গল্পবাজে সরিফা খাতুন

মিথ্যা অভিনয়

রিয়া – মনে মনে এত কষ্ট পাচ্ছিস, তবুও সায়নীকে মুখ ফুটে মনের কথা বলবি না তাই তো? সবাই বলে মেয়েদের বুক ফাটে তবু মুখ ফাটে না, কিন্তু তুই তো ছেলে| তুই কেন বলছিস না?
রোহিত – না রে আমি বলেছিলাম| সায়নী আমাকে একসেপ্ট করেনি| সায়নী বলেছিল ও একজনকে ভালোবাসতো| ওকে ভালোবাসার পর, আমাকে সায়নী কখনো ভালোবাসতে পারবে না|
রিয়া – এইজন্য তুই হেরে গেলি| হ্যাঁ, আমিও জানি সায়নী ছোটো থেকেই একজনকে পছন্দ করতো আর মনে মনে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসতো| কিন্তু সায়নী জানতো না যে, ওই ছেলেটা সায়নীকে কখনো ভালোবাসতো না| সায়নী ওকে এতটা ভালোবাসতে পারে, ওই ছেলেটা কখনো বিশ্বাস করতে পারেনি| ছেলেটা সায়নীকে বিশ্বাস করতো না, তাই সায়নী নিজেকে প্রচুর কষ্ট দিত | একদিন ওই ছেলেটার কানে এই খবরটা গেল তখন ছেলেটাকে সবাই জোর করায়, সায়নীর সামনে ছেলেটা মিথ্যা ভালোবাসার অভিনয় করতো| সায়নী সেটা সত্যি মনে করলো, ওই ছেলেটার প্রতি সায়নীর ভালোবাসা আরো বেড়ে গেল| ছেলেটা যে সায়নীকে সত্যিকারের ভালোবাসে না, সেটা সায়নীকে সবাই বলতো| কিন্তু সায়নী কখনো কারোর কথা বিশ্বাস করতো না| একদিন সায়নী ওই ছেলেটাকে সারারাত ফোনে ব্যস্ত পেল, তারপর থেকে ওই ছেলেটা সায়নীকে এড়িয়ে যেতে লাগলো| এরপর থেকে সায়নী সবসময় ছেলেটাকে ফোনে ব্যস্ত দেখল| কিন্তু সায়নী এসব কিছুই বিশ্বাস করতে পারছিল না| একদিন ওই ছেলেটাকে সায়নী অন্য মেয়ের সাথে দেখল| এর আগে অনেকেই দেখেছে কিন্তু সায়নীকে বললে, সায়নী কোনো দিন কারোর কথা বিশ্বাস করতো না| সেদিন নিজের চোখে দেখে সায়নী ব্লেড দিয়ে নিজের হাত কেটে দিয়েছিল| ধীরে ধীরে অসুস্থ হয়ে পড়ে, তখন সায়নীর কাছে সুস্থ হওয়ার একমাত্র উপায় যেন, ওই ছেলেটার গলার আওয়াজ আর দূর থেকে হলেও একবার দেখতে পাওয়া| কিন্তু ছেলেটা সায়নীর ফোন আর কখনোই তুললো না| সায়নীর অসুস্থতার কথাও ছেলেটা জানতে পারলো না| আর এদিকে সায়নী খাওয়া দাওয়া বন্ধ করে, সারাদিন সারারাত কাঁদতো, রাতে ঘুমাতো না পর্যন্ত| তখন ওর ঐ অবস্থা দেখে একদিন সায়নীর মা আমাকে ডেকেছিল তখন সায়নী আমাকে পর্যন্ত নিজের রুমে আসতে দেয়নি| তখন আমি অবাক হয়ে গেলাম যে সায়নী আমাকে পেলে সব কিছু ভুলে যেত, সেই সায়নী আমাকে রুমে ঢুকতে দিচ্ছে না| অনেক ডাকার পর দরজা খুলল মুখে কিছু বলল না| হাতে দেখলাম রক্তের ভর্তি| আমি কিছু জিজ্ঞেস করে জোর করিনি, কারণ সায়নীর মনের অবস্থা ভালো ছিল না, শুধু কেঁদেই চলছে সারাক্ষন নিজের মোবাইল টাও ভেঙে ফেলেছে| নিজের রুমের সব কিছুই ভেঙে ফেলেছিল| আর সায়নী একটু অন্যরকম ছিল| কেউ সায়নীকে কোনো কষ্ট দিলে তখন সায়নী ভিতরে ভিতরে খুব কষ্ট পেত কাউকে কিছু বলতো না, সেই কষ্ট কমাতে সায়নী নিজেকে আরও বেশি কষ্ট দিত তবে ওর কষ্ট কমতো| সেই রাতে আমি সায়নীর কাছে থাকলাম ওর কাছে সব জানতে চাইলাম| তখন সায়নী এই কথাগুলো আমাকে বলে , কিন্তু কিছুতেই আমি সায়নীকে বোঝাতে পারলাম না| কোনোমতে মুভ অন করাতেও পারলাম না| শেষমেষ সায়নীকে একটা মিথ্যা কথা বললাম, আমি জানতাম সায়নী আমাকেও খুব ভালোবাসে, আমার কথা বিশ্বাসও করবে| তখন সায়নীকে আমি বললাম, তুই তো জানিস না সায়নী আমি আজ হঠাৎ কেন এসেছি, তুই তো ফোন ও ধরিস নি কদিন ধরে, তাই তোকে জানাতে পারিনি| তোকে আজ সেটাই বলতে এসেছি এতদিন তুই যেটা আশা করছিলি সেটাই হয়েছে| আমার বিয়ে ঠিক হয়ে গেছে| তুই যদি এরকম ভেঙে পড়িস তাহলে আমি কি করবো এবার? আমার তো সব খুশি তোকে ঘিরেই| তুই কত প্ল্যানিং করে রেখেছিস এতদিন ধরে, সেসব কি হবে বল? তোর মনে কি বেস্টফ্রেন্ডের জন্য জায়গা আছে? নাকি সব ওই অন্যের বয়ফ্রেন্ডের জন্য বল? মনে রাখবি সায়নী তুই যার জন্য এত কষ্ট পাচ্ছিস তার থেকেও তোর সাথে আমার সম্পর্কটা পুরোনো|
দেখলাম সায়নী একটু খুশি হয়েছে আমার বিয়ের খবর শুনে| পরদিন আমি চলে এলাম, ধীরে ধীরে সায়নী আগের থেকে একটু সুস্থ হল| আমার সাথে আমার বিয়ে নিয়ে অনেক প্ল্যানিং করতে লাগল, এভাবে সায়নী অনেকটা সুস্থ হল| দুইমাস পর যখন সায়নী জানতে চাইল, আমার বিয়ে কবে? তখন আমি বললাম সায়নী আমি তোকে সুস্থ করে তোলার জন্য ওটা মিথ্যা বলেছিলাম, আমি বলতে বাধ্য হয়েছিলাম | আমার আর উপায় ছিল না, মিথ্যা বলা ছাড়া| সায়নী ফোনটা কেটে দিল আবার আগের মতো অবস্থায় ফিরে গেল| হঠাৎ হঠাৎ করে এই খবরগুলো সায়নী সহ্য করতে পারলো না| তাই সায়নী আর কাউকে বিশ্বাস করতে পারে না| বিশ্বাস করবেই বা কি করে বল আমি বেস্ট ফ্রেন্ড হয়েও তো মিথ্যা অভিনয় করেছি সায়নীর সামনে|
তুই বল রোহিত, বারবার মিথ্যা অভিনয়ের কাছে হেরে গেলে কেউ কি আর স্বাভাবিক হতে পারে? সায়নীর জায়গায় যে কেউ থাকলেই তো এই অবস্থাই হত| এরপরেও কি তুই সায়নীকে আর ভুল বুঝবি?
আমার মনে হয় কি রোহিত, তুই সায়নীকে যতটা ভালোবাসিস সেটাই সায়নীর জীবনে দরকার| তুই আর একবার বল, সায়নী আজও নিজের জীবনে অন্য কাউকে মেনে নিতে পারেনি|
রোহিত – আমি আর কখনো সায়নীর কাছে যাবো না| ভালোবাসা ফিরিয়ে দিয়ে, আমাকেও তো সায়নী অপমান করেছে|
রিয়া – তুই তাহলে সায়নীকে কেমন ভালোবাসলি, তুই যাকে ভালোবাসবি আগে তার মনটা বোঝার চেষ্টা করবি| তুই সায়নীকে কখনো বোঝার চেষ্টা করিসনি| ভালোবাসি বলার সাথে একসেপ্ট করে নিলেও সবসময় ভালোবাসা হয় না| তুই যে মুহূর্তে সায়নীকে ভালোবাসার প্রস্তাব দিয়েছিলি তখন সায়নীর মনের অবস্থা ভালো ছিল না| তুই আর ভালো থাকার মিথ্যা অভিনয় করিস না| আমি খুব ভালো করেই জানি মিথ্যা অভিনয় তুই ও করছিস নিজের কাছে, আমার কাছে, সবার কাছে| কষ্ট পাচ্ছিস কিন্তু স্বীকার করছিস না| কিন্তু কতদিন এভাবে চলবে বল, মিথ্যা অভিনয় ধরা একদিন পড়বেই|
রোহিত – না কখনো ধরা পড়বে না,
রিয়া – এই তো আমার কাছে ধরা পড়ে গেলি| মনের মধ্য থেকে ইগোর পর্দা টা সরিয়ে দেখ একবার| তুই সায়নীকে ক’দিন ভালোবেসেই এত দুঃখ পাচ্ছিস, তবু সায়নী তোর সাথে কোনো মিথ্যা অভিনয় করেনি| তাহলে সায়নীর কথা টা ভেবে দেখ|
রোহিত – আমার খুব বড়ো ভুল হয়ে গেছে আমি যাবো সায়নীর কাছে, যাকে এত ভালোবাসি তার অসহায় অবস্থায় আমিই পাশে থাকবো|
রিয়া – ভালোবাসা হল পৃথিবীর এক সুন্দরতম অনুভূতি| ভালোবাসার মানুষ পাশে থাকলে অনেক সময় পৃথিবীর সকল দুঃখকেও জয় করা যায়| ভালোবাসা অসফল হলে অনেকসময় পৃথিবীর সকল খুশিকেও দুঃখ মনে হয়|মিথ্যা অভিনয়ের মুখোশ বাস্তবে অনেক কষ্ট দেয়|
মনীষীদের কথা “মিথ্যা কথা বলে হাসানোর থেকে সত্য কথা বলে কাঁদানো অনেক ভালো|”
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।