সাপ্তাহিক ধারাবাহিকে সুদীপ ঘোষাল (পর্ব – ৩৪)

সীমানা ছাড়িয়ে

অনিল বলে, আমি সাবধান হয়ে কি করব। গাড়ির চালককে বুঝতে হবে কারণ তার উপরেই নির্ভর করছে দুটি প্রাণ। অনিলের ডাক্তার বন্ধু আর কিছু না বলে চিন্তিত হয়ে হাঁটতে শুরু করলেন হাসপাতালের দিকে। অনিল বাড়ি এল। তার স্ত্রীকেও এই কথাটা বলল। স্ত্রী বললেন, রোগ হলে তো কিছু করার নেই। আমার মামার এই রোগ আছে। একবার সাইকেল থেকে পড়ে গিয়ে পা ভেঙেছিলো মামার, এই ঢুলুনি রোগের জন্য। তোমার ভয় লাগলে ওর সঙ্গ ছেড়ে দাও। অনিল বললো, না গো লোকটা খুব ভালো। আমার কাছে কোনো টাকা পয়সাও নেয় না তেল খরচের। আমি চাইছি দুজনে একসঙ্গে ট্রেনে যাওয়া আসা করলে বেশ হয়। কিন্তু বিমল বলে, ট্রেনে গেলে স্কুল পৌঁছতে দেরি হবে। বদনাম হবে লেট হলে রোজ।
অগত্যা অনিল প্রাণ হাতে করে বিমলের সঙ্গেই যায়। কিছুতেই ওর সঙ্গ ছাড়তে মন চায় না। বিমল ফোন করে ডেকে নেয় রোজ। কেমন একটা আকর্ষণে জড়িয়ে গেছে অনিল। হয়ত এটাই বন্ধুত্ব। অনিল ভাবে, ভালো সঙ্গ পাওয়া দুস্কর। তাই তার সঙ্গ সে ছাড়তে চায় না।
অনিল আর বিমল আজ স্কুলে যাচ্ছে। বিমলে সেই একইভাবে ঢুলতে শুরু করলো। অনিল বললো, এত বুদ্ধিমান লোক হয়ে আপনি গাড়ি চালানোর সময় ঘুমুচ্ছেন। বিমল বলে, না না। কত কাজ জানেন সারাদিন। মা বাবা দুজনে বয়স্ক লোক। তাদের দেখাশুনা করি। মেয়ে ও মেয়ের মা স্কুলে চলে যায়। তারপরে আমি বের হই। অনিল বলে, মেয়ের মা স্কুলে যায় কেন? বিমল বলেন, ও একটা স্কুলের টীচার। সারাদিন বাবা, মা একা। রাত হয়ে যায় শুতে। কি বলব আপনাকে অনিলদা। কিছু বলার নেই।
অনিল আর কিছু বলতে পারে না। সবটাই ছেড়ে দেয় ঈশ্বরের হাতে। যা হয় হবে। আর কি করব। এই ভেবে সেও চোখ বন্ধ করে থাকে।
এখন বিমল স্পিডে গাড়ি চালায় আর তারই ফাঁকে ঘুমিয়ে নেয়। মাঝে মাঝে হ্যান্ডেল কাঁপে। অনিল ভাবে এ তো বেশ চালাকি শুরু করেছে। ও মনে করছে জোরে গাড়ি চালালে হয়ত বুঝতে পারবে না অনিল। অনিল একদিন বলেই ফেললো বিমলকে, আপনি এইভাবে গাড়ি চালান। পুলিশ দেখলে কিন্তু পেটাবে। আর তাছাড়া আমরা দুজনেই তো সোজা নিমতলার শ্মশানে চলে যাবো।বিমল বললো, না না। কিছু হবে না। তবে আমি একবার প্যারাডাইস লজের কাছে পরে গেছিলাম গাড়ি নিয়ে। হাত, পা ছিঁড়ে গেছিলো। বাড়িতে বলি নি। বললে আর গাড়ি চালাতে দেবে না। অনিল বললো, বিমলবাবু আপনি এভাবে গাড়ি চালাবেন না প্লিজ। তারপর দুদিন খুব ভালোভাবে তারা স্কুলে গেলো। কিন্তু তারপর থেকে সেই একই অবস্থা। আবার ঢুলুনি। গাড়ি চলছে কম গতিতে।এক একবার গাড়ি রাস্তার পাশে খালে পড়ছে তো আবার উঠছে উঁচু স্থানে। অনিল ভাবে, ভারি মুস্কিল তো। মানুষের কোনো হাত থাকে না কিছু কিছু জায়গায়। সেখানে অজানা অদৃশ্য এক চালক ঠিক করে মানুষের আগামী জীবনের গন্তব্য ।

একবার আমরা সপরিবারে পুত্র কন্যাসহ দার্জিলিং এর তিনচুলে(৫০০০ফুট) গিয়েছিলাম।প্রচন্ড ঠান্ডা।
আমরা একটা কমদামি লজে আশ্রয় নিলাম।তিনচুলে ও ছোটোমাঙ্গোয়ার মধ্যবর্তি পথ বেশ বিপজ্জনক।ছোটা মাঙ্গোয়ারা দৃশ্য মোহিত করে দেয় মন।একদিকে দার্জিলিং, কালিম্পং অন্যদিকে সিকিম।শালিক পাখি আর কমলালেবুর বাগান চোখে পড়ার মত। সকালবেলার কুয়াশা কাটতেই বেলা বারোটা বেজে যায়। আমি কোনোদিন ভগবানের অস্ত্বিত্বে বিশ্বাস করতাম না। সবাই আমাকে নাস্তিক বলেই জানতো। কিন্তু ভগবান না থাকলে তো, ভূতেরও অস্তিত্ব নেই। এই তিনচুলে এসে সে বিশ্বাস আমার ভঙ্গ হয়েছিলো।বলছি সে ঘটনা। বিশ্বাস নাও করতে পারেন।আমি আর আমার এক বন্ধুর পরিবার এখানে লজে আছি। পোশাক আরও প্রয়োজন ছিলো। ঠান্ডা যে এত বেড়ে যাবে এই ধারণাটা ছিলো না। একদিন আমি আর আমার বন্ধুটি রাতে ঘুরতে বেড়িয়ে দেখি এক স্কন্ধকাটা লোক আমাদের আগে আগে চলেছে। বন্ধুটি ভয়ে বু বু করছে। আমি বললাম, চুপ। ভয় পাস না। কেউ হয়তো আমাদের ভয় দেখাচ্ছে। আমি কথাটা বলামাত্র পুরো শরীরটা লোকটা পাহাড়ের উপর থেকে নিচে ভাসিয়ে দিলো। লোকটা নিচে পড়ছে। প্রায় কয়েক হাজার ফুট নিচে। আমরা অবাক হয়ে দেখলাম লোকটা লাফিয়ে পড়লো নির্দ্বিধায়। দেখে আমাদের পিলে চমকে উঠলো। বন্ধুটি বললো, চল লজে ফিরে যাই। আমিও বললাম,সেই ভালো। আর ঘোরার শখ নেই।
তারপর লজের দিকে পা বাড়ালাম। ও মা, হঠাৎ ধূমকেতুর মত স্কন্ধকাটা আবার আগে আগে চলতে লাগলো।বন্ধু বললো,এখনি তো লাফিয়ে নিচে পড়লো। আবার কি করে উপরে এলো। আমি বললাম,ওরা সব পারে। উড়তেও পারে। বন্ধুটি বললো,ওরা মানে , ওরা কে? আমি বললাম, বোঝো না কেন? ওরা হলো অশরীরী। আমরা যাকে ভূত বলি। ভীত বন্ধুটি অজ্ঞান হয়ে গেলো। আমি চিৎকার করতে শুরু করলাম। কিছুক্ষণের মধ্যে লোক জড়ো হলো। আমাদের গাইড বললো আপনি রাতে বেড়িয়েছেন? ভালো। রাত এগারোটার পর আপনাদের বেরোতে বারণ করেছিলাম। আমার কথা শুনলেন না। এখন চলুন লজে যাই। মাথায় জল দিলে বন্ধুটি জ্ঞান ফিরে পেলো। আমরা সানাই লজে, সবাই এক ঘরে বসলাম। সকলে আমাদের ঘটনা শুনে ভয় পেলো। গাইড বললো,ভয় পাবেন না। আজ পর্যন্ত কোনো লোকের ক্ষতি হয় নি। শুনুন এই ভূতের একটি মর্মান্তিক ঘটনা আছে। একবার নব দম্পতি বেড়াতে এসেছিলো। মধুচন্দ্রিমা, বিয়ের পরে আনন্দ ভ্রমণ। আর তাদের সঙ্গে এসেছিলো ছেলেটার বন্ধু। বেশ চলছিলো আনন্দের ফোয়ারা। কিন্তু বাদ সাধলো এক বিকেলের ঘটনা। বর ছেলেটি, চা আনতে গেছে সামনের দোকানে। একটু দেরী হয়েছে। চল্লিশ মিনিটের মত। তারপর ফিরে এসে দেখে, তার বৌ, বন্ধুর সঙ্গে বিছানায় মধুচন্দ্রিমায় রত। আর বন্ধুট বলে চলেছে বিয়ের আগের সম্পর্কের কথা। বর ছুটে গিয়ে নিজের বৌকে ধরে মারতে মারতে দরজার বাইরে বের করে দেয়। তারপর নিজে দরজা বন্ধ করে বন্ধুর সঙ্গে অনেকক্ষণ বাগ বিতন্ডা করে। মারামারও চলে।

তারপর সেইদিন রাতে প্রেমিক বন্ধুটি তার প্রতিদ্বন্ধি বন্ধুটিকে চিরতরে সরিয়ে দিলো।
আমি বললাম,কি ভাবে?
গাইড বললো,মাথা কেটে দিয়েছিলো , তারপর বডিটা পাহাড় থেকে ছুড়ে ফেলে পালিয়ে গেছিলো দুজনেই। আজ পর্যন্ত পুলিশ তাদের খোঁজ পায় নি।
তারপর থেকে প্রতি রাতে এই লজে কেউ এলেই গলাকাটা অই ভূতটি দেখে নেয় কে এসেছে তার লজে। একবার এক নব দম্পতীর সঙ্গে এক বন্ধু এসেছিলো। বন্ধুটির দেহ পরের দিন পাওয়া গেলো পাহাড়ের নিচে মৃত অবস্থায়। তারপর থেকে লজের মালিক, পরিবার ও তার সন্তান থাকলে তবেই ভাড়া দেয়। আপনার বন্ধুটিকে দেখে হয়তো মারার পরিকল্পনা করেছিলো। কিন্তু আপনার বন্ধুর স্ত্রীও কন্যা থাকায় রক্ষা পেলেন । পরিবার সঙ্গে থাকলে কোনো ক্ষতি হয় না।হয় নি আজ পর্যন্ত।

এই গল্প শুনে আমরা আর ওখানে থাকার সাহস করলাম না। পালিয়ে এলাম প্রাণ নিয়ে…

লতিকা স্বামীকে ডেকে বললো, শোনো আমি বাজারে যাচ্ছি। তারপর ইলেকট্রিক বিল জমা দিতে যাবো। আমার দেরি হবে আস

স্বামী জয় বলে, ঠিক আছে। যাও।জয় চাকরী করে একটা বেসরকারি কারখানায়। লোহার রড তৈরি হয়। ছুটি বুধবার। আর এই একটা ছুটির দিনে জয় আর বাইরে বেরোতে চায় না। নিজের পছন্দ গাছ লাগানো। তাছাড়া বাড়ির উঠোনে ঘাস, জঙ্গল পরিষ্কার করতেই তার দিন কেটে যায়। আর লতিকা এই সুযোগে বাজার করা, বিল দেওয়া সব বাইরের কাজ সেরে নেয়।যখন জয় চাকরী পায় নি, তখন ছাত্র পড়িয়ে তার রোজগার হতো মোটা টাকা। সবটা খরচ না করে সে জমিয়ে রাখতো নিজের অ্যাকাউন্টে। বরাবর স্বাধীনচেতা ছেলে। কাউকে নিষেধের বেড়ায় রাখতে তার মন সায় দিতো না। গ্র্যাজুয়েট হবার আগে অবধি মেয়েদের সাথে কথা বলতে তার শরীর ভয়ে কাঁপতো। তার কারণ আছে।তখন কলেজর পড়ে। হিরু বলেএকট ছেলে ভালোবাসতো অনিতাকে। অনিতা আল্ট্রামডার্ণ মেয়ে। স্কুটি চালিয়ে কলেজে আসতো। আর পোশাকে ছিলো খোলামেলা মেজাজের পরিচয়। হিরু কালো সাদাসিধা একজন শহরের ছেলে। আমাদের বন্ধু বান্ধব অনেকে আড়াল থেকে অনিতাকে দেখতো কিন্তু সামনে গিয়ে কথা বলতে পারতো না। কিন্তু হিরু পারতো। ওদের দুজনের কলেজে নাম হয়েছিলো, ওথেলো, দেসদিমোনা।জয়ের মনে পরছে, কলেজে ক্লাস ফাঁকি দিয়ে একদিন হিরু বললো, অনিতা, চলো সিনেমা দেখতে যাই। অনিতা রাজি হলো। হিরু আমাদের সকলকে যেতে বললো। আমরা সবাই অবাক। মলয় বলছে, কার মুখ দেখে উঠেছিলা। অসীম বললো, অনিতার সাথে সিনেমা। এই সুযোগ মিস করা যাবে না। ওদের পাল্লায় পড়ে জয় গিয়েছিলাো। হাওড়ার পুস্পশ্রী হলে। ভিতরে অন্ধকার, হিরু আর অনিতা সামনে এগিয়ে বসলো। জয়রা পিছনে।ওরা দেখলো ওরা সিনেমা দেখা বাদ দিয়ে একে অপরকে জড়িয়ে বসে। আলো আঁধারিতে এর বেশি কিছু দেখতে পাইনি জয়।

তারপর একমাস হিরু ও অনিতাকে দেখতে পাই নি জয়।

লতিকা বাজারে গেছে। জয় বাড়িতে একা। মেয়ে স্কুলে গেছে। জয় বিছানায় গা এলিয়ে কলেজ জীবনের কথা ভাবছে। ঘন্টা খানেক হয়ে গেলো। লতিকা বাজারে গেছে।
জয় ভাবছে,আমার
নিজের মনের আয়নায় হিরুর ছবি।
অসীম একদিন আমাকে নিয়ে সুরে্ন্দ্রনাথ কলেজে গেছে। হিরুর সঙ্গে দেখা। অসীম বললো, কি ব্যাপার হিরু তোরা আর কলেজে যাস না। কেমন আছিস। এখানেই বা কি করছিস। হিরু নোংরা জামা প্যান্ট পরে কলেজের সামনে ফুটপাতে বসে আছে। আমরা তো নরসিংহ কলেজে পড়ি। আজকে কাজ আছে বলে এই কলেজে আসা।

আমি হিরুকে জিজ্ঞাসা করলাম, বল কিছু বল।
হিরু অন্ধকার মুখ তুলে বললো, জীবন শেষ। অনিতা বিয়ে করে আমেরিকা চলে গেছে।

হাতে হিরুর সাদা কাগজে মশলা পুড়ছে। ধোঁয়াটা নাক দিয়ে টেনে নিচ্ছে।

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।