর্ম শেখানোর?”
তেজোদীপ্ত মাস্ক-বর্জনকারী টেক্সানদের হাত থেকে বাঁচতে আমার বন্ধু এখন ডবল মাস্ক পরে |
জিজ্ঞেস করেছিলুম, “মানে ওর মাস্কটাও তুই পরিস, তাই তো?”
বড় বিষণ্ণ হেসেছিলো | আহা, প্রাণ হাতে করে জীবনধারণ |
আর মাস্ক যখন পুরোনো হয় ? বেশিরভাগই ডিসপোজেবল, ট্র্যাশক্যানেই তার যাওয়া উচিত | কিন্তু জগতে কবে আর মানুষ সব উচিতকাজগুলো করেছে ? অতএব পুরোনোটি ছড়িয়ে থাকে সর্বত্র |
ড্রাইভওয়েতে মাস্ক গড়াগড়ি যায় | সমুদ্রতীরে বেলাভূমিতে মাস্ক এলিয়ে থাকে | ঢেউ এসে তাকে আদর করে জলের ভেতর নিয়ে গিয়ে ফ্যালে | তারপর সেখানেই তার স্থিতি | সাড়ে চারশো বছর ধরে | হ্যাঁ, ডিসপোজেবল মাস্ক সাড়ে চারশো বছর অটুট থাকবে | ইতিমধ্যেই ফ্রান্সের মেডিটারেনিয়ান সমুদ্র থেকে ডুবুরীরা তুলে আনছে শয়ে শয়ে মাস্ক | জলভর্তি বেলুনের মতো ল্যাটেক্স গ্লাভস | প্যান্ডেমিক শেষে স্বাস্থ্যসচেতন ফরাসী জনগণ প্রমোদভ্রমণে বিচে এসেছেন, সঙ্গে এসেছে মাস্ক, গ্লাভস, হ্যান্ড স্যানিটাইজার | তারাই এখন সমুদ্রের আবর্জনা হয়ে গড়াগড়ি খাচ্ছে | জেলিফিশের মতোই মাস্ক মেডিটারেনিয়ানের জলে ভাসে | সমুদ্রের তলায় ল্যাটেক্স গ্লাভস গড়াগড়ি খায় | জেলিফিশের থেকেও নাকি মাস্কের সংখ্যা বেশি ! ফ্রান্সের পরিবেশপ্রেমীরা সাবধান করেছেন, কোভিড ওয়েস্ট প্লাস্টিকের মতোই বিপজ্জনক |
শেষ করি পাড়ার অ্যাঞ্জেলিনাকে দিয়ে | হাইস্কুল সদ্য শেষ হয়েছে | এবছর কলেজ যাবে | মিষ্টি মেয়ে অ্যাঞ্জেলিনা আমার কাছে শাড়ি পরতে এসেছিল | স্কুলে নাকি নানাদেশের এথনিক ড্রেসের প্যারাড হবে | তার মনে হয়েছে আমার কথা | শাড়ি পরে অ্যাঞ্জেলিনা স্কুলে সবাইকে চমকে দিতে চায় |
তার মা লিসা খুব কিন্তু কিন্তু করে আমায় শুধিয়েছিলো, অ্যাঞ্জেলিনাকে আমি শাড়ি পরতে সাহায্য করতে পারি কিনা | অ্যাঞ্জেলিনা একটা শাড়ি অলরেডি দোকান থেকে কিনে এনেছে | যদি আমার খুব অসুবিধে না হয়, তাহলে…. ইত্যাদি ইত্যাদি |
হেসে বলেছিলুম, “খুব অসুবিধে হবে, দোকান থেকে কেনা শাড়ি পরাতে এতটাই অসুবিধে যে সে আর বলার নয় | তার চে’ বরং আমার একটা মানানসই শাড়ি পরিয়ে দেব, কেমন? তাতেই সুবিধে |”
হাঁপ ছেড়ে পরের দিনই পাঠিয়েছিল মেয়েকে |
তা সেই অ্যাঞ্জেলিনার অনেক গুণ | লেখাপড়ার সঙ্গে সঙ্গে ও একজন দুর্দান্ত আইস স্কেটার | স্টেট লেভেলে ওর স্কুলকে রিপ্রেজেন্ট করে | আর তার জন্যে ওকে দৈনন্দিন প্র্যাক্টিসে অনেক সময় দিতে হয় | স্কেটিং রিঙ্কগুলো এবার খুলতে চলেছে | তারা বলেছে মাস্ক পরে ট্রেনিং করতে |
স্কেটারদের ঘনঘন বুকভরে দম নিতে হয় | অ্যাঞ্জেলিনা ভেবেই পাচ্ছে না মাস্ক পরে ও কিভাবে ট্রেনিং করবে | খুব চিন্তায় আছে |
হাইস্কুল গ্র্যাজুয়েশনএর খবর দিয়ে ফোন করেছিল | তাতেই জানলুম |
চট করে মাথায় বুদ্ধি এলো, বললুম, “সেই ছোট্ট ছেলেটা আর প্রজাপতির গল্পটা জানো তো?”
চুপ করে আছে | জানেনা |
এই সুযোগে বলতে থাকলুম, “সেই একটা ছেলে রাস্তা দিয়ে যেতে যেতে দেখে কোকুন থেকে প্রজাপতির জন্ম হচ্ছে | এত্তোটুকু একটা ফাঁক, তার মধ্যে দিয়ে বেরোবার জন্যে সে কি প্রাণপণ চেষ্টা | ছেলেটার মনে হলো ছোট্ট প্রজাপতি বোধহয় দম আটকে মরেই যাবে | তাড়াতাড়ি একটা ছুরি এনে কোকুনটা চিরে দিলো একটু | প্রজাপতি বেরিয়ে এলো | কিন্তু…. ”
এ পর্যন্ত বলে যেই থেমেছি, অন্য প্রান্ত থেকে তাড়া, “আঃ, থামলে কেন?”
“প্রজাপতি বেরিয়ে এলো বটে কিন্তু ডানাদুটো দুর্বল, উড়তে পারছে না, নেতিয়ে পড়ছে ক্লান্তিতে |”
“কেন?” রুদ্ধশ্বাস জিজ্ঞাসা |
“কেন আবার ? ওই যে কোকুনের ছোট্ট জায়গাটা দিয়ে বেরুতে ওর যে লড়াই – সেই লড়াইয়ের জোরেই ওর শরীরে বইতো প্রাণরস, ডানায় আসতো ওড়ার শক্তি | প্রকৃতির চ্যালেঞ্জ জিতে ও শক্তপোক্ত পাখনা মেলতো | কিন্তু তা আর হলো না | চ্যালেঞ্জটাই যে উধাও হয়ে গেল |”
“বুঝেছি |”
“কি বুঝলে ?”
“জীবন তো বাধা দেবেই, সে বাধা টপকে এগিয়ে গেলে তবেই না জিত | মাস্ক পরে স্কেটিং করে আমিও পয়েন্ট জিতে নেবো – দেখে নিও তুমি |”
খুশি হয়ে বললুম, “জয়ী হও | এথনিক ডিজাইনার মাস্ক পরবে নাকি ? আছে আমার কাছে বেশ কয়েকটা |”
লাফিয়ে উঠে বললে, “দুর্দান্ত আইডিয়া, কোচ চমকে যাবে | কালই তোমার কাছ থেকে নিয়ে আসছি | দেরি করে লাভ কি ? ট্রেনিং শুরু হলো বলে |”
Spread the love

You may also like...

error: Content is protected !!