গদ্যানুশীলনে সুদীপ ঘোষাল

ভবঘুরে
কলকাতার কফি হাউসের সামনে লোকটা অনেক্ষণ ধরে দাঁড়িয়ে আছে। রবীন দেখেছে অনেক আগেই। খোঁচা দাড়ি আর ছিপছিপে লম্বা লোকটা একটা বিড়ি ফুঁকছে। রবীনের ইচ্ছে হলো লোকটার সঙ্গে একটু পরিচয় করার। কিন্তু লোকটা যদি বিরক্ত হয়। একটা দোটানা মনোভাব নিয়ে রবীন লোকটার কাছে গিয়ে বললো,কিছু খুঁজছেন নাকি?
লোকটা বেশ বিজ্ঞের মত উত্তর দিলো,আমরা সবাই তো খুঁজে বেড়াই। কি খুঁজে মরি জানি না। তবু খুঁজি।
লোকটার কথা শুনে রবীনের ভালো লাগলো। সে বললো,আসুন কফি হোক এক রাউন্ড।
লোকটা বললো, কেন, আপনি খাওয়াবেন? আমার পয়সা নেই।
রবীন বললো,আসুন আমার সঙ্গে। আমি আছি তো। আর আজ রবিবার। একটু আড্ডা মারা যাবে।
অন্য কেউ হলে হয়ত ভাবত অপরিচিত লোক। চোর, গুন্ডা হতে পারে? এড়িয়ে যায় অনেকে।
কিন্তু রবীন একটু ইন্টারেষ্টিং লোক দেখলেই আলাপ জমায়। ওর এটাই অভ্যাস।
রবীন বললো,আপনি কিছু বলুন।
লোকটি বললো,আমাকে সবাই তো চুপ করতে বলে। কথা বললেই খেপে যায়।আপনি আমাকে কিছু বলতে বলছেন।
—-হুম, বলছি। বলুন
—আচ্ছা আপনি আঁতেল দেখেছেন। বেশ বড় বড় কথা। আর কাজের সময় অষ্টরম্ভা।
—ঠিক, ঠিক
—- নিজের পুরনো জামার মায়া ছাড়তে পারে না। কোনোদিন একটা না খেতে পাওয়া লোককে খাওয়াতে পারে না। কোনো সামাজিক অবদান থাকে না। শুধু পয়সা কামাবার ধান্দা। প্রচুর পয়সার মালিক হয়ে, আদিরসে হাবুডুবু খেয়ে সবশেষে লাইনে দাঁড়ানো। ব্যস শেষ। আগুন, আগুন শালা মাটি চিনলো না অথচ মাটিতেই জন্ম।
রবীন ভাবছে, বাবা তুমিই বা কি এমন কাজ করেছো যে এত ফাটাচ্ছ।
লোকটি বললো,আমি এখন ভবঘুরে। বাবা, মা মরে যাওয়ার পর গাংপুরের তিরিশ বিঘে জমি অনাথ আশ্রমের নামে লিখে দিলাম। তারপর মনে করলাম, একটা পেট তো, ঠিক চলে যাবে। আমার দুটো রুটিতেই দিন কেটে যায়। পড়ে থাকি এদিকে ওদিকে। কোনো নিয়মে আটকা থাকতে পছন্দ করি না। কি হলো ভাট বকছি না তো। আপনি কিছু বলছেন না তো।
—না, মানে আমি বলছিলাম আমাদের একটি সংস্থা আছে। আমরা স্টেশনে ফুটপাথে অনাথ লোকদের জন্য মাঝেমাঝেই খাওয়ার ব্যবস্থা করি। আপনার মত লোক আমাদের প্রয়োজন। যদি সময় দেন তো ভালো হয়।
—কিন্তু মশাই, আমার এক জায়গায় বেশিদিন ভালো লাগে না।
—-যতদিন পারবেন, থাকবেন।
—বেশ চলুন।
এবার লোকটির থাকার ব্যবস্থা হলো রবীনের চিলেকোঠার ঘরে । খায় দায় গান গায়। মাঝে মাঝে কাজ করে। কিন্তু লোকটার চোখ মুখে পরিতৃপ্তির ছাপ নেই। একদিন রবীন ওর চিলেকোঠার ঘরে মারলো উঁকি। দেখলো লোকটা উবু হয়ে বসে দাগ কাটছে আঁকিবুকি। কৌতূহল হলো রবীনের। সোজা ঘরে ঢুকে বললো, কি করছেন কই দেখি। লোকটা কিছুতেই দেবে না। শেষে রবীন কোনোরকমে বুঝিয়ে হাতে কাগজটা নিলো। দেখলো সুন্দর সুন্দর ছবি আঁকা। আর ছবির তলায় দু লাইনের ছড়া। রবীন বললো,আপনি তো ছুপা রুস্তম। শিল্পী লোক। আপনার এলেম আছে বাপু।
লোকটি বললো,যখন ভালো লাগে, একটু আঁকতে বসি। আর কিছু নয়। চলুন আপনার কাজে যাই।
রবীন বললো,ওই কচি কাঁচা অনাথ ছেলেদের আপনি পড়ানোর দায়িত্ব নিন আর নানারকম ছবি আঁকা শেখান।
লোকটি বললো,বেশ, তাই হবে।
—তাহলে আজ থেকেই শুরু করুন।
লোকটি এক কথায় তিরিশ বিঘে জমির মায়া ছাড়তে পারে, যখন তখন সকলের মায়া কাটিয়ে ভবঘুরে হয়ে না খেয়ে জীবন কাটাতে পারে। রবীন ভাবে এইসব লোক সত্যিকার গুণি লোক। অথচ এদের সঠিক কাজে লাগাবার লোক নেই।
কি করে একটা লোক এরকম হতে পারে তার জানা নেই। সে সংসারী লোক। একটি পুত্রসন্তান ও মা আর স্ত্রীকে নিয়ে তার সংসার। মোটামুটি মাইনের, একটা কাজ করে। একটা অনাথ আশ্রমের সদস্য।
আজ অনাথ আশ্রমের আলোচনা সভায় রবীন লোকটির প্রসঙ্গ উত্থাপন করল। সকলে রাজী হল লোকটিকে আঁকার শিক্ষক হিসাবে রাখার প্রস্তাবে। লোকটির থাকা, খাওয়ার ব্যবস্থা করল আশ্রম। রবীন একটু হাল্কা হল। কয়েকদিন ধরেই লোকটার কথা চিন্তা করছে। আজ যা হোক একটা হিল্লে হল।