সাপ্তাহিক ধারাবাহিক উপন্যাসে সুদীপ ঘোষাল (পর্ব – ১৭)

তান্ত্রিক পিসেমশাই ও আমরা দুজন

২৬
পিসেমশাই আজ রতনদের বাড়িতে এসেছেন। রাতে থেকে আমাদের নিয়ে যাবেন দূরের এক গ্রামে। যেখানে কয়েকদিন ধরেই ভৌতিক একটা ব্যাপার ঘটছে। সকলে মিলিত হয়ে পিসেমশাইকে ডেকেছেন যথারীতি অগ্রিম টাকা দিয়ে। ডাকসাইটে নামকরা তান্ত্রিক টাকাপয়সা গরীবদের কাছে নেন না। তবে স্বেচ্ছায় কেউ দিলে নিয়ে নেন। কারণ নিজেরও পেট বলে একটা কথা আছে। তারপর সকাল হলো। আমরা গেলাম ঠিক বেলা দশটা নাগাদ। পিসেমশাই বাড়িতে ঢুকেই একটা আঁশটানি গন্ধ পেলেন। আমাদের বললেন কিন্তু আমরা কিছু টের পাই নি।তান্ত্রিকের সঙ্গে এইটাই তফাৎ আমাদের। পিসেমশাই প্রশ্ন করে জানতে পারলেন গত দুমাস আগে এই বাড়ির মেয়েটা গলায় দড়ি দিয়ে মরেছে। তার অপআত্মা এখনও ঘুরে বেড়ায় মায়ার টানে। পিসেমশাই হোম শুরু করলেন উপবাস করে। আমরা চুপচাপ বসে আছি। হঠাৎ বাড়ির রান্নাঘরে আগুন লেগে গেলো। প্রায় চারঘন্টা হোম করার পরে পিসেমশাই বললেন, আর ভয় নাই।অনিষ্ট কিছু হতে পারে তাই হয়েছে। তা না হলে প্রাণে মরত এ বাড়ির সকলে। পিসেমশাই আরও বললেন, মন থেকে থেকে যদি বিচিত্র আওয়াজ শোনেন ফাঁকা বাড়িতে, তবে নিশ্চিত হন, সেটা ছুঁচোর কীর্তি বা বিড়ালের ডাক কি না। তাতে যদি সন্দেহ না-মেটে, তবে সাবধান। আর একটা ব্যাপারেও তিনি খেয়াল রাখতে বলেছেন, যদি হঠাৎ হঠাৎ বাড়ির ভিতরে শীত বোধ হয় গরমকালে, তা হলে সমস্যা রয়েছে। তবে এটাও ঠিক, সামান্য ঠান্ডা অনুভব করা মানেই তেনারা এসে গিয়েছেন, তা একেবারেই ঠি নয়।
বাড়ির মহিলাটি বললেন, হঠাৎ কোনও বিশেষ গন্ধ পাওয়া যেত উগ্র এ বাড়িতে। আবার কওনও সুগন্ধ। রাতে মনে হত ছাদে নুপুর পরে কেউ ঘুরছে। পিসেমশাই বললেন, গন্ধপিশাচ হতে পারে।আমার মতে বিশেষত, আপনার কোনও অনুপস্থিত প্রিয়জনের সুবাস যদি ঘ্রাণেন্দ্রিয়ে ধাক্কা মারে, তা হলে সাবধান। গন্ধটা খুবই সন্দেহজনক বলে জানবেন।পিসেমশাই মহা তান্ত্রিক এবার বললেন, একটি নতুন গল্প।ভয়ংকর এক নরখাদকের কাহিনী। সারা পৃথিবী জুড়েই নরখাদকদের সন্ধান পাওয়া গেছে। তাদের পাওয়া গেছে ফিজি, আমাজন অববাহিকা, আফ্রিকার কঙ্গোতে। এমন কি নিউজিল্যান্ডের মাওরি জনগোষ্ঠীর মধ্যে মিলেছে নরখাদকের সন্ধান। ইউরোপের হল্যান্ডেও সন্ধান পাওয়া গেছে।শোনা যায় উগান্ডার স্বৈরাচারী রাষ্ট্রনায়ক ইদি আমিনও নাকি নরখাদক ছিলেন।প্রত্যেকটি মানুষকে খাওয়ার পর সর্দার রাতু উদ্রে উদ্রে তার শিকারের স্মৃতিতে একটি করে পাথর সাজিয়ে রাখতো। তারপর খেয়ালখুশি মত গুনতে বসত, এ পর্যন্ত কটা মানুষ খেল সে। সে চাইত তার মৃত্যুর পর তাকে যেন এই পাথরগুলির পাশে কবর দেওয়া হয়। হয়েছিলও তাই। মৃত্যুর পর উদ্রে উদ্রেকে উত্তর ভিটিলেভুর এলাকার সেই পাথরের স্তূপের মধ্যে সমাধিস্থ করা হয়েছিল।উদ্রের উদরে যাওয়া সমস্ত হতভাগ্যই ছিল, আফ্রিকার আদিবাসী গোষ্ঠী সংঘর্ষে হেরে যাওয়া যুদ্ধবন্দী।
রতন বললো, আপনি আগেও বলেছিলেন, উদ্রের দলে থাকা সাকানাকার অনান্য আদিবাসী সর্দাররা তাদের জীবিত বন্দী ও মৃত শত্রুর দেহ উদ্রে নরখাদকের হাতে তুলে দিত। মৃতদেহগুলির সৎকারের জন্য নয়, স্রেফ খাওয়ার জন্য।টেরিওকে উদ্রের ছেলে কাভাতু বলেছিল, তার নরখাদক পিতা মানুষের মাংস বিশেষ করে নারীর মাংসল দেহ ছিন্নভিন্ন করেখেত। তার নরখাদক বাবা হতভাগ্য মানুষদের পুরো শরীরের প্রত্যেকটি অঙ্গপ্রত্যঙ্গই আগুনে ঝলসে খেত। একেবারে একটা দেহের সব মাংস খেতে না পারলে অর্ধভুক্ত দেহ্টি একটা বাক্সে তুলে রাখত। কিন্তু পরে পুরোটা খেয়ে নিত।
পিসেমশাই বললেন, তার পরিণতি ভয়ংকর হয়েছিল। মৃত মানুুষের আত্মাগুলো তখন ভূত হয়ে ঘুরে বেড়াত। তারপর ঘুরতে ঘুরতে একদিন সেই নরখাদকের গলা টিপে ধরে এবং সেই আত্মাদের হাতেই তার মৃত্যু হয়। তাকে পাওয়া যায় ছিন্নভিন্ন অবস্থথায়। একদম টুকরো-টুকরো অবস্থায় তার হাত-পা সব ছিন্নবিচ্ছিন্ন আঙুলগুলো এদিক ওদিক ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল এমনই পরিণতি তার একদম সত্যি ঘটনা।
রতন আর আমি ছাদের উপরে বসে আমরা এই সব কথাগুলো শুনছিলাম তারপর সন্ধ্যে হয়ে গেলে আমরা ফিরে এলাম। পিসেমশাইয়ের আর এক বন্ধুর বাড়িতে। তারপর খাওয়া-দাওয়া করে ঠিক এগারোটার সময় শুয়ে পড়লাম।তার বন্ধু আমাদের একটা আলাদা ঘর দিয়েছিল। তিনজনই ছিলাম ঘরে। আমরা মেঝেতে বসে ছিলাম। তারপর ঠিক বারোটার সময় আমরা দেখলাম আমাদের দেহে ভেতরে কত জোঁক। অনেক রক্তচোষা জোঁক জমা হয়েছে। পিসেমশায় বলছেন এত জোঁক কেনরে? তখন বললাম যে আমাদের মারতে চাইছে কেউ। পিসেমশাই বললেন দাঁড়া তাড়াহুড়ো করিস না। একটু পরেই ঠিক হয়ে যাবে তারপর দেখলাম তিনি সাধনায় বসলেন। অল্প কিছুক্ষণের মধ্যেই জোঁকের সংখ্যা কমে গেল।পিসেমশাই কিন্তু সাধনা ভেঙে উঠলেন না তিনি মারণ, উচাটন শুরু করলেন।এক ঘন্টার পরে পিছনের ঘর থেকে বন্ধু চিৎকার করে বললেন, কেন রে এত সাপ কেন? ঘরের মধ্যে দেয়ালে একটার পর আর একটা সাপ আমার উপর দিয়ে নেমে আসছে নিচে।পিসেমশাই চুপ করে থাকলেন কোন উত্তর দিলেন না পরদিন সকালে উঠে আমাদের নিয়ে ব্যাগ নিয়ে একদম বাইরে বেরিয়ে এলেন তখন পিছনে বন্ধু বলছেন এই নে চা আর বিস্কুট খেয়ে যাবি । পিসেমশাই বন্ধুকে বললেন খুব সাবধান আবার যদি আমি পাঁচ মিনিট দাঁড়ায়, তোর কিন্তু জীবনের সংশয় হবে।তারপর পিসেমাশায়ের বন্ধুটি আর কোন কথা বলল না।আমরা সকলে বাইরে বেরিয়ে এসে হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম।রতন বললো, বাবা রে, এমন জায়গায় ঢুকেছিলাম কি করে বেরিয়ে আসবো চিন্তা করছিলাম।পিসেমশায় বললেন ওকে আর কোন দিন ঘুরে এইসব লোকের ক্ষতি করতে হবে না। তার কারণ তিনদিনের মধ্যেই ভূত হয়ে যাবে।আমরা ওদের গ্রামের একটা লোকের মুখে অনেকদিন পর শুনেছিলাম লোকটি নাকি মরার পরে ভূত হয়ে শেওড়া গাছে বসে থাকে । পিসেমশায় আধা হিন্দিতে বললেন, ঠাট্টা কা কথা নেহি,সিরিয়াস ব্যাপার হ্যায় তন্ত্র জগতমে।তিনি বাংলা হিন্দী মিশিয়ে এক জগাখিচুড়ী ভাষা তৈরি করেন আমাদের হাসাবার জন্য। রতন কাছেই ছিলো। পিসেমশাই বললেন, কি রতন কিছু বলবে? রতন বললো, আমি বোকা। অত কিছু বুঝি না। কিন্তু আপনার সঙ্গে থাকতে ভালো লাগে। কত কিছু শেখা যায়।পিসেমশায় বললেন, বিদুরের নাম শুনেছো? আমি বললাম, হ্যাঁ উনি তো পন্ডিত ছিলেন। ন্যায়পরায়ণ ছিলেন। রতন বললো, বিদুর মহাভারত মহাকাব্যে ধৃতরাষ্ট্রের ভাই। আসলে তিনি ছিলেন দাসিপুত্র। পিসেমশাই বললেন, হ্যাঁ আরও অনেক ঘটনা আছে। তবে সে প্রসঙ্গে না গিয়ে তাঁর বাণীগুলো বলি। কিছু শিখতে পারবে। তিনি বলতেন, যার মধ্যে অনেক জ্ঞান আছে সে জ্ঞানী। আর জ্ঞানের সঠিক ব্যবহার করতে পারলে বুদ্ধিমান। আর যারা তার সঠিক ব্যবহার করতে পারেন না তাঁরা বোকা। যে মানুষ সফল সে সমস্ত নেতিবাচক ভাবনা থেকে বহুদূরে থাকে। আর জীবনের প্রথম দিন থেকে বেড়ে ওঠাই তাঁদের মূল লক্ষ্য হয়ে ওঠে তাঁরাই বুদ্ধিমান। কিন্তু বোকা মানুষ চিনতে গেলে তার কিছু লক্ষণ রয়েছে। যাঁদের মধ্যে এই লক্ষণগুলো রয়েছে তাঁরাই বোকা। ধৃতরাষ্ট্রের সৎভাই বিদুর মহাভারতের একটি গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র। তিনি বলে গেছেন বোকা মানুষের সাতটি লক্ষণ রয়েছে। এখন দেখা যাক সেগুলি কী কী যে ব্যক্তি সর্বদা অজান্তে আত্মঅহংকার নিয়ে বাস করেন এবং পরিশ্রম না করেই ধনী হতে চান। এ জাতীয় ব্যক্তিকে বোকা বলা হয়। যে ব্যক্তি তাঁর নিজের কাজ ছেড়ে অন্যের কর্তব্য পালন করেন এবং বন্ধুদের সঙ্গে সময় কাটান। তাঁরা বোকা। এ ছাড়া যারা সর্বদা ভুল কাজ করে চলেন তাঁদের বোকা বলা হয়।এমন ব্যক্তি যে নিজের প্রয়োজনের চেয়ে বেশি দাবি করে এবং নিজের চেয়ে ক্ষমতাবান লোকের সঙ্গে শত্রুতা করে। সেই ব্যক্তিকে বোকা বলে মনে করা হয়।যে ব্যক্তি তার শত্রুকে বন্ধু তৈরি করে এবং তার জন্য বন্ধুদেরও ত্যাগ করেন। যাঁরা ভুল সংস্থাকে অবলম্বন করেন তাঁদেরই বোকা বলা যায়।যে ব্যক্তি নিজেকে সবোর্চ্চ দেখানোর চেষ্টা করেন তাঁদের বোকা বলা হয়। যে ব্যক্তি ভুল করে অন্যকে দোষারোপ করে এবং সর্বদা তার ভুলগুলি আড়াল করার চেষ্টা করে এমন ব্যক্তিকে মূর্খ বলা হয়। যে ব্যাক্তি নিজের বাপকে অসম্মান করে এবং অজ্ঞ লোককে প্রাধান্য দেয় তাকে বোকা বলে।

ক্রমশ…

ফেসবুক দিয়ে আপনার মন্তব্য করুন
Spread the love

You may also like...

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *

কপি করার অনুমতি নেই।