সবার জীবনের এক একটা গল্প থাকে। ছকে বাঁধা জীবন, ছকহীন জীবন, গতিময় জীবন স্থিরহীন গল্পগাঁথায় পরিপূর্ণ জীবন। এক জীবন থেকে অপর জীবনে পাড়ি দিয়ে জীবনের অর্থ খুঁজে পাওয়া। নদী যেমন সমুদ্রের দিকে এগিয়ে চলে বাঁধনহারা গতিতে— নদীর সাথে জীবনের কি মিল যেমন মিল বাউলের সাথে পাখির। বাউল যেন পাখির মতো ছন্নছাড়া। স্বাধীন ছকে জীবনের ঘুঁটি সাজিয়ে নিয়ে উড়ে চলেছে এক প্রান্ত থেকে অপর প্রান্তে পাগলপারা উল্লাসে, সৃষ্টি-সুখের ছন্দময় গান বেঁধে,যার অন্তর্নিহিত অর্থ শুধু তারাই বোঝে। একে অপরের পরিপূরক যেন। একজন ভালোবাসতে শেখায় আর একজন ভালোবাসা সংগ্রহ করে নিয়ে আসে । ভালোবাসা কি জমিয়ে রাখা যায় নাকি জমিয়ে রাখলে শুধুই তা যন্ত্রণার? বয়ে নিয়ে বেড়ানোর যন্ত্রণা !যন্ত্রণার সুর বুকের উপর চেপে বসে। তার ভার বাড়ে বই কমেনা। তারই ছন্দ বাউলের একতারায় বেজে ওঠে ,আর পাখির গলার মিষ্টি সুরের ছন্দে জানান দেয়।এ জীবনের গান, খুঁজে পাওয়ার গান , আবার হারিয়ে ফেলার ও গান !
(১)
সকালে পরপর কলিং বেলটা বাজতে থাকলে এমনিতেই মেজাজ সপ্তমে থাকে ত্রিধার। অনন্য পড়ে পড়ে ঘুমায়। সেইসঙ্গে তিতির। সাড়ে ন’টা বাজবে তো ঘাড়ের উপর নিঃশ্বাস ফেলে তবু দুটো প্রাণী ঘুমে আচ্ছন্ন।
‘ মাসি আজ সাড়ে ছটা বেজে গেছে তোমায় ছটায় আসার কথা বলেছি।আমি বেরোবো কলেজে ,তিতির বেরোবে, তাছাড়া অনন্য ও তো বেরোবে প্রতিদিন কত বলব !”
দরজাটা খুলেই এক নিঃশ্বাসে সমস্ত রাগটা উগড়ে দিল নমিতার উপর ত্রিধা।
‘ চা বসাও, রান্নাটাও চাপাও। আর হ্যাঁ আমি কিন্তু টিফিন নেবো না। কলেজে আজ বাইরে থেকে খাবার আসবে হয়তো। তিতিরকে তোলো”
নমিতা নির্বিকার মুখে রান্নাঘরে ঢুকে গেল ।ও জানে ত্রিধা মানে পালক বৌদি প্রতিদিন এমন টাই করে। একটু দেরি হলেই সমস্ত রাগ বৃষ্টির মতো ঢেলে দেয় তারপর আবার হাসি মুখে এসে দাঁড়ায়।
স্নান সেরে মনটা ভালো হয়ে যায় ত্রিধার। অনন্য প্রায় রেডি। তিতিরকে স্কুল বাসে তোলার জন্য ।’মা তুমি আজ কখন আসবে?” মুখে কনফ্লেক্স নিয়ে প্রশ্ন করল তিতির।
” আজ আমি বিকেলের টিফিন এ কিছুতেই রুটি খাব না। তুমি আসার সময় আমার জন্য চকলেট পেস্ট্রি নিয়ে আসবে।’
ত্রিধা হেসে ফেললো তিতিরের গালে একটা চকাস করে চুমু খেয়ে বলল,’ ঠিক আছে সোনা”
অনন্য ফিরে এলে ত্রিধাকে এক মুহূর্তের জন্য দেখে নিয়ে প্রশ্ন ছুড়লো,’ রেডি ম্যাডাম? আমার কিন্তু এখনো পনেরো মিনিট লাগবে তারপর একসাথে বেরোবো”
সকাল নটা টা থেকে সাড়ে দশটা কলকাতার রাস্তায় জট লেগে থাকে। প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে শুধু গিঁট। শক্ত করে আটা গিঁট। ত্রিধা বারবার ঘড়ি দেখছে। বেজে গেল সাড়ে নটা। অনন্য এক মুহূর্ত তাকিয়ে প্রশ্ন তোলে ,”কি ব্যাপার ম্যাডাম? এত ঘনঘন ঘড়ি দেখছেন ?আজ কোন সিরিয়াস ম্যাটার?”
ত্রিধা আর বিরক্তি চাপতে পারল না,” উফ জ্যামটা এখনই লাগতে হলো এর চেয়ে মেট্রো ধরা অনেক ভালো ছিল। দেখো কত দেরি হয়ে যাচ্ছে। আমার সাড়ে দশটার মধ্যে আজ কলেজে ইন করতেই হবে ।কে নতুন জয়েন করবে তাও আবার কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্ট এ। তার সাথে সবার ইন্ট্রোডিউস তাছাড়া সামনের সেমিনার এইসব নিয়ে ঘেঁটে আছি।”
” বাবা এ তো হাজার ফিরিস্তি ।তোমাকে দেখে মাইরি সত্যিই হিংসে হয়। গড়িয়া থেকে শোভাবাজার কিনা সেমিনার! তোমাদের কলেজে সত্যি কোনো চাপ নেই ।আজও ক্লাস হবে না। তুমি তো ছুটিও নিয়ে নিতে পারতে!’
‘ তা কেন ক্লাস ক্লাস এর মতই হবে ।শুধু সিডিউল চেঞ্জ হয়েছে ।তোমার মত নয় বাবু কতগুলো ফোন কল আর মিটিং করলেই কেল্লাফতে। আইটিতে চাকরি করা যে কখনও কখনও সুখের হয় তোমায় দেখে বোঝা যায়।’
অনন্য হেসে ফেলল। সত্যিই তাই ।ভাগ্যিস পড়াশোনা ভালো করে করেছিল তাই এইরকম একটা নামি কোম্পানিতে জয়েন করেছে সে। কাজের চাপ নেই । অর্ধেক দিন বাড়িতে বসে কাজ করলেই হয় ।ওয়াক ফ্রম হোম।
আনমনে জানালায় তাকায় ত্রিধা। বর্ষা চলে এসেছে ক্যালেন্ডারে তবুও কাঠফাটা রোদ চারিদিকে। গাড়িতে ঠান্ডায় বসলেও রোদের আঁচ কতটা অনুমান করতে পারে সে। হঠাৎ কোথা থেকে এক ঝাঁক প্রজাপতি উড়ে আসে জানালার কাছে। তারই মধ্যে একটি নীল। একমনে দেখতে দেখতে হঠাৎ মনের বাক্স খুলে যায় তার ।কোথায় যেন রেখেছিল এমনই একটি রঙিন পাখার পতঙ্গ কে। বইয়ের পাতায় !তার পাশে আর একটা মুখ ভেসে ওঠে পাশে— আর্য! ত্রিধার চোখ আবছা হয়ে আসে ।ভাবতে চায় না সে !তবু কেন? কেন স্মৃতির পাতা উল্টে আসে বারবার? বন্ধ করে দাও দরজাটা !মন বন্ধ করে দাও। জোরে ব্রেক কষলে সম্বিৎ ফিরে ত্রিধার।
(২)
অনন্য কে ছোট্ট একটা বাই বলে প্রায় দৌড়তে দৌড়তে এসে ত্রিধা পৌঁছালো যখন প্রিন্সিপালের রুমে তখন প্রায় সকলের উপস্থিত। ত্রিধা কারোর দিকে না তাকিয়ে সোজা প্রিন্সিপাল এর দিকে লক্ষ্য রেখে বলল ,’সরি বিপাশা দি আজ আমি প্রায় পঁচিশ মিনিট লেট।’
ঘড়িতে চোখ বুলিয়ে নিল একবার ত্রিধা।
‘ ইটস অলরাইট’ একটু থেমে বিপাশা দি বললেন,’ প্রথমেই বলি কালকের সেমিনার কোন আলাদা ডিপার্টমেন্ট হিসেবে নয় এটা অল ওভার কলেজ কেই জয়েন করতে বলা হয়েছে। পরিবেশ ও আমরা বিষয়ের উপর সেমিনার। অতএব সকলেই আমরা কম বেশি যুক্ত তাই না?’
ত্রিধা ততক্ষনে ঘেমে নেয়ে ফাইল দেখে বোঝার চেষ্টা করছে আর কি কি করনীয়। বিপাশাদির প্রিয় ও কাছের হওয়ার কারণে এ বিষয়ে আগেই কিছুটা আলোচনা হয়েছে তার সাথে।
বিপাশা দি এক এক করে বুঝিয়ে দিতে লাগলেন,’ কার কি কি দায়িত্ব !আলোচনা শেষে কেমিস্ট্রির অধ্যাপক অরুনাংশুর দিকে তাকিয়ে বললেন,’ কি ব্যাপার অরুনাংশু আজ আমাদের নতুন অধ্যাপক কোথায়? আপনি তো কাছাকাছি থাকেন আপনার সাথে আসার কথা ছিল তাই না?”
অরুনাংশু মৃদু হেসে উত্তর দিলো,’ চলে আসবে দিদি আমি একটু আগে বেরিয়েছি মিটিং আছে বলে। ঠিকানাটা টেক্সট করে দিয়েছি।”
” না না উনি নতুন হয়তো চিনবেন না ঠিক করে সবার সাথে ইন্ট্রোডিউস করার দরকার তুমি একবার খবর নিয়ে দেখো।”
” ত্রিধা উঠে দাঁড়ালো। বিপাশা দির রুমের সাথে লাগোয়া রুমে গেল নিজেকে একটু গুছিয়ে নিতে। যেভাবে ছুটতে ছুটতে কলেজ ক্যাম্পাস পেরিয়ে এসে ধপ করে চেয়ারে বসে পড়েছিল একটু ফ্রেশ না হয় ক্লাস নেয়া মুশকিল।’
‘ আরে আপনার কথাই হচ্ছিল আসুন আসুন ‘আগুন্তুকের দিকে হাত বাড়িয়ে অরুনাংশু নিয়ে এলেন রুমে। ‘দিদি আপনি একবার সবার সাথে ইন্ট্রোডিউস করে দিন এরপরে আমরা সবাই ক্লাসের দিকে যাব”
অরুনাংশ লিপিকা আবৃত্তি ফাল্গুনের মাঝখানে ত্রিধা ঘরে ঢুকতেই বিপাশা দি বললেন,”ইনি আর্য চ্যাটার্জী আর উনি হলেন লিপিকা, উনি হলেন ফাল্গুনী ,উনি ত্রিধা। ত্রিধা খুব ভালো লেখালিখি করেন কিন্তু। আপনি যদিও কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের ।তবু আপনি ওনার লেখা পড়লে ভালো লাগবে আশা করি। কালকের সেমিনারের প্রথম শুরু টা ত্রিধা পুরোটা ম্যানেজ করেছে ,আই মিন লিখেছে।”
ত্রিধার শিরা-উপশিরা দিয়ে রক্তের গরম স্রোত হুলছুল করতে লাগল ।আর্য আর্য সেই আর্য !অদৃষ্ট কি চায় !কেন সে দাঁড় করালো তাকে ?প্রশ্ন প্রশ্ন প্রশ্ন! মাথাটা যেন কে হাতুড়ি দিয়ে মারছে! কিভাবে পালাবে এখন এখান থেকে? ত্রিধার অসুস্থ লাগছে কেমন! হাত-পা ঘামছে ক্রমাগত! হৃদপিন্ডের উপর আর একটা হৃদপিণ্ড গজিয়েছে যেন। উল্টোদিকের লম্বা সুপুরুষ ব্যক্তিটি তখন অপলক দৃষ্টিতে তাকিয়ে দেখছে। এ কে ! পালক!তার পালক! ঈষৎ মেদ জমলেও লালিত্য চুঁয়ে চুঁয়ে পড়ছে সর্বত্র। শেষ কবে দেখেছে পালককে! একযুগ মনে হলো !রামের বনবাসের মত !অতীতকে চোখের সামনে দেখে কিছুটা হতভম্ব আর্য!
‘ এই ত্রিধা শরীর খারাপ লাগছে?” এগিয়ে এলো দৃপ্তি
” নারে আমায় একটু ওয়াশরুম যেতে হবে এখনই আসছি বিপাশা দি’ যতটা সম্ভব জোর দিয়ে ত্রিধা এই কথাটুকু বলতে পারল! তারপর চলে গেল কোন দিকে না তাকিয়ে সোজা ওয়াশরুমে। নিজের প্রতিবিম্বের দিকে তাকিয়ে নিজেই চমকে গেল সে ।এতটা বিধ্বস্ত হয়েছে কয়েক মুহূর্তের মধ্যে ?চেষ্টা করেও আটকাতে পারলোনা গলার কাছে আটকে থাকা বহুদিনের চাপাপড়া জমা কান্না ।ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদতে থাকলো। কতক্ষন এভাবে কেঁদেছিল ত্রিধার মনে নেই। মনে নেই দৃপ্তি যখন জিজ্ঞাসা করেছিলো কি কি বলেছিল ত্রিধা। শুধু পুরনো স্মৃতির বইয়ের পাতা উল্টে পিছিয়ে গিয়েছিল সে।
(৩)
এই পালক পা-ল–ক , একবার শুনে যা ,প্লিজ রাগ করিস না’ আর্য প্রাণপণে ডাকছিল পালক কে । পালক ফিরে তাকিয়ে শুধু বলেছিল,’ কোনদিন আর আসবো না দেখিস’
আর্য মুখ নামিয়ে হেসেছিল। পালককে রাগিয়ে খুব মজা। ভারি অভিমানী ।তাতে আবার আর্য। তার উপর অভিমান করার পাল্লাটা একটু ভারী তা ভালই বোঝে আর্য। প্রশ্রয় দিতে ইচ্ছে করে তাকে। একবছরের জুনিয়ার হলেও ওরা বন্ধু বা বন্ধুত্বের চেয়ে বেশি কিছু ওদের মধ্যে দৃঢ় হয়েছে।
সকাল থেকে খুনসুটি ভালোই চলছিল ।বলার মধ্যে আজ ও শুধু বলেছে ওদের কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের একটি ছেলে নির্মাল্য ওকে খুব পছন্দ করে। তাতেই রাগ করে চলে গেল। এখন রাগ থাকবে কম করে দুই থেকে তিনদিন ।কথা বলবে না যেন চেনেনই না। আবার নিজের থেকে অভিমানে কেঁদে ফেলবে আর জানে না আসলে কী চায়। আর্যএকবার আকাশের দিকে তাকাল ঘন কালো মেঘ অভিমানের পর অভিমান। তারপর আদর, আদর ,আদরে বৃষ্টির মতো ভেসে যাবে সমস্ত পৃথিবী সমস্ত মাটি। আর্য কি কখনো পারবে পালককে ওই রকম বৃষ্টি তে ভেজাতে! নাকি অভিমানের মেঘ জমতে জমতে একদিন ঝোড়ো হাওয়ায় মেঘ গুলো সব উড়ে উড়ে চলে যাবে দূর কোন প্রান্তরে ।কেন মনে হয় আর্যর যে পালক একদিন অনেক দূরে চলে যাবে তার থেকে। কোনদিন তার কাছে বৃষ্টি হয়ে ঝরে পড়বে না। আর এই কথাটা মনে পড়লে তার বুকের ভেতরটা একটা নিঃসীম শূন্যের মত আকাশ উড়ন্ত নিঃসঙ্গ পাখি নিয়ে চুপচাপ গুমড়ে গুমড়ে কাঁদে।
আচ্ছা আর্য কি কিছু বোঝেনা? কেন বোঝেনা? যেদিন বলেছিল পালক তুই পাখি আর আমি ক্ষ্যাপা বাউল। পাখি উড়ে উড়ে বাউলের গান গাওয়ার রসদ জোগায়। সেদিন পালক বলতে পারেনি কিছুই। অথচ বলতে চেয়েছিল অনেক কিছু। মানুষের যখন কথাগুলো পাহাড়ের মত বুকের ভেতর জমে তখন কি বোবা হওয়ার মতো কোনো প্রতিক্রিয়া মাথার মধ্যে পেয়ে বসে যে তোমায় কথা বলতে দেব না তুমি নির্বাক থাকো তুমি নিশ্চুপ থাকো অনেক সময় চুপচাপ থেকেও সব কথা বলে দেওয়া যায়। অথচ না বলতে পারলেও এক অজানা ভালোলাগার লজ্জায় গাল দুটো হয়ে গেছিল রক্তিম। বারবার প্রশ্ন করেছে নিজেকে কি চায় আর্য? কি বলতে চাইলো আর্য ?কেমিস্ট্রি ডিপার্টমেন্টের আর্য কে প্রথম দেখেছিল নবীনবরণের দিন। কি ভালো লেখে ছেলেটা, কি ভালো আবৃত্তি করে! পালক তো ভাবতেই পারেনি যে বাংলা ডিপার্টমেন্টের নয় আর্য।পালক ই যেচে আলাপ করেছিল লাজুক ছেলেটির সাথে। তারপর বন্ধুত্ব ঘনিষ্ঠতা।কিন্তু পালক যা শুনতে চায় কোনদিন বলেনি আর্য! আর্য কি জানে কেমন উৎসুক হয়ে আছে পালকের মন? বাড়ি ফিরে মন ভালো নেই পালকের। কেন যে ওর সাথে ঝামেলা হয় ।আর কেনইবা আর্য বোঝেনা যে অন্য কোন ছেলের কথা বললে পালক ভয়ে কুঁকড়ে যায় এটা ভেবে যে আর্যর থেকে দূরে চলে যাবে অন্য কারো সাথে ?অন্য কেউ আর্যর জায়গা নেবে এটা ভাবতেই পারেনা পালক।
‘ খেতে আয় ‘ মায়ের ডাকে পালক উঠে-পড়ে ।পালক উঠে ফোনটা চার্জে দিতে গিয়ে দেখে আর্যর ছোট্ট মেসেজ ‘পাখি রাগ করেছে?” এটাই আশা করেছিল ।উত্তর দেবো না ভেবেও লিখে ফেলল ,’বাউল নিজে ক্ষ্যাপা পাখিকেও ক্ষ্যাপায়’ কয়েক মিনিটের মধ্যে আজও উত্তর উল্টো দিক থেকে ভেসে আসে ফোনের স্ক্রিনে’ পাখি ছাড়া বাউল অচল। বাউল গান বাঁধে পাখির জন্য, বাউলের বুকে শূন্য কুয়োর মত তৃষ্ণা, পাখি কি চঞ্চু করে জল আনবে সেখানে?ক্ষ্যাপা বাউল তাই খুঁজে খুঁজে বেড়ায় পাখি কোথায় পাখির খোঁজে!’
পড়তে পড়তে পালকের চোখ জলে ভরে উঠলো। এত অনুভূতি ছেলেটা রাখে কোথায় ?মুখে তো কিছু বলে না সামনাসামনি! ফোন রেখে খেতে বসে সে। কি উত্তর দেবে ভেবে পায়না। এই নাম না জানা সম্পর্কে যে সে আস্তে আস্তে জড়িয়ে যাচ্ছে তাতে যন্ত্রণা অনেক ।মুখ ফুটে বলতে পারে না কিছু । আর্য ও জানায় না যে ।অথচ এই যন্ত্রণা থেকে মুক্তি পাবার চেষ্টাও করে না পালক এ যন্ত্রণা ভালোলাগার যন্ত্রণা।
সকাল হলেই পালক জাগে আর্যর কথা ভেবে। প্রতিনিয়ত নিরন্তর ।দিন যায় মাস যায় বছর যায় সম্পর্ক চলতে থাকে সময়ের সাথে তাল মিলিয়ে । কিন্তু কিছুতেই বলে উঠতে পারে না একে অপরকে তাদের মনের কথা। শুধু মনে পড়ে আর্য কে এক দিন বলেছিল ,’ জানো আমার ডাক নামটা ভীষণ অপছন্দের কিনা পালক! আর্য গম্ভীর হয়ে বলে ছিল,’ পালক বাহ তুই তো ভীষণ হালকা রে! তাই পালক হয়ে থাক। ত্রিধা নাম টা বড্ড ভারী কতদিকে যে গড়িয়ে যায়। বড্ড দূরের। কবে কখন কোথায় চলে যাবে আমাকে ছেড়ে।’ পালক অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিল কি বলতে চাইলো আর্য! পালক নিজের মনে বিড়বিড় করে বলেছিল ,’কোনদিন তোমাকে ছেড়ে যাওয়া সম্ভব নয় আমার। যদি কখনো তুমি আমাকে না ছেড়ে যাও!’
তারপরেও বছর দুই কেটেছে পালক আর আর্যর রাগ ভালোলাগার কিন্তু ভালবাসায় পরিণত হয়নি সেই সম্পর্কের সমীকরণগুলো। নির্দিষ্ট কোন নামকরণ হয়নি সম্পর্কটার। প্রায়ই অতীতে মুখ ডোবায় পালক ।ভাবে তাদের এই নাম না জানা সম্পর্ক নিয়ে জল্পনা শেষ নেই বন্ধুমহলে। তবু কাউকে বলে উঠতে পারেনি এক মৌবনি ছাড়া ।মৌবনি অবশ্য কথা রেখেছে। বলে নি কাউকে পালকের কথা।
(৪)
হলোটা কী আর্যর !মেসেজ করলে রিপ্লাই করে না !ফোন ধরে না !কলেজ তো ছেড়ে ইউনিভার্সিটির সাথে যোগাযোগ করার কথা ,পালক ছটফট করে উঠলো এই সপ্তাহ খানেকের বিরতিতে। কলেজে গিয়ে দুটো উৎসুক চোখে তন্ন তন্ন করে খুঁজে শুধু ক্যাম্পাসে আর্য কে। আর্যর বাড়ি তো শহর থেকে অনেক দূরে গ্রামে। কিভাবে যোগাযোগ করবে পালক বুঝে উঠতে পারেনা ।শূন্য লাগে চারিপাশ। যন্ত্রণায় ক্ষতবিক্ষত হয় মন।মৌবনিকে জিজ্ঞাসা করে বারবার আর্যর কোন বন্ধুর মারফত খোঁজ পায় কিনা। তার সাথে ভীষণ অভিমান জমে মনের কোণে কেন আর্য তার সাথে এভাবে যোগাযোগ বন্ধ করে রাখছে ।আর্য কি বোঝে না আর্যকে ছাড়া পালকের কতটা অসহায় লাগে! কিসের শোধ নিচ্ছে আর্য! কলেজে ঢুকতেই মৌবনি এসে খবর দেয় ‘পালক আর্যদা চলে যাচ্ছে কলকাতা যাদবপুর বা প্রেসীতে ভর্তি হবে হয়তো”
পালক যেন বিশ্বাসই করতে পারলো না। প্রচন্ড বিস্ময়ে মৌবনিকে জিজ্ঞাসা করল,’ কি আর্য যাবে কলকাতা? আমাকে তো কিছু বলল না? কি করেছি আমি ঝগড়াওতো হয় নি? এসবের মানে কি মৌবনি?”
মৌবনি আশ্বস্ত করে,’ নিশ্চয়ই দেখা করবে দেখ !হয়তো ব্যস্ত আছে ফর্ম টর্ম তুলছে!” পালক কিছু বলেনা। ভেতরের অসম্ভব যন্ত্রণাটা বাষ্পে পরিণত হয়। গলার কাছে আটকে যায়। ভীষণ যন্ত্রণা হচ্ছে ।মনে হচ্ছে এক গলা জলে তাকে কেউ ডুবিয়ে মারতে চাইছে ও খাবি খাচ্ছে কিছুতেই সাঁতরে পার হতে পারছে না অতল সমুদ্রে। যতবার ভাবছিল আর্য চলে যাবে তার ধরাছোঁয়ার বাইরে অথচ একবারও তাকে জানালো না, কি অন্যায় করেছিল সে! ততবার মনে মনে এতোটুকু ছোট হয়ে যাচ্ছিল সে আর মনে হচ্ছিল চারিদিকের পৃথিবীটা অনেক অনেক বড়।
সেদিন দেখা হয়েছিল তার দুদিন আগে থেকে আর্য একটু অন্য মনস্ক ছিল ।পালক ভেবেছিল হয়তো বাড়িতে বাবা মা এর সাথে কোন ঝামেলা হয়েছে বা বন্ধুর সাথে। তাই বিশেষ করে কিছু জিজ্ঞাসা করেনি ।কিন্তু যে মানুষটাকে এতদিন ধরে রন্ধ্রে রন্ধ্রে চিনতো এক নিমেষে অচেনা হয়ে যায় কি করে সে! ডুবে যাচ্ছে সে !কোথায় ডুবে যাচ্ছে! কিছুতেই সাঁতরে উঠতে পারছে না !নিঃশ্বাস জড়িয়ে আসছে !কিসের প্রতিশোধ নিল! কেন বাউল পাখিকে ছেড়ে চলে গেল নিরুদ্দেশে ?পাখি যন্ত্রণায় ডানা ঝাপটায়! কোথায় যাবে জানে না যে !আমার বাউল তুমি ফিরে এসো পাখি যে বাউল ছাড়া বাঁচবে না।
(৫)
ত্রিধা কলেজের করিডোরে দাঁড়িয়ে আছে আনমনা হয়ে। ভাবছে অনন্যর কথা, ভাবছে তিতিরের কথা! এই একমাস হলো আর্য এসেছে কলেজে। কেন এলো ?বাইরের রিসার্চ করে অন্য কোন কলেজ ছিল না জয়েন করার? নাকি শিকড়ের টানে যোগাযোগ হয়েছে। কিন্তু এই এক মাসে ত্রিধা যে পাল্টে যাচ্ছে ক্রমাগত। অনন্য কে দূরে সরিয়ে আছে শত যোজন দূরত্বে ।কেন করছে এইসব? তিতিরকে নিজেকে দিতে পারছে পুরো? না শুনতে চায় না মন! তবু বুঝে উত্তরটা হ্যাঁ হবে না জানা। অথচ আর্যর সাথে সচেতনভাবেই দূরত্ব রাখে। মুখোমুখি হওয়ার চেষ্টাও করে না ।হলেও জোর করে সরিয়ে নেয় নিজেকে। অথচ ত্রিধা জানে কি অদম্য শক্তি আজও টানে ত্রিধাকে আর্যর দিকে।
‘ পালক কেমন আছিস?” ভাবনা গুলো ছিঁড়ে খানখান হয়ে গেল ত্রিধার। আজকাল অফ টাইমে কমন রুমে বসতে ইচ্ছা করে না ত্রিধার। কলিগরা , নিন্দুকরা বলে প্রিন্সিপালের স্নেহের পাত্রী বলে অহংবোধ হয়েছে । ত্রিধা অবশ্য পাত্তা দেয় না।
ত্রিধা প্রথমে চমকে উঠলো তারপর বুঝতে বাকি থাকল না পুরনো চেনা কত কাছের কণ্ঠস্বর। একটা তীব্র আক্রোশ তার মনের তালুতে চাবুক মারলো। চোখে অসম্ভব ঘৃণা আর রাগ নিয়ে আর্যর দিকে তাকিয়ে সরাসরি বলল,’ কে পালক! অচেনা কাউকে আমার ডাকনাম রাখার অনুমতি আমি দিই না !আমি মিসেস ত্রিধা রায়।’ মিসেস কথাটার উপর ইচ্ছে করে জোর দিয়ে যোগ করল,’ অযথা আলাপ জমানোর চেষ্টা করা বৃথা আমি সবাইকে আমার সাথে পরিচয় করবার উপযুক্ত মনে করিনা!’ এই কয়েকটা কথা ত্রিধা কি করে কি শক্তিতে বলল জানে না তবে শেষ করে সে পাশ কাটিয়ে চলে। আর্য হতভম্ব হয়ে তাকিয়ে থাকল একটা অপ্রত্যাশিত অপমানে চোখ দুটো জ্বলছে তার। তারপর হঠাৎ মনটা নরম হলো পালক কে ভেবে। পালক তার সাথে ঠিকই করেছে ।’কিন্তু পালক আমার পাখি তুমি কি জানো কেন আঘাতে আঘাতে জর্জরিত করেছি তোমায়? জানলে তুমি এই অপমানটা আমায় করতে পারতেনা।’ চোখ দুটো জলে ভরে উঠলো আর্যর।
‘ স্যার আমাদের প্র্যাকটিকাল ক্লাস টা কোন রুমে হবে?’ তৎক্ষণাৎ হাতের উল্টো দিকের চোখ দুটো মুছে সামলে আর্য বলল ,’চলো এল যাচ্ছি ফাইভ রুমে, ল্যাবটা কাছে।’
ক্লাসে যন্ত্রের মত পড়িয়ে গেল পালক। বাংলা সাহিত্যের ইতিহাস পড়ানোর সময় তার মাথায় শুধু অনেকগুলো অতীতের ইতিহাস মারপিট করছিল। মাথাটা ভার হয়ে আসছিল। ভীষণ ভীষণ ক্লান্ত লাগছিল ত্রিধার।
‘ বিপাশা দি আসব?’
‘ আরে ত্রিধা? এস !কি ব্যাপার আজকাল লাইব্রেরীতে আসো না আমার কাছে ও না ।শরীর খারাপ? অনন্য ঠিক আছে তো?”
‘ না তেমন কিছু নয় দিদি ক’দিন ছুটি দরকার তাই বলছিলাম।’
” কিন্তু ত্রিধা এখন তো সেকেন্ড ইয়ার এর সেমিস্টাসামনে। সেমিস্টারটা পার করে ছুটি নিও বরং।’
তাই তো মনেই ছিলনা ত্রিধার।মেয়েরা বলছিল বটে ।সামলে নিয়ে বললো ,’ঠিক আছে সেমিস্টার তো চলবে এ মাসের মাঝামাঝি তারপর আমি ছুটি নেব!”
ত্রিধার মুখের দিকে তাকিয়ে বিপাশা দিয়ে কিছুটা আঁচ করল ,’কি ব্যাপার ত্রিধা এনি প্রবলেম ?অনন্যর সাথে সব ঠিক আছে তো ? আর তিতির!’
‘ হ্যাঁ দিদি সব ঠিক আছে ছোট করে উত্তর দিয়ে ত্রিধা পাশ কাটাতে চাইল।
সত্যি ভালো আছে অনন্্য,? এই কতগুলো দিন ধরে অনন্য কে দূরে সরিয়ে রেখেছে ত্রিধা। একসাথে অফিসে যাবার সময় কলেজেও আসেনা ।সারারাত ক্লান্তি আর ঘুমের ভান করে সে। দুজনের মাঝে অদৃশ্য দূরত্ব শূন্যস্থান করে রেখেছে ।অনন্য জোর করেনি। জোর করার মানুষ অনন্য নয়। অনন্য নিজের জগত নিয়ে থাকতে ভালবাসে তবে এই নয় যে তাকে গুরুত্ব দেয় না ।ও বোঝার চেষ্টা করেছে কি হয়েছে ত্রিধার? এত কেন চুপচাপ? নিরাসক্ত? এত কেন উদাসীনতা? একবারও কিন্তু মনে হয়নি যে অন্য কোন রোগ বাসা বেঁধেছে ত্রিধার মনে। মনে হয়েছে সংসারের নিত্যকর্মের হাঁপিয়ে উঠেছে তাই হয়তো মন খারাপ ।অন্যন্য নিজেকেও প্রশ্ন করেছে কোন দোষ করে ফেলেনি তো সে !তবু দূরত্ব ঘোচে নি। দূরত্ব যখন আস্তে আস্তে দানা বাঁধে তাকে কিছুতেই পার করা সম্ভব হয় না ।শত যোজন দূরত্ব পাশাপাশি থাকা মানুষকে অচেনা করে দেয়।
(৬)
ভাদ্র মাসের শুরুতে কলকাতায় বর্ষা এলেও গরম কমেনি। বরং চারিদিকে থমথমে গুমোট ভাব। অটোর জন্য দাঁড়িয়ে ত্রিধা তার শাড়ির আঁচল দিয়ে ঘাম মুছে চিন্তা করছিল আজ বাড়ি ফিরে এসে অনন্যর জন্য প্রিয় ডিস রান্না করবে। অনন্য কি ক্লান্তভাবে গতকাল ত্রিধা কে জিজ্ঞেস করছিল,” কী হয়েছে বাবু? কিছু অন্যায় করেছি আমি?’
ত্রিধা কিছু বলতে পারেনি অনুশোচনার আগুনে শুধু বড় বড় চোখ দুটো দিয়ে অশান্ত জল গাল বেয়ে নেমে এসেছিল। অনন্য কাঁদতে দিয়েছিল অনেক সময় ধরে কিছু জানতে চায়নি ।অনন্য জোর করতে পারেনা।
সকালে উঠে অনন্যর বাবা মা যখন ফোন করেছিল ত্রিধা কে ছেলের জন্মদিনের জন্য। ত্রিধা নিজের মনকে শাসন ছিল যে কখনো আর পুরনো ঝাঁপি খুলবেনা তালা লাগানো থাকুক।
দুবার রিং হওয়ার পর ফোন বের করে তা দেখল মা কলিং।
যা আজ দুদিন ধরে বাবার খবর নেয়নি সে বাবা দু’বছর ধরে বিছানায় রোগগ্রস্ত অবস্থায় শয্যাশায়ী। কে বলবে একদিন এই বাবাই ছিল প্রভাব-প্রতিপত্তি এবং ব্যবসার দিক থেকে খ্যাতি সম্পন্ন একজন মানুষ। দীর্ঘ রোগভোগের পর এখন মানুষটা ভালো করে হাঁটতে চলতে পারে না। সেই বাবার খবর নেয়নি পালক। একটা মানুষের জন্য সবাইকে অবহেলা করছে সে।
” হ্যাঁ মা বল!’
” কি বলবো বুবু তুমি ফোন করো না ফোন করলে ধরো না পরে তো একবার জানাতে পারো কি হলো!:
” সরিমা কলেজে এত চাপ সামনে সেমিস্টার তো ।’আর্যর কথাটা বলতে গিয়েও বলতে পারলোনা পালক।
ত্রিধা মাকে সব জানায় আর জানায় মৌবনি কে সেই মৌবনি কেও এখনকার কথা কিছু বলতে পারে নি ।
” আজ অনন্যর জন্মদিন তাই ফোন করেছিলাম বুবু ।আমরা তো আর যেতে পারি না ।কি করবে তোমরা?’
” কিছুনা মা ঘরে দু-একটা রান্না করবো।’
‘ পায়েস করবে তো? বাবা বলছিল পালক কবে আসবে?” ত্রিধা দীর্ঘনিঃশ্বাস ফেলে ,”পুজোর আগে নয় মা তাছাড়া পুজোর সময় অনন্যর বাবা মা আসছেন ওদের সঙ্গে নিয়ে দু-এক দিনের জন্য যাব!’
আরো দু-চারটে কথা বলে ত্রিধা ফোনটা রাখে অটো থেকে নেমে মেট্রোর দিকে পা বাড়ায় ত্রিধা। মেট্রোয় যাতায়াত করছে দুমাস হল। মন্দ লাগে না তার ।শহরকে চিনতে ভালো লাগে তার। শহরের গন্ধ গায়ে মাখতে তৃপ্তি পাওয়া যায় ।অনন্যর বাবা মা মানুষ দুটো নির্ঝঞ্ঝাট। এদিক থেকে ও সত্যি ভাগ্যবান । ওনারা এলে সংসার থেকে ছুটি নিয়ে নেয়। অনন্যর মা নিজের মেয়ের মতোই প্রশ্রয় দেয়।
বাড়ি ফিরে ইচ্ছেমতো স্নান করে কিছুটা নিজেকে ফ্রেশ করে নিল ত্রিধা। গায়ে জড়িয়ে নিয়ে ছিল অনন্যর দেওয়া নরম মলমলের শাড়ি। তিতির কে সাজিয়েছিল পরীর মত। নিজের হাতে গোটা ঘর সাজিয়ে ছিল মনের মত করে। অনন্যর প্রিয় চকলেট কেক সেমাই এর পায়েস পাঁঠার মাংস নমিতার সাথে সাথে গুন গুন করে গান গাইতে গাইতে বানাচ্ছিলো। যেন নিজেকে নতুন করে জোর করে জন্ম দিতে চাইছে, ঝেড়ে উঠতে চাইছে পুরনো মোড়ক ছেড়ে।
‘ বাবা তুমি এসে গেছ ’দরজা খুলতে খুলতে তিতির বলল
‘ দেখো মা কি সুন্দর সাজিয়েছে আমায় একেবারে প্রিন্সেস লাগছে আমাকে!”
তিথির কে কোলে তুলে বললো ,’হুম পরী লাগছেতো একটা ছোট্ট পরী!”
অনন্য চারিদিকে তাকিয়ে আঁচ করল ত্রিধা আজ ভালো মুডে আছে। যাক ব্বাবা গুমোট আবহাওয়া কেটে গেছে। তাহলে কি হয়েছিল ত্রিধার! কলেজে কোন ঝামেলা? এখনই এই মুহূর্তকে কিছুতেই নষ্ট করতে চাইলো না অনন্য। সন্ধ্যে থেকে অনন্যর দু একটা বন্ধু ও তাদের ওয়াইফ কে নিয়ে হৈ হুল্লোড় এর পর তিথির ঘুমিয়ে পড়েছিল তাড়াতাড়ি। নমিতা সব গুছিয়ে চলে যাবার পর ত্রিধা ফ্রেশ হয়ে নিচ্ছিল। যাক বাবা কাল ছুটি আছে আয়নায় দাঁড়িয়ে চুল আঁচড়াতে আঁচড়াতে ত্রিধা ভাবছিল। পিছন থেকে অনন্য জড়িয়ে ধরে বলল,’ কি সুন্দর লাগছিলো বুবু তোমায়! তুমি সাজো না কেন ?আমি ভাবছিলাম আমার জন্মদিন টা হয়তো তুমি ভুলেই গেলে। সকাল থেকে তো উইশ করলে না।’
ত্রিধা ঘুরে গিয়ে মুখোমুখি দাঁড়িয়ে বলল ,’ভুলিনি তবে ভুলে যেতাম মা-বাবা ফোন না করলে!’
” আজব ব্যাপার তুমি তো কখনো কারোর জন্মদিন ভোলোনা?’
” আরে কলেজে এত ঝামেলা পরে হয়তো মনে পড়তো।” প্রসঙ্গ ঘোরালো ত্রিধা
অনন্য আর কিছু না বলে ত্রিধা কে আরো ঘনিষ্ঠ করে নিল।ত্রিধাও বাধা দেয়নি ।শুধু রাতের অন্ধকারে অনন্য যখন আদরে আদরে ভরিয়ে দিচ্ছিল ত্রিধা কে তখন ত্রিধার দুচোখ বেয়ে নোনা জলে ভরে গিয়েছিল গাল বালিশ। হাউ হাউ করে কাঁদতে পারে নি সে। তখনই উপলব্ধি করেছিল এ জীবনে কখনো ও অনন্যর ছিল না ।নিজের বুকের মধ্যে অনন্যর মাথা টা বড্ড ভারী লাগছিল তার। আরো আবিষ্কার করে অনন্যর মধ্যে খোঁজার চেষ্টা করেছে সারাক্ষণ শুধু আর্যকে। আজও তার সাম্রাজ্যে রাজত্ব করেছে আর্য।বহু যুগ ধরে। একাই ।তাকে ত্রিধা চাইলেও পরাজয়ের শাস্তি দিতে পারছে না ।পারবেও না হয়ত।
(৭)
পরীক্ষা এসে গেছে। সেকেন্ড ইয়ার এর ছাত্র ছাত্রী দের ঘাড়ে নিঃশ্বাস ফেলছে।তার প্রস্তুতি চলছে জোরকদমে।সেদিনের পর থেকে আর্য ও আর চেষ্টা করে নি ত্রিধার সাথে যোগাযোগ করার।দূর থেকে দেখে।ভাবে এই বেশ ভালো। আর্য চেয়েছে পাখি ভাল থাক। মানুষের যে এত পরিবর্তন হতে পারে তা পালক কে না দেখলে আর্য জানতে পারত না। যে মেয়েটার নরম তুলোর মতো সে কেমন যেন কঠিন পাথর হয়ে গেছে। তার জন্য কি বাউল দায়ী কোন ভাবে? নিজেকে প্রশ্ন করেছে বহুবার! বিদেশ অধ্যাপনা করার সময় ঠান্ডা আবহাওয়ায় যখন রাত্রে কখনো কখনো ক্যাফের কফি খেতে যেতে ইচ্ছে করতো তখন প্রায় জনশূন্য জমে যাওয়ার শীতের রাস্তায় একা কি হাঁটতে হাঁটতে বহুবার মনে পড়েছে পালক কে। মনে হয়েছে পাখি কেমন আছে? বাউল চলে এসেছে নিরুদ্দেশে কখনো কি খুঁজে পাবে তার পাখিকে? যাদবপুরে পড়াকালীন ব্যাচমেট অনলের কাছে জেনেছিল পালক বর্ধমান ইউনিভার্সিটিতে এমফিল করেছে ।নেট ক্লিয়ার করেছে। তার পালক এত বড় হয়েছে? ভাবতেই অন্যমনা হয়ে যেতো। সে বিদেশে আসার আগেই জেনেছে বিয়ের কথা ।অন্য কোন বাউল এর সাথে সংসার পাতবেপাখি! একটা পোকা তার ভেতরে কামড়ে কামড়ে জ্বালা ধরাচ্ছিল হৃদয়ে। অথচ পালক কিন্তু তারই হতে পারত। হয়নি তার জন্য সে দায়ী একা? নিজের বাবার অপমান সে কখনো মেনে নেয় নি। যে মানুষটাকে নিঃস্ব হয়ে এখানে এসে দাঁড়িয়েছে তার অপমান কি করে মেনে নেবে আর্য! আর পালক? পালক কে নিয়ে পালাতে চায় নি সে ।সে কাপুরুষ নয়।
মনে পড়ে যখন রেজাল্ট বেরোলো, ইউনিভার্সিটি তে ফর্ম তোলার জন্য দাঁড়িয়ে আছে গেটের কাছে। তখন একটা বড় গাড়ি গেটের সামনে এসে দাঁড়াল। এক ভদ্রলোক বেরিয়ে এলেন তারপর তাকে ডেকে বললেন ‘তুমি আর্য ?’ আর্য হকচকিয়ে গেছিল,’ হ্যাঁ কিন্তু আপনি?’
‘ একটু কথা বলবো তোমার সাথে ‘
‘কিন্তু আমি তো এখন ফর্ম তুলবো ‘
‘বেশি সময় নেবো না এই দশমিনিট’
গাড়িতে উঠে আসে আর্য
“পালক মানে ত্রিধা তোমার ভালো বন্ধু তাই না?’
‘ হ্যাঁ’
” আমি পালকের বাবা’এতক্ষণ ধরে আর্য ভাবছিল কার মুখ যেন কেটে বসানো ভদ্রলোকের মুখে। ঢোক গেলে কয়েকবার আর্য,’ হ্যাঁ কাকু মানে স্যার বলুন’
‘ কতগুলো কথা বলি তোমায়। তোমাকে চিনতে হয়েছে বেশ কিছুদিন আগে। পালকের ডায়েরি থেকে জানি তোমার কথা । খোঁজ নিয়ে কলেজে জানি তুমি কেমিস্ট্রির ছাত্র। তোমার বাড়ির খোঁজ ও নি অবশ্য ।কে বা কার কাছ থেকে এসব জানানোর প্রয়োজন মনে করছি না আমি। শুধু পালকের ডায়েরি থেকে জানতে পারি তোমায় ভালোবাসে পালক। কিন্তু জানো আর্য ভালোবাসা হয় সমানে সমানে ।তোমার বাবা তো চাষবাস করেন তাই না? আর হ্যাঁ কি একটা প্রাইভেট প্রাইমারি স্কুলে পড়ান! পালক যেমন যেভাবে বৈভবে মানুষ যাতে তোমার সাথে সময় কাটাতে ভালো লাগলেও জীবন কাটাতে পারবে কি? পালক কষ্ট করতে জানেনা! ওকে আমি তুলোর মতো করে মানুষ করেছি ,তোমার জন্য তোমাদের বাড়ির জন্য মেয়েটাকে জলে ভাসিয়ে দিতে পারবো না আমি। আর ঘর জামাই থাকার মতো কাপুরুষদের আমি আমার মেয়ের যোগ্য হাজব্যান্ড হিসাবে মেনে নেব না!
আরো একটা কথা শোনো তোমরা কি সব কবিতা কাব্য বাউল পাখি লেখো পরস্পরকে ওগুলো বন্ধ করে দিও এবং তোমাদের বয়সে কারো কারো কবিতা আসে বাস্তব দেখনি তো? এসব কথা আমি বলতে পালককে বলতে পারতাম কিন্তু ও নরম মনের আমি কখনো কঠিন হয়নি ওর কাছে ।আমি বলতে চাইওনি ।তাই উদ্যোগ টা তোমাকেই নিতে হবে ।মানে সরে আসতে হবে তোমাকে। কারণ পালকের উপযোগী হবার অভাবটা তোমার তাই। আর হ্যাঁ কোন রকম হেল্প চাইলে আমায় জানিও ।ফোন নম্বরটা দিয়ে রাখি আমি?’
একভাবে কথাগুলো বলার পর যখন আর্যর মুখের দিকে তাকালেন স্বপ্নময় বাবু তখন আর্যর মুখ পাংশুবর্ণ হয়ে গিয়েছে।
” তোমার ইউনিভার্সিটি চলে এসেছে আর কথাগুলো মনে রেখো কি বললাম!” গেটটা খুলে দিয়েছিল গাড়ির স্বপ্নময় বাবু। তখনি ভেতরে ঠান্ডা শীতলতা থেকে বাইরের প্রচন্ড গরম আর্দ্রতা দুটো গালে ঠাস ঠাস করে চড় মেরেছিল আর্যর।
আর্য যেন নামতে পারছে না গাড়ি থেকে। হ্যাঁ না কোন উত্তর না দিয়ে পুতুলের মতো দাঁড়িয়ে স্থানু হয়ে থাকল কিছুক্ষন। যেন জড়পদার্থ। কে যেন গরম সিসা ঢেলে দিল কানের ভেতর ।কতক্ষন এভাবে দাঁড়িয়ে ছিল তার কোন হিসেব নেই। অনল যখন ডাকলো তখন আর্যর চারদিকটা বাষ্সময় হয়ে উঠেছে।
‘ এই শালা কি হয়েছে বে অমন বালের মত মুখ করে দাঁড়িয়ে আছিস?”
‘অনল আমরা গরীব কার দোষে? বাবা চাকরি করে নি কার দোষে? গরিব বলে কি ভালবাসতে নেই?’
” চুপ কর অনল চুপ কর মুখ খারাপ করিস না ।আর পালক নামটা মুছে ফেলতে চাই আমি। এই অপমান আমি আর নিতে পারছি না।’
অনল মাথামুণ্ডু কিছুই বুঝল না ইউনিভার্সিটি ক্যাম্পাসে বসে সবটা জেনে শুধু বলেছিল,’ বাপটা শালা হেব্বি হারামি, তো পালক কি করবে?’
আর্য অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে উত্তর দিলো “পালক নয় আমি করব আমি চলে যাব এখান থেকে!”
‘ লে হালুয়া দেবদাস হয়ে যাবি নাকি আমি চুনিলাল হতে পারব না,মাল ফাল খাওয়াতে পারবো না বলে দিলাম। এত সেন্টু দিয়ে সারাজীবন চালাবে কি করে রে ,’
আর্য অন্যমনস্ক হয়ে শুধু গোটা কলেজের ক্যাম্পাস দেখছিল যেখানে সমস্ত জায়গায় ওর আর পালকের সমস্ত স্মৃতি গুলো ছড়িয়ে ছিটিয়ে রয়েছে সেগুলো কি ইরেজার দিয়ে মুছে দেওয়া যায় না বৃষ্টি দিয়ে ধোয়া যায়!
সারারাত ভেবে সেদিনই আর্য সিদ্ধান্ত নিয়েছিল বর্ধমান নয় কলকাতায় পড়াশোনা করবে ও। পালক কে কিছুতেই কাছে আসতে দেবে না। যাদবপুরে চেষ্টা করবে একবার সত্যি উপযোগী হবার চেষ্টা করে দেখুক ।পালক যদি হারিয়ে যায় হারিয়ে যাক তবু বাবার অপমান সে গায়ে লাগবে না। কিন্তু পালক !তার পাখি !যাকে হারাবার কথা বলছে পারবে কি কখনও তাকে হারাতে? মনের মনিকোঠায় বাউল পাখিকে যত্নে লালিত করবে চিরকাল!
মনে একটা অসম্ভব পরাজয়ের অপমানের দংশন কুঁড়ে কুঁড়ে খাচ্ছিল। আর পালক সে ও তো কম ভালবাসেনি আর্য কে ।আর্য তা জানে খুব ভালো করে। কি করে পারবে পালক এই আঘাতটা মেনে নিতে !কিন্তু আর্যকে যে যেতেই হবে !সত্যি যদি ভালবেসে সুখী করতে না পারে তার পরাজয়ের কাছে ভালোবাসা পরিহাস করবে সেদিন! সব ছেড়ে ছেড়ে বেরোতে হবে তাকে।
যাদবপুর থেকে পিএইচডিতে দারুণ রেজাল্ট করে রিসার্চ করতে ও অধ্যাপনা করতে যখন বিদেশ যায় তখন পালকের বিয়ের খবরটা জেনেই গিয়েছিল ।কি নিদারুন যন্ত্রণায় হৃদয় চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়েছিল তার একমাত্র সাক্ষী অনল।চলে যাবার দুদিন আগেই খবরটা দেয়,’ জানিস পালকের বিয়ে, পাত্র উচ্চপদস্থ আইটি অফিসার অনন্য রায়!’
আর্যর বুকের রক্ত জমাট বেধে গেছিলো বরফের মতো ছুরি দিয়ে কাটা যাবে না হয়তো।
অনল হয়তো বুঝেছিল, ‘চল ভাই দুদিন বাদে চলে যাবি আজ মাল খাব শালা !সব খরচ আমার! শালা টিচার বলে কি মাল খেতে নেই? তাছাড়া তুই আজকে দেবদাস আমি আজকে চুনিলাল”
আর্য সায় দিয়েছিল শুধু। মনে মনে বলেছিল ‘পালক তুমি আমার পাখি ,তুমি চললে অন্য বাউলের একতারায় সুর বাঁধতে। আমার সুর কেটে গিয়েছে ছন্দের অভাবে। তুমি জানো? তুমি ভালো থেকো আমায় ক্ষমা করো! উল্টোদিকে এতক্ষণ বসে থাকা পালকের বন্ধু মৌবনি তখন গটগট করে এগিয়ে আসছিল তাদের লক্ষ্য করে,অনল শুধু হা করে তাকিয়ে বলেছিল এসব মেয়েদের স্বর্গের কোথায় বানায় রে ! আর এখানে ছাড়ার ই বা কি দরকার! শালা দম আটকে যায়। বিপত্তি টা ঘটেছিল তখনই।”
” না না নীচেও পড়েছে মনে হয় নিচে অজয়দা ছিল কাল ।অজয়দার কালকে কারোর সাথে একটা ডিউটি পরেছিল”
‘ ও আচ্ছা
তারপর বর্ষায় যে তোরা পুরী যাস কি হলো এবার?”
‘ দেখি সেমিস্টার শেষে যাবো ভাবছি।’
” তাড়াতাড়ি গিয়ে তাড়াতাড়ি ফিরে এসো সোনা ,ফিরে এসেই কলেজের গোল্ডেন জুবিলি প্রিপারেশন বিপাশা দি বলে দিয়েছে।যা কিছু করবার এ মাসেই করতে হবে।’
‘ আমাকে বলছিল বটে দেখি কি হয় !ওকে যাও, আমাকে আবার ক্যাম্পাস পেরিয়ে যেতে হবে।”
অরুণাংশু সাথে ডিউটি পড়লে মনটা ভালো হয়ে যায়। এত হাসায় ছেলেটা বোর লাগেনা। বয়সে ছোট হবে।
খুব প্রাণবন্ত।
প্রথমে একদফা বৃষ্টির মধ্যেই শুরু হয়ে গেল পরীক্ষা পরীক্ষা যখন মাঝ রাস্তায় অরুনাংশ বলে গেল যাবার সময়,” ত্রিধা দি আজ একটু ম্যানেজ করে নিও প্লিজ। নিচে কে আছে দেখছি তোমায় হেল্প করতে বলছি।’
” কেন রে কি হয়েছে তোর এত তাড়া কেন প্রেম করতে যাবি নাকি?’
” এই বুড়ো বয়সে প্রেম? ওসব না ডক্টরের কাছে মাকে নিয়ে যাব আজ অনেক কষ্টে অ্যাপোয়েন্টমেন্ট পেলাম প্লিজ কিছু মনে করোনা!’
‘ এরপর আর কিছু বলার থাকে না— ঠিকআছে, ঠিকআছে ,ডোন্ট মাইন্ড যা”
পরীক্ষা শেষ হতে আরো ঘন্টা খানেক লেগে গেল।
পরীক্ষা শেষ হওয়ার মুহূর্তে ভূত দেখার মত নিজের ডিউটি রুমের দরজায় আর্য কে দেখে চমকে উঠলো ত্রিধা।
” তুমি?”
“অজয়দা বললেন উপরে আসতে ।তু…. আপনি একা খাতা মিলিয়ে নিতে হবে! নিচে খাতা নেওয়া হয়ে গেছে অজয়দা মিলিয়ে দেখছে তাই আমি উপরে এলাম।’
ত্রিধার নিজের মনে হল হৃদপিন্ডের আওয়াজটা সে নিজেই শুনতে পাচ্ছে।অন্য
কলেজের ছাত্র ছাত্রীদের সামনে কিছু না বলাই শ্রেয় মনে করে চুপ করে গেল।
সবাই এক এক করে খাতা জমা দিয়ে চলে গেল। হুড়মুড়িয়ে আবার এক ঝাঁক বৃষ্টি নামল। আকাশের যত অভিমান যেন ঢেলে দিচ্ছে বৃষ্টির আকারে ঘাসের ওপর গাছের উপর একচালার উপর কলেজ বিল্ডিং এর মাথার উপর ঝাপসা হয়ে গেছে। নিচে অজয়দা আছে কিনা কে জানে! একটা গোটা আস্ত ঘরে আর্য আর ত্রিধা। যেদিন একসময় ছিল বহু প্রতিক্ষার তাঁর কাম্য নয়। আকাশ যেন ঢেলে দিয়েছে এমন বৃষ্টি হচ্ছে চারিদিক সাদা এ বৃষ্টি যেন থামবার নয়। আর্য এই কিছুক্ষণের মধ্যে একবারও চোখ নামায়নি ত্রিধার দিক থেকে। ত্রিধার অস্বস্তি হচ্ছিল। কিছু বলেনি। মনে মনে ঠিক করেছিল খাতা নিয়ে বৃষ্টি থামলেই বেরিয়ে যাবে মেন বিল্ডিং এ একটা কথা না বলে।
মানিব্যাগ থেকে কিছু একটা বার করে খেলো আর্য। ওষুধ? কি হয়েছে আর্যর ?ত্রিধা আড়চোখে তাকায়! পায়ের কাছে কি একটা পড়ল! হাওয়ায় ভাসতে ভাসতে কাছাকাছি এসে পড়ল ওটা। তুলে দেবে কি? নীল রঙের প্রজাপতি! বহুমলিন, ঝাঁপি টা আবার খুলে গেল ।একদিন একটা সুন্দর নীল প্রজাপতি বানিয়ে দিয়ে পালক বলেছিল ‘বাউল পাখি ছোট হয়ে প্রজাপতি হয়ে গেছে তোমার কাছে থাকবে বলে সব সময়”
ত্রিধা প্রজাপতি টা তুলে বিহ্বল চোখে আর্যর দিকে তাকায়। এতোকাল এত যুগ পর দুই জোড়া চোখ এক হয়ে যায়।
‘ এখনো?” ত্রিধা প্রশ্ন করে
” এখনো পাখি বাউল রেখেছে যত্নে”
উত্তর যোগায় আর্য
আর কিছু বলতে পারেনা আর্যর খুব কাছে এগিয়ে যায় সে,” কেন কেন তুমি এমন টা করলে?” আর্য কে ঝাঁকায় সে।
আর্য কিছু না বলে তাকে কাছে টেনে নেয় দুটো ওষ্ঠ এক হয়ে যায়। ত্রিধার যেন এত দিনের তৃষ্ণা মিটলো। কোথায় ছিল এত পিপাসা! সাম্রাজ্যের রাজা কে সে আজ পরাজিত করেছে মনে হলো! কী সুখ কী আনন্দ এত পরিতৃপ্তির জন্মে থেকে হয়নি তার ।আর্য তার! বাউল তার! পরস্পর পরস্পরকে জড়িয়ে থাকলো বহুক্ষণ ।সময় যেন থমকে গেছে। বারো বছরের ব্যবধান মিলে গেল এক বিন্দুতে।
‘ চলো পালক কেউ আসবে এখানে!”
পালকের জ্ঞান ফেরে সে কিংকর্তব্যবিমূঢ় হয়ে বসে থাকে কিছুক্ষণ তারপর যন্ত্রচালিত পুতুলের মতো কাজ করতে থাকে। ফিরে আসে মেইন বিল্ডিংয়ে। আর সময় না নিয়ে বেরিয়ে পড়ে কলেজ থেকে।
(৯)
ঘরে এসেই দরজা বন্ধ করে শুয়ে পড়ল সে। গোটা রাস্তা এসেছে মন্ত্রমুগ্ধের মতো। কয়েক যুগ আগে যেন ফিরে গেছে সে। অনন্য আজ work-from-home এ ছিল। তিতির নমিতার সাথে নাচের স্কুলে। অনন্য হকচকিয়ে গেল ত্রিধার এইরকম ব্যবহারে। দরজার লক খুলে জিজ্ঞেস করল,’ কি হয়েছে বুবু?’ ততক্ষনে বালিশে মুখ গুঁজে ত্রিধা ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছে!
পিঠে হাত দিতেই ত্রিধা ক্ষোভ উগরে দিল ,’তোমরা কি কেউ একা আমাকে থাকতে দেবে না ?কি হয়েছে! কি হয়েছে! কিছু হয়নি আমার !আর প্লিজ দয়া দেখাতে আসবে না একদম!”
অনন্য এতক্ষণ চুপ করেছিল তারপর আর সামলাতে না পেরে কড়া ভাষায় বলল,’ আর কত নাটক করবে তুমি? একদিন কাঁদবে ?একদিন হাসবে। জিজ্ঞাসা করলে বলো কিছু হয়নি। তুমি আসলে ভীষণ স্বার্থপর। উল্টোদিকের মানুষটার কথা ভাবো নি কখনো। একা থাকতে চাও তো থাকো একা’ বলে দরজাটা দড়াম করে বন্ধ করে চলে গেল অনন্য।
বালিশে মাথা রেখে ত্রিধা ভাবতে চাইলো কেন এমন অন্যায় করছে অনন্যর সাথে! কেন ভাসিয়ে দিচ্ছে সব কিছু? তার সংসার, তার অনন্য ,তার তিতির ভাসিয়ে দিচ্ছে খড়কুটোর মতো,আর নিজে ভেসে যাচ্ছে স্রোতের উল্টো দিকে।
বহুদিন পর ডাইরি নিয়ে বসলো মাঝরাতে এখানে লিখবে সে সব কথা সব আকাঙ্ক্ষার সব না পাওয়া কাউকে জানাতে চায় না সে।
” বাউল তোমার সাথে দেখা হলো পাখির বহু যুগ পরে বাউল তুমি এক তৃষ্ণার্ত শুকনো বুকে বসে ছিলে পাখি চঞ্চুতে এক ফোঁটা জল নিয়ে এসে তৃষ্না বাড়িয়েছে তাই না? কিন্তু পাখিতো নিয়মের বেড়াজালে আবদ্ধ ।পাখি জানে যা কিছু দূর থেকে মহাবিশ্বের লক্ষ্য লক্ষ্য আলোককনা কাছে গেলে সেই অগ্নিকাণ্ডে পুড়ে ছাই হয়ে যাবে সে। বাউল এর কাছে সে কোনদিন ফিরবেনা ।এ ফেরাতে যে আনন্দ নেই তার। প্রত্যাশাহীন চাওয়াতেই আনন্দ আছে ।বাউল যেদিন সে তোমার বিচ্ছেদে চূর্ণ-বিচূর্ণ হয়ে ছিল সেদিনের সৃষ্টি হয়েছিল নতুন পালকের। সেদিন তার নিজের পাখার রংয়ের সৃষ্ট নানা রঙের প্রজাপতি কে জোর করে ঝাঁপিতে তালা দিয়ে বন্ধ করে রেখেছে ।আজ কেমন করে যেন হাজার ওয়াটের আলো নিয়ে প্রজাপতিগুলো চোখের সামনে নাচানাচি করতে লাগলো। তুমি বলবে জন্মান্তরে মিলব আমরা হয়তো। কিন্তু আমি যে জন্মান্তর বিশ্বাস করিনা। জন্ম একবার মৃত্যুও একবার ।মৃত্যুর পর হয়না। মহাবিশ্বে বিলীন হয়ে যায়। পাখির ডানা এখন শক্ত। উড়তে পারে নিজেই ।পথ খুঁজে না পেলে দিগ্বিদিক শূন্য হয়ে ঘুরে বেড়াতো। তবে বাধা পড়ার মতো ভুল করবেনা সে। দূর থেকেই ভালবাসবে তোমাকে।তবু তুমি কখনো মনে কর দেখো বৈশাখের তপ্ত মাটি অফুরন্ত রংয়ের বারিধারায় তৃষ্ণা মেটাতো, যখন পরমাণু বিস্ফোরণ ঘটাতো শরতের আকাশে মেঘ,শীতের রিক্ততায়, রুক্ষতায় ,কখনোবা বসন্তের সবুজে মনে পড়েনি তোমার আমার কথা? পাখির মনে হয়েছে সব সময়! প্রশ্ন চলে নিরন্তর মনে! উত্তর পায় না খুঁজে। বাউল তুমি জানো? প্রশ্নে জর্জরিত পাখি উত্তর হাতড়াতে গিয়ে আর বাধা পড়ার মতো ভুল করতে চায় না সে । ভীষ্মের মত বানে জর্জরিত হয়ে বেঁচে থাকে মৃত্যুর সাথে লড়াই মৃত্যুর চেয়ে কম যন্ত্রণার ?নরম চঞ্চু শক্ত হয়েছে পাখির। বেলাশেষের পড়ন্ত রোদ্দুর ডানায় মেখে শেষবারের মতো বিদায় জানাবে বাউলকে। দূরে থেকো ভালো থেকো। প্রকৃতির নিয়ম পাল্টায় এমন সাধ্য যে আমাদের নেই বাউল।”
(১০)
পরীক্ষার পর্ব শেষে মৌবনি কে ফোন করল পালক। মৌবনিকে খুব দরকার। দুবার তিনবার রিং হওয়ার পর ও প্রান্ত থেকে ভেসে আসে ,’বলিয়ে জী , সকাল সকাল, ডুব মেরেছিস?’
“মৌ এই উইকেন্ডে আসবি?’
” কি সকাল সকাল ইয়ার্কি মারছিস আমার বলে মরার সময় নেই ইউনিভার্সিটিতে গুচ্ছের কাজ খাতা দেখা বাকি!”
” প্লিজ মৌ একবার আয়!”
ত্রিধার গলায় এমন কিছু ছিল যা নাড়া দেয় মৌকে।
‘ এই কি হয়েছে তোর অনন্যর সাথে ঝামেলা?’
‘ তুই আসবি? উপায় থাকলে চলে যেতাম আমি নেহাত নেই তাই জোর করছি!”
” ওকে ওকে দেখছি ফ্রাইডে করে দেখছি কিন্তু একদিনের বেশি স্টে করতে পারবোনা।’
” হ্যাঁ তবে আমরা বাইরে কোনো সিসিডিতে দেখা করে তারপর বাড়ি আসবো অনন্য এখন ওয়ার্ক ফ্রম হোমে।’
মৌবনি ফোন ছেড়ে ভাবল কি হলো ত্রিধার ।অনন্যর সাথে কিছু ?যাক গে গিয়ে জানা যাবে।
অনন্যর সাথে কথা নেই আজ বেশ কিছুদিন। অনন্য ও চেষ্টা করে না ।এক ঘরে দুটো ভিন্ন গ্রহের প্রাণী তারা। শুধু ভাবে কেন এভাবে অন্ধকারে ঠেলে দিচ্ছে বুবু তাকে? কি দোষ তার !বুবু কি অন্য কাউকে ভালোবাসে ?এটা সম্ভব!! ও তো কখনো এমন করে না! নিজের দায় থেকে কখনো সরে আসেনি। কিন্তু অনন্য ও আর নিজেকে ছোট করতে পারেনি তার সামনে ।তাই সন্তর্পনে পা ফেলে তাদের দাম্পত্য জীবনে। পাঁচ বছরের তিতির ভাবে কেন করেছে মা-বাবার সাথে এমন! মা যেন কেমন হয়ে গেছে! গান করে না ,জড়িয়ে ধরে না, আদর করে না ,কলেজ থেকে ফেরার সময় কিচ্ছু আনেনা। বড়োদের আড়িটা যেন কেমন! ভাব হয় না সহজে! এই যে টিকলির সাথে খেলতে খেলতে আড়ি হয় আবার তো ভাব হয়ে যায়। ছোট্ট মাথায় এত কিছু ঢোকে না।
ত্রিধা ঐ দিনের পর দুদিন কলেজ যেতে পারেনি ।মাথাটা কাজ করছিল না। অসম্ভব ভার লাগছিল। দুদিন পর যখন কলেজে ঢুকলো মনে হল যেখানে একদিন মুক্তির আকাশ খুঁজেছিল সেখানে আবার শিকলের যন্ত্রণা। হৃদয়ে যেন বারবার রক্তক্ষরণ হয় ।নিয়তি কি লিখেছে তার জন্য !কলেজে ঢুকেই বিপাশা দির মুখোমুখি হতে হয় তাকে,’ ঠিক আছো তো?’
” হ্যা দিদি’ ঠিক আছি’ নিজেকে গুটিয়ে নিতে চায় সে! সারাদিন মনে হলো সবাই তাকে দেখছে এমনকি দেওয়াল, জানালা, ছাদ, ক্যাম্পাস, সকলে।সে যেন আসামী।এল ফাইভ বিল্ডিং এর দিকে তাকাতেই পারেনি।
‘ পালক’
ত্রিধা অপেক্ষা করছিল তা নয় কিন্তু কে জানত যে কে ডাকবে তাকে।
” আর্য তুমি আর এসো না আমার সামনে। একটা দিন নিঃস্ব করে চলে গিয়েছিলে আমায় ।আজ আবার নিঃস্ব করে দিওনা!”
” কিন্তু পালক তোকে যে অনেক না বলা কথা জমা আছে আমার!”
সিঁড়ির এক কোণে দাঁড়িয়ে কথা বলছিল ওরা।
” কিন্তু আমার যে কিছু শোনার নেই আর্য যা শুনতে চেয়েছিলাম তা আজ শুনতে চাইলে তোমারও বিপদ আমারও অসুবিধা।’
” তোকে যে আঘাত দিতে চাইনি আমি।’
” কিলাভ শুনে আর্য! তুমি এসো না আমার কাছে!যে আঘাতটা দিয়েছিলে তাতে অন্য পালকের জন্ম হয়েছে। এই পালক কে মেরে ফেলতে চাইলে পালকের সাথে আরো দুজন যে ভেসে যাবে ওদের কষ্ট দেবার অধিকার আমার নেই।’
‘পালক!”
‘ হ্যাঁ আর্য তোমায় আমি বাউল করেই রেখেছি এটুকু জেনে রেখো। কিন্তু ঘর বাধতে হয়েছে যে অন্য বাউলের কোঠায় ।তুমি পিছু ডেকোনা আমায় ।বিয়ে করো তুমি। অরুনাংশ বলছিল বিয়ে করোনি তুমি। কেন করনি? বিয়ে করো, পালক কে ভোলো ।পাখিকে ছেড়ে দাও নিজের আকাশে।’
‘ এক জীবনে যে সব পাওয়া যায়না পালক! তবে তুই না চাইলে আমি আসবো না তোর সামনে !তোকে আঘাত আমি কোনদিন দিতে চাইনি! আমার পাখিকে মেরে ফেলতে চাই নি আমি !সময় সুযোগ হলে জানবি একদিন হয়তো ।আর কোনদিন যদি জানতে না পারিস জানবো দোষী হওয়া আমার অদৃষ্ট। ভালো থেকো পাখি, আর কখনো বাঁধব না তোমায়।”
(১১)
‘ কি বলছিস আর্যদা! তোর কলেজে!’
‘ হ্যাঁ মৌবনি’ কলেজে আসা থেকে শেষ দিনে দেখা হওয়া সব এক এক করে বলে হালকা হতে চাইল ত্রিধা।
‘ তোদের মাইরি সার্থক প্রেম’
” ফালতু বকিস না অনন্যকে আমি কষ্ট দিতে চাই না রে। কিন্তু আমি যে কলঙ্কিত। কালী আমার গায়ে।’
” কলঙ্কিনী রাধা! কিসের কালি বস ?ভালবেসেছ একটা চুমুই না হয় খেয়েছৃ বিদেশে কতজন কতজন কে চুমু খায় তার হিসেব আছে? জানিস? দোষের কি হলো? কিন্তু বস আর না ।আমাদের খোকন সোনা কে যন্ত্রণা দেওয়া তোমার ঠিক নয়। অনন্যকে তুমি সব ভুলে কাছে ডেকে নাও পিছন ফিরে তাকাস না রে।”
” ঠিকই বলেছিস মৌ মনের সাথে যুদ্ধ করে অনেক যন্ত্রনা পেয়ে এই সিদ্ধান্তে আসবো ভেবেছি ।কিন্তু জানিস মৌ। কিন্তু একটা প্রশ্ন আমার জানার ছিল। কিসের জন্য আর্য আমায় ছেড়ে গেছে একদিন? অন্য কারোর সাথে সম্পর্ক থাকলে ও তো তাকে বিয়ে করত!’
‘ মৌবনি একটা লম্বা নিঃশ্বাস নিয়ে বলল ত্রিধা আজ হয়তো তোরে গিটটা আমি খুলতে পারবো। তোর বিয়ের দু’দিন আগে আমি ঋকের সাথে গিয়েছিলাম একটা বার কাম রেস্টুরেন্ট এ ।দেখা হয়েছিল অনলদা আর আর্যদার সাথে। আর যাচ্ছেতাই অপমান করে ছিলাম আমি তোর উপর হওয়া অন্যায়ের জন্য। কিন্তু অনল দা যখন বলল সবটা তখন আর ক্ষমা চেয়ে নিজেকে ছোট করিনি রে আর্যদার কাছে।’
‘ সবটা মানে কি সবটা?’
মৌ খুলে বলল ত্রিধাকে। ত্রিধার পায়ের তলা থেকে মাটি সরে যাচ্ছিল ।তার বাবা একজন বড় ব্যবসায়ী। ব্যবসায়িক ক্ষমতার জোর খাটিয়েছে তার জীবনে! যে বাবা তাকে এতটুকু কষ্ট দেয় নি কোনোদিন সেই বাবা তার জীবনটাই এলোমেলো করে দিল? আর আর্য কিছু বলল না তাকে!
” আচ্ছা চল ওঠ। আমি ইচ্ছে করে তখন তোকে বলিনি কারন তোর বিয়েটা ঠিক হয়ে গিয়েছিল ।আর আর্যদা তখন বিদেশে চলে যাচ্ছে। আর্য দাও বারণ করেছিল।এখন বাড়ি যা। আমি কসবায় পিসিমণির সাথে দেখা করে রাত্রে যাব তোর ওখানে। অনন্য দাকে বলেছি মাল খাব আজ তোর বর টা মাইরি হেব্বি, চুমু খেতে ইচ্ছা করে।”
মৌবনি আবহাওয়া হালকা করার চেষ্টা করে।
‘ চল উঠি ‘মৌবনিকে ক্যাবে উঠিয়ে বিধ্বস্ত ক্লান্ত লাগলো নিজেকে। মনে হল রাজপথে হারিয়ে গেছে কোথায়? ওর বাড়ি নেই, আশ্রয় নেই! দিকশূন্য পাখি! কার কাছে জবাবদিহি করবে ও ?কাকে জবাব চাইবে বাবার কাছে? যে কিনা বিভিন্ন রোগে মৃত্যুর সাথে লড়াই করছে? আর আর্য !আর্য কে যন্ত্রণা দেবার অধিকার কে দিল বাবাকে? পারছে না আর পারছেনা সে। ক্লান্ত শ্রান্ত ।আর্যকে অবিশ্বাস করেছে, অনন্যকে ঠকিয়েছে তিতিরকে অবহেলা করেছে। কেন ?কেন! কেন! হঠাৎ একটা সজোরে আওয়াজ। চোখের সামনেটা অন্ধকার হয়ে গেল ।উফফফ কী যন্ত্রনা!
(১২)
জ্ঞান যখন ফিরল তখন হসপিটালের বেডে শুয়ে। অনন্য সামনে বসে। মাথাটায় অসহ্য যন্ত্রণা।
‘সিস্টার চোখ খুলেছে!”
‘ কী হয়েছে আমার?’ কোনরকম বিড় বিড় করলো ত্রিধা।
” আপনার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে অন্যমনস্ক হয়ে রাস্তায় চলছিলেন ডক্টর আসবেন”সামনের নার্স বললো।কোন রকমে তাকালে অনন্যর দিকে ত্রিধা।
” কিসের শাস্তি দিচ্ছ বুবু? কেন এমন সর্বনাশী খেলায় মেতেছো তুমি? তোমায় ছাড়া আমি বাঁচবো কি করে সেটা ভেবেছো?”
ত্রিধা মনে করতে পারলো কিছুটা সিসিডি মৌবনি উফ কি আওয়াজ।
চোখ দুটো বন্ধ করলো ত্রিধা !বাবার মুখটা মনে পড়ল আর্যর মুখটাও মনে পড়ল। চোখ দিয়ে গরম জল নেমে এলো অবিরত।
” কেন কাঁদছো বুবু? তোমাকে এবার আমি শাসন করব! কোন কথা শোনো না তুমি, আমার গাড়িতে আসবে এবার থেকে আমার গাড়িতে যাবে”
ডাক্তার এলেন ।ভালো করে ত্রিধা কে দেখলেন ।’খুব বাঁচা বেঁচেছেন ।গাড়িটা পায়ের উপরে গেছে। স্টিচ দিয়েছি কিছুটা ।মাথায় হালকা চোট। মাথায় গাড়িটা পড়লে কি হতো ভেবেছেন? আপনারা শিক্ষিত মানুষ অন্যমনস্ক হয়ে চলাফেরা করেন কি করে আমি তো ভেবে পাইনা।’
ঈষৎ বিরক্তি প্রকাশ করলেন ডাক্তার।
ফোনটা এসেছিল অনন্যর অফিস টাইমে ।আননোন নাম্বার দেখে ধরে নি প্রথমে। আবার রিং হলে ধরতে ও প্রান্ত থেকে ভেসে এসেছিল অচেনা গলায
,” আপনি অনন্য রায়?’
” হ্যাঁ বলুন’
” একজন মহিলা তার ব্যাগে আপনার কার্ড পাই ওনার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে গল্ফ গ্রীনের কাছে’
” হ্যাঁ আমার কার্ড অনেকের কাছেই থাকে অফিসের পারপাশে ।মহিলার নাম না জানলে জানবো কী করে উনি কে! দেখুন কে”
অনন্য কে হোল্ড করিয়ে আরো কিছু কাগজপত্র ঘেঁটে এটিএম কার্ড ঘেঁটে লোকটা বলেছিল ত্রিধা রায়। আর এক মুহূর্ত সময় নষ্ট করেনি অনন্য। একজন কলিগ কে নিয়ে চলে গেছিল ঘটনাস্থলে সেখান থেকে হসপিটাল।
(১৩)
সকালে বেশ ঘুমিয়ে পড়েছে আর্য ।বালিগঞ্জের এই বাড়িটা বেশ নিরিবিলি ।ঘুম ভাঙতেই নাড়ু চা দিয়ে গেল আর খবরের কাগজ ।খবরের কাগজে চোখ বুলিয়ে কলেজ যাবার প্রস্তুতি নিতে গিয়ে মনে হল ত্রিভুবনে কি আর কলেজ ছিল না! এই কলেজেই মুখোমুখি হতে হল পালকের সঙ্গে তাকে। ফোনটা এসেছিল তখনি অরুণাংশু ফোন করে দিয়েছিল খবরটা।
‘ আর্যদা ত্রিধা কে চেনো তো? ত্রিধা রায় ত্রিধাদির একটা অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে। হসপিটালে ভর্তি আছে। আমরা কেউ কেউ যাব ওখানে ।তুমি যদি না যাও আমার ক্লাসটা ম্যানেজ করে দিও প্লিজ।’
” কি ত্রিধা! পালক!’
” হ্যাঁ বাংলা ডিপার্টমেন্টের ত্রিধারায় ‘
“আমি আসছি কোন হসপিটাল?’
অরুণাংশুর কাছে জেনে নিয়ে আর এক মুহূর্ত দাঁড়ালো না আর্য। অরুনাংশু একটু অবাক হল মনে হয় তাতে কিছু যায় আসে না আর্যর। তার পালক, তার পাখি ,বিপন্ন সে যাবে আগলাতে ।এটাই স্বাভাবিক মনে হলো তার।
হসপিটালে পৌঁছে সকলে দেখা করে ত্রিধার সাথে শুধু আর্য বাদে ।আর্য ছিল অনন্যর সাথে বাইরে। দুই পুরুষ ,দুই বাউল ,এক নারী —একটি পাখি !দুজনাই আগলাতে চায় তাকে ।অনন্যকে দেখে আর কিন্তু হিংসা হল না ।বুকের ভেতর পোকাটা কামড়াতো তো বহুদিন ধরে সেই ক্ষত স্থানে প্রলেপ পড়লো। এত নির্ভেজাল মানুষটির কাছ থেকে কেড়ে নিতে পারবে না পালককে। আর্য ক্ষণিকের কথাতে এই টুকুই বুঝেছে। কি অসম্ভব ভালোবাসে মেয়েটাকে ।যতক্ষণ ছিল শুধু বুবু বুবু বুবু ।বাচ্চা ছেলের মত বলে যাচ্ছিল অনন্য ।আর্যর শুনতে ভালো লাগছিলো। পাখির কথা ।আবার সুর খুঁজে পেয়েছে আর্য। চোখে পড়লো শিউলি ফুল বিক্রি করছে একটি বাচ্চা ছেলে শাল পাতায় হসপিটালের বাইরে ।পূজো এসে গেল। আর্য হাসলো আপন মনে। পাখি ভালো থাকবে ।শেষ উপহার সে দিয়ে যাবে পাখিকে।
সবাই দেখা করে চলে গেলে ত্রিধা একটু অবাক হয়। এত এত অহংকার তোমার? আমার অ্যাক্সিডেন্ট হয়েছে শুনে একবারও আসতে পারলে না তুমি ?না হয় অনেক আঘাত পেয়েছ তবুও আমায় একবারও চিরতরে হারানোর ভয় হয় নি তোমার? ত্রিধা মনে মনে আর্য কে বলল ।
‘ সবাই চলে গেল অনন্য?”
” হ্যা বুবু চলে গেছে।”
ত্রিধাএকটু ওঠার চেষ্টা করল।
“কালকের দিনটা অবজার্ভ করে ছেড়ে দেবে বলেছে।’
” তিতির কেমন আছে?’
” সে দস্যি মেয়ের কথা বলোনা! মায়ের মাথা খারাপ হয়ে যাচ্ছে ,খালি বায়না করছে তোমার কাছে আসবো!”
” নিয়ে এসো কাল একবার’
” পাগল নাকি শেষে নিয়ে যেতে পারব না কান্নাকাটি জুড়বে”
‘ আরে বুবু তোমায় বলাই হয়নি আর্য না কে একজন এসেছিল তোমার খোঁজ নিতে। তোমাদের কলেজের। তোমার কেবিনে ঢুকলো না। বলল রুগীকে বিশ্রাম নিতে দেওয়া ভালো। উনিই শিউলি ফুল কিনলেন। বললেন পুজো আসছে তো আপনাদের মিসেস এর ভালো লাগবে। আর ওনার বাড়ি তো তোমার বাড়ির কাছে বলল ,নতুন জয়েন করেছে।”
তোমার মনে আছে আর্য ?সব মনে আছে তোমার ?তুমি এসেছিলে ?শিউলি ফুল নিয়ে আসতে তুমি আমার জন্য ভোলোনি এখনো? তবু একবার এলে না নিজের হাতে দিতে! আর্য তুমি ক্ষ্যাপা বাউল, তুমি উদাসী বাউল, তুমি পাখির বাউল!”
(১৪)দু মাস পর
ত্রিধা জয়েন করেছে কলেজে। আর্যর সাথে দেখা হয় না আর ।আর্য ই সরে গেছে অনেক চিন্তা করে। সিদ্ধান্ত নিয়েছে চলে যাবে সে। কয়েকটা জায়গায় মেইল পাঠিয়েছে রিপ্লাই এসেছে। বেশিরভাগই বিদেশের। সেই ভালো এই টানা পোড়েন আর ভালো লাগেনা ।সম্পর্কের যন্ত্রণা তাকে মৃত্যুর সমান যন্ত্রনা দিয়েছে ।পালক কেও কম কষ্ট পেতে হয়নি তার জন্য ।সে না এলে তো এই কঠিন পরিস্থিতিতে ফিরতে হত না ।
ত্রিধা কেও মেনে নিতে হয়েছে ভবিতব্য। বাউল এর উপর তার জোর নেই ।সময়ের সাথে চলতে চলতে ছাড়তে হয়েছে অনেক কিছু। অনন্যকে কষ্ট দিতে পারবে না সে।
কলেজে ঢুকে নিজের ড্রয়ার খুলতেই একটা খাম চোখে পড়লো কলেজে। ছোট্ট নীল প্রজাপতি বেরিয়ে পড়লো পায়ের কাছে ।একটা সবুজ খামে আঠা দিয়ে আটকানো পাতায় লালকালিতে চেনা অক্ষরে লেখা চিঠি ।
‘আমার পাখি -এক জীবনের সব পাওয়া যায়না ,ভবঘুরে বাউল আমি! চলে যাচ্ছি চিরতরে! ঝড় উঠেছিল মাঝে পাখি ।বিধ্বস্ত তুমি ক্লান্ত তুমি। পালক আমার। আমার পাখি।তোমায় আঘাত দিতে চাই না আর ।আমার এই ছন্নছাড়া জীবনের সাথে তোমাকে জড়িয়ে যেটুকু বিড়ম্বনা দিয়ে ফেলেছি তার জন্য ক্ষমা চেয়ে তোমাকে আর কষ্ট দেবো না। শুধু জেনো এক সন্ধিক্ষণে মিলন হয়েছিল বাউল আর পাখির তখন একে অপরের কাছে পরিপূর্ণভাবে নিজেদের উৎসর্গ করেছে ।আমার আর কিছু চাওয়ার নেই পালক। আমার পাখি নিরাপদে থেকো। ভালো থেকো।
ক্ষ্যাপা বাউল
আস্তে আস্তে খামটা সমেত প্রজাপতিটা সযত্নে ভাঁজ করে রেখে দিলো মনের মনিকোঠায় । ত্রিধার চোখ দুটো দিয়ে নোনা জল গাল বেয়ে গড়িয়ে পড়ল।।