T3 শারদ সংখ্যা ২০২২ || তব অচিন্ত্য রূপ || বিশেষ সংখ্যায় সুদীপ ঘোষাল

বিপন্ন সমাজ
অজিত দেখল চারটে কুকুর ভাগাড় থেকে আনা একটা গরুর ঠ্যাং নিয়ে কামড়াকামড়ি করছে।
অজিত ভাবে, লাইনের ধারে গিয়ে দূরে কোথাও ছুঁড়ে ফেলে দিলেই হবে এটা। তা না হলে ঝামেলা হবে হয়তো।অজিত রেললাইন ধরে চলতে থাকল আর ভয়ে ভয়ে কুত্তাগুলোকে ঢিল মেরে তাড়িয়ে তারপর জল দিয়ে শনি মন্দির পরিষ্কার করে নিজের গামছায় গরুর ছোট ঠ্যাং বেঁধে নিল। সে ভাবল এটা ফেলতে না পারলে অশান্তির সৃষ্টি হবে। অজিত দেখল শনি মন্দিরে কয়েকটা কুকুর এখনও আছে।হাতকাটা বিলু অজিতের পাশে এসে বলল,তোর গামছায় কি রে?
আমি বাড়ি ফিরছিলাম গলির পাশ দিয়ে। শনি মন্দিরে কুকুরে গরুর হাড় ফেলেছিল, আমি শনি মন্দির থেকে তুলে গামছায় বেঁধে, ফেলবো বলে যাচ্ছি।
বিলু বলল,ওরে আমার খোকা।
মুখ বিকৃত করে বলল, তুই এটা পেলি কোথায় বল ঠিক করে।
আবার গামছা খুলে দেখলো যে একটা গরুর ঠ্যাং ওর গামছার মধ্যে বাঁধা আছে।
অজিত গামছায় বেঁধে কোথায় যাচ্ছে বলল তবু বিলু নাছোড়বান্দা। সে বলল,আর গামছায় কি আছে দেখা।
— আর কিছু নেই গো। তোমাকে দেখাবো কেমন করে
– আমাকে না দেখালে কিন্তু বিপদে পরবি, দেখা
তারপর সেই দিক থেকেই আসছিল হিপিকাট গুলু।
কিন্তু হাত কাটা বিলু অজিতের একথা বিশ্বাস করল না। সে বলল চালাকি করার জায়গা পাওনি কোথায় কত টাকা মাল্লু পেয়েছো বল। কত টাকা পেয়েছিস যে তুই এই কাজটা করতে এসেছিস, আমাদের শনি মন্দিরে গরুর ঠ্যাং দিয়ে অপবিত্র করা। পাজি শয়তান।
তাড়াতাড়ি মোবাইল ফোনটা বের করে মিনিটের মধ্যে ডেকে আনল তার সাঙ্গপাঙ্গদের।
অজিত বোকার মতো দাঁড়িয়ে রইলো না না আমি ভালো কাজ করতে গিয়ে বিপদে পড়লাম। এটা কাজটা করেছি আমি তার কারণ এই গরুর হাড় আমি দূরে ফেলে দেবো। ভাবলাম তাহলে আর কোন ঝামেলা হবে না।হাড়টা লাইনের ধারে ফেলে দেবো বলে নিয়ে এসেছি, যাতে তোমাদের মধ্যে কোন ভুলবোঝাবুঝি বা ঝামেলা না হয়। কিন্তু চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী। তারা সবাই চলে এলো এবং মারমুখী হয়ে তাকে দু চার ঘা বসিয়ে দিলো। অজিত বলল আমাকে মেরো না আমি এটা নিয়ে গিয়ে ফেলে আসছি। বোঝো না তুই নাম বল তার, কে তোকে এই কাজের প্রেরণা জুগিয়েছে। নিশ্চয়ই বেটা টাকাপয়সা নিয়েই কাজ করেছিস।
এই ভাবেই আমাদের ঝগড়াগুলো লাগে। কিন্তু চোরে না শোনে ধর্মের কাহিনী হাত কাটা বিলু বলল,একে ক্লাবে নিয়ে চল। অজিত একটু আড়ালে গিয়ে প্রস্রাব করে এল, ওদের পারমিশন নিয়ে।তারপর গামছায় হাত মুখ মুছে রেডি হল ক্লাবে যাবার জন্য।
আসলে শনি মন্দিরের একটা ইতিহাস আছে।হাতকাটা বিলু ভাবল, আমার কাজ করার সামর্থ্য নেই।একটা মন্দির করে ধূমধাম করে পুজো দিলে প্রণামীর টাকায় বিন্দাস চলে যাবে।
পুরোহিত বলেছিল,খবরদার না।ঠাকুর নিয়ে ছেলেখেলা করো না।
পুরোহিতবললেন,শনি একজন দেবতা যিনি সূর্য ও তার পত্নী ছায়াদেবীর, সূর্যদেবের স্ত্রী ও দেব বিশ্বকর্মার কন্যা দেবী সংজ্ঞার ছায়া থেকে সৃষ্ট দেবী ছায়া,পুত্র, এজন্য তাকে ছায়াপুত্র-ও বলা হয়। শনিদেব, মৃত্যু ও ন্যায় বিচারের দেবতা বা ধর্মরাজ ও যমুনা দেবীর অনুজ ভ্রাতা।ব্রহ্মবৈবর্ত পুরাণ মতে একদিন শনির ধ্যানের সময়, তার স্ত্রী দেবী ধামিনী সুন্দর বেশভূষা নিয়ে তার সামনে এলে ধ্যানমগ্ন শনিদেব সেদিকে খেয়াল না করাতে পত্নী ধামিনী বা মান্দা শনিদেবকে অভিশাপ দিলেন, আমার দিকে তুমি ফিরেও চাইলে না। এরপর থেকে যার দিকে চাইবে, সে-ই ভস্ম হয়ে যাবে। কোনো কোনো মতে মনে করা হয় যে এটি মঙ্গলদোষের প্রভাবে হয়েছে। মধ্যযুগীয় গ্রন্থ মতে শনি হলেন একজন দেবতা, যিনি দুর্ভাগ্যের অশুভ বাহক হিসেবে বিবেচিত হন। কিন্তু তা প্রকৃতপক্ষে সত্য নয়। শনি ভালোর জন্য ভালো আর খারাপের জন্য খারাপ। তিনি খুব ধৈর্যশীল ও বুদ্ধিমান।তিনি মহাদেব হতে বক্রদৃষ্টির বর পেয়েছিলেন, যা ব্যক্তিকে সঠিক পথে নিয়ে আসে। উল্লেখ্য, কর্মফল দিতে গিয়ে তিনি অনেকের রোষানলে পড়লেও কখনোই সত্যের পথ থেকে তিনি বিচ্যুত হননি। অতএব শনিদেবতা নিয়ে ছেলেখেলা কোরো না।
ল্যাংড়া কার্তিক রেগে বলল,বেশি পাকামি নয় পুরোহিত। তোমার মেয়ে বারোক্লাসে পড়ে,এদিকেই যায়।মন্দির হলে বিপদে পড়বে না।তা না হলে বুঝতেই পারছ।দেবতার কোপে মেয়ের সর্বনাশ হবে।
হিপিকাট বেলবটম প্যান্ট পরে খিকখিক করে হাসতে লাগল।ভয়ে পুরোহিত পুজো করে এখনও।
সুবোধ অজিত ক্লাবে এল।
হিপিকাট বলল,সত্যি করে কাশ তো মাইরি।কতটাকা নিয়ে গরুর হাড় ফেলছ মন্দিরে। জল দিয়ে পরিষ্কার করে গামছাটা গোল করে নিয়ে জলে ধোব বলে লাইনের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলাম।
– না তুই তো আমাকে বললি এই হাড়টা লাইনের ধারে ফেলব।
– না তাতো আমি বলিনি তুমি ভুল শুনেছ । তখনই কুকুরগুলি আবার ওই হাড়টা নিয়ে চলে গেল।
হাত কাটা বিলু বলছে, না দেখলাম তোর গামছায় বাঁধা ছিল হাড়টা।
অজিত বলে,যখন কুকুরগুলো হাড় মন্দিরে আনছে তখন আমি জল দিয়ে ধুয়ে দিলাম তারপর আবার অজিত সকলকে বলল বিশ্বাস করো আমি যা বলছি সব সত্যি।
অজিত জানে দাঙ্গা লাগাতে পারলে এরাই লুটপাট করবে,ধর্ষণ করবে,আগুন লাগাবে।সহজ,সরল মানুষ জীবন নিয়ে আনন্দে থাকে।তারা এসব ঝামেলা কেউ পছন্দ করে না। এইসব হাতকাটা বিলুদের মত,খুনী,লুটেরাদের কোন জাত নেই,ধর্ম নেই,দেশ নেই।এরা শুধু সমাজকে ফোঁপরা করে লুটেপুটে খায়।পৃথিবীতে দুটো দল আছে,একটা মানুষের দল আর একটা অমানুষের দল।আর এরা হল অমানুষের দল।এবার বিলু বলল,বের কর গামছা খুলে মাংসখন্ডটা। অজিত বলল,কী সব আজেবাজে কথা বলছ।বিলু বলল,গরুর ঠ্যাং রেখে ঝামেলা পাকাবি বেটা।অজিত বলল,কোথায়, গরুর ঠ্যাং, দেখাও তো? সকলে তন্ন তন্ন করে খুঁজেও গরুর হাড়টা খুঁজেও পেল না।