ছোটগল্পে সোনামনি কুঁতি

সম্পর্ক
সেদিন বাড়িতে অশ্মী একা । সারাদিন প্রায়
কেটেছে কলেজের কাজ নিয়ে, এমনকি টেবিলের ওপর মায়ের বেড়ে রাখা ভাতটাও খাবার সময় পায়নি অনলাইন ক্লাসের ঠেলায়।
তার ওপর রাজ্যের ফোন, স্টুডেন্টসদের আর কি, এক ফোনেই যখন সব সমাধান তখন নিজেদের বুদ্ধিটা একটু আদর – যত্নে তোলা থাক ভবিষ্যতের জন্য।
–ম্যাডামদের সময় এখন অনেক বেশি,
বাড়িতেই তো থাকে তাই কথায় কথায় ফোন।
এরকমই একটা ফোনের মাঝে কখন যে অন্য একটা কল এনগেজ টোন পেয়ে রেগে ফুঁসছে অশ্মী সে খবরই পায়নি ।
যতই হোক অমিত চার বছর ধরে অশ্মীকে ভালোবাসার দাবি জানিয়েছে ।
-অশ্মীও একসময় সেই দাবিতে সম্মতি দিয়েছিলো কিন্তু তখন জানতো না এই দাবি,
এতো অনুরোধ , আবার একদিন হুমকিতে পরিণত হবে।
লম্বা ছিপছিপে চেহারা, —- সাথে চোখের টান
যেকোনো ছেলের মনে সহজে দাগ কাটার মতো ।
মায়ের কথা রাখতে রূপচর্চার জন্য আগের দিকে কিছুটা সময় ব্যায় করলেও এখন সেটা—–
অপচয়য়ের খাতায় জমা হয়।
অশ্মী আর অমিতের সম্পর্কের কথা দুটো পরিবারের সবাই সবটা জানে — সেটা অবশ্য সম্ভব হয়েছে অশ্মীর সব সম্পর্কের প্রতি দুর্বলতা থেকে।
সব সম্পর্কের মধ্যে একটা সিরিয়াস মনোভাব রাখে অশ্মী।
অনেকের কাছে এই স্বভাবের জন্য বিদ্রুপ হতে হয়েছে , —– যদিও তাতে অশ্মীর কিছু যায় আসেনা । অমিত দ্বিতীয়বারের চেষ্টায় বুঝে
গেলো এইবার অশ্মীকে ভালোভাবে বুঝিয়ে দিতে পারবে, তার একেকটা ফোন অশ্মীর কাছে কতটা গুরুত্বপূর্ণ হওয়া উচিত।
একটা বেসরকারি কোম্পানিতে কাজ শুরু করেই নিজের ভালোবাসার দাবিটা অশ্মীকে জানিয়েছিল অমিত।
কলেজ থেকেই অশ্মীকে চোখে ধরেছিলো তার।
অশ্মী পড়াশোনাতে তখন থেকেই ভীষণ সিরিয়াস কিন্তু সেতো অনেকেই হয়——-
কলেজে পড়া সামান্য মেয়েটা একদিন
নিজে কলেজে পড়াবে–
এটা অমিত ভাবতে পারেনি। তবে
চাকরির খবর পেয়ে অমিতই অবশ্য ট্রিট দিয়েছে সব বন্ধুদের।
ইদানিং অশ্মী খুবই ব্যাস্ত থাকে কলেজের কাজে — বাকি সময় নিজের একটা বহু পুরানো শখ কবিতা লেখাতে সময় দেবে সে উপায় ও নেই হোয়াটস্যাপ গ্রুপের দৌলতে ।
—- ফোনের ওপার থেকে অনবরত
চিৎকারে অশ্মী একটু বিরক্ত হয়ে ফোনটা রেখে দিলো।
—তৎক্ষণাৎ আবার ফোন বেজে উঠলো, অশ্মী এবার তার উত্তরটা যেই দিতে যাবে, —- অমিত তার অসম্মানের প্রতিশোধটা নিয়েই নিলো।
—–অমিতকে এমনিতেই স্পষ্টভাষী বলে সবাই জানে তাই অশ্মী তার স্পষ্ট কথায় আর কষ্ট পায়না।
কিন্তু তাও যেন অশ্মী একটু চমকে উঠলো অমিতের কথায়। —-এখন রিলেশনটা
নাকি তার কাছে একটা বোঝা,
অমিত মুক্তি চায় তার এতদিনের ভুল হয়ে যাওয়া একটা রিলেশনশিপ থেকে।
অশ্মী আজ আর বোঝানোর দায়িত্বটা নিলোনা খুব ক্লান্ত থাকার জন্য হোক বা
নিজের —- আত্মসম্মানের জন্য হোক।
কোনোরকম স্নান আর দুপুরের খাবারটা সেরে সবে বিকালের অনলাইন ক্লাসের জন্য তৈরি হচ্ছে , —
এমন সময় হোয়াটস্যাপ গ্রুপে চোখ পড়লো,
প্রচন্ড বৃষ্টির কারণে আজ অনেকের
নেটওয়ার্কিং প্রবলেম তাই একের পর এক আর্জি ক্লাস না নেওয়ার । সাত পাঁচ না ভেবে অশ্মী রাজি হয়ে গেলো ।
মুষলধারে বৃষ্টি সাথে ঝোড়ো হাওয়া অশ্মীকে বাধ্য করলো জানালা খুলে সেই দৃশ্য উপলব্ধি করতে।
বৃষ্টি দেখতে দেখতে কখন মনের মধ্যে
কিছুক্ষন আগে অমিতের বলা কথা গুলো ভিড় করেছে । নিজের ভিতরে কেউ যেন একজন প্রশ্ন করলো সম্পর্ক ভাঙা কি এতটাই সহজ ?
অশ্মী নিজের মনে কথা বললো —আসলে
রিলেশন শব্দটা সবার কাছে খুব সহজলোভ্য হয়ে গেছে ।
মানুষ যত তাড়াতাড়ি একটা সম্পর্কে ঢুকতে পারছে তার থেকেও তাড়াতাড়ি বেরোতে পারছে। হয়তো এটাই আধুনিকতা ।
যেখানে সম্পর্ক গুলো দিনে দিনে আধুনিক হয়েছে, —টেকনোলজির মধ্যে সীমাবদ্ধ হয়েছে,
সম্পর্কের মানে ছোট হয়েছে, সম্পর্কের বয়স ছোট হয়েছে,
এখন তো সম্পর্কের প্রকৃত মানে বুঝতে আইনের দ্বারস্থও হতে হয় ।
হয়তো অশ্মীকে আরো বেশি আধুনিক হতে হবে যেখানে সম্পর্ককে নয় রিলেশন কে বুঝবে , আধুনিক ভাবে ।
আবারো ফোনটা বেজে যাচ্ছে , অশ্মী অবজ্ঞা করলো ফোনের শব্দ ,
—-চোখের জলটাও মিলিয়ে গেলো বৃষ্টির অঝোর ধারায় ।
জানালার পাশে একা দাঁড়িয়ে নিজের মনে বলতে লাগলো সম্পর্ক ভাঙ্গা কি এতটাই সহজ——-