সাপ্তাহিক কোয়ার্ক ধারাবাহিক উপন্যাসে সুশোভন কাঞ্জিলাল (পর্ব – ৫৬)

ছাপান্ন

আমরা যখন কাউকে পথ দেখাই তখন হাতের একটা ভূমিকা গুরুত্বপূর্ণ । আমরা সাধারণত হাতের আঙ্গুল ব্যবহার করি । এ কথা মনে হওয়ায় আমি রামকৃষ্ণ দেবের ছবি দুটিতেই হাতের আঙ্গুলের বিন্যাস ও অবস্থানগুলো ভালোভাবে লক্ষ করতে লাগলাম। একটি ছবিতে রামকৃষ্ণদেব দাড়িয়ে আছেন এক হাত ওপর দিকে তুলে আর একহাতে বুকের সামনে ধরে । এই ছবিটিতে দু হাত
মিলে মোট ছোটা আঙ্গুল দেখা যাচ্ছে । অন্য ছবিটার ঠাকুর বসে আছেন, দুই হাতের আঙ্গুল একে অপরের সঙ্গে জড়ানো । এই ছবিতে দু হাত মিলে মোট পাঁচটা আঙ্গুল দেখা যাচ্ছে । এবার দুটো ছবির ছটা আঙ্গুল ও পাঁচটা আঙ্গুল এবং ঘড়িটার মধ্যে কোনো লিংক খুঁজতে হবে । হ্যাঁ ঠিক । আঙুলের সংখ্যা ৬ ও ৫ এবং ঘড়িতেও আছে বিভিন্ন সংখ্যার মধ্যে ৬ ও ৫। আমার মাথা যেন ক্রমশ খুলছে । এখন মনে হচ্ছে আমি সমাধানের কাছে এসে গেছি । ভেতরে উত্তেজনা বোধ করছি । কিন্তু উত্তেজিত হলে হবে না । আর একটু পথ এগোতে হবে । এক কাজ করলে হয় । ঘড়ির কাঁটা দুটোকে ঘুরিয়ে ৬আর ৫ এর সঙ্গে মেলালে কিছু একটা পাওয়া যেতে পারে । খাটে উঠে ঘড়ির ছোট কাঁটাটা ৬থেকে ৫ এ এনে দেখলাম কিছু লাভ হল না । তার পর দুটি কাঁটা নিয়ে বিভিন্ন ভাবে এদিক ওদিক করলাম ।একবার বড় ও ছোট দুটি কাটাকেই ৬ টায় এনে বড় কাঁটাকে পেছনদিকে অর্থাৎ অ্যান্টিক্লকওয়াইজ ঘোরাতে লাগলাম । পুরো একপাক ঘোরানোর পর ছোট কাঁটা যেই ৬ থেকে ৫ এ এল অমনি একটা খট করে আওয়াজ হল । আওয়াজটা শুনেই মনে হল কিছু একটা ঘটলো কিন্তু আওয়াজটা ঘড়ি থেকে আসেনি । মনে হল খাটের নীচ থেকে এসেছে। তারাতাড়ি খাট থেকে নেমে খাটের নীচে তাকালাম । তাকিয়েই আমি লাফিয়ে উঠলাম আনন্দে । খাটের নীচে মেঝের একটা টাইল খানিকটা উঠে আছে । উত্তেজনায় আমার বুকের হৃদপিন্ড লাফাতে শুরু করেছে । আমি টাইলটা টানতেই ওটা উঠে এলো । টাইলের নীচে দেখা গেল একটা গর্ত । ঝুকে দেখলাম গর্তের মধ্যে একটা বইয়ের মতো কি রাখা আছে । তুলে দেখি ওটা বই না একটা ডাইরি । ডাইরিটার সাইজ একটা পকেট ডিকসনারির মতন । তাড়াতাড়ি একটু দেখেনিলাম । সামনের পাতায় নাম লেখা আছে ডঃ কানুপ্ৰিয় চোঙদার । পাঁচবছরের পুরোনো ডাইরি । হাতেই লেখা । অনেক লেখা আছে ভেতরে । এতো এখানে পড়া যাবে না। তাই তারা তাড়ি পকেটে পুরে নিলাম । টাইল টা আবার আগের জায়গায় বসিয়ে দিলাম । আগের মতো সুন্দর সেট হয়ে গেল । পুশ লকের ব্যবস্থা আছে। এবার আলমারি থেকে বের করা কাগজপত্র আর ফাইলগুলো দেখতে হবে ।
ফাইলগুলো দেখতে গিয়ে ডঃ চোঙদারের জার্মান পাসপোর্ট পেলাম । ভদ্রলোক দেখতে বেশ অভিজাত ছিলেন । ফ্রেঞ্চকাট দাড়ি, চুল ধপধপে সাদা, চোখ দুটো বেশ উজ্জ্বল । চোখদুটো চেনা লাগলো । আমার দিকে যেন মিটি মিটি হেসে বলছেন, হ্যালো জুনিয়ার চৌধুরী তোমার বুদ্ধির দৌড় কতদূর দেখবো । সত্যিই এই ভদ্রলোক আমাকে ভাবিয়ে তুলেছেন । কিছু পুরোনো ছবি পেলাম । ছবিগুলো আলগা ভাবে ছিল এবং সেগুলো অনেক পুরোনো । ডঃ চোঙদারের যৌবন বয়েসের মনে হল । সুটেড এবং বুটেড একজন তরতাজা অসাধারণ স্মার্ট যুবক । একটা ফ্যামিলি ফোটোগ্রাফ ও দেখলাম । ডঃ চোঙদারের বয়েস তখন সম্ভবত বছর আঠেরো, পাশে ফ্রক পড়া দশ বারো বছরের একটি মেয়ে এবং সামনে বসা একজন ভদ্রলোক ও একজন ভদ্রমহিলা । বোঝাই যাচ্ছে ওনারা ডঃ চোঙদারের বাবা ও মা । ফাইলের কাগজপত্র গুলো ঘেটে দেখলাম । ইতিমধ্যে কখন লুলিয়া এসে ঘোরে ঢুকেছে খেয়াল করিনি । হালকা কেসে ও ওর উপস্তিতি টা আমায় জানালো। আমি তখন ফাইল থেকে পাওয়া একটা ইংলিশ চিঠি পড়ছিলাম । ওর দিকে তাকিয়ে হেসে আবার নিজের কাজে মন দিলাম । চিঠিটা ডঃ চোঙদারকেই লেখা মনে হল । লিখেছে গোগোল নামে কোনো একজন । নানা কথা লেখার পর চিঠিতে কিছু টাকা চাওয়া হয়েছে।পড়ে মনে হল ডঃ চোঙদার এই গোগোলকে নিয়মিত টাকা পাঠাতেন । চিঠিটার শুরুতে লেখা হয়েছে, ‘Dear Uncle Kan’ আর একেবারে শেষে লেখা হয়েছে,’From Gogol’। হাতের লেখাটা আমার খুব চেনা চেনা লাগলো । লুলিয়া আমায় কিছু জিজ্ঞাসা করলো আমি ঠিক খেয়াল করিনি । ও হয়তো আমায় ডিসটার্ব করছে কিনা জিজ্ঞাসা করলো । আমি অল্প ঘাড় নেড়ে না বললাম । চিঠিতে মগ্ন ছিলাম তাই কথা গুলো মাথায় ঢুকলেও মনে ঢোকেনি । লুলিয়া হঠাৎ বলে উঠল, “আচ্ছা অর্ক ঘড়ি মানেই তো টাইম মেশিন “। আমি সম্মতি জানিয়ে ওর দিকে একটু অবাক হয়ে তাকালাম । ও আবার বলে উঠল,”দেখো রামকৃষ্ণের হাতের আঙ্গুল গুলো দেখে মনে হচ্ছেনা যে একটায় ৬টা আরেকটায় ৫ টা দেখাচ্ছে? লুলিয়ার এই পর্যবেক্ষনে আমি হতবাক হয়ে গেলাম ।
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।