গদ্যানুশীলনে সুদীপ ঘোষাল

শ্রাবণের ধারা
রিক্সা চালায় রঞ্জন। আজকে রোজগার ভালো নয়। ঘুরে ঘুরে বেড়ায় শহরময়। যদি কোন আরোহী মিলে যায়। হঠাৎ সে লক্ষ্য করলো এক জায়গায় অনেক ভিড়। কৌতূহলবশত গিয়ে দেখে একজন পথ দুর্ঘটনায় পড়ে আছে। রক্তাক্ত তার দেহ তবু কেউ তাকে তুলে হাসপাতালে নিয়ে যায় না। রঞ্জন মনস্থির করে ফেলে তাকে রিক্সায় তুলে নিয়ে যায় হাসপাতালে। সারাদিনে রোজগার সেই রোগীর পেছনে খরচ করে। সামান্য রিকশাচালক হলেও বড় মানুষ রঞ্জন। সকলেই তাকে চেনে ভক্তি শ্রদ্ধা করে। তারপর কাজ হয়ে গেলে বাড়ি ফেরে বিকাল চারটেয়। পরিবার তার অপেক্ষায় বসে থাকে। একসাথে সবাই মিলে খায় আর গল্প করে।আজকের খাবারের ব্যবস্থা না হয় হল কিন্তু আগামীকাল কি হবে এই ভেবে রঞ্জন রিকশা নিয়ে আবার বেরিয়ে পড়ে। বিকেলের দিকে ভালোই রোজগার করেছে সে। পরপর নতুন নতুন আরোহী পেয়ে সে উৎফুল্ল। সে জানে, নদীর একদিক পার ভাঙ্গে কিন্তু অন্য পার গড়ে।
বাড়িতে অসুস্থ মা সে দেখাশোনা করে দিনরাত বয়স্কা মহিলা প্রায় 90 বছর বয়স। বয়স্ক মা বিছানায় মলমূত্র ত্যাগ করেন রঞ্জনের মা। সে কিন্তু ঘৃনা করে না সে হাত দিয়ে পরিষ্কার করে মায়ের বিছানা। সে জানে, জ্যান্ত ভগবান বলতে এই মা-বাবা। শহরের লোকেরা রঞ্জন এইজন্যই খুব ভালোবাসে তারা জানি রঞ্জন এর মত মানুষ এই পৃথিবীতে দুর্লভ যারা নিজের কষ্ট মুখ বুজে সহ্য করে কিন্তু মানুষের কষ্ট তা দেখতে পারেনা দূর করার চেষ্টা করে।
তার স্ত্রী ও কন্যা কিন্তু খুব ভালো তারাও রঞ্জন কে সাহায্যের হাত বাড়িয়ে দেয়। দুই ভাই। এই ভাইকে, ভাইয়ের নাম সুমিত। রঞ্জন ছোটবেলা থেকেই মানুষ করে সুমিতকে। সেই তার বাবা সেই তার মা। তবু সুমিত রঞ্জন কে ভুলে গিয়ে নিজের সংসার নিয়ে ব্যস্ত। ভুল করে একদিন ও মায়ের খোঁজ নেয় না। তাতে অবশ্য রঞ্জন এর কোনো অভিযোগ নেই সেই নিজের কর্তব্য পালন করে যায় নীরবে নিঃশব্দে। কোন পুরস্কারের আশায় নয়, কর্তব্যে সে কোনদিন গাফিলতি করে না।
আজ শ্রাবণ মাসের সকাল। সকাল থেকেই ঝিরঝির করে বৃষ্টি পড়ছে আর এই বৃষ্টির মধ্যে মায়ের শরীর আরো খারাপ হয়ে অসুস্থ হয়ে গেল। তার মা সেই দিনই মারা গেলেন। এই ভরা বর্ষায় কোন লোক যাবে শ্মশানে রঞ্জন বড় চিন্তায় পড়ে গেল। কিছুক্ষণ এর মধ্যেই দেখতে পেল প্রতিবেশীরা সবাই একে একে জড়ো হয়েছে তার বাড়িতে। কোমরে গামছা বেঁধে শ্মশানে যাবার জন্য তৈরি হয়েই সবাই এসেছে কেউ পাশে থাকতে শুরু করলো। কেউ বা তার মায়ের মরদেহ ধরাধরি করে বাইরে নিয়ে এল। তারপর প্রতিবেশীদের সাহায্যে মায়ের মরদেহ কাটোয়ার শ্মশানে নিয়ে এলো। সেখানেই মরদেহ দাহ করার পর প্রতিবেশীরা নিজের নিজের খরচে খাওয়া-দাওয়া করলো। রঞ্জন বুঝতে পারল তার মায়ের আশীর্বাদ ঝরে পড়ছে তার মাথার উপর শ্রাবণের ধারার মতো। তার ছোট ভাই কলকাতা থেকে চলে এসেছে কিন্তু তার ভাগ্য খারাপ সে মায়ের মরা মুখ দেখতে পেল না। প্রতিবেশীরা কেউ তার সঙ্গে কথা বললো না মুখ ঘুরিয়ে নিল ভাই বুঝতে পারল তার ব্যবহারে সবাই ক্ষুব্ধ।
কাজ মিটে গেল কয়েকদিনে, 15 দিনের মধ্যে তারপরে ভাই চলে গেল রঞ্জন আবার একা হয়ে পড়ল রঞ্জন আবার তার প্রতিদিনের কাজ শুরু করল।রিক্সা নিয়ে সকালবেলা বেরিয়ে পড়ল হাসপাতালে মোড়ে। সেখানে লাইন দিল। লাইনে যখন আরোহী পাবে তখনই তার যাবার পালা।
রঞ্জন আশ্চর্য হয়ে গেল আজ তারিখ সায় প্রচুর আরোহী যাওয়া সকল লোক অনেক টাকা আয় করেছে বাড়ি ফিরল এইভাবে প্রত্যেকদিন তার আয় বাড়তে থাকল তারা আয় বাড়তে বাড়তে একটা মোটা অংকের টাকা জমে গেল। সে জমা টাকা দিয়েছে টোটো কিনলো।সে দিতে পারল মায়ের আশীর্বাদ শ্রাবণের ধারার মতো তার মাথায় ঝরে পড়ছে সে নির্ভীক হয়ে টোটো রিক্সা চালাতে লাগলো। টোটো রিক্সাতে একই ফল। প্রচুর যাত্রী তার গাড়িতে যাওয়া আসা করতে লাগল।
আর ব্যবহারে তার আন্তরিকতায় যাত্রীরা খুব খুশি তার ফলে রঞ্জনের টোটো গাড়ি যাত্রী হতো বেশি তার সঙ্গে আছে মায়ের আশীর্বাদ। এইভাবে সে একদিন টাটা সুমোর মালিক হয়ে গেল। এইভাবে আয় বাড়তে বাড়তে সে পাঁচ ছয়টা গাড়ির মালিক হয়ে গেল সে ভাবলো অনেক তো হলো এখন সমাজে কিছু মঙ্গল করে যেতে পারলেই ভালো।
রাস্তায় ফুটপাতে পড়ে থাকা উলঙ্গ প্রায় শিশুদের দেখাশোনার জন্য তার মন কেঁদে উঠলো সে ঠিক করলো আয়ের কিছু অংশ ও তাদের সেবার জন্য রেখে দেবে। রাস্তায় ফুটপাতে পড়ে থাকা অনাথ শিশুদের জন্য তার মন কেঁদে উঠলো। সে ঠিক করলো সে অনাথ শিশুদের দেখভালের দায়িত্ব নেবে। ধীরে ধীরে গড়ে উঠল একটা অনাথ আশ্রম। এক ব্যক্তি অনাথ আশ্রম এর জন্য জমি দান করলেন। রঞ্জন সেখানে গড়ে তুলল একটা অনাথ আশ্রম। সেখানে আয়ের কিছু অংশ মাসে মাসে দিয়ে আসে আর কিছু লোকজন রেখে দিলো তারা এই অনাথ আশ্রম দেখাশোনা করে। রঞ্জন এই আশ্রমের নাম রাখল মায়ের নামে তার মায়ের নাম ছিল গীতা। তাই এই আশ্রমের নাম রাখল, গীতা ভবন।
শহরের কিছু বেকার ছেলে ঘুরে ঘুরে বেড়াতো রঞ্জন তাদের দেখে একদিন ডেকে বলল তোরা একটা রেস্টুরেন্ট তৈরি কর আমি তোদের টাকা দিয়ে সাহায্য করবো। ছেলেরা সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেল তারা টাকা পেয়ে গেল এবং সঙ্গে সঙ্গে তাদের ব্যবসা শুরু করার কথা চিন্তা করল। বেকার ছেলেরা তৈরি করে ফেলল রেস্টুরেন্ট সেখানে খরিদ্দার ধীরে ধীরে যেতে শুরু করলো তারপর একদিন দেখা গেল বেশ ভিড় হচ্ছে সেখানে। শহরের বেকার ছেলেদের কাছে রঞ্জন একজন মহানায়ক হয়ে উঠল সকল বেকার ছেলে তার কাছে এসে সাহায্য চায় কেউ ফিরে যায় না রঞ্জন যথাসাধ্য সাহায্য করে।
সময় তো এগিয়ে যায় নদীর স্রোতের মতো। বন্ধু রমজানের সঙ্গে রঞ্জনের বয়সও বাড়তে থাকল। সে এখন গাড়ি গুলো ড্রাইভার রেখে চালায়। সে নিজে ড্রাইভ করে না। রমজান অনাথ আশ্রমের বাচ্চাদের দেখাশোনা করে। রঞ্জনকে সে খুব ভালবাসে। স্কুল বয়স থেকেই তার সঙ্গে বন্ধুত্ব। রমজান বিয়ে করেনি। এই আশ্রম এ কাজ নিয়ে সে ব্যস্ত থাকে। এই আশ্রমের কাজে সে আনন্দ পায়।
একজনের বয়স ষাট বছর হল। সে কঠিন পরিশ্রম করতে পারেনা কিন্তু আশ্রমের কিছু কাজ দেখাশোনা করে তারপর অবসর সময়ে রমজানকে সঙ্গে নিয়ে নদীর ধারে গিয়ে বসে সেখানে নদীর স্রোতের কুলুকুলু ধারায় মায়ের মুখদর্শন করে। তার কাছে মা হল দেবী, নদীর ধারে আসে দেবি দর্শন করে। এই দেবির শ্রাবণের ধারার মতো আশীর্বাদ তার মাথায় ঝরে পড়ে নিশিদিন।
সেভাবে প্রত্যেকে যেন তার মা-বাবাকে ঈশ্বরের মতো সেবা করে। ও মা বাবাকে যেন বৃদ্ধাশ্রমে যেতে না হয় প্রত্যেক পুত্র-কন্যারা যেন মা-বাবার গুরুত্ব বুঝতে পারে বয়স্ক বাবা-মা হলো বট গাছের মতো তারা আশ্রয় দেয় তারা অর্থ দিতে না পারলেও যে পরম আদরে সৎ উপদেশ দেন, সৎ চিন্তা সন্তানদের মধ্যে প্রোথিত করে চরিত্র গঠন করেন তার তুলনা মেলা ভার। সুস্থ সমাজ গড়ার কাজে এনাদের অবদান অনস্বীকার্য।
তাদের কোন সন্তানাদি নাই তারা স্বামী-স্ত্রী দুজনে সংসারের দুজন সদস্য মাত্র। তার সংসার হলো অনাথ আশ্রম। সেই অনাথ আশ্রম এ তারা স্বামী-স্ত্রী গিয়ে কাজ করে আনন্দ পায়। তাদের দেখে দুচোখ ভরে পুত্র-কন্যা সুখের আনন্দ অনুভব করে।
একটা দুটো সন্তান দিয়ে ঈশ্বর তাদের স্বার্থপর করে করে তোলেননি। শত শত শিশুর মধ্যে তারা পুত্র-কন্যার সুখের আস্বাদ অনুভব করেন। প্রচারবিমুখ তারা। ঘরের ভিতরে থাকতেই তারা ভালবাসেন তবু সাংবাদিকদের কৌতুহলের সীমা নেই কবে রঞ্জনবাবু সঙ্গে একটা সাক্ষাতকার নেবেন এই চিন্তা নেই তারা ব্যস্ত। তারা সুযোগের সন্ধানে থাকেন।
আশ্রমের বার্ষিক অনুষ্ঠানের সময় সাংবাদিকরা এসে রঞ্জন এর সাক্ষাৎকার নিলেন তারা পত্রিকায় প্রকাশ করলেন রঞ্জনের জীবনী। কিন্তু তিনি নির্বিকার। বন্ধু রমজানকে নিয়ে সেই নদীর ধারে বিকেলে চলে যান সেখানে বসে থাকেন। সন্ধধ্যা হলে তারপর ফিরে আসেন বাড়িতে। বাড়িতে এসেই কিছু খাওয়া-দাওয়া করে বেরিয়ে পড়েন অনাথ আশ্রমের উদ্দেশ্যে। সেখানে বাচ্চাদের নিয়ে সময় কাটান। প্রায় 12 টার সময় আবার বাড়ি ফেরেন। কিছু খেয়ে দেয়ে আবার শুয়ে পড়েন। সকালে উঠে আবার চলে আসেন অনাথ আশ্রমে।
সামনে একটা চপের দোকান সেখানে সকাল থেকেই ছেলেটি উনুন ধরিয়ে বেসন গোলে।এই চপের দোকান থেকেই তার সংসার চলে। রঞ্জন এর সাহায্যে এই ছেলেটি এর দোকান চালায়। যখনই বিপদে আপদে পরে রঞ্জন তাকে সাহায্য করে। রমজানের প্রয়োজনে তার কাজ করতেও কুণ্ঠাবোধ করেনা ছেলেটি। রঞ্জন কিছু বললে সে যেন হাতে স্বর্গ পেয়ে যায়। তার খুব ভালো লাগে রঞ্জন এর কাজ করতে।
কোন মানুষ কোন বিপদে পড়লে রঞ্জন এর সাহায্য আর রমজানের ভালোবাসায়, রঞ্জনের আন্ততরিকতা শ্রাবণের ধারার মতো তার মাথায় পড়ে। সে কোনদিন কার্পণ্য করেনি তাদের সাহায্য করতে। রঞ্জন জানে সে ঈশ্বরের করুণায় সমস্ত কিছুর মালিক। আবার মানুষরূপী ঈশ্বরের সেবায় সেই পাওয়া অর্থ সে বিতরণ করতে কোনদিন কার্পণ্য করেনা। তার সমস্ত কিছুর বিনিময়ে সে শুধু পেতে চায় ভালোবাসা।
স্ত্রী অনিমা বাড়িতে বসে থাকে না। সে রঞ্জন এর সঙ্গেই অনাথ আশ্রমে চলে আসে সেখানে কাজে নিজেকে নিয়োজিত করে। এইভাবে সে সংসারের যাবতীয় কাজ করে। সংসারের কাজ করে আনন্দ পায়। সেই আনন্দের অংশীদার সকলকে ঈশ্বরের করুণায় সিক্ত করতে চায় তার মন।
অনিমা রঞ্জনকে বলে, চলো আমরা একদিন বাইরে বেড়াতে যাই।রঞ্জন বলে, চলো।
বেড়াতে গিয়ে মন্দিরের সামনে অনেক ভিখারি দেখে রঞ্জন অনিমাকে বলল, এইতো মানুষ, মানুষের জীবনের তলায় যে পাক আছে সেখানে চেষ্টা করলে পদ্ম ফুল ফোটানো যায়। মানুষ যখনই পদ্ম ফুলের সুগন্ধে মোহিত হয়ে পড়ে সে ভুলে যায় স্বার্থপরতা হিংসা ঘৃণা।
হাজার হাজার লক্ষ লক্ষ কোটি কোটি মানুষের মধ্যে পার্থক্য ধরা যায় তখনই যখন হৃদয় কুসুম ফুটে ওঠে আনন্দে, গানে। যারা ভালো মানুষ তারা পাঁককে অস্বীকার করে না। তারা এই পঙ্ক সহ্য করে, তার মধ্যে পদ্ম ফুল ফুটিয়ে তোলে। তাই তারা মহান। তারা মহাপুরুষ হয়ে যায়। রঞ্জন আরো বলে, শতশত অনাথ শিশুদের সহ্য করতে শিখেছ তাদের ভালবাসতে শিখেছি তোমার জন্ম, সার্থক তাই তুমি আমাকে সদা সর্বদা সাহস জুগিয়েছ। পৃথিবীতে যে কোন ভাল কাজের জন্য নারীর অবদান অনস্বীকার্য। পৃথিবীর সমস্ত নারীদের আমি প্রণাম জানাই। এই নারী হতে পারে আমার মা দেশের মা মাসি পিসি বোন দিদি বা আমার অপরিচিতা কেউ।
অনিমা বলেন,এই মানুষের ছবি আঁকতে কবি-লেখক শিল্পিরা ব্যস্ত। ব্যস্ত এই মানুষের সেবা করার জন্য। মানুষের সেবা করলেই ঈশ্বর বা আল্লা বা খ্রীষ্টের সাধনা করা হয়। অনিমা বাগানে এলেন। সেখানে দেখলেন বাগান জুড়ে গাছ গাছালির উপরে মেঘ থেকে শ্রাবণের শীতল ধারা নেমে আসছে। ভিজিয়ে দিচ্ছে বাগানের তথা আশ্রমের নব বীজের অঙ্কুর। শ্রাবণের ধারায় সিক্ত বীজগুলো আলোর বাসনায় কেমন মরিয়া হয়ে উঠেছে।
আশ্রম চলে নব নব আশায় সিক্ত হয়ে । দিন আসে, দিন যায়….