ক্যাফে ধারাবাহিকে সুদীপ ঘোষাল (পর্ব – ৪)

ঝিঁ ঝিঁ পোকার আলো
সব অভাব অভিযোগ তার কাছে এসে থমকে পড়ে অনায়াসে। আর অপরের উপকার করতে স্বপ্নার তুলনা মেলা ভার। ভাইঝিরা তানুশ্রী, দেবশ্রী,জয়শ্রী। এরা বড়দার মেয়ে আর মেজদার মেয়ে পৃথা,ছেলে ইন্দ্র। এরা সকলেই আমার খুব প্রিয়। বাবুর মেয়ে তিন্নি আমার ছেলে সৈকত।
ভরা সংসারে সবাই সুখে আছি। কিন্তু কতদিন?
রূপসী বাংলার রূপে ছুটে যাই। কিন্তু আমার চেনা পৃথিবীর সবটা হয়ে যায়
অচেনা বলয়,মাকড়সার জালের মতো জটিল । সবাই এত অচেনা অজানা রহস্য ময় ।বুকটা ধকধক করছে,হয়তো মরে যাবো, যাবো সুন্দরের কাছে,চিন্তার সুতো ছিঁড়ে কবির ফোন এলো । এক আকাশ স্বপ্ন নিয়ে, অভয়বাণী মিলেমিশে সৃষ্টি করলো আশা ।আর আমি একা নই,কবির ছায়া তাঁর মায়া আমাকে পথ দেখায়…
৪
সঞ্জীব বলেন,জল তুমি ডুবিয়ে রাখো। মানুষের দুর্গতির কারণ। তুমি ছাড়া আমরা ভালো থাকতাম।মরুভূমি দর্প করে। আমি সমগ্র পৃথিবী শাসন করবো।সমগ্র জীবন প্রতিবাদ করে। সৃষ্টি হয় প্রকৃতি সবুজ বন। নামে বৃষ্টিধারা। সঙ্গে জীবন। জিত হয় জলের। তাই জলের অপর নাম জীবন। জলের মত সহজ হও।বাউল হবে।
সঞ্জীবের ছাত্র বলে,আপনার কথাগুলো কবিতার মত।বেশ লাগে শুনতে।
– শুধু শুনলে হবে না।পালন করতে হবে।
– হ্যাঁ স্যার,চেষ্টা করব।
এইভাবে জীবন এগিয়ে চলে সুখেদুখে।
সঞ্জীবের মনে পড়ে রাম আর রমার কথা।রাম ও রমা বিয়ের পর থেকেই ভাড়া বাড়িতে থাকে । তাদের সন্তান হলো । ভাড়া বাড়িতে স্বাধীনতা নেই । তারা দুজনে বসে নিজের বাড়ি বানানোর স্বপ্ন দেখলো । রোজগার কম । রমা তার গহনা দিলো । রামের কিছু নগদ সঞ্চিত সম্পদ মিলিয়ে ছয় মাসের মধ্যেই স্বপ্ন সফল করলো । এখন তারা শিশুকন্যাকে নিয়ে নিজের বাড়িতে থাকে । দুজনের সম্মিলিত প্রচেষ্টায় অসম্ভবও সম্ভব হলো ।
কন্যা যখন চার বছরের তখন থেকে মা স্কুলে নিয়ে যান । আর রাম গৃহশিক্ষকতা করে অর্থ জোগান । রমা বাড়ির কাজ করেন। এইভাবে ওদের যৌথ প্রচেষ্টায় শিশুকন্যা আজ বড়ো হয়ে স্কুল শিক্ষিকা হয়েছে । তাদের স্বপ্ন সফল হয়েছে ।
নর ও নারীর শক্তি একত্রে নতুন স্বপ্ন গড়ে তোলে । যুগে যুগে তার প্রমাণ মেলে ।
৫
পার্শ্বশিক্ষকতা থেকে অবসর নেওয়ার পর থেকে আমি ও আমার স্ত্রী কাছাকাছি দ্রষ্টব্য স্থানগুলি ঘুরে দেখি।ছেলে চাকরি করে, কোলকাতায় থাকে।মাঝে মাঝে বাড়ি আসে।আমরা বাসে চেপে কড়ুই গ্রামে এলাম।এখানে কবিশেখর কালিদাস রায়ের বাড়ি।একজন বললেন,১৮৮৯ সালের ২২ শে জুন পূর্ব বর্ধধমানের কড়ুই গ্রামে কালিদাস রায়ের জন্ম। তাঁর লেখা ছাত্রধারা পড়ে আমি তার প্রতি আকৃষ্ট হয়েছিলাম ছোটবেলাতে। আমার এক দাদা স্বপন ঘোষাল নিয়ে গিয়েছিললন তাঁর জন্মভিটে কড়ুই গ্রামে। খুব ভাল লেগেছিল সে সময়ে। আমি যখন গেছিলাম তখন খড়ের চালের একটা ঘর দেখেছিলাম তাঁর ভিটেতে। এখন হয়ত সংস্কার করা হয়েছে বাসভূমি। তিনি ছিলেন চৈতন্যদেবের জীবনীকার লোচনদাসের বংশধর। কালিদাসের শৈশব কেটেছিল মুর্শিদাবাদ জেলার বহরমপুর শহরে। সেখান থেকে বিএ পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে তিনি শিক্ষকতার বৃত্তি গ্রহণ করেন। কলকাতার ভবানীপুরের মিত্র ইনস্টিটিউশনে দীর্ঘকাল শিক্ষকতা করেছিলেন তিনি। ১৯৭৫ সালে টালিগঞ্জে ‘সন্ধ্যার কুলায়’ নামক নিজস্ব বাসভবনে শেষ নিঃশ্বাস ত্যাগ করেন কালিদাস রায়।কালিদাস কাশিমবাজার আশুতোষ চতুষ্পাঠীতে সংস্কৃত শেখেন এবং পরে কাশিমবাজারের খাগড়া লন্ডন মিশন স্কুলে অধ্যয়ন করেন। ১৯১০ সালে তিনি বহরমপুর কৃষ্ণনাথ কলেজ থেকে বিএ পাস করে স্কটিশ চার্চ কলেজে দর্শনশাস্ত্রে এমএ শ্রেণিতে অধ্যয়ন করেন; কিন্তু চূড়ান্ত পরীক্ষায় অংশগ্রহণের আগেই পেশাগত জীবনে প্রবেশ করেন। রংপুরের উলিপুর মহারানী স্বর্ণময়ী হাইস্কুলের সহশিক্ষক (১৯১৩) হিসেবে তাঁর কর্মজীবন শুরু হয়। পরে কিছুদিন (১৯২০-৩১) চবিবশ পরগনার বড়িশা হাইস্কুলে শিক্ষকতা করার পর রায়বাহাদুর দীনেশচন্দ্র সেনের সহায়তায় তিনি কলকাতার মিত্র ইনস্টিটিউশনের ভবানীপুর শাখায় প্রধান শিক্ষকরূপে যোগদান করেন এবং ১৯৫২ সালে অবসর গ্রহণের পূর্ব পর্যন্ত এ পদে অধিষ্ঠিত ছিলেন।কালিদাস ‘রসচক্র’ নামে একটি সাহিত্য সংসদ প্রতিষ্ঠা করেন এবং রবীন্দ্র-ভাবধারায় উজ্জীবিত হয়ে তিনি কাব্যচর্চা শুরু করেন। রোমান্টিকতা, প্রেম, পল্লিজীবন, সমাজ, ঐতিহ্যপ্রীতি এবং বৈষ্ণবভাব তাঁর কবিতার প্রধান বিষয়। তাঁর মোট কাব্যগ্রন্থ ১৯টি; তন্মধ্যে কুন্দ (১৯০৭) তাঁর প্রথম প্রকাশিত কাব্য। এ ছাড়া পর্ণপুট (১৯১৪), ঋতুমঙ্গল (১৯১৬), রসকদম (১৯২৩), হৈমন্তী (১৯২৪), লাজাঞ্জলি, ব্রজবেণু (১৯৪৫), চিত্তচিতা, পূর্ণাহুতি (১৯৬৮) ইত্যাদি তাঁর উল্লেখযোগ্য কাব্যগ্রন্থ। তিনি কালিদাসের শকুন্তলা, কুমারসম্ভব এবং মেঘদূতের অনুবাদ করেন। প্রাচীন বঙ্গ সাহিত্য পরিচয়, প্রাচীন বঙ্গ সাহিত্য, পদাবলী সাহিত্য, শরৎ-সাহিত্য ও সাহিত্য প্রসঙ্গ তাঁর সমালোচনা গ্রন্থ। তাঁর রচিত শিশুতোষ গল্পকাহিনীও আছে। ‘বেতালভট্ট’ ছদ্মনামে রচিত তাঁর রম্যরচনাগুলি পাঠকসমাজে খুবই সমাদৃত হয়েছে।সাহিত্যকর্মের স্বীকৃতিস্বরূপ কালিদাস বহু সম্মানে ভূষিত হয়েছেন। তিনি রংপুর সাহিত্য পরিষদের ‘কবিশেখর’ উপাধি (১৯২০), কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ‘জগত্তারিণী স্বর্ণপদক’ (১৯৫৩) ও ‘সরোজিনী স্বর্ণপদক’, বিশ্বভারতীর ‘দেশিকোত্তম’ উপাধি, পশ্চিমবঙ্গ সরকারের ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ (১৯৬৩) এবং রবীন্দ্রভারতী বিশ্ববিদ্যালয়ের সম্মানসূচক ডিলিট ডিগ্রি (১৯৭১) লাভ করেন। ১৯৭৫ সালের ২৫ অক্টোবর কলকাতায় তাঁর মৃত্যু হয়।