সাপ্তাহিক কোয়ার্ক ধারাবাহিক উপন্যাসে সুশোভন কাঞ্জিলাল (পর্ব – ৫৯)

উনষাট

আকর্ষণ মানুষকে অন্ধ করে দেয়।এই লুলিয়াকেই কত না বুদ্ধিমতী ভেবেছিলাম । ওর কথাবার্তা,ওর রসবোধ, ওর সপ্রতিভো ভাব, ওকে আমার চোখে এক্সট্রাঅর্ডিনারি করে তুলেছিল এক সময় । এখন বুঝি সেটা ছিল আমার ভ্রম । আসলে ও অত্যন্ত সাধারণ বুদ্ধির চরিত্রহীনা মেয়ে । এতোই সাধারণ বুদ্ধির মেয়ে যে ও একমিনিটে ওর আসল পরিচয় আমার কাছে পরিষ্কার করে দিল। মানুষ যখন তার অনুকূল পরিস্থিতিতে থাকে তখন অনেক অভিনয় করতে পারে । ভান করতে পারে মুখোশ পরে।কিন্তু হিসাব না মিললেই বা কোনো ক্রাইসিস্ কন্ডিশনে পড়লেই তার আসল রূপটা বেরিয়ে আসে । আগের লুলিয়া মুখোশ পরে ওর হিসাব মাফিক আমার সামনে ধরা দিয়েছিলো । আমি ডঃ চোঙদারের বেডরুম পর্যন্ত পৌঁছে যেতেই ও ধরে নিয়েছিল যে আমি ডায়েরি পর্যন্ত পৌঁছে যাবো । ওর দলের লোক হয়তো ওকে এরকমই আশ্বাস দিয়েছিল।আমি বেডরুম সার্চ করার সময় নিশ্চই ও ওর দলের লোকের সঙ্গে যোগাযোগ করেছিল । কিন্তু ফিরে এসে আমাকে ডঃ চোঙদারের খাটে বসে আলমারি থেকে বের করা কাগজপত্র ঘাঁটতে দেখে ওর হিসাব গন্ডগোল হয়ে যায় । ও ভাবল আমি ভুল জায়গায় হাতড়াতেই থাকবো, সঠিক জায়গায় পৌঁছতেই পারবো না । আমাকে এসে জিজ্ঞাসাও করেছিল কিছু পেয়েছি কিনা । কাকতালীয় ভাবে ওর জিজ্ঞাসার উত্তরে আমি বেখেয়ালে না -ই বলেছিলাম । আর এই না বলার জন্যই ওর স্বরূপ প্রকাশ হয়ে পরে । সত্যের পথে থাকলে জয় আসে এই আপ্ত বাক্যটাই খাটলো । ও ভেবেছিল হায়রে আমি বোধহয় সমাধান খুঁজে পাব না । ফলে ও দিশাহারা হয়ে যায় । অথচ ডায়েরিটা আমার হাতে পড়া দরকার। তাই ও আর থাকতে না পেরে ডায়েরি পর্যন্ত পৌঁছনোর রাস্তার ইঙ্গিত দিয়ে দেয় । এটা যে ওর কত বড় ভুল অবোধটা বুঝতেও পারেনি । হঠাৎই আমার নিজেকে জেমস বন্ড মনে হল । শত্রুপক্ষের মহিলার সঙ্গে সহবাস করে ক্লু বের করা সহজ কাজ নয় । তবে লুলিয়া না বুঝলেও, ওর দলের বাকিরা বুঝবেনা যে ওর ব্যাপারটা ধরে ফেলেছি,সেটা ভাবা বোকামি হবে । রাস্তার দিকে খেয়াল হতে দেখি ট্যাক্সি ই এম বাইপাস এর দিকে ছুটেছে । আমি চেঁচিয়ে বললাম, “আরে কোথায় যাচ্ছ? হালতু যাব বললাম তো । বিজনসেতু থেকে নেমে ডান দিকে যেতে হত।”ট্যাক্সিওলা বলল,”রাস্তা চিনিনা বাবু ” গাড়ি ততক্ষনে বসপুকুর পেরিয়ে এসেছে । আমি বললাম, “সামনের মোর থেকে ডান দিকে ট্যাক্সি ঘোড়াও “। বাইপাস কানেক্টর থেকে ডান দিকে গাড়ির মুখ ঘোরাতেই মোড়ের মাথায় একটি ছেলেকে দাঁড়িয়ে থাকতে দেখলাম । খুব চেনা চেনা লাগলো । এবার চিনলাম শ্রেয়ানের বন্ধু অনিকেত ।
বাঃ বেশ ভালোই হল । অনিকেতের সঙ্গে যোগাযোগের কথা ভাবছিলাম । ট্যাক্সিকে আমার ওখান দাড়করাতে বললাম অনিকেতের পাশে ।ট্যাক্সি থেকে মুখ বার করে অনিকেতকে ডাকলাম,। আমাকে দেখে অনিকেত হাসলো । আমি ওকে বললাম কোথায় যাচ্ছ? বিশেষ কোনো কাজ না থাকলে উঠে এস না । চা খেয়ে আসবে, সময় থাকলে গল্পগুজব করা যাবে । বাড়ি তে বড় একা লাগে । অনিকেত এক মুহূর্ত কি ভেবে ঘড়ি দেখলো তারপর বললো ” ঠিক আছে চলুন ” । ট্যাক্সি তে উঠে বসে বললো ” অথবা বিশেষ কোনো কাজ নেই । টিউশানি সেরে ফিরছিলাম । একেবারে রাতের খাবার । একেবারে রাতের খাবার হোটেলে খেয়ে মেসে ফিরতাম”। আমি সঙ্গে সঙ্গে বললাম ” ঠিক আছে নো প্রবলেম।আমার ওখান থেকেই একেবারে খেয়ে ফিরবে “। ও বিশেষ আপত্তি করলো না । ছেলে তা খাঁটি তাই কোনো ফর্মালিটি বা ভনিতার কথা বাত্তা বলে না। আমার একটু হেল্প পেলে ভালো হয়। সেই আশাতেই অনিকেত কে বাড়ি নিয়ে এলাম। মাথায় শুধু একটা কথাই ঘুচে আমার টার্গেট তিন দিন। বাল্মীকিকে অনিকেত এর খাওয়ার কথা বলে অনিকেত কে ড্রয়িং রুমে বসিয়ে আমি ফ্রেশ হতে গেলাম। পকেট থেকে ডাইরি টা বের করে সাবধানে ড্রয়ারের মধ্যে রাখলাম। অন্য পকেট থেকে মোবাইল টা বের করতে গিয়ে দেখি আরও কিছু পকেটে আছে । সেগুলো হাতড়ে বের করে দেখি তিনটেAlphabet । লুলিয়ার ছেলে Alphabet নিয়ে খেলতে খেলতে কখন জানো আমার পকেট ই ঢুকিয়ে দিয়েছে । অসহায় বোবা ও কালা বাচ্চা । কার কে জানে? আমি লেটার তিনটে ডাইরির সঙ্গেই ড্রয়ারে রেখে দিলাম ।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।