অনন্য সৃষ্টি সাহিত্য পরিবার পাক্ষিক প্রতিযোগিতা পর্ব – ৩০ বিষয় – সততার মূল্য
শম্ভু দুয়ারী একজন বস্তিবাসী মানুষ। মালিকের অটো ভাড়া নিয়ে চালায়। খুব অভাবের সংসার।তার একটি খুব সুন্দর দেখতে বাচ্চা মেয়ে আছে তার নাম টুকটুকি। টুকটুকি বস্তির ইস্কুলে ক্লাস থ্রি তে পড়ে। শম্ভু মেয়েকে খুবই ভালোবাসে। মেয়ে কোনোকিছু বায়না করলে শম্ভু রাত্রি পর্যন্ত অটো চালিয়ে মেয়ের বায়না পুরণ করার চেষ্টা করে। শম্ভুর সততার জন্য শম্ভুর মালিক ও শম্ভু কে খুব বিশ্বাস করে।
একদিন টুকটুকি ছোটাছুটি করে খেলতে খেলতে প্রধান রাস্তায় উঠে পড়ে।সেই সময় দ্রুতবেগে একটি গাড়ি টুকটুকি কে ধাক্কা দিয়ে চলে যায়। টুকটুকি অচৈতন্য হয়ে রাস্তার ধারে ছিটকে পড়ে। বস্তির মানুষেরা টুকটুকি কে হাসপাতালে নিয়ে যায়। তিনদিন পর টুকটুকির জ্ঞান আসে। মাথায় জোরে চোট লাগার ফলে টুকটুকির বাকশক্তি হারিয়ে যায়।হাত পা নাড়াচাড়াও বন্ধ হয়ে যায়। শুধু করুন দৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে। হাসপাতাল থেকে বলা হয় কোনো বড়ো নার্সিংহোমে ভর্তি করাতে কারণ ঐ হাসপাতালে ব্রেন অপারেশনের মতো পরিসেবা নেই। শম্ভু তখন জানায় আমরা তো গরিব মানুষ অতো টাকা তো আমাদের নেই। তখন হাসপাতাল এর ডাক্তার বাবু বলেন- এখানে যখন চিকিৎসা হবে না এখানে ফেলে রেখে তো লাভ নেই আমি কয়েকটা ঔষধ লিখে দিচ্ছি ঠিক সময়মতো ওগুলো খাওয়াবে দেখবে কোনো ঔষধ ফাঁক না পড়ে যায়। বাকিটা ওপরওয়ালার হাত।
টুকটুকির ফ্যালফ্যাল করে করুন দৃষ্টি শম্ভুর হৃদয়ে ভীষণ আঘাত করে। টুকটুকির দিকে দেখলেই শম্ভুর মন ভারাক্রান্ত হয়ে চোখ থেকে জলের ধারা নেমে আসে।
এমনিতেই অভাবের সংসার তার উপর ঔষধের দাম শম্ভু ঠিক করে সে গভীর রাত পর্যন্ত অটো চালিয়ে ঔষধের জোগান দিয়ে যাবে। এভাবেই কোনো রকমে চলে যাচ্ছিল।
বর্ষাকালে এমনিতেই যাত্রী সংখ্যা খুব কম ওদিকে টুকটুকির ঔষধ ও শেষ। ফাঁকা বাসস্ট্যান্ডে একাএকা অটো নিয়ে বসে বসে শম্ভু চিন্তাগ্রস্ত হয়ে ভাবছে কালকে কি করবে ! অঝোরে বৃষ্টি হচ্ছে। এমন সময় এক দম্পতি শম্ভুর দিকে এগিয়ে এসে জিজ্ঞাসা করল সে ভাড়া যাবে কিনা। দম্পতি ভাড়ার কথা জানতে চাইলে শম্ভু বলে দেখুন ওখানে ২৫০ টাকা আমাকে ৩০০ টাকা দিলে খুব ভালো হয়। দম্পতি বলেন আমাদের বিপদের তুমি সদ্ব্যবহার করছো ? আমাদের গাড়ি বিগড়ে গেছে বলেই তোমার কাছে এসেছি যা ভাড়া সেটাই দেবো তুমি চলো। গন্তব্যে পৌঁছে ভাড়া নেবার সময় শম্ভু আবার বলে দেখুন স্যার আমার মেয়ে খুব অসুস্থ তার ঔষধ কিনতে ৩০০ টাকা লাগবে ৫০ টাকা বেশি দিলে খুব ভালো হয়। দম্পতি বলেন ওরকম নাটক আমার অনেক দেখি যেটা ন্যায্য ভাড়া সেটা নিয়ে চলে যাও নাহলে পাড়ার লোক ডাকতে বাধ্য হবো। শম্ভু কিছু বলতে যায় কিন্তু দম্পতি দরজা বন্ধ করে দেয়।
চিন্তাগ্রস্ত শম্ভু বাড়ির দিকে রওনা হয় কিছুদূর আসার পর অটো একটা গর্তে পড়তে অটোর পেছনে ভারী কিছু লাফিয়ে উঠার আওয়াজ হলো। শম্ভু পেছনে গিয়ে দেখে একটা সুটকেস অটোর নাড়াচাড়ায় খুলে গেছে তাতে টাকা আর গহনায় ভর্তি। দেরি না করে অটো ঘুরিয়ে সেই দম্পতির গেটের সামনে হাজির হয়। অনেক টোকা মারা ও ডাকাডাকির পর যখন দরজা খুলে শম্ভু কে দেখে দম্পতি তো তেলেবেগুনে জ্বলে উঠলো শম্ভু কে মারতে উদ্যত হলে শম্ভু বলে স্যার আমি টাকার জন্য আসিনি এই সুটকেস টা আমার অটো তে রয়ে গিয়েছিল এটা দিতে এসেছি।সব ঠিক আছে কিনা দেখে নিন। দম্পতি খুলে দেখেন সবকিছু ঠিকঠাক আছে শম্ভু কে বেশকিছু টাকা দিতে যায় কিন্তু শম্ভু নিতে রাজি হয়নি।
দম্পতি তখন বলেন একটু আগেই তুমি ৫০ টাকার জন্য অনুনয় বিনয় করছিলে এখন এতোগুলো টাকা তুমি নিতে চাচ্ছো না কেন ? শম্ভু বলে – এটা ঠিক যে আমি গরিব এবং আমার টাকা খুব দরকার তাবলে আপনার টাকা আমি এমনি এমনি নিতে যাবো কেন। দম্পতি শম্ভুর সততায় মুগ্ধ হয়ে যান। এবং শম্ভুর সঙ্গে খারাপ ব্যবহারের জন্য অনুতাপ অনুভব করেন।
দম্পতি বলেন তোমরা মেয়ের শরীর খুব খারাপ বলছিলে না,চলো তোমার মেয়েকে দেখতে যাবো। শম্ভুর বাড়িতে এসে পরিস্থিতি দেখে দম্পতি বলেন দেখো শম্ভু আমরা নিঃসন্তান দম্পতি তোমার মেয়ে আজ থেকে আমাদের ও মেয়ে। যতই টাকা লাগুক আমরা মেয়েকে সুস্থ করে তুলবোই। তোমাদের এই ঝুপড়িতে থাকতে হবে না তোমরা আমাদের সঙ্গেই থাকবে।