ছোটগল্পে সৈকত ঘোষ

এক অন্য জীবন

২৪এ সেপ্টেম্বর ,২০১৫ দিনটা সৌভিকের জীবনে সাংঘাতিক বিপর্যয় নেমে এসেছিল, চারিদিক তার কেমন স্তব্ধ হয়ে গিয়েছিল, পাগলের মতো লাগছিল ওর, সে যেন নিজের কাছে হেরে গেল এই জীবনের লড়াই এ, চুপ হয়ে গিয়েছিল, আর চোখের পাশ থেকে গাল বেয়ে অশ্রু ধারা বালিশ টাকে ভিজিয়েছিল, চারিপাশ থেকে শুধুই কান্নার আওয়াজ আর কিছু সজ্জন তখন তাকে দুঃখ ভোলানোর চেষ্টা করছে। সৌভিক উঠে তখন ও মায়ের মুখের দিকে তাকাতে পারেনি , সদ্য ঘন্টা খানেক হলো সে তার অতি পরম পিতা কে হারিয়েছে। খুব কঠিন পরিস্থিতি তেও নিজেকে বার বার সামলে নিলেও এবার আর হলো না , মন তছনছ হয়ে গেছে , চিৎকার করে কাঁদতে পারেনি , কিন্তু তার ভিতরে তখন যুদ্ধ চলছে। সাংঘাতিক অসুখে বাবা ভুগছিল, মৃত্যু আসন্ন জেনেও তবু লড়াই চালাচ্ছিল জীবিত রাখার, কিন্তু সে ব্যার্থ। মৃত্যুর আগের মুহূর্তটা ওকে সাংঘাতিক বিঁধে গেছে। বাবার শ্বাস রোধ হয়ে আসছে , অক্সিজেন নিতে অক্ষম ফুসফুসটা যখন ব্যার্থ হলো, তখন তার হাত চেপে ধরে তার বাবা শেষ নিঃশ্বাসটা ফেললো , সেই যন্ত্রনা হয়তো কোন দিনও সে ভুলবে না। তার মায়ের পাগলের মতো কান্না তাকে স্তব্ধ করে দিয়েছিল, ওর আর ওর মায়ের মাথার উপর থেকে বট বৃক্ষের অবসান হলো ওই দিন টায়।
খুব ছোট থেকেই চরম দরিদ্রতায় মানুষ হয়েছে সৌভিক। বীরভূম এর একটা ছোট্ট গ্রামে থাকত সে। কিন্তু তার বাবা মা কক্ষনো সেটা তার বা তার দিদি কে বুঝতে দেয়নি। সামর্থ মতো খাবার , জামাকাপড় ও শিক্ষা সবই দিয়েছে শত অনটন কে আড়ালে রেখে। তার বাবা একজন নিম্নবিত্ত চাষী ছিলেন আর মা গৃহবধূ । অনেক ছোট বেলা থেকেই সে ঠাকুমা ও বাবা মা এর ভালোবাসা পেয়েছিল। দাদুর মৃত্যু তার জন্মের আগেই, তাই দাদুকে দেখা বা দাদুর ভালোবাসাটা আর পেয়ে ওঠেনি। ছোট থেকে দিদির সাথে আর পাঁচটা ছোট ভাইয়ের মত ঝগড়া, মারপিট করেই কেটেছে। ছোট সংসার দারিদ্রতার মাঝেই অনেকটা সুখ , স্বল্প পাওয়ার মধ্যে অনেকটা আনন্দ ছিল। ধীরে ধীরে বড় হয়ে উঠেছে পড়াশোনা খেলাধুলা সবই করেছে। বিশেষ করে ক্রিকেটের প্রতি নেশা ছোট থেকেই । অনেক বড়বেলা অবধি খেলেছে, তখন বোধহয় ওর ক্লাস নাইন হাতই ভাঙল ক্রিকেট মাঠে। শৈশবে অত্যন্ত দুরন্ত ছিল সবার মতোই । আর একটা জিনিস যেটা ছিল ওর সবথেকে ভালোলাগার সেটা হলো, ছিপ দিয়ে মাছ ধরা সেটা বাবার থেকেই পাওয়া, ওটা আজ একই রকম আছে নেশা, শুধু সময়ের অভাব ও পরিস্থিতির চাপে কেমন বিলীন হয়ে যাচ্ছে এই ইচ্ছা গুলো। যত বড় হতে লাগলো সে বুঝতে শিখলো । শৈশবে পড়াশোনা টা খুব একটা ভালো না করলেও , বড় যত হলো উন্নতি করলো তত। বাবার সাথে চাষের কাজ ও করতো , আসতে আসতে কেমন যেন দায়িত্ব নিতে শিখলো বাবা মা এর। দিদির বিয়ে হয়েছিল ২০১০ এ অনেক বাধা বিপত্তির মধ্যেও সে এখন ভালোই আছে, সংসার আর এক কন্যা সন্তান নিয়ে। সৌভিক কে যেন ভগবান নিজের দায়িত্বে তৈরি করছিলেন ,তিনি মনে হয় জানতেনই তার উপরই সংসার এর চাপ এবার বর্তাবে। এরই মাঝে সে বিভিন্ন জায়গায় পড়তে যাওয়া, কম্পিউটার ক্লাস ,বিভিন্ন রকম ভাবে প্রশিক্ষিত করে তুলছিল। সে ও স্বপ্ন দেখেছিল কলেজ শেষ করে চাকরি করবে । বহু চেষ্টা করেছিল , কিন্তু অদৃষ্ট যেন তার দিকে তাকিয়ে হাসছিল । মানসিক ভাবে ভেঙে পড়েছিল সাংঘাতিক ভাবে। সম্ভবত ২০১৪ এর শেষের দিকে ওর বাবা সাংঘাতিক অসুস্থ হলো ফুসফুসের সংক্রমণ নিয়ে , প্রায় শয্যাশায়ী হলেন তিনি। আর সংসারের হাল তাকে ধরতেই হলো। তার ব্যাক্তিগত আয় নাই,এক প্রকার বাধ্য হয়েই পড়াশোনা কে পিছনে ফেলে,বাবার চাষের কাজ কে বেছে নিতে হলো শত অনিচ্ছা সত্ত্বেও। মেনে নিতে পারতো না, অনিদ্র রাত কেটেছে, এই মানসিক ও শারীরিক পরিশ্রমে সে ভেঙে পড়েছিল। যে ছেলেটা স্বপ্ন দেখেছিল অফিসে বসে কম্পিউটার চালানোর ,তারই হাতে উঠেছিল কোদাল। সবকিছু কে বিসর্জন দিয়ে চাষে মগ্ন করেছিল নিজেকে, বন্ধুরা তখন চাকরির চেষ্টায়, একটা অন্য জীবন কাটাচ্ছে, তখন সৌভিক ব্যাগ টা ছেড়ে স্প্রে মেশিন কাঁধে তুলেছে, কত জন কে সে দূরে সরে যেতে দেখেছে এই অসময়ে। তার এই পরিশ্রমের অভ্যাস ছিল না কোনদিনই , পরিস্থিতি তাকে টেনে এনেছিল কাদা মাটিতে। মা বাবা দেখে সহ্য করতে পারত না , বাবার হাত ধরে একদিন কেঁদে বলেছিল দেখ , হাত গুলোর কি অবস্থা কোদাল চালিয়ে ফোসকা উঠে লাল হয়েছে। বাবা মা এই কষ্ট মেনে নিতে পারত না , কিন্তু কিছু করার ছিল না, এছাড়া তাদের আর কোনো উপায় নাই, দুমুঠো অন্ন মুখে তুলতে গেলে। তার বাবার চিকিৎসার খরচও অনেক , যদিও তার আত্মীয়রা অনেক খানি তার পাশে দাঁড়িয়েছিল আর্থিক ভাবে। কিন্তু দিন আসতে আসতে ঘনিয়ে আসছিল সে বুঝেছিল। বাবার শারীরিক অবস্থার অবনতি দিন দিন হচ্ছিল। একটা দিন এমনই হলো ডাক্তারবাবু ওকে জানালো এই পেশেন্ট বাঁচানো খুব কঠিন । এই কষ্ট বুকে চেপেই বেরিয়েছে , লড়াই চালিয়েছে প্রকাশ করেনি কখনো পাছে বাবার কানে ওঠে। কিন্তু দিন যে শেষ, এগিয়ে এল সেই অন্ধকার দিন, ও বুঝেছিল আর বাবা থাকবে না , দুপুর গড়াতেই এই অঘটন। তার মাথায় বাজ পড়লো সব শেষ করে । শেষ হলো বাবাকে জীবিত রাখার লড়াই। সাংঘাতিক চেষ্টা করে যখন আর পারলো না সবাই স্তব্ধ হয়েছিল, তার দিকে চেয়ে।
‌ ১ এপ্রিল ২০১৬ , না কোনো এপ্রিল ফুল হয়নি ওর জীবনে। একটি আধাসরকারী সংস্থায় কর্মজীবন শুরু করলো, অল্প বেতন হলেও, যেটা ছোট থেকে চেয়ে ছিল সেটা পেয়েছিল সম্মান। মা ও খুব খুশি হয়েছিল, কিন্তু কষ্ট একটাই বাবা সারা জীবন কষ্ট টাই সহ্য করে গেল , তিনি হয়তো সবথেকে খুশি হতেন এই খবরে, এই দুঃখ টা তাকে কুঁড়ে কুঁড়ে খেত। ছয় মাস হলো বাবা কে হারিয়েছে ,কষ্ট টা একই রকম । বাবার মৃত্যুর পর শ্রাদ্ধ শান্তির কাজ মিটে যেতে তাকেই হাল ধরতে হবে সংসারটার। শোকস্তব্ধ মা এর কষ্ট ও তাকে বুঝতে হবে। সব কিছুই ভাবছিল কিন্তু যেন সোজা হয়ে দাঁড়াতে পারছিল না। আবার চাষবাস এ মন দিল সংসার চালাতে হবে , দুজনের সংসার চালাতে হবে তাকেই। এবার ভালোবেসেই চাষ টা শুরু করেছিল আর সাফল্য ও পেয়েছিল । পারিপার্শ্বিক লোক জনকে চমকে দিয়েছিল । কি ভাবে সম্ভব একজন তেইশ বছরের অনভিজ্ঞ চাষীর পক্ষে। কিন্তু সৌভিক বিশ্বাস করত তার বাবার আশীর্বাদ আজও তার সাথে । মাস না ঘুরতে সে আবার চাকরির খোঁজে বেরোতে লাগলো , সে বুঝেছিল আর সরকারি চাকরির আসায় বসে থাকলে হবে না । বহু পরিচিত জনকে বলেও কোনো লাভ হয়নি। হঠাৎ একটি ইন্টারভিউ এ সাফল্য আসে নিজের ই চেষ্টায় ও যোগ , যেটা তার এখন সবচেয়ে প্রয়োজন বাড়িতে মায়ের পাশে থেকে একটা কিছু করার , আসা পূর্ণ হলো । বাড়ি থেকে যাতায়াত যোগ্য এমনই চাকরি স্থান। প্রবল অন্ধকারে একটু যেন আলোর দেখা।
‌জীবন বদলাতে শুরু করলো , একটু একটু করে উন্নতি হতে লাগলো। সংসারের প্রয়োজন গুলো মিটছিল একটু একটু করেই। মা কে নিয়ে সব দুঃখ ভুলেও ভালোই ছিল। মা ও ভেবেছিল দুঃখ ঘুচলো। এখনো চাষবাস টা লোকজন দিয়ে ভালোই করে , তবে এখন অনেকটা ভালোবেসে করে। সে ভাবে কৃষিকাজ কোনো ছোট কাজ না , মানুষের মুখে অন্ন তুলে দেওয়ার মতো বড় কাজ আর কি আছে, উন্নত বিজ্ঞান পদ্ধতি কে কাজে লাগিয়ে আজ বেশ পরিচিত হয়েছে এই কৃষিকার্যে। একটু একটু করে শখ গুলোও মিটছিল। ওর মা খুব কষ্ট পেত ওর বয়সী সকলে মোটর গাড়ি চড়ে, ও কিন্তু সেই বাবার দেওয়া সাইকেলেই। মা এর ইচ্ছাটাও মিটল একটা মোটর বাইক এল অনেকটা কষ্ট করেই, কিন্তু অনেকনখানি আনন্দ। এই ভাবেই চলছিল দিনগুলি।
‌ কিন্তু সুখের কফিনে শেষ পেরেক টা ভগবান মেরেদিল, এটা কখনো ভাবতে পারিনি , স্বপ্নেও না। কথায় আছে দুঃখির কি আবার সুখ সয়। জীবনে একি সাংঘাতিক পরিস্থিতির সামনে নিয়ে এল, হসপিটালের ওয়েটিং রুমের চেয়ারে বসে ভাবছে সৌভিক আর চোখ দিয়ে ফোটা গুলো মার্বেলের মেঝেতে চকচক করছে , মা এর শরীর তখন ডাক্তাররা কাটছে, হ্যাঁ, ওর এক মাত্র অবলম্বন মা এখন কর্কট ক্যান্সারে আক্রান্ত। তারই এক মাস্তুত দাদার চেষ্টায় ধরা পড়ে। পরে অপারেশন বাধ্যতামূলক হয়ে পড়ে, মানসিক ভাবে ওর মা ও খুবই ভেঙে পড়েছিল আর এটাও বাস্তব। কিছুতেই ও মানতে পারেনা কেন এত কঠিন শাস্তি তাকে ভগবান দিচ্ছেন। দীর্ঘ পাঁচ ঘণ্টা কাটা ছেড়া শেষে ডাক্তার সাফল্য বললেও, রোগ তো কর্কট, কখন যে কি হয় কেউ জানে না। অনেক অর্থের প্রয়োজন তার এই মুহূর্তে যা তার সামর্থের বাইরে। কিছু আপন আত্মীয় ওর পাশে দাঁড়ায় ,কিন্তু বিশেষ করে ওর ওই ডাক্তার মাস্তুত দাদা যে নিরস্বার্থ ভাবে পাশে দাঁড়ায় । ওর মা এখন ওদেরই বাড়ি কলকাতা তে। ডাক্তার দের পরামর্শ মতো ক্যানসার প্রতিরোধী কেমো থেরাপি চলছে ,আজ তিন মাস তার মা বাড়ি ছাড়া। জীবনটা যে কত অসহায় তার এটা কেউই বুঝবে না। মানসিক ভাঙাচোরা গুলো কোনো কিছু দ্বারাই সম্ভব কিনা না আমার জানা নাই , কিন্তু এখন চেষ্টা সে চালাচ্ছে। একাকী প্রতিটিরাত জানে সে কত কঠিন ভাবে কাটাচ্ছে। দুঃখ একটাই নিজের মায়ের চিকিৎসা করানোর ক্ষমতা ওর নাই, এই সব সাত পাঁচ চিন্তা ওর মাথায় ঘুরপাক খাচ্ছে। নিয়মিত অনেক বার ফোনে কথা হলেও , যে মাকে ছাড়া থাকতে পারতো না এখন প্রতি তিন সপ্তাহে মায়ের সাথে দেখা হয় , কারণ অফিস ও ফাঁকা বাড়ি সামলাতে ওকে ঘরেই থাকতে হয়। আজ ও যাচ্ছে মায়ের কাছে কাল যে মায়ের কেমো থেরাপি , ওর পাশে থাকা আবশ্যক , নিজের শান্তির চেয়ে মায়ের শান্তি অনেক খানি ছেলেকে পাশে দেখে। কি যে হবে কি করবে এই ভেবে পথ চলেছে , ওর দুঃখ যে ভাগ নেওয়ার না , বোঝার না, কমানোর ও না।
‌ এখনো জানিনা ওর জীবনে আরো কি লিখেছে অদৃষ্ট। আর কত সহ্য করবে ??
ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।